ভারতীয় সিনেমার চেহারাটা এমন বেমালুম পালটে গেল একুশ শতকে এসে যে আমরা প্রায় ভুলেই গেছি, আমাদের হিন্দি বাণিজ্যিক ছবির ইতিহাস কীরকম। আজ আর গুরুদত্ত, রাজ কাপুরের কথা ভেবে লাভ নেই। এমনকি কাশ্মীর কি কলি (১৯৬৪) ছবিতে মহম্মদ রফির গানের স্মৃতিতে কাতর হয়েও লাভ নেই। আজ সিনেমায় কেবল সম্মুখসমর, যেখানে আমাদের প্রমাণ করতে হবে যে আমরা জিতব। কিন্তু এই জেতা কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের জেতা নয়, এই জয় গুপ্তচরের জয়। অর্থাৎ একজন ব্যক্তিকে চূড়ান্ত ক্ষমতা দেওয়া এবং ইতিহাসচ্যুত করা। ধুরন্ধর ফ্র্যাঞ্চাইজির যে প্রধান অপরাধ, তা হল দুটি ছবিতেই পরিচালক আদিত্য ধর ভেবেচিন্তে মানুষকে ইতিহাসের বাইরে নিয়ে ফেলেছেন।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
যদি একুশ শতকের হিন্দি সিনেমার কথা ভাবি, প্রথমেই বলতে হয় কহো না পেয়ার হ্যায় (২০০০) ছবির কথা। সেই ছবিতেই প্রথম, অর্থনৈতিক উদারীকরণের ফলে ভোগ্যপণ্যের বিপণনকে সিনেমার ‘স্পেকটাকল’ করে ফেলা প্রতিষ্ঠা পায়। ওই ছবি শুধু নিউজিল্যান্ডের সমুদ্র সৈকতে তন্বীর মুক্ত উরুদেশ দেখার নিমন্ত্রণ নয়। এক ধরনের পেশিবহুল পৌরুষের বয়ানও সৃষ্টি হয়। সমগ্র চলচ্চিত্রে যত ভোগ্যপণ্যের সমাবেশ ঘটেছে তা খেয়াল করলে বোঝা যায়, ক্রয়ক্ষমতাযুক্ত ভারতীয় মধ্যবিত্তকে (যাদের সংখ্যা মধ্য ইউরোপের জনসংখ্যার থেকে বেশি) একটু প্রেমের উৎকোচ দিয়ে ডিওডোর্যান্ট বা হেয়ার রিমুভারের ক্রেতা করা তোলা হচ্ছে। একজন দর্শককে ‘কনজিউমার’ বানানো হচ্ছে। এরপর ২০০১ সালে লগান নামে একটি ছবি মুক্তি পায়, যা আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক বিকল্প ধারণা তৈরি করে। স্বাধীনতার যুদ্ধ যে একদিনের ক্রিকেটের মতই তুচ্ছ, উত্তেজক এবং মজার হতে পারে, তা দেখে আমরা দেশপ্রেমের আবেগে মথিত হলাম। গরমের সন্ধ্যায় একটু বিয়ার খাওয়ার মত সে অনুভূতি, কিন্তু খেয়ালই করলাম না যে আমাদের মঙ্গল পাণ্ডে থেকে শুরু করে যে সংগ্রামের ইতিহাস ছিল তা শেষ হয়ে গেল। তারপর গত ২৫ বছরের মধ্যে পাঠান, জওয়ান, অ্যানিমাল এবং ধুরন্ধর ও ধুরন্ধর: দ্য রিভেঞ্জ মুক্তি পেয়েছে ২০২৩ সাল থেকে। অর্থাৎ এই শতকের তৃতীয় দশকে এসে ভারতীয় সিনেমার অন্ত্যেষ্টির আয়োজন সম্পূর্ণ এবং সিনেমার যা হাল হয়েছে তা হল, সেনাবাহিনীর ভাষায় যাকে বলে কোর্ট মার্শাল। দর্শককে এটাই মেনে নিতে হবে।
