অনিন্দ্য হাজরা

‘তোরা বাংলাদেশি! এখানে কী করছিস? বাংলায় কথা বলতে চাইলে বাংলাদেশ চলে যা। নইলে এনআরসি করে তোদের তাড়ানো হবে। চল ফোট।’

খাস কলকাতার বুকে দাঁড়িয়ে ঠিক এই ভাষায় হুমকি শুনতে হয়েছে বাঙালি পড়ুয়াদের। শুধু হুমকি শোনাই নয়, বাংলা বলার অপরাধে হিন্দিভাষী দুষ্কৃতীদের হাতে মারও খেতে হয়েছে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই পড়ুয়াদের। ঘটনার সূত্রপাত বুধবার রাতে, যার রেশ গড়ায় বৃহস্পতিবার ভোর অবধি।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কারমাইকেল হোস্টেলের কয়েকজন আবাসিক পড়ুয়া বুধবার রাত এগারোটা নাগাদ শিয়ালদা চত্বরের শিশির মার্কেটে মোবাইলের কভার কিনতে যান। জিনিসের দাম নিয়ে কয়েকজন বিক্রেতার সঙ্গে তাঁদের বচসা হয়। রাজ্যের বিভিন্ন জেলার মফস্বল এলাকা থেকে আসা পড়ুয়াদের অভিযোগ, তাঁরা হিন্দি জানেন না বলে বচসার সময়ে উত্তেজিত দোকানিদের সঙ্গে বাংলা ছাড়া অন্য কোনো ভাষায় কথা বলতে পারেননি। সেই শুরু। দাম নিয়ে শুরু হওয়া ঝামেলা ক্রমে গড়ায় ‘তোরা হিন্দি জানিস না? বাংলায় কথা বলছিস কেন? তোরা বাংলাদেশি’ – এই কথার দিকে।

এখানেই শেষ নয়। উত্তেজনার পারদ চড়তেই দোকানের নিচ থেকে বেরিয়ে আসে হকি স্টিক, লোহার রড। কোমর থেকে বেরোয় দেশি পিস্তল, যা চালু লব্জে ওয়ান শটার। রাস্তায় ফেলে পেটানো হয় পড়ুয়াদের। আক্রান্তদের মধ্যে একজন মোবাইলে ভিডিও করছিলেন, তাঁর ফোন কেড়ে নিয়ে সেই ভিডিও ডিলিট করানো হয়। তারপর আক্রান্ত ছাত্ররা ফোন করে হোস্টেলের অন্যান্য আবাসিকদের ঘটনাস্থলে উদ্ধারের জন্য ডাকেন। বন্ধুদের উদ্ধার করতে আসা সেই পড়ুয়াদেরও মারধর করা হয়। এই হামলায় প্রায় দশজন পড়ুয়া গুরুতর জখম হন। তাঁদের পরবর্তীকালে ন্যাশনাল মেডিকাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়।

পালটা বিক্ষোভে ফেটে পড়েন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়ারা। ততক্ষণে যদিও দুষ্কৃতীরা পালিয়েছে। এরপর আবির্ভাব ঘটে মুচিপাড়া থানার পুলিসের। এক ভাইরাল ভিডিওতে দেখা গিয়েছে, আক্রান্ত পড়ুয়াদেরই আঙুল উঁচিয়ে শাসাচ্ছেন সাদা পোশাকে থাকা পুলিসকর্মীরা। অভিযোগ, পড়ুয়াদের সঙ্গে অভব্য আচরণও করা হয়।

এরপর মুচিপাড়া থানায় গিয়ে অবস্থানে বসেন পড়ুয়ারা। ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন ভারতের ছাত্র ফেডারেশনের প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি প্রতীক-উর রহমান এবং বর্তমান রাজ্য সম্পাদক দেবাঞ্জন দে। বাংলা পক্ষ সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক গর্গ চ্যাটার্জিও উপস্থিত হন। তাঁদের উদ্যোগে দীর্ঘ টালবাহানার পরে পুলিশ অজ্ঞাতপরিচয় ২০ জনের বিরুদ্ধে এফএইআর দায়ের করে।

