সুদীপ্ত রায়
জীবনে হিসাব করা লোকের অভাব নেই আর তাই বেহিসাবি হতে ইচ্ছে করে। আপনার করে, পাঠক? বেহিসাবি হয়ে ভালোবাসতে? বেহিসাবী হয়ে ভালোবাসার মানুষের জন্য জান কবুল করতে? স্নায়ুর পরতে পরতে বেহিসাবি হয়ে অনুভব করতে করতে শিহরিত হয়ে উঠতে? আরেকটু জড়িয়ে রাখতে বন্ধুর হাত, ছেড়ে যাওয়ার আগে? করে তো! করে না আপনার? বীরেনেরও করেছিল। কিন্তু অজানা এক ভয়ের কাছে নিজেকে বন্ধক রেখে চক্রবর্তী (অশোক মজুমদার) ও বেলালের সামনে হ্যাঁ হ্যাঁ বলা সং হওয়া ছাড়া তার কোনো উপায় ছিল না। অথচ এই বীরেন (রানা রায়) গ্রামের সদ্য নিযুক্ত এগ্রিকালচার বিভাগের অফিসার দিদিমণি সম্পূর্ণার (দেবারতি চক্রবর্তী) সমস্ত সুবিধা অসুবিধার খোঁজ রাখছিল নিজের তাগিদে। কিন্তু তার ওই একটি ত্রুটি— ভয়ের সামনে নতজানু হওয়া— তাকে এই নাটক খলচরিত্র বা কাপুরুষ হিসাবে দাঁড় করায় না। এখানেই সূর্যায়ণ নাটকটি অন্য উচ্চতায় উড়াল দেয়।
এই নাটককে অভিনয়, আঙ্গিক, বিষয়, আলো, শব্দ প্রক্ষেপণ, আবহ, পোশাক, মঞ্চনির্মাণ— এই নিক্তিতে ফেলে তুল্যমূল্য বিচারের প্রহসনে আমি বিচারক হতে নারাজ। অযথা সেসব লিখে আমি এ লেখাকে ভারাক্রান্ত করব না। বেলঘরিয়া অভিমুখের আগের নাটকগুলির সঙ্গে যাঁরা পরিচিত, তাঁরা জানেন যে এ দল অভিনেতা, অভিনেত্রী তৈরির রসায়নাগার। আমি কিছু খণ্ড মুহূর্ত, এই নাট্যের দেহে যা আত্মাসম, তাকেই খোঁজবার অবিরাম প্রয়াস জারি রাখব এ লেখায়।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
পরিবেশ নিয়ে সাম্প্রতিককালে যে হইচই, তা বেশ কিছুকাল আগেও ছিল, কিন্তু তা অন্য বিষয়ের কোলাহলে হারিয়ে যেত। কিছু মানু্ষ পরিবেশ নিয়ে অনেক আগে থেকেই সচেতন ছিলেন। কেবল তাঁদের কথা ঠিকভাবে ঠিক জায়গায় পৌঁছত না। কিন্তু তাঁরা তাঁদের পরিবেশ-প্রকৃতি ভালোবাসার নিষিদ্ধ ইস্তেহার গোপনে বুক থেকে বুকে পাচার করে দিতেন অবলীলায়, সীমিত সংখ্যক মানুষের মধ্যে। আমাদের ছোটবেলায়, নয়ের দশকে, রাস্তা জুড়ে বিজ্ঞাপন দেখতাম— একটি গাছ একটি প্রাণ। ব্যাস, ওই পর্যন্তই। বৃক্ষ সংহারবিরোধী ওই বার্তা শুধুমাত্র বিলবোর্ডে, হোর্ডিংয়ে ঝুলে থাকাই ছিল গাছেদের ট্র্যাজিক নিয়তি। কোথায় পড়েছিলাম এখন মনে নেই, কে বলেছিলেন তাও মনে নেই, যে গাছেদের নিয়ে কথা বলাও এখন পাপ।
উপর্যুক্ত উদ্ধৃতির উপর ভর করেই দাঁড়িয়ে আছে বেলঘরিয়া অভিমুখের এই নবতম প্রযোজনা। এটুকু পড়তে পড়তে আপনার এই নিরীহ ভ্রমের দেশের নাগরিক হিসাবে কিছুকাল আগেই আরাবল্লী পর্বত ধ্বংসের নিদানের কথা মনে পড়বে। মনে পড়বে গৌতম আদানির বিদ্যুৎ প্রকল্পের স্বার্থে অরণ্য-সংহারের কথা। মনে পড়বে যশোর রোডের গাছেদের কথা। মনে পড়বে জলাশয় বুজিয়ে কেমিকাল হাবের কথা। কৃষিজমি অধিগ্রহণ করে শিল্পতালুক করার কথা। মনে পড়বে উন্নয়নের নামে ভাবাদীঘি রেল প্রকল্পের কথা, ভাঙড়ের কৃষি ও জলাজমি বুজিয়ে পাওয়ার গ্রিড বসানোর কথা। এ সমস্ত কথা স্মৃতিতে চাগাড় দিতে দিতেই হয়ত এই নাট্যের কাল্পনিক (?) গ্রামের এগ্রিকালচার বিভাগের অফিসার দিদিমণি সম্পূর্ণার চোখ বেয়ে গড়িয়ে নামবে রোদসীরেখা, যেন বা এক স্মৃতিবেদনা। যে গ্রামে