পশ্চিমবঙ্গে লোকসভা ও বিধানসভা মিলিয়ে পরপর তিনটে নির্বাচনে শূন্য পাওয়া, ভোট শতাংশও তলানিতে ঠেকে যাওয়া সিপিএম দলটার সদস্য, সমর্থক এখনো কারা? সোশাল মিডিয়ার সরব শহুরে মধ্যবিত্ত, যাদের অনেকেরই সিপিএম হওয়ার প্রধান কারণ পারিবারিক, তারা ছাড়া আর কেউ আছে কি? সাংবাদিকসুলভ বদভ্যাসে এই প্রশ্নের উত্তর প্রায়ই খুঁজি। খুঁজতে গিয়ে চোখের সামনে যে উদাহরণগুলো পাই, তাঁদের কথাই বলি। এঁরা সকলে আমারই আশপাশে থাকেন, নামধামও জানি, কিন্তু এঁদের ক খ গ ঘ বলেই উল্লেখ করব। কারণ এঁদের তো গায়ে গতরে খেটে খেতে হবে, আর শাসক দল যদি মনে করে এঁদের নিজেদের দলে টানতেই হবে, তাহলে প্রতীক-উর রহমানের মত সাদরে সাংবাদিক সম্মেলন করে হাতে পতাকা ধরাবে না। যেভাবে ধরাবে সেটা পশ্চিমবাংলার প্রাচীন পদ্ধতি, এবং শান্তিপূর্ণ পদ্ধতি নয়। তাছাড়া নিজেদের দলের শত্রুরাও আছে।

রেল বাজারে সবজির জোগান নিয়ে আসা ভারি ভারি বস্তা ট্রাক থেকে নামিয়ে বাজারের বিভিন্ন দোকানির কাছে পৌঁছে দেওয়াই ক দাদার পেশা। মাথার সমস্ত চুল পেকে গেছে, কিন্তু শরীর এখনো শক্তপোক্ত বলে কাজটা করতে পারছেন। আমার পেশা বা রাজনৈতিক মতামত সম্পর্কে এঁর কিছুই জানা নেই, আমার নামও জানেন না সম্ভবত। কিন্তু আমার বাবাকে চিনতেন এবং যেহেতু তিনি সিপিএম করতেন, অতএব ক-দা ধরে নিয়েছেন আমিও একই মতের। আমি দাদাকে বছর তিনেক আগে অবধিও চিনতাম না, কিন্তু উনি আমাকে দেখলেই চিরপরিচিতের মত কুশল সংবাদ জিজ্ঞেস করতেন বলে উত্তর দিতাম। সন্দেহ ছিল— আমাকে অন্য কারও সঙ্গে গোলাচ্ছেন। কিন্তু একদিন আমার বাবার সম্পর্কে এক দোকানিকে বিস্তারিত বললেন এবং আমার বোনের কোথায় বিয়ে হয়েছে তা-ও দেখলাম জানেন, ফলে নিশ্চিত হওয়া গেল। মে দিবসে দেখা হয়ে গেলে ক-দা আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে গুপ্তচরদের সংকেত বলার মত কানে কানে বলেন ‘লাল সেলাম, কমরেড’।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

খ একজন টোটোচালক। হ্যান্ডেলের উপর বসানো মোবাইল ফোনের ওয়াল পেপারে সবসময় থাকে মীনাক্ষী মুখার্জির ছবি, গাঁক গাঁক করে গান শোনার জন্যে লাগানো স্পিকারে প্রায়শই বাজে মীনাক্ষীর কোনো বক্তৃতা। ব্যাপারটা খ-এর পক্ষে কতটা দুঃসাহসিক, সেটা যাঁরা বেড়াতে যাওয়া ছাড়া হাওড়া ব্রিজ পেরোন না তাঁদের পক্ষে বোঝা শক্ত।

গ দাদার পেশা গাড়ি চালানো। একসময় মিনিবাস চালাতেন, তারপর আমাদের মত ঊর্ধ্বগামী মধ্যবিত্তদের প্রাইভেট গাড়ি চালাতেন। তাতে রোজগার যথেষ্ট না হওয়ায় কিছুদিন এক কারখানার অ্যাম্বুলেন্স চালকের চাকরি নিয়েছিলেন। সেখানে অধিকাংশ সময় বসেই থাকতে হয় এবং কারখানার অন্যান্য গাড়ির ড্রাইভারদের মধ্যে বিজেপি সমর্থকদের প্রাধান্য, ফলে গ-দার সঙ্গে তাদের প্রায়শই ঝগড়া লেগে যেত। তাই গ-দার ও চাকরি বেশিদিন পোষাল না। গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে দেয়ালে সিপিএমের পোস্টার লাগাতে গিয়ে স্থানীয় তৃণমূল কর্মীদের সঙ্গেও মারামারি হয়েছে। যা-ই হোক, কারখানার গাড়ির চাকরি ছেড়ে কিছুদিন দূরপাল্লার বাস চালিয়েছেন, এখন উবের বাস চালান। পার্টির প্রতি প্রচুর ক্ষোভ আছে, পার্টিকে লড়াকু চেহারায় দেখতে চান। নেতৃত্ব তা চায় না বলে অনুযোগ করেন। আমার সঙ্গে আলাপ বছর সাতেক হল। এই সাত বছরে ১২-১৫ বার বলেছেন ‘ধুর, সব ছেড়েছুড়ে দেব।’ এখনো ছেড়েছেন বলে খবর নেই।