ছাত্ররা জানিয়েছেন, রাতে তাঁদের সঙ্গে কলকাতার পুলিস কমিশনার মনোজ ভার্মার কথা হয়। কমিশনার আশ্বাস দিয়েছিলেন, এই ব্যাপারটা পুলিস গুরুত্ব দিয়ে দেখবে। সেই অনুযায়ী বৃহস্পতিবার ভোরবেলা এবং সকালে দুই অভিযুক্তকে গ্রেফতার করে ব্যাঙ্কশাল কোর্টে হাজির করে পুলিস, আদালত তাদের পাঁচদিনের পুলিস হেফাজত দেয়। বাকি আক্রমণকারীরা পলাতক।

এ তো গেল প্রশাসনিক রুটিনের কথা। প্রশ্ন হচ্ছে, শিয়ালদা চত্বরের মত কলকাতার গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বাংলা বলার জন্য বাংলাদেশি তকমা সেঁটে দেওয়ার সাহস বা ক্ষমতা দুষ্কৃতীরা পেল কীভাবে?

এর উত্তর ওই অঞ্চলের রাজনৈতিক বিন্যাসে লুকিয়ে রয়েছে। যেখানে গণ্ডগোলটা হয়েছে, সেটা কলকাতা কর্পোরেশনের ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্গত। ওই ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলর শচীন সিংয়ের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের অভিযোগ – তিনি বিহার, উত্তরপ্রদেশ থেকে লোক নিয়ে এসে শিয়ালদা চত্বর সমেত আশেপাশের এলাকার ফুটপাথ দখল করাচ্ছেন। এই কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে কিছুদিন আগে নারকেলডাঙা কাণ্ডে যুক্ত থাকারও অভিযোগ উঠেছিল। আক্রান্ত পড়ুয়াদের অভিযোগ, দুষ্কৃতীদের প্রত্যেকেই শচীন সিং বাহিনীর সদস্য। বেআইনি দখলদার বসিয়ে সরকারি জায়গা দখল করার পরেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না, কারণ তিনি প্রকাশ্য সভা থেকে বহুবার বলেছেন, তাঁর এলাকার হিন্দিভাষী মানুষ দিদির পাশেই থাকবে, কারণ এই রাজ্যে তারা খুব সুখে রয়েছে।

এখানে দেওয়া নেওয়ার অঙ্কটা সহজ। শচীনের বাহিনি রাজ্যের শাসক দলের হয়ে ভোট ‘করবে’। তাদের জয়ের ব্যবধানকে আকাশ ছুঁতে সাহায্য করবে (যেমন ২০২১ সালে কলকাতা কর্পোরেশন নির্বাচনে এই ওয়ার্ডে ১৫,৩৮৫টি ভোট পড়ে। শচীনের নামের পাশে গিয়েছে ১২,৫৩৬টি ভোট)। তার বদলে মিলবে সমস্ত ধরনের দুষ্কর্ম করার লাইসেন্স। এই লাইসেন্সের মধ্যেই পড়ে কলকাতার বুকে দাঁড়িয়ে, উত্তর ভারতের বিজেপির কায়দায় বাঙালিকে বাংলাদেশি বলে দাগিয়ে দেওয়ার দুঃসাহস।

তাই নিজের অঞ্চলকে মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি ‘মিনি বিহার’-এ পরিণত করার ঘোষণা করতে পারেন। যাদব, ক্ষত্রিয় ইত্যাদি সম্প্রদায়ের সংগঠন তৈরি করার ডাক দিতে পারেন। বিহার, উত্তরপ্রদেশের কায়দায় কয়েক বছর আগে নর্তকী ডেকে এনে নাচগানের ব্যবস্থাও করেছিলেন তিনি। সেই ভিডিও কারমাইকেল কাণ্ডের পরে ফের ভাইরাল হতে শুরু করেছে।