আরো পড়ুন হিংসা, উগ্র জাতীয়তাবাদ, বীরগাথা: আপাতত এ পথেই বলিউড
সিনেমায় যে ব্যক্তিকে ধুরন্ধর বলা হচ্ছে, তাকে চালাকের শিরোপা দেওয়া হয়েছে। অথচ তাকে যা যা করতে দেখা যায় তাতে মনে হয়, ভারতে কারও গুপ্তচরগিরি ছাড়া কোনো কাজ নেই। আমরা মা বলে কারও গর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হইনি, আমাদের জীবনে কোনো নারী নেই এবং নারীর কোনো পুরুষ নেই। এ এক আশ্চর্য জেব্রা সভ্যতা, যেখানে কোনো মানবিক সম্পর্ক কাজ করে না। আছে কেবল সন্দেহ আর হত্যার কাটাকুটি। ভায়োলেন্সের কথাই যদি বলেন, আগে সিনেমায় ‘ভায়োলেন্স’ দেখিনি? যখন আমরা দিলীপকুমার, রাজ কাপুর, দেব আনন্দ বা আমাদের উত্তমকুমারকে দেখতাম, তখনো ‘ভায়োলেন্স’ দেখেছি; একজন মানুষের উপর অতিমানবিক ক্ষমতা আরোপ করা দেখেছি। সে যুগের কথা যদি ছেড়েও দেন, অমিতাভ বচ্চনের ‘অ্যাংরি ইয়াংম্যান’-এর মূল অবলম্বনই তো ভায়োলেন্স। কিন্তু এখন যা দেখানো হচ্ছে তাতে ইতিহাসের সিনেমা হলের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া উপায় নেই। জীবনানন্দ দাশ লিখেছিলেন ‘…হে কালপুরুষ,/ধ্রুব, স্বাতী, শতভিষা,/উচ্ছৃঙ্খল প্রবাহের মতো যারা তাহাদের দিশা/স্থির করে কর্ণধার?— ভূতকে নিরস্ত করে প্রশান্ত সরিষা’। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ যে নীল নকশা ভারতীয়দের জন্য তৈরি করেছে, তাতে যা একদা অশোকের শিলালিপিতে উৎকীর্ণ ছিল তা আজ বম্বের সিনেমার খুনোখুনিতে উৎকীর্ণ হয়েছে। বিপদ এখানেই যে আমাদের চওড়া নামের বুদ্ধিজীবীরাও বলতে শুরু করেছেন ‘কী ক্রাফটসম্যানশিপ! কী বানানো!’ তাঁদের সুব্রত মিত্রকে আর মনে নেই, রাধু কর্মকারকে মনে নেই, রমেশ যোশীও বিস্মৃত। কম্পিউটারের ক্রাফটসম্যানশিপ দেখেই তাঁরা মুগ্ধ।
এখানে খেয়াল করার মত বিষয় হল, ক্রমশ মানুষের অবমূল্যায়ন হচ্ছে এবং মানুষের বদলে যন্ত্র আমাদের দখল নিচ্ছে। ঘটনাটা যে ২০২৬ সালে ঘটছে, সেটা খুবই আকর্ষণীয়। কারণ রক্তকরবী নাটকের শতবর্ষে আমরা রবীন্দ্রনাথকে এই প্রত্যুত্তর দিচ্ছি। তাঁকে উপহার দিচ্ছি জীবনানন্দ কথিত প্রশান্ত সরিষা, যেখানে রক্ত আর ঘৃণা ছাড়া কিছু নেই। ভারতে হাজার বছর ধরে যে সম্প্রদায়ের মানুষ রয়েছেন, যাঁদের সংস্কৃতি আমাদের মৃত্তিকায় মিশেছে ফতেপুর সিক্রিতে, তাজমহলে এবং যে সংস্কৃতিকে আমরা দিল্লি ৬ (২০০৯) ছবির সাধারণ বস্তিতে দেখি, অনতি অতীতে রাষ্ট্রপতি ভবনেও দেখেছি, সেইসব মানুষ ধুরন্ধরের ভারতে অনুপস্থিত।