ঘ আমার ছোটবেলার সহপাঠী। এখন ছোট ব্যবসায়ী। পারিবারিক পুঁজি বলতে কিছুই নেই— না অর্থনৈতিক, না সাংস্কৃতিক। প্রচুর পরিশ্রম করতে হয় জীবিকার্জনের জন্যে। তা সত্ত্বেও এলাকায় সিপিএমের কোনো মিটিং, মিছিলে ঘ নেই— এমন হয় না। পার্টি সম্পর্কে তার বিস্তর সমালোচনা আছে, তার কিছু কিছু কখনো কখনো সোশাল মিডিয়ায় লিখে ফেলে। কিন্তু একটা স্তরে গিয়ে নিজেই নিজেকে লাগাম পরায়। তবে কখনোই অন্য কোনো পার্টিকর্মী বা নেতাকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করে না।

ক-দা সমাজবিপ্লবের স্বপ্ন-টপ্ন নিয়ে পার্টির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন কিনা, তা জানার সুযোগ আমার আজ পর্যন্ত হয়নি। কারণ আমি যখন বাজারে যাই তখন আমার গ্যাঁজানোর সময় থাকলেও, উনি প্রায় দৌড়তে দৌড়তে কথা বলেন।

খ-ও সারাক্ষণ যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছে দিতে ব্যস্ত। ফলে সে কেন সিপিএম সমর্থক, সিপিএম প্রকৃত কমিউনিস্ট পার্টি কিনা— এসব তার সঙ্গে আলোচনা করার সুযোগ আমার হয় না। স্থানীয় সিপিএম নেতৃত্বের আলোচনা করা কর্তব্য, তাঁরা করেন কিনা জানি না।

গ-দার সঙ্গে এসব নিয়ে আমার কিঞ্চিৎ আলাপ আলোচনা হয়। তিনি মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন, স্তালিন, হো চি মিন, মাও সে তুং, ফিদেল কাস্ত্রো, চে গেভারা – এসব নাম জানেন। ম্যাক্সিম গোর্কির মাদার পড়েছেন। বাকিটা নেতাদের থেকে শুনে শুনে নিজের মত করে বুঝে নিয়েছেন। দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ, ঐতিহাসিক বস্তুবাদ, উদ্বৃত্ত মূল্যতত্ত্ব, ‘উপনিবেশবাদ হল পুঁজিবাদের চরমতম রূপ’, ‘কংক্রিট অ্যানালিসিস অফ কংক্রিট কন্ডিশনস’— এসব কথা উনি জানেন না। ওঁর বরং রাগ হয় স্থানীয় পার্টিনেতারা গলায় মা কালীর পুজোর ফুল পোরা মাদুলি দেখে হাসাহাসি করলে। সরল মনে প্রশ্ন করেন— মার্কস, লেনিন কি কোথাও বলেছেন যে পুজোআচ্চা করলে কমিউনিস্ট হওয়া যায় না? প্রশ্নটা নাকি পার্টির দাদাদেরও করেছিলেন। তাঁরা আমতা আমতা করেছেন এবং যা বলেছেন তার মোটের উপর মানে হল— আমরা যখন বলছি এটা ঠিক নয়, তখন এটা ঠিক নয়। গ-দার নেতাদের প্রতি অবিশ্বাস এতে বাড়ে, মা কালীর প্রতি বিশ্বাস কমে না। তাঁর মতে, না জেনেশুনে মানুষের বিশ্বাসে অকারণ আঘাত করা পার্টির আজকের জনবিচ্ছিন্নতার অন্যতম কারণ। উপরন্তু গ-দা মনে করেন, এই ফাঁক দিয়েই বিজেপি ঢুকে পড়েছে। তাদের মত বদ পার্টি দুটো নেই। তাদের সঙ্গে মারামারি ছাড়া কমিউনিস্টদের অন্য কোনো সম্পর্ক হয় না, হতে পারে না। গ-দা আরও বলেন, হিন্দু আর মুসলমানে কোনো লড়াই নেই। ওটা বিজেপি আর তৃণমূল খুঁচিয়ে তুলছে নিজেদের অপদার্থতা ঢাকতে। আসলে সব বাঙালির পক্ষেই বিপজ্জনক হল বিজেপি সমর্থক অবাঙালি হিন্দুরা।

ঘ নিজের আগ্রহে বেশ খানিকটা পড়াশোনা করে। মার্কসবাদী বইপত্রের বাইরে বাবাসাহেব ভীমরাও আম্বেদকর নিয়েও তার আগ্রহ আছে। জাতপাতের রাজনীতিকে অগ্রাহ্য করে ভারতে গরিব মানুষের জন্যে কিছু করা সম্ভব কিনা তা নিয়ে তার ঘোর সন্দেহ।

