সৌভিক দাস

ইদানীং কলকাতায় ভারী বৃষ্টি আর বন্যা প্রায় সমার্থক হয়ে গিয়েছে। গত ২৩ সেপ্টেম্বরের অতিবৃষ্টিতে প্রায় গোটা শহরই জলের তলায় তলিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তা ছিল হিমশৈলের চূড়া মাত্র। বৃষ্টি থেমে সূর্য উঠলেও, জল বার করার নানা চেষ্টা সত্ত্বেও, শহরের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে জমে থেকেছে বন্যার জল। প্রশ্ন জাগে, এত চেষ্টা সত্ত্বেও জল জমে থাকছিল কেন? অনেকে বলছেন, হুগলি নদী উপচে জল ঢুকেছিল বলে এমন হয়েছে। কিন্তু আসল কারণ বুঝতে হলে কলকাতার নদী ও নিকাশি ব্যবস্থার ইতিহাসটা ঘেঁটে দেখা দরকার। এই পরিস্থিতি যে জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও একটা বিরাট ঝুঁকি তৈরি করেছে, তাতে এই জলনিকাশি ব্যবস্থা ঠিক করতে এখনই জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া আবশ্যিক।

পরিবেশ সংরক্ষণ সংস্থা জলাদর্শ দীর্ঘদিন ধরে শহরের জলাধার ও খাল নিয়ে নিরন্তর গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের লক্ষ্য, শহরজুড়ে বিস্তৃত এই জল-পরিবেশের সমন্বিত ব্যবস্থাটি বোঝা – কীভাবে এটি বর্জ্য বয়ে নিয়ে যায়, কীভাবে তা পূর্ব কলকাতা জলাভূমি ও হুগলি নদীতে গিয়ে পড়ে, এই প্রবাহের সঙ্গে যুক্ত বা এর চারপাশে বসবাসকারী স্থানীয় মানুষের মধ্যে সম্পর্কই বা কীরকম, সমস্তই সেই চর্চার অন্তর্গত। দীর্ঘকালীন গবেষণার পর, ২০২৪ সালে সংস্থার পক্ষ থেকে প্রকাশিত হয়েছে একটি বই, টুওয়ার্ডস সাস্টেনেবল ফ্লোজ।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

এই ধারাবাহিক নাগরিক নিরীক্ষণ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হল কলকাতার প্রাকৃতিক জলপ্রবাহের মানচিত্র তৈরি, কীভাবে সেই প্রবাহে বাধা-বিঘ্ন ঘটছে, তা অনুসন্ধান করা এবং শহরের ভবিষ্যৎ বাস্তুতন্ত্র ও স্থানীয় মানুষের কথা মাথায় রেখে এর গুরুত্ব তুলে ধরা।

২০১১ সালের জনগণনা বলছে, কলকাতায় প্রতি বর্গ কিলোমিটারে বাস করেন প্রায় চব্বিশ হাজার মানুষ। জনঘনত্ব এই পর্যায়ে পৌঁছলে শহরের পরিবেশের ওপর চাপ পড়বেই – জমি আর জলের ব্যবহার থেকে শুরু করে কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সব ক্ষেত্রেই এই চাপ স্পষ্ট। কলকাতার ভূ-প্রকৃতি গড়ে উঠেছে মূলত গঙ্গা থেকে আসা নদী আর সাগরের যোগাযোগের ফলেই। শহরের মূল ঢাল উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে। তার উপর আবার পূর্ব দিকেও একটি ঢাল রয়েছে।

ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে যদি আমরা দেখি, তাহলে দেখব, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কলকাতার বাস্তুতন্ত্রেরও পরিবর্তন ঘটেছে। ব্রিটিশরা যখন আসছে, তখন পশ্চিম দিকের এলাকাগুলি ইউরোপীয় অন্যান্য ঔপনিবেশিক শক্তির দখলে, ফলে ব্রিটিশদের পূর্ব দিকেই বসতি গড়তে হয়েছে। বাণিজ্যের জন্য নদীপথকে কাজে লাগানোই ছিল তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য।