আরো পড়ুন হিন্দি বনাম বাংলা: নিজের ভাষাকে কোণঠাসা করেছে বাঙালিও

আসলে শুধু শচীনের মত সামান্য কাউন্সিলরই নয়, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে এমন চরিত্রদের যা খুশি করার লাইসেন্স দিয়ে রেখেছে তৃণমূল, শুধুমাত্র ভোট পাওয়ার জন্য। এই আঞ্চলিক নেতারা খাতায় কলমে তৃণমূল করলেও, মনেপ্রাণে বিজেপির ভাষ্যে বিশ্বাস করে। তারা বিশ্বাস করে যে বাংলা আসলে বাংলাদেশি ভাষা, হিন্দি হচ্ছে এই দেশের রাষ্ট্রভাষা। তাই কলকাতা হোক কিংবা কোচি, সবাই হিন্দিতে কথা বলতে বাধ্য। অসমবয়সী বাঙালি পড়ুয়াদের হিন্দি আগ্রাসনকে নস্যাৎ করে দিয়ে নিজের ভাষাতেই কথা বলার প্রতিস্পর্ধা তাদের দম্ভে আঘাত করে। তাই সামান্য বচসাতেও হকি স্টিক থেকে শুরু করে পিস্তল বেরিয়ে পড়ে।

কারমাইকেল হোস্টেলের ছাত্রদের প্রতি যে ব্যবহার করা হয়েছে, তা থেকে তৃণমূলেরও কয়েকটা কথা বুঝে নেওয়া দরকার। মুখ্যমন্ত্রী মুখে যতই বাংলা ভাষার জন্য আবেগ দেখান, ভাষাকে রক্ষা করার আহ্বান জানান, সাধারণ মানুষ নিজেদের দৈনিক অভিজ্ঞতায় স্পষ্ট বুঝতে পারছেন, হাওড়া বা শিয়ালদা স্টেশন চত্বরে, কিংবা ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে যারা প্রতিনিয়ত কারণে অকারণে বাঙালিকে হেনস্থা করে, কটূক্তি করে, তারা কিন্তু তৃণমূলেরই আশ্রিত।

রামনবমী কিংবা হনুমান জয়ন্তীর মত বিজেপি-আরএসএসের ছকে দেওয়া একের পর এক বিভাজনমূলক রাজনৈতিক কর্মসূচি কিন্তু নিষ্ঠাভরে এই বাহিনিই পালন করে। এদের প্রশ্রয় দিয়ে হিন্দি আগ্রাসন থেকে বাংলা ও বাঙালিকে রক্ষা করার ডাক দেওয়া যে রাজনৈতিক দ্বিচারিতা, তা রাজ্যের সাধারণ মানুষ দিব্যি বোঝেন। তাই মমতা ব্যানার্জির তোলা বাঙালি জাত্যভিমান ফাঁকা আওয়াজ ছাড়া কিছুই নয়।

সোজা কথায়, স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক ফায়দার জন্য সামাজিক দক্ষিণপন্থাকে নিজেদের সংগঠনের আড়ালে বাড়তে দিচ্ছে তৃণমূল। যদি তারা নিজেদের শুধরে না নেয়, পুলিসকে দিয়ে এই বাহিনিকে নিয়ন্ত্রণ না করায়, তাহলে রাজ্যের রাজনৈতিক ভারসাম্যের সামান্য পরিবর্তন হলে এই বাহিনিই যে বিজেপির পতাকা তুলে নেবে না, তার নিশ্চয়তা কি তৃণমূল কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে আছে? তখন উত্তর ভারত জুড়ে যে ছকে বাঙালির উপর অত্যাচার চলছে, ঠিক সেই কায়দায় এখানেও অভিযান শুরু করবে বিজেপি। সেই আক্রমণের হাত থেকে যে কালীঘাটের ব্যানার্জি পরিবারও নিস্তার পাবে – তা বাজি রেখে বলা যায় না।

এই বাহিনিকে আশ্রয় ও প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ কিন্তু কালো দাগের মত তৃণমূল কংগ্রেসের গায়ে লেপ্টে থাকবে। চাইলেও সেই দাগমুক্তি সম্ভব নয়।

নিবন্ধকার সাংবাদিক, বর্তমানে ব্রিটেনে স্নাতকোত্তর স্তরে পাঠরত। তথ্য লেখকের, মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

মতামত জানান

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.