গ-দা আর ঘ, দুজনেরই বক্তব্য হল, পার্টির দাদারা ওঁদের কথায় পাত্তা দেন না। পার্টির প্রতি আনুগত্যের নামে নিজেদের মতই চাপিয়ে দেন। নিজেদের পেশার কারণেই রোজ নানা ধরনের মানুষের কথা এঁদের কানে আসে। সেইসব মানুষ সিপিএম বৃত্তের বা বাম বৃত্তেরও বাইরের, সুতরাং তাঁদের সমর্থন ফেরাতে না পারলে বিপ্লব-টিপ্লব দূরের কথা, ক্ষমতায় ফেরাও সম্ভব নয়। কিন্তু সেইসব কথা নেতাদের কানে তুলতে গেলে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। যা নেতারা ভাবেন তা-ই সাধারণ মানুষের ভাবনা— এই নীতি নিয়ে পার্টি চলে।

যেখানে প্রতীক-উর ঠিক

ক, খ, গ, ঘ-র জায়গায় ইচ্ছামত নাম বসিয়ে নিন। সিপিএম সম্পর্কে সারা পশ্চিমবঙ্গের কর্মী সমর্থক তো বটেই, সাধারণ ভোটারদেরও মোটের উপর এই অভিযোগগুলোই রয়েছে। তৃণমূল, বিজেপির বিকল্প কোনো নীতি তুলে ধরতে না পারা বা তৃণমূল সরকারের আমলে একের পর এক আন্দোলন করার মত ইস্যু উঠে আসা সত্ত্বেও আন্দোলন গড়ে তুলতে না পারার ব্যর্থতা তো সবাই জানে। কিন্তু এই ভুলগুলো ১৫ বছর ধরে হয়েই চলেছে কেন— এ প্রশ্ন যদি করা হয়, তাহলে উত্তর হিসাবে এগুলোই উঠে আসে। সে কারণেই প্রেম দিবসের দুদিন পরে প্রতীক-উরের পার্টির প্রতি অপ্রেম প্রকাশ্যে আসার পরে তিনি বেশকিছু সদস্য, সমর্থকের মন পেয়েছেন। এমনকি তৃণমূলের ঝান্ডা হাতে নিচ্ছেন— এই সম্ভাবনা প্রকাশিত হওয়ার পরেও যতজন তাঁকে বিশ্বাসঘাতক বলে ভেবেছে, তার চেয়ে কম লোক সহানুভূতি প্রকাশ করেনি। আসলে প্রতীক-উরের মুখ দিয়েই এই গোপন প্রকাশ্যটি সর্বসমক্ষে এসে পড়ল যে, বঙ্গ সিপিএম হয়ে দাঁড়িয়েছে একুশ শতকের ব্রাহ্ম সমাজ। এটা কোনো বিপ্লবী দল তো নয়ই, স্রেফ সংসদীয় রাজনীতির নিয়ম মেনে জনপ্রিয়তা আদায় করে ক্ষমতা দখল করার পরিশ্রম করার মত দলও নয়। এ হল চেনা পরিচিতদের এক সংঘ, যেখানে যতদূর সম্ভব দ্বন্দ্ব এড়িয়ে চলার চেষ্টা করা হয়। যেটুকু দ্বন্দ্ব হয় তার বিষয় এই সংঘের বাইরে রাজ্যে বা দেশে কী হচ্ছে, তার মোকাবিলা কীভাবে করা হবে তা নয়। কে অমুক কমিটির তমুক হবে, কার লোককে কে তমুক কমিটি থেকে বাদ দিতে পারবে— সেইসব।

এই চেনা পরিচিত কারা? মূলত পশ্চিমবঙ্গের ভদ্রলোক শ্রেণি বলতে যাদের বোঝায়, তার পুরুষ ও মহিলারা। বাংলার মুসলমান, আদিবাসী, নিম্নবর্গীয় মানুষ— অর্থনৈতিক হিসাবে বললে গরিব মানুষ— অনুবীক্ষণ দিয়ে খুঁজতে হয়। এমনিতেই ক্ষমতা চলে যাওয়ার পরে পার্টির সদস্যসংখ্যা কমেছে, ফলে এই ধরনের মানুষের সংখ্যাও অঙ্কের নিয়মেই কমে গেছে। তার উপর আবার এমন সব ইস্যু নিয়ে পার্টি ভাবিত এবং যৎসামান্য আন্দোলন করে, যা দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের গরিব মানুষের কিচ্ছু এসে যায় না।

যেমন রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের ডিএ বাড়ানো নিয়ে সিপিএম ভীষণ সোচ্চার। এটা অবশ্যই কর্মীদের সাংবিধানিক অধিকারের প্রশ্ন, কিন্তু চাকুরে মধ্যবিত্তদের স্বার্থের সঙ্গে জড়িত। ডিএ বাড়লে এ রাজ্যের গরিব মানুষের কী? আশা কর্মীরা বরং অনেক পিছিয়ে থাকা শ্রেণি। তাঁদের আন্দোলনে সিপিএমের অবদান কতটুকু?