আগে কলকাতা ছিল এমন এক জটিল জলাভূমি, সুন্দরবনের সঙ্গে যার অবাধ নদীসংযোগ। পরিবহন আর জল নিষ্কাশনের জন্য নদী থেকে বানানো হয়েছিল অসংখ্য খাল, সেসব খাল যুক্ত হয়েছিল এই জলাজমির সঙ্গে। কিন্তু পরবর্তীকালে অনেক প্রাকৃতিক খালকেই নিয়ন্ত্রণ করতে সুবিধা হবে বলে বদলে ফেলা হয় কৃত্রিম খালে, ফলে পুরো ভূদৃশ্য থেকে হারিয়ে যায় অসংখ্য নদীর শাখাপ্রশাখা। বিদ্যাধরী, মাতলা, আদি গঙ্গা, যমুনার মতো এইসব ‘খণ্ডিত’ নদী ও হারিয়ে যাওয়া খালগুলিই এখন এই অঞ্চলের জল নিষ্কাশনের ক্ষমতা অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে।

শুরুর দিকে খালগুলি তৈরি হয়েছিল মূলত নৌ-পরিবহনের রাস্তা হিসেবে। এই সময়ে বেলেঘাটা, বাগজোলা, কেষ্টপুর খাল খনন করা হয়েছিল। তারও আগে উইলিয়াম টলির তত্ত্বাবধানে আদি গঙ্গার মজে যাওয়া অংশের পুনরুদ্ধার করা হয়, যা ‘টলি নালা’ নামে পরিচিতি পায়। জমির স্বাভাবিক ঢাল ছিল পূর্ব দিকে, তাই এই খালগুলি দিয়েই শহরের বর্জ্য জল বয়ে যেত পূর্বের নোনা জলের হ্রদগুলির দিকে, এবং সেখান থেকে বিদ্যাধরী নদীপথে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়ত। এছাড়াও, সে সময়ে পুকুরের সংখ্যাও নেহাত কম ছিল না, এই পুকুরগুলির কারণেও বিপুল পরিমাণ বৃষ্টির জল ধরে রাখা যেত, জল জমার ঝুঁকি এড়ানো যেত।

পরবর্তীকালে কলকাতার জনসংখ্যা যত বাড়ল, যত নগরায়ণ ঘটল, দেখা গেল, এই প্রাকৃতিক নিকাশি ব্যবস্থা আর যথেষ্ট নয়। প্রাথমিক সমাধান হিসেবে বর্জ্য ও নর্দমার জল সরাসরি হুগলি নদীতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিল তৎকালীন প্রশাসন। কিন্তু জমির স্বাভাবিক ঢাল পূর্ব দিকে, আর হুগলি নদী কলকাতার পশ্চিমে, ফলে সেই নদীতে বর্জ্য পাঠাতে যাওয়ার অর্থ, সে প্রবাহের অভিমুখ স্বাভাবিক ঢালের ঠিক উল্টোদিকে।

১৮২৭ সালে গঠিত ‘ইমপ্রুভমেন্ট কমিটি’-র সুপারিশে ১৮২৯ সালে নির্মাণ করা হয় ‘সার্কুলার খাল’। কিন্তু ভারী বৃষ্টির সময়ে যখন হুগলি নদী ও পূর্বের নোনা জলের হ্রদ, দুদিক থেকেই বন্যার জল ঢুকে পড়ত, তখন বন্যা নিয়ন্ত্রণে এই খালটির খুব বেশি কার্যকারিতা থাকত না। তাই জলপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণে বাষ্পচালিত লকগেট ও স্লুইসগেট বসানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। তারই ধারাবাহিকতায়, ১৮৫৭ সাল নাগাদই, বন্যার জল যাতে দ্রুত খাল, নদী বা নোনা হ্রদের দিকে ঠেলে দেওয়া যায়, সেজন্য একাধিক পাম্পিং স্টেশন বসানোর প্রস্তাব আসে।

এই পুরনো জল-প্রকৌশল ব্যবস্থাটিই ২০০০ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ বছর ধরে বন্যা ব্যবস্থাপনার মূল ভিত্তি ছিল। ২০০০ সালের পর থেকে বিভিন্ন বিদেশি সাহায্য, ঋণ এবং জল-পরিকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে এই খালগুলির মেরামতি ও রক্ষণাবেক্ষণ, নতুন পাম্পিং স্টেশন নির্মাণ এবং শহরের নর্দমা ব্যবস্থা সংস্কারের উপর জোর দেওয়া হয়।