আমি ধুরন্ধরকে প্রোপাগান্ডা বলব না। সব শিল্পই এক অর্থে প্রোপাগান্ডা— মানুষের সপক্ষে। হ্যামলেট বা কিং লিয়র যে প্রোপাগান্ডা নয় তা তো নয়। এমনকি পথের পাঁচালী-ও জীবনের সপক্ষে প্রচারাভিযান। কিন্তু ধুরন্ধরের মত প্রোপাগান্ডায় লক্ষণীয় ব্যাপার হল, মানুষকে তার চামড়া বাদ দিয়ে দোকানে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। সংলাপ আউড়ে যাচ্ছে কিছু রক্তাক্ত শবদেহ। আমরা ভাবছি সবই সম্ভব, কারণ আমাদের পক্ষে চূড়ান্ত অসম্ভব হয়ে উঠেছে বাস্তব সত্য। ফলে আমাদের ধুরন্ধরকে সাবাস বলে না মেনে উপায় নেই।
আমার একথা ভেবে খারাপ লাগে যে এই কলকাতা শহরে রামমোহন রায় ছিলেন, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ছিলেন। এ শহরের লোকেরা জাঁক করে বলে— একই বছরে (১৯৫৫) পথের পাঁচালী, শাপমোচন আর সবার উপরে মুক্তি পেয়েছিল। অযান্ত্রিক (১৯৫৮) দেখেছে বলেও এদের গর্বের শেষ নেই। হলিউডের বিখ্যাত যুদ্ধের ছবিগুলো এবং ব্যাটলশিপ পোটেমকিন (১৯২৫) দেখা নিয়ে কলার তোলার লোকেরও অভাব নেই আজকের কলকাতায়। এই সমস্ত দেখা আজ এক প্লাবনেই ভেসে যাচ্ছে এবং আমরা ক্রমশ স্নায়ুবিহীন পোকামাকড়ে পরিণত হচ্ছি।
ধুরন্ধর আরও অনেক পয়সা কামাবে। এত পয়সা কামাবে যে ভারত সরকারের কোনো বিভাগীয় দফতর হয়ত অত আয় করে না। কিন্তু পয়সা কামানোই যদি শিল্পের উৎকর্ষের মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে বুঝতে হবে যে আমাদের জীবনে শিল্পের প্রয়োজন চিরতরে ফুরিয়ে গেছে। ডিজিটাল কারিকুরিকে যাঁরা দারুণ ক্রাফটসম্যানশিপ বলছেন, তাঁদের কাছে আমার প্রশ্ন, এই ক্রাফটসম্যানশিপ কি সুব্রত মিত্রের কাশবনের সঙ্গে তুলনীয়? আর শুধু ক্রাফটসম্যানশিপ যদি শিল্পের লক্ষণ হত, তাহলে লোকে এতদিন বাল্মীকি বা কালিদাসে মজে থাকত না। সেখানে আমাদের অন্তরের স্পর্শ ছিল, এখানে শুধু দেখা যায় ‘মানুষ এখনও নীল, আদিম সাপুড়ে;/রক্ত আর মৃত্যু ছাড়া কিছু পায় নাকো তারা খনিজ, অমূল্য মাটি খুঁড়ে।’ এই হিংসা, এই দ্বেষ, ইতিহাসের এই অস্তিত্বহীনতা আমাদের মাথার উপরে আজ একাদশীর চাঁদের মত ঝুলছে বলে বলি— এ বড় সুখের সময় নয়, এ বড় আনন্দের সময় নয়।
হে হিন্দু পুরুষ, তুমি বুঝতে পারছ, তোমার মত নাস্তিক আর কেউ নেই? তুমি ঈশ্বর পরিত্যক্ত? তুমি জননীর স্নেহ, প্রণয়িনীর প্রেম পরিত্যক্ত? মৃত্যুকালে শান্তির জল দেওয়ার মত তোমার কেউ নেই?
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