একসময় ভালোবাসার প্রজাপতি উড়ত বাতাসে বাতাসে, পাক খেত ফুলে ফুলে, বহু বহু দিন পরে ভালোবাসাকে দেখলে মানুষ মানুষী যেমন উদ্বেল হন, তেমনই প্রৌঢ়ের (নাটকের এক চরিত্র) তিতাইকে উপহার দেওয়া শুঁয়োপোকা থেকে প্রজাপতি হওয়া দেখে সম্পূর্ণা কাঁদে। বেদনার রোদসীরেখার আভাসে প্রৌঢ় (জয়ন্ত ব্যানার্জি) উচ্চারণ করেন— এই যন্ত্রণাই পুরস্কার। এই সংলাপে বোঝা যায় নাটককারের মুন্সিয়ানা। এ জগতে মানব-মানবী চায় এক অবিচ্ছিন্ন সুখ। যন্ত্রণাকে পুরস্কার ভাববার মত মন তৈরি করতে পারার প্রস্তুতি লাগে। নাটককার তীর্থঙ্কর চন্দ পারেন, আর তাঁর চরিত্র সম্পূর্ণা ও প্রৌঢ় ক্রন্দনে অনাবিল আনন্দের রঙ মিশিয়ে দিতে পারেন।
প্রজাপতি ও সম্পূর্ণার সংলাপ নির্মিত হলে তাঁরা কী বলতেন? হয়ত বলতেন
‘জীবন গিয়েছে চ’লে আমাদের কুড়ি-কুড়ি বছরের পার—
তখন আবার যদি দেখা হয় তোমার আমার!’
প্রৌঢ় ও সম্পূর্ণা— এই দুই চরিত্র যতটা চোরাস্রোতের মত আমাদের মনে মনে বয়ে যায়, ঠিক তার বিপ্রতীপে আছে চক্রবর্তী ও বেলাল (অনুজয় চট্টোপাধ্যায়) এবং তাদের সহযোগীরা। চক্রবর্তী বৌদ্ধিক শয়তান এবং বেলালকে সে নিয়ন্ত্রণ করে, কারণ সে চায় নিজে সফল রাজনীতিক হতে। বেলালরা উচ্চাকাঙ্ক্ষী রাজনীতিকদের ব্যবহারের সামগ্রী। বেলালদের ক্রোধ রাজনীতিকদের কাছে বিপণনযোগ্য। কূটনীতি চক্রবর্তীর চরিত্রে প্রচ্ছন্নভাবে থাকলেও বেলাল সেসবের ধার ধারে না। সে বোঝে আক্রমণের শরীরী ভাষা। তার প্রবল প্রতাপ গ্রাম জুড়ে। অন্যদিকে চক্রবর্তী নজরদারি চালায় তার ক্ষমতা কায়েম রাখবার জন্য। এই নজরদারির প্রকৌশল সম্পূর্ণা প্রয়োগ করে সরকারি এক সভায়। ক্যামেরার সঠিক ব্যবহার শিখে সে সেই সভায় সরকারি আধিকারিক, চক্রবর্তী এবং বেলালের গতিবিধি রেকর্ড করে। এই দৃশ্যের অনতিবিলম্বে চক্রবর্তী ও বেলালের গ্রেফতারির সঙ্গে সঙ্গে সম্পূর্ণার বদলিরও নির্দেশ আসে। এই পোড়া দেশে এই ব্যবস্থার মধ্যে যে ব্যতিক্রমী কাজ করতে যাবে, তার শাস্তিই অবধারিত। সম্পূর্ণা চেয়েছিল কৃষিকাজে কীটনাশকের ব্যবহার সম্পর্কে কৃষকদের সচেতন করতে। দেশীয় প্রজাতির ধান চাষ করার প্রবণতা বাড়াতে। কিন্তু রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে তাকে বারবার বাধাবিপত্তির সামনে পড়তে হয়েছে। তবু হাল ছাড়েনি।
আরো পড়ুন শুধু শিম্পাঞ্জি নয়, মানুষকে দেখার চোখও বদলে দিয়েছেন জেন গুডঅল
এবার পরিবারের কথায় আসি। সম্পূর্ণার স্বামী সৌমিক (শতদল), তাদের কন্যাসন্তান তিতাই। সৌমিক চলচ্চিত্র নির্মাতা, তিতাই স্কুলে পড়ে। যেহেতু সম্পূর্ণার চাকরির শর্তে এই গ্রামের দায়িত্বে রয়েছে, তাই সৌমিক ও তিতাই ফাঁক পেলেই এই গ্রামে আসে। তিতাইয়ের বহু প্রশ্ন জাগে এই অচেনা জায়গা সম্পর্কে। তার উত্তর অক্লেশে দেয় সম্পূর্ণা ও সৌমিক, কখনো কখনো প্রৌঢ়। এখানে এক আবেগঘন মুহূর্তে সম্পূর্ণা সৌমিককে বলে, সৌমিকের মা গ্রামে এসে থাকলে ভালো হয়। কিন্তু তিতাইয়ের পড়াশোনা ও নগরের স্বাচ্ছন্দ্যের কথা ভেবে সৌমিক তা নরমভাবে খারিজ করে দিলে সম্পূর্ণার সংলাপে উঠে আসে এক জরুরি প্রশ্ন। যদি সৌমিক এই গ্রামে তার পেশার খাতিরে থাকত, তবে কি তার মা আসত না?
জরুরি প্রশ্ন। আরও জরুরি এই নাটকের স্তরগুলিকে চিহ্নিত করা। একদিকে যেমন রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে সমস্ত পরিবেশবান্ধব কাজে বাধার পাহাড় দেখা যায়, অন্যদিকে এই নাটক নিজের দিকে তাকাতেও প্ররোচিত করে। আমাদের মনে পড়ে যায়, বিপ্লব যতটা না বহিরঙ্গের তার চেয়ে বেশি অন্তরঙ্গের। নিজেকে বদলে ফেলাই এক আস্ত বিপ্লব।
জেগে থাকা এক কুকুরের চোখে যখন নিশুত রাতের মন্ত্রণা ঢুকছিল ক্রমশ, তখন একটি দৃশ্যে এসে চোখ আটকায়। প্রৌঢ়কে সৌমিক প্রণাম করতে গেলে তাকে আলিঙ্গন করেন তিনি। তিতাই (শ্রীপর্ণা মিস্ত্রি) নেহাতই শিশু, সে প্রণত হলে প্রৌঢ় তাকে কোলে তুলে নিয়ে কপালে চুম্বন করেন, কিন্তু সম্পূর্ণার ক্ষেত্রে প্রণাম গ্রহণ করেন তিনি। প্রৌঢ়ের পারিবারিক ইতিহাস নাটকে স্পষ্ট না হলেও, তিনি যে আঁকিয়ে— সেকথা স্পষ্ট করা হয়েছে এই নাটকে। তবে কি প্রৌঢ় সম্পূর্ণাকে কন্যা জ্ঞান করেছেন? অপত্যস্নেহেই কি তিনি ঝুঁকি নিয়ে জীবনতলায় শারীরিক নিগ্রহ অগ্রাহ্য করেও সম্পূর্ণার পাশে দাঁড়িয়েছেন নিঃশর্তভাবে? সেকথা জানার কোনো উপায় পরিচালক অশোক মজুমদার রাখেননি নাটকের শেষ দৃশ্যে। প্রৌঢ় সম্পূর্ণাকে বিদায় জানিয়ে যখন ফিরে গেলেন অল্প বিমর্ষ তফাতে তাঁর আঁকা ক্যানভাসের প্রজাপতির কাছে, দুর্বৃত্ত চালাল হাতিয়ার। বারুদ ছিটকে উঠল, রক্ত চলকে পড়ল প্রৌঢ়ের শরীর থেকে মাটিতে। গ্রাম পতনের শব্দ হয়। যিনি যন্ত্রণাকে মনে করেন পুরস্কার, তাঁর সাহসকে খুন করতে না পারলে রাজনীতির কারবারীরা নিশ্চিন্ত হবেই বা কী করে? আসলে শুধু দুর্বৃত্ত নয়, প্রেক্ষাগৃহের নরম ঠান্ডায়, ভাষাহীনতায় আক্রান্ত নীরব দর্শক আমরাই প্ররোচনা দিয়েছি এই মৃত্যুর। প্রতিটি মৃত্যুকেই হত্যা বলে ভাবি আজকাল। মঞ্চের এক কোণে নিরালম্ব, খুন হয়ে যাওয়া গাছের ওপর বসে থাকা এক বৃদ্ধ শকুন খেয়ে চলে আমাদের পচাগলা নীরবতা।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।