স্কুলের মিড ডে মিল নিয়ে যে ধাষ্টামো রাজ্য সরকার করে চলেছে, তার বিরুদ্ধেও সিপিএমের কোনো আন্দোলন নেই। অথচ ওটার সঙ্গে রাজ্যের সবচেয়ে গরিব মানুষের স্বার্থ জড়িয়ে আছে।

স্মার্ট মিটারের বিপদ নিয়ে গোটা রাজ্যে আন্দোলন গড়ে তুললে মধ্যবিত্তদের পাশাপাশি কৃষকদের সমর্থনও পাওয়া যেত। কিন্তু কিছু বিচ্ছিন্ন আন্দোলন ছাড়া সিপিএম কিছুই করেনি।

২০১৩ সালে চিট ফান্ড কেলেঙ্কারি ফাঁস হয়ে গেল, তা নিয়েও সিপিএম রাজ্যজুড়ে কোনো ঝড় তোলেনি। অথচ ওই কেলেঙ্কারিতে কপর্দকশূন্য হয়ে গিয়েছিলেন গৃহ সহায়িকা, রিকশাচালক, রাস্তার চায়ের দোকানের মালিকদের মত মানুষ।

আর জি কর আন্দোলনের মত ভয়ঙ্কর ঘটনা, যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ উল্কার গতিতে ছড়াচ্ছিল, সেটাকেও রাজ্যের গ্রামাঞ্চলে এবং গরিব মানুষের কাছে নিয়ে গিয়ে লাগাতার আন্দোলন করতে ব্যর্থ হল। সফল হওয়া সম্ভবও ছিল না। কেন?

ভারতের আর পাঁচটা কমিউনিস্ট পার্টির মত সিপিএম নেতৃত্বেও মধ্যবিত্তদেরই আধিক্য ছিল বরাবর, কিন্তু তাঁদের মধ্যে গরিব মানুষের সঙ্গে সংযোগ রক্ষার তাগিদ দেখা যেত, ফলে তাঁরা জানতেন কোনগুলো গরিব মানুষের সমস্যা। নইলে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় এসে অপারেশন বর্গা করত না। কিন্তু ক্ষমতার অলিন্দে সময় যত গড়িয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে রাজ্যে মধ্যবিত্ত যত বেড়েছে, তাদের ভোট আদায় করে ক্ষমতায় টিকে থাকার প্রবণতা বেড়েছে। গরিব মানুষের সঙ্গে সংযোগ তত কমেছে। নয়ের দশকের শেষ থেকে একেবারেই সরকারি ও বেসরকারি চাকুরেদের পার্টি হয়ে গেছে সিপিএম। আপনার পাড়ার শহিদবেদীতে নভেম্বর বিপ্লব দিবসে কারা পতাকা তোলে লক্ষ করবেন। কোনো রিকশাচালক, অটোচালক, টোটোচালক কি সবজি বিক্রেতাকে দেখতে পান? যাঁরা তোলেন তাঁরাই এরিয়া কমিটি থেকে রাজ্য কমিটি পর্যন্ত নেতৃত্ব দখল করে ফেলেছেন। ফলে তাঁদের চোখই পার্টির চোখ, সেই চোখ দিয়েই রাজ্যটাকে দেখা হয়। শেয়ার বাজারে টাকা খাটানো, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত গাড়ি চড়ে স্কুলে যাওয়া শিক্ষক নেতা কী করে ভেবে উঠতে পারবেন যে মিড ডে মিল নিয়ে আন্দোলন করা দরকার?

সিপিএম যে এঁদেরই দল এবং এঁদের চোখ দিয়েই রাজ্যটাকে তারা দেখে, তার সবচেয়ে জ্বলজ্বলে প্রমাণ হল লক্ষ্মীর ভাণ্ডার সম্পর্কে সিপিএমের কটুকাটব্য। যে বলতে গেছে— মানুষের হাতে সরাসরি টাকা দেওয়া আসলে কল্যাণমূলক অর্থনীতি এবং এতে লাভ হয় বলে বহু বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদের মত, তাকেই শুনতে হয়েছে ‘চটিচাটা’। শূন্যের হ্যাটট্রিক হওয়ার আগে রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমেরও মনে হয়নি যে পার্টি মুখপাত্র এবং রাম শ্যাম যদু মধুদের বোঝানো দরকার— সরকারি ভাতাকে ভিক্ষা বলা মানে গরিব মানুষকে অপমান করা। শূন্যের ঠেলায় যতদিনে তিনি কথাটা বললেন, ততদিনে মধ্যবিত্ত সদস্য ও সমর্থককুল এতবার ‘মরা মরা’ বলে ফেলেছে যে আর ‘রাম রাম’ বলা সম্ভব নয়। মুখপাত্ররা তাই ঢোঁক গিলে বলতে শুরু করলেন— ভাতা দিচ্ছে ঠিক আছে, কিন্তু কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করলে শুধু ভাতা দিয়ে কি চলবে?