বর্জ্য পদার্থ ও মাত্রাধিক দূষণে বুজে যাচ্ছে কলকাতার খাল
বর্জ্য পদার্থ ও মাত্রাধিক দূষণে বুজে যাচ্ছে কলকাতার খাল

তবুও একই সময়ে, নাগরিকদের একাধিক অভিযোগের প্রেক্ষিতে জাতীয় সবুজ ট্রাইব্যুনাল (এনজিটি) খালগুলির অপ্রতুল রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়ে নানাবিধ নির্দেশ জারি করে। জলাদর্শের ২০২৪ সালের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ১৩ ও ১৪ নম্বর ওয়ার্ড এলাকার সার্কুলার খালের একটি বড় অংশ, এসডব্লিউএফ ও ডিডব্লিউএফ চ্যানেলের প্রধান অংশ, টলি নালা, টলি-পঞ্চান্নগ্রাম এবং বাগজোলা খালের জল জমে থাকতে দেখা গেছে। ক্রমাগত জমতে থাকা প্লাস্টিক বর্জ্য এবং অনিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের কারণে খালের পথ হয়েছে রুদ্ধ, যার ফলে বিঘ্নিত হচ্ছে জলের স্বাভাবিক প্রবাহ।

এই খালগুলি গিয়ে মিশেছে পূর্ব কলকাতা জলাভূমিতে, যাকে ‘শহরের কিডনি’ বলে গণ্য করা হয়। শহরাঞ্চলের ময়লা জলের ‘প্রাকৃতিক শোধন’ হয়ে যায় এই জলাভূমিতেই, এই শোধনপ্রক্রিয়ায় ভূমিকা নেয় সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি, জলে জন্মানো অজস্র শৈবাল এবং অনুজীব। এই প্রক্রিয়াকে বলে ইউট্রোফিকেশন। এই জল পূর্ব কলকাতা জলাভূমিতে ফসল ও মাছ চাষের জন্য ব্যবহার করা হয়। কিন্তু দ্রুত নগরায়ণের ফলে এই জলাভূমির আকার ও ক্ষমতা দুটোই বর্তমানে কমে এসেছে। এছাড়া সল্টলেক ও নিউটাউন অঞ্চলে নগরায়ণের ফলে অবস্থার অভূতপূর্ব অবনতি ঘটেছে।

বেহাল নিকাশি ব্যবস্থা
বেহাল নিকাশি ব্যবস্থা

কলকাতার খাল ব্যবস্থা কেবল নিকাশি পরিকাঠামো নয়, এটি শহরের জীবনরেখা তো বটেই, এমনকী স্থানীয় মানুষের জীবনধারার সঙ্গেও তার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। খালগুলির অব্যবস্থাপনা ও দূষণ কেবল জলাবদ্ধতার সমস্যাই সৃষ্টি করে না, তা সরাসরি প্রভাব ফেলে খালতীরের বাসিন্দাদের জীবনযাত্রা, স্বাস্থ্য ও জীবিকার উপর। পূর্ব কলকাতা জলাভূমির মতো একটি আশ্চর্য প্রাকৃতিক ব্যবস্থার ক্ষমতা-হ্রাস শহরকে তার নিজস্ব বর্জ্য শোধনের ক্ষমতা থেকে ক্রমাগত বঞ্চিত করছে। তাই কেবল যান্ত্রিক পাম্পিং স্টেশন নির্মাণ একমাত্র সমাধান নয়, বরং খালগুলিকে তাদের হারানো নদী-সংযোগ এবং স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে দেওয়া ভীষণ প্রয়োজন। খালগুলির রক্ষণাবেক্ষণেও অংশীদার করতে হবে স্থানীয় মানুষকে, তবেই সামগ্রিকভাবে একটি পরিবেশ-বান্ধব সুস্থায়ী সমাধান পাওয়া সম্ভব।

নিবন্ধকার তুলনামূলক সাহিত্যের ছাত্র, বর্তমানে জলাদর্শে গবেষণারত। মতামত ব্যক্তিগত।

 

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.