লক্ষ্মীকান্ত যোশী

‘বাবারা ছেলেদের জন্যে রুপো রেখে যান। জিনিসটা সোনার চেয়ে সস্তা আর কিলো দরে পাওয়া যায়। ফলে এটা বেশি কাজের জিনিস’, বললেন পণ্ডিত উত্তম, যিনি রাজস্থানের বাঁশোয়াড়া জেলায় ভীল পরিবারগুলোর আচার অনুষ্ঠান করান। ভীল জনগোষ্ঠীর বিপুল পরিমাণ মানুষের বাসস্থান বাঁশোয়াড়ায় রুপোই হল সবচেয়ে মূল্যবান ধাতু। রোজকার পরার জিনিস থেকে শুরু করে বিয়েশাদি— সর্বত্র রুপোর উপস্থিতি লক্ষ করা যায়।

কুশলগড় ব্লকের বাসুনি গ্রামের আদিবাসী মহিলা এবং সমাজকর্মী দীপিকা কাটারা বললেন ‘কেবল বিয়েতে নয়, মেলায় আর সাপ্তাহিক হাটেও মহিলারা গয়নাগাঁটি পরেই যান। রোজকার গয়নার মধ্যে পড়ে হাতের পালে, পায়ের পায়েল আর নাকছাবি। রুপো একইসঙ্গে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা আর স্ত্রী ধন।’ দীপিকার কথা অনুযায়ী, মহিলারা প্রথা অনুযায়ী গলায় হাসলি, কপালে বোরলা, তাগালি, বাজুবন্ধ আর পায়ের আঙুলেও গয়না পরেন। বাচ্চাদের গলাতেও রুপোর মাদুলি পরিয়ে দেওয়া হয় নজর লাগা আটকাতে। পুরুষরাও রুপোর বালা পরেন।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

ভিকলি গ্রামের রেখা মাইদা, লীলা দোদিয়ার আর সীতা বললেন, রুপোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আবেগের মূল্য রুপোর দামের চেয়ে বেশি। ওঁদের ভাষায় ‘আমরা রুপো ভালোবাসি। ওটা আমাদের অলঙ্কার তো বটেই, সঙ্গে এই আত্মবিশ্বাস দেয় যে, বিপদে পড়লে কাজে লাগবে। কঠিন সময়ে রুপো বন্ধক রেখে বা বিক্রি করে টাকা পাওয়া যায়। এই নিরাপত্তা এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের হাতে যায়।’ রেখা বললেন তাঁর জা-কে প্রায় দশ বছর আগে সাড়ে তিন কিলো রুপো দেওয়া হয়েছিল বিয়েতে। ‘তিন বছর আগে যখন আমাদের গমের ফলন খারাপ হওয়ায় ক্ষতি হল, এক কিলো বেচে ক্ষতি সামলানো হয়।’

প্রথা হল, বিয়ের সময়ে বরপক্ষ কনেপক্ষকে রুপোর গয়না দেবে। অন্যান্য শুভ অনুষ্ঠান উপলক্ষেও রুপোর আদানপ্রদান হয়। এলাকার বাসিন্দারা বললেন, গত কয়েক বছরে আদিবাসী মহিলাদের মধ্যে রুপোর পায়েল পরার নতুন উৎসাহ সঞ্চার করেছে সোশাল মিডিয়া।

আরো পড়ুন জলবায়ু পরিবর্তনের সংকট: বিয়ে যে হবে, গাছ কই?

তবে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে রুপোর দাম লাফিয়ে বেড়েছে। বাঁশোয়াড়া সারাফা অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বিশাল দোশী জানালেন, এই মুহূর্তে জেলায় এক কিলো রুপোর দাম প্রায় ২.৪ লাখ টাকা। ১৯ ও ২০ জানুয়ারি তিন লাখে পৌঁছেছিল। ২৯ জানুয়ারির মধ্যে চার লাখ পেরিয়ে যায় এবং ক্রমশ নেমে আসার আগে ৪.১৭ লাখ পর্যন্ত উঠেছিল।

অনেক বাসিন্দা এই প্রতিবেদককে বলেছেন যে দামের এই ওঠানামার প্রভাব পড়েছে সামাজিক ও ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে।

প্রথার বদল

কুশলগড় ব্লকের ভীল জনগোষ্ঠীর বর্ষীয়ান সদস্য মোহন মাইদা, যাঁর বয়স প্রায় ৮০, এইসব প্রথার পুরনো যুগের চেহারা দেখেছেন। বললেন ‘সে এক সময় ছিল, যখন আমাদের বাড়ির বউমারা বাড়িতে পা দিলে তাদের গয়নার আওয়াজে বাড়ি ভরে উঠত।’ মোহন যখন প্রায় ২৫ বছর আগে তাঁর ছেলেদের বিয়ের জন্যে রুপো কিনেছিলেন, তখন এক কিলো রুপোর দাম ছিল ৭,০০০-৮,০০০ টাকা।