প্রতীক-উর পার্টির যা যা দোষ চিহ্নিত করেছেন তার প্রায় সবের জন্যেই দায়ী করেছেন বর্তমান রাজ্য সম্পাদককে। কিন্তু এই দোষগুলো সেলিমের পূর্বসুরি সূর্যকান্ত মিশ্রের আমলেও ছিল। কারণ এ রোগের জন্ম ক্ষমতায় থাকার সময়েই। উপরে যে ক খ গ ঘ-দের কথা বলেছি, তাঁদের পার্টির তত্ত্ব, গঠনতন্ত্র ইত্যাদি শিখিয়ে পড়িয়ে নেওয়ার দায়িত্ব ছিল পার্টির। পৃথিবীর সমস্ত কমিউনিস্ট পার্টিতে এটাই নিয়ম। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে সেসব উদ্যোগ স্তিমিত হয়ে গেছে বামফ্রন্ট আমলেই। এখন তো এমন অবস্থা যে কেউ ‘কমিউনিস্ট পার্টি করতে গেলে পড়াশোনা করতে হয়’ বললে, যাঁদের পড়াশোনা করার মত সময় এবং সংস্থান আছে তাঁরাও বক্তাকে মনে মনে খিস্তি করেন। ফলে কোনটা নয়া উদারবাদী অর্থনীতি আর কোনটা কল্যাণমূলক অর্থনীতি— সেটা ব্রাহ্মসমাজের হাতেগোনা কজন বুদ্ধিজীবী ছাড়া কেউ জানে না। তাঁরা অন্যদের জানানোর প্রয়োজনও বোধ করেন না। ‘আমরা কমিউনিস্ট, আমরা শিক্ষিত, আমরা ভালো। যে জানে না সে অশিক্ষিত (নইলে চটিচাটা)। তাকে আমাদের দরকার নেই’— এই অঘোষিত নীতিতে চলেন ওঁরা।

দেবেন ঠাকুরদের ব্রাহ্মসমাজের তবু একটা গুণ ছিল। পড়াশোনা এবং লেখালিখিকে গুরুত্ব দেওয়া হত, তত্ত্ববোধিনী-র মত পত্রিকা বেরোত। সিপিএম ব্রাহ্মরা এত পণ্ডিত যে পার্টি মুখপত্রটিকে মোটেই পাত্তা দেন না। প্রথম পাতা থেকে শেষ পাতা পর্যন্ত ভুলে ভরা থাকে। যেমন তথ্যের ভুল তেমন ভাষার। যে কোনো কাগজে যে পাতা সবচেয়ে যত্ন করে সময় নিয়ে তৈরি হয়, সেই সম্পাদকীয় পাতাতেই কোনোদিন নিজেদের পার্টির নেতা কলতান দাশগুপ্তের নাম হয়ে যায় ‘কালতান’, কোনোদিন আবার দীঘার ওপারে ভেসে ওঠে আন্টার্কটিকা। ক খ গ ঘ ঙ কমরেডরা, যাঁরা টেক স্যাভি নন, মৈত্রীশ ঘটকের সাক্ষাৎকার পড়ার বা দেখার মত প্রাথমিক পড়াশোনা নেই, তাঁরা গণশক্তি পড়ে নিজেদের যেটুকু শান দিয়ে নিতে পারতেন তার পথও বন্ধ। আসলে তাঁদের কথা নেতৃত্ব ভাবে না। কারণ ব্রাহ্মসমাজের লোকেরা কাগজ-ফাগজ পড়েন না, তাই পড়েন যা অ্যান্ড্রয়েড বা আইফোনে পড়া যায়।

এঁরাই ভেবে বের করেছেন যে দিনকাল বদলে গেছে। এখন রাজনীতি করা মানে পথে পথে ঘোরা নয়, মানুষের সঙ্গে মেশা নয়। ক্ষমতাসীন সিপিএমও অন্তত মনে করত— ভোটের প্রচার ৩৬৫ দিনের ব্যাপার, প্রত্যেক বাড়ির প্রত্যেকটা লোকের মুখ চেনার ব্যাপার। এঁরা মনে করেন হোয়াটস্যাপ ফরোয়ার্ড আর ফেসবুক পোস্টের লাইক গুনেই মানুষের মন বুঝে নেওয়া যায়। সোশাল মিডিয়া প্রচার দিয়েই ভোটে জেতার ব্যবস্থা পাকা করে ফেলা যায়। তাই প্রমোদ দাশগুপ্ত, বিনয় চৌধুরী, জ্যোতি বসুরা কীভাবে রাজনীতি করতেন সেকথা মনে করিয়ে দিলে বলেন ‘ওসব ওই যুগে চলত’। বিরক্তি চেপেই বলেন, যেহেতু ওই নামগুলো কেউ করে দিলে তাকে চটিচাটা বলতে এখনো জিভে আটকায়।

আরও অনেক গণ্ডগোলের কথা বলা যায়। কিন্তু মোদ্দাকথা হল, এই পরিমাণ আভিজাত্যের চাষ করে প্রত্যেক নির্বাচনের ফল বেরোবার পর ‘এই রাজ্যের লোক এদেরই ডিজার্ভ করে’, ‘লোকে তো ভাতা পেলেই খুশি, আর সবকিছু গোল্লায় যাক’ ইত্যাদি বলার যে ঔদ্ধত্য তা অতুলনীয়। তাই ২০১১ সালের পর থেকে এ রাজ্যের সিপিএমের পতনের গতিও অতুলনীয়। প্রতীক-উরের ঘটনায় অভিনবত্ব এটুকুই যে এতদিন ক খ গ ঘ ঙ চ-রা যেসব কথা বলে পাত্তা পেতেন না, উনি সেগুলোই রাজ্য কমিটির সদস্য থাকা অবস্থায় ক্যামেরার সামনে বলে দিয়েছেন।

যেখানে প্রতীক-উর বেঠিক

২০২২ সালে সিপিএমের রাজ্য সম্মেলনের প্রথম দিনের একখানা ছবি ভাইরাল হয়েছিল। সেই ছবিতে দেখা যাচ্ছে, মঞ্চের উপর এক নেতা বক্তৃতা দিচ্ছেন আর পিছনে বসা একাধিক বয়স্ক নেতা ঝিমোচ্ছেন বা ঘুমোচ্ছেন। এই সহস্রাব্দের গোড়া থেকে আনন্দবাজার গোষ্ঠীর পৌরোহিত্যে এ রাজ্যের সংবাদমাধ্যম ক্রমাগত বলে যাচ্ছিল যে সিপিএমে বৃদ্ধতন্ত্র চলে, তরুণ রক্ত দরকার। অনিল বিশ্বাসোত্তর সিপিএমের মিডিয়াসর্বস্বতা ক্রমশ বাড়ে, ফলে ‘তাজা রক্ত’ মাথায় উঠে যায় এবং ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরে (মধ্যবিত্তায়ন সম্পূর্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে), তাজা রক্ত আনলেই পার্টি ঘুরে দাঁড়াবে— একথা পাড়ার সিপিএম কর্মীরাও বলতে শুরু করেন। ওই ভাইরাল ছবিটা বৃদ্ধতন্ত্রের একেবারে প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছিল। মনে রাখা দরকার, সম্মেলনের ওই অধিবেশনে কিন্তু পার্টির বাইরের কোনো লোকের থাকার কথা নয়। সুতরাং ছবিটা তুলে বাইরে পাঠিয়েছিলেন পার্টি সদস্যরাই কেউ।

এখন পদত্যাগপত্র ভাইরাল হওয়া নিয়ে তদন্ত দাবি করে বসলেন যে প্রতীক-উর, সদস্যপদ নবীকরণ করানো হয়েছে কি হয়নি, সে খবর বাইরে এসে যাওয়ায় চক্রান্তের অভিযোগ তুলছেন যে দীপ্সিতা ধর, তাঁরা ওই ছবি কী করে ভাইরাল হল— সেকথা জানতে চেয়ে তখন চেঁচামেচি করেছিলেন? কোনো সংবাদমাধ্যমে তেমন খবর বেরিয়েছিল বলে তো দেখছি না। কেন করেননি? তাহলে কি একমাত্র নিজের তথ্য ফাঁস হয়ে গেলেই এঁদের রাগ হয়? অন্য কিছু বেরিয়ে গেলে পার্টির শৃঙ্খলা ইত্যাদি মনে থাকে না, বা কিছু এসে যায় না? একথা ভাবলেও কি অন্যায় হবে যে, সিপিএমের তরুণ তুর্কিরা তখন ভেবেছিলেন— বেশ হয়েছে বুড়োগুলোর ঘুমোবার ছবি বেরিয়ে গেছে। এদের জায়গা আমরা নেব?

প্রশ্নগুলো এখন মনে আসছে কারণ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, সিপিএম যে তরুণ তুর্কিদের উপর হাল ফেরানোর জন্য ভরসা রেখেছিল, তাঁরা কেউই হাল ফেরাতে পারেননি। সে না পারতেই পারেন। রাজনীতি এত সোজা জিনিস নয় যে কেউ চাইলেই কিছু করে ফেলতে পারবে। কিন্তু ২০২১ সালে যেসব ‘তাজা রক্ত’ ঢুকেছিলেন সিপিএমের প্রার্থী তালিকায়, তাঁদের মধ্যে মীনাক্ষী মুখার্জি ছাড়া আর কাউকে তো লড়াইয়ের ময়দানে দেখাই গেল না সেভাবে। প্রতীক-উরের প্রায় খুন হয়ে যাওয়া তো আরও আগের কথা। মীনাক্ষী গত পাঁচ বছরে রাস্তায় নেমে লড়তে গিয়ে পুলিসের মার খেলেন, গ্রেফতারও হলেন। শতরূপ ঘোষকে বেশি দেখা গেল টিভি স্টুডিওতে, থিয়েটার শোতে সিনেমার প্রিমিয়ারে আর ইউটিউবে। সৃজন ভট্টাচার্য, দীপ্সিতা, প্রতীক-উর লোকসভায় ফের প্রার্থী হলেন এবং বৃদ্ধ নেতাদের চেয়ে বেশি সুবিধা করতে তো পারলেনই না; ভোটের প্রচারে কদিন প্রচুর দৌড়াদৌড়ি করে হারার পর, সেই এলাকা থেকে স্রেফ উধাও হয়ে গেলেন। সৃজনের গিটার বাজিয়ে গান গাওয়া আর দীপ্সিতার নাচ যদি রাজনৈতিক কার্যকলাপ বলে ধরা হয়, তাহলে অবশ্য আলাদা কথা। কোথায় গেলেন ঐশী ঘোষ? কেউ জানেন? দিল্লিতে আছেন বলবেন না আবার। কথা হল, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নেই কেন? যদি থাকবেন না এমনই কথা ছিল, তাহলে উড়ে এসেছিলেন কেন? পার্টি এরকম যাওয়া আসা স্রোতে ভাসার সুযোগ দিয়েছিলই বা কেন? নাকি এরকম উদ্দেশ্যহীন ওড়াউড়িই নেতৃত্বের অভিপ্রেত?