তাঁর চার ছেলে আর সাতজন নাতি-নাতনি। ছেলেরা সব গুজরাটের ভদোদরা, বাপী, সুরাট, ভালসাদ আর আমেদাবাদে চলে গেছে। সেখানে ৬০০-৮০০ টাকা দৈনিক মজুরিতে নির্মাণ আর পাইপলাইন বসানোর কাজ করেন। তিন ছেলের বউ অবশ্য কুশলগড়েই থাকেন, আরেকজন স্বামীর সঙ্গে গুজরাটে আছেন। মোহন বললেন, তাঁর পরিবারকে প্রায়শই বাঁচিয়ে দিয়েছে রুপো। ‘কোনোবার চাষে ফলন ভালো না হলে বা ওষুধ-বিষুধ কিনতে টাকার দরকার হল আমরা রুপো বন্ধক রেখেছি।’

আমলিপদা গ্রামের হরসিং বললেন, চাষবাস থেকে মুনাফা প্রায় হয়ই না। ‘বেশিরভাগ চাষির হাতে আছে দেড় থেকে দু বিঘা জমি। চাষের খরচ অনেক। ফসল বেচে সেই খরচ উঠে আসার পরে যদি ৩০ শতাংশও বাঁচে, তা দিয়ে একটা পরিবারের সারাবছরের খাওয়ার খরচও চলে না।’

বিয়ের নতুন আচার

বাসিন্দারা বললেন, সাধারণত ভীলদের বিয়েতে তিন থেকে চার কিলো রুপো দেওয়া হত। কিন্তু এবছর দাম অনেকখানি বেড়ে যাওয়ায় কোনো কোনো পরিবার নতুন করে ভাবছে অতখানি রুপো দেবে কিনা।

বাঁশোয়াড়া সারাফা অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বিশাল বললেন, সম্প্রতি মাহি বাঁধের ওদিকের এক গ্রামের বিয়েতে দুই পরিবার মিলে ঠিক করে যে রুপোর ভারি গয়নার আদানপ্রদান হবে না। তার বদলে কনেকে একটা সোনার মঙ্গলসূত্র আর রুপোর পায়ের আঙুলের গয়না দেওয়া হয়, যার দাম প্রায় দেড় লাখ। তাছাড়া কনের নামে দু লাখ টাকার ফিক্সড ডিপোজিটও করা হয়।

বাসুনি গ্রামের আঞ্চি বললেন যে তাঁর ভাইয়ের বিয়েতে পরিবার প্রায় এক কিলো পুরনো রুপো কিনেছে ২.৮৫ লাখ টাকা দিয়ে। তিনি বললেন ‘তার সঙ্গে আমরা ১.৬ লাখ টাকা দিয়ে একটা সোনার মঙ্গলসূত্র, রুপোর পায়ের আঙুলের গয়না আর পায়েল কিনেছি। আমাদের ধার করতে হয়নি।’

বিশাল আরও বললেন, আগে পরিবারগুলো প্রায়শই বিয়ের আগে ধারে রুপো কিনত, তারপর নোত্রা নামের সামাজিক সমবায় থেকে টাকা নিয়ে ধার শোধ করে দিত। কিন্তু দাম বাড়তে থাকায় আর ওঠানামার ফলে সেরকম ব্যবস্থা করাও শক্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি আরও জানালেন ‘আগে কোনো কোনো পরিবার ছোটখাটো ধারের জন্যে রুপো বন্ধক রাখত, তারপর বহুবছর আর সেগুলো উদ্ধারের ব্যবস্থা করত না। এখন দাম বেড়ে যাওয়ায় ফিরে এসে টাকাপয়সা মিটিয়ে রুপোর জিনিসগুলো ফেরত নিয়ে যাচ্ছে।’ বললেন দামের ওঠানামার ফলে দর বদলে যাওয়া নিয়ে মাঝেমধ্যে বিবাদও হচ্ছে।

বারওয়াস, ভগতপুরা আর থুমারের মত গ্রামে বিয়েতে রুপোর আদানপ্রদান সীমিত রাখার আলোচনাও চলছে। দিনেশ চন্দ্র দিন্দোর বললেন, কুশলগড় এলাকার বিভিন্ন সময়ে এক ২১ সদস্যের কমিটি গড়া হয়েছে। তিনি বললেন ‘কোনো কোনো গ্রামে পরিবারগুলো মিলে ঠিক করেছ, রুপো এক থেকে দেড় কিলোর বেশি দেওয়া-নেওয়া হবে না। প্রথা বজায় রাখা হচ্ছে, তবে অদলবদল করে।’

প্রতিবেদক একজন ফ্রিলান্স সাংবাদিক এবং 101reporters.com–এর সদস্য। এই প্রতিবেদন ওই ওয়েবসাইট ও নাগরিক ডট নেটের সহযোগিতার ভিত্তিতে মূল প্রতিবেদন থেকে ভাষান্তরিত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

মতামত জানান

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.