২০২১ সালে যখন সিপিএমের প্রার্থী তালিকা প্রকাশিত হয়েছিল এবং তালিকায় অত তরুণ মুখ দেখে বাংলার মিডিয়া হাততালি দিচ্ছিল আর সিপিএম কর্মী সমর্থকরা উল্লাস করছিলেন, তখন উত্তরবঙ্গ সংবাদের পাতায় প্রশ্ন তুলেছিলাম ‘তরুণ কৃষক নেতা, শ্রমিক নেতারা কোথায়?’ অর্থাৎ তরুণ নেতা বলতেই সিপিএম ছাত্রনেতা বা যুবনেতা বুঝছে কেন? সিপিএমের রাজনীতি থেকে ‘শ্রেণি’ শব্দটা বহুকাল নির্বাসিত বলেই এই প্রশ্নটা আমাদের মত সাংবাদিকদের তুলতে হয়। শতরূপের মত নীতি, নৈতিকতার দায় নিতে না চাওয়া নেতারা তোলেন না; প্রতীক-উরের মত আপাত বিপ্লবীও তুললেন না। তাঁর অভিযোগের তির সরাসরি রাজ্য সম্পাদকের দিকে, অথচ ক খ গ ঘ-রা পার্টির কার্যকলাপ নিয়ে যেসব মৌলিক প্রশ্ন তুলেছেন, সেগুলো সেই গভীরতায় গিয়ে কিন্তু প্রতীক-উর তোলেননি। তাঁর যাবতীয় অভিযোগের কেন্দ্রে ‘আমি’।

আমি পার্টির জন্যে এত করলাম অত করলাম, খুন হয়ে যাচ্ছিলাম, আর পার্টি কী করল? অমুকে কেন বেশি গুরুত্ব পেল? তমুককে কেন অমুক দায়িত্ব দেওয়া হল? এই হল তাঁর ক্ষোভের নির্যাস। স্পষ্টতই, পার্টির থেকে তাঁর কিছু প্রত্যাশা ছিল। সে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি বলেই তিনি এই চরম সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সাংবাদিক সুমন দে যা-ই বলুন, এটা মাও সে তুংয়ের কথা অনুযায়ী, সদর দফতরে কামান দাগা নয়। এটা তৃণমূল ভবনের দরজায় রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়া ‘খোলো খোলো দ্বার, রাখিয়ো না আর/বাহিরে আমায় দাঁড়ায়ে’।

অথচ সত্যি সত্যি পার্টির সমালোচনা করতে চাইলে বলার মত অনেককিছু ছিল। তিনি বলেছেন— পার্টির মধ্যে সংখ্যালঘু হয়ে গিয়েছিলাম, তবে আমি তো এদেশে সংখ্যালঘু হয়েই জন্মেছি, ইত্যাদি। চমৎকার সিনেমাসুলভ সংলাপ। কিন্তু দুরকম সংখ্যালঘুকে এক করে দেখা রাজনৈতিক বোধের দিক থেকে অত্যন্ত কাঁচা ব্যাপার। সিপিএম যে বাংলার মুসলমানদের থেকে অনেক দূরে সরে গেছে, বিজেপির বিরুদ্ধে সোচ্চারে দাঁড়ায়নি সেই ২০১৪ সাল থেকে, এসআইআর যে মূলত মুসলমানদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার চক্রান্ত সেকথাও যে সিপিএম আজও স্বীকার করল না, অথচ সেলিম নিজে জিতে আসার জন্যে ঘুরে ফিরে মুসলমানগরিষ্ঠ আসনে গিয়ে দাঁড়ান— এই সমালোচনাটা প্রতীক-উর করতে পারতেন। করলে নিজেকে ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিসাবে চিহ্নিত করার একটা মানে থাকত। সিপিএম যে পুরোপুরি ভদ্রলোকের পার্টি হয়ে গেছে এবং সেখানে রাজ্য সম্পাদক একজন মুসলমান হলেও রাজ্যের মুসলমানদের প্রতি পার্টির অবহেলা দূর হয় না— সেই জরুরি কথাটা উঠে আসত। রাজ্য কমিটিতে জায়গা পেয়েও দেবলীনা হেমব্রমের মত আদিবাসী নেত্রী যে তেমন কিছুই করার সুযোগ পাচ্ছেন না, সেকথাটাও প্রতীক-উর বলতে পারতেন। তাহলে সরকারি দলে চলে গেলেও ভাবার অবকাশ থাকত যে, তিনি এত বিদ্রোহ নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করতে করেননি, দলটা যেনতেনপ্রকারেণ ছাড়তে হবে বলে করেননি, পার্টির বা বামপন্থী আন্দোলনের ভালোমন্দ নিয়ে চিন্তিত বলেই করেছেন।

পার্টিতে সংখ্যালঘু হয়ে যাওয়া নিয়ে হাহুতাশ করা রীতিমত হাস্যকর। একটা দল মানে সব ব্যাপারে সবাই একমত হয়, না হওয়া মানেই লবিবাজি, যা একটা নোংরামি— এরকম অতিসরলীকৃত ধারণা তৈরি করে বৃহৎ পুঁজি নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যম, কারণ তারা চায় দলীয় রাজনীতির বাইরের মানুষ বিশ্বাস করুন, রাজনীতি ব্যাপারটাই নোংরামি। অথচ সত্যিটা হল, পৃথিবীর সব দলে (কমিউনিস্ট পার্টিতে তো বটেই) চিরকাল বিভিন্ন লবি ছিল। ভবিষ্যতেও থাকবে। কারণ সব ব্যাপারে এক দলেরও সব মানুষ কখনো একমত হতে পারে না। তখন যে মত সংখ্যাগরিষ্ঠের সেটা প্রতিষ্ঠিত হওয়াই গণতন্ত্র। কেবল কমিউনিস্ট পার্টিতে নয়, সব পার্টিতেই।

দেশভাগের প্রশ্নে স্বয়ং মহাত্মা গান্ধী কংগ্রেসে সংখ্যালঘু হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি নিজের মত করে নিজের অবস্থান বজায় রেখেছিলেন। সারা দেশ যখন স্বাধীনতা দিবস পালন করছিল, তিনি অনশন করছিলেন। মিডিয়াকে ডেকে অন্য কংগ্রেস নেতাদের গাল পাড়েননি।

১৯৯৬ সালে কেন্দ্রের সরকারে যোগ দেওয়ার প্রশ্নে সিপিএমের অবিসংবাদী নেতা জ্যোতি বসুও পার্টিতে সংখ্যালঘু হয়ে পড়েছিলেন। প্রকাশ্যে বলেও দিয়েছিলেন যে পার্টি ঐতিহাসিক ভুল করল। তিনি যে ঠিকই বলেছিলেন সেটা পরবর্তীকালে বিজেপির ক্রমাগত শক্তিবৃদ্ধিতে প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু বলার কথাটা হল, জ্যোতিবাবু কখনো বলেননি— অমুক আমাকে প্রধানমন্ত্রী হতে দিল না, পার্টি আমার এতদিনের লড়াইয়ের মর্যাদা দিল না।

বলেননি মানে জ্যোতিবাবু মহাপুরুষ ছিলেন তা নয়। বলেননি, কারণ কমিউনিস্ট পার্টি করা মানে ব্যক্তির ঊর্ধ্বে দল— একথা বিশ্বাস করা। কংগ্রেস বা তৃণমূল কংগ্রেসে ‘গো অ্যাজ ইউ লাইক’-এর বহু ইতিহাস আছে। অনেকে সেটাই ভাল, সেটাই উদার বলেও মনে করেন। কিন্তু রাজ্য কমিটি পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়া একজন নেতা কমিউনিস্ট পার্টির এই সামান্য নিয়মটা যদি না জেনে থাকেন, তাহলে তাঁকে রাজ্য কমিটিতে যাঁরা নির্বাচিত করেছেন তাঁদের যোগ্যতা এবং শৃঙ্খলা নিয়েই প্রশ্ন তোলা উচিত।

এমনিতে মতপার্থক্যের কারণে কমিউনিস্ট পার্টি ছেড়ে দেওয়া বা বিতাড়িত হওয়া এমন কিছু অভিনব ব্যাপার নয়। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি ১৯৬৪ সালের পর থেকে বহুবার ভেঙেছে তো বটেই, তাছাড়াও অনেকেই এই বাম দল ছেড়ে ওই বাম দলে গেছেন। সৈফুদ্দিন চৌধুরী, সমীর পুততুণ্ডদের মত কেউ কেউ নতুন দলও খুলেছেন।

অশোক মিত্রের মত উদাহরণও আছে। দ্বিতীয় বামফ্রন্ট সরকারের অর্থমন্ত্রী থাকার সময়ে মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতিবাবুর সঙ্গে মতভেদ হওয়ায় একইসঙ্গে মন্ত্রিত্ব আর পার্টির সদস্যপদ ত্যাগ করেন। আজীবন সিপিএমের অনেক সমালোচনাও করেছেন, কিন্তু কখনো কাউকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করেননি এবং বারবার বলতেন/লিখতেন যে এমন কিছু করবেন না যাতে বামপন্থার ক্ষতি হয়। সেই কারণে সকলেরই শ্রদ্ধা অর্জন করেছেন। পরবর্তীকালে বামফ্রন্টই তাঁকে রাজ্যসভায় পাঠিয়েছিল।

ত্রিপুরার একদা মুখ্যমন্ত্রী নৃপেন চক্রবর্তী কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য থাকাকালীন বহিষ্কৃত হয়েছিলেন, সরাসরি জ্যোতিবাবুর সঙ্গে সংঘাত ছিল। তারপরেও তিনি পার্টির বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করে বেড়াননি। আমৃত্যু আড়ম্বরহীন বামপন্থী জীবনযাপনই চালিয়ে গেছেন।

আরো পড়ুন সেলিব্রিটি কাল্ট দরদি সিপিএমকে খোলা চিঠি

এর বাইরে অসংখ্য অখ্যাত কমিউনিস্ট ছিলেন এবং আছেন, যাঁরা প্রতীক-উরের মত সংখ্যালঘু হয়ে গিয়েছেন। অনেকেই পার্টির খারাপ লোকেদের জোটের কাছে হেরেই সংখ্যালঘু হয়েছেন। ফলে কেউ বসে গেছেন, কেউ পার্টি ছেড়ে দিয়েছেন, কেউ মানুষের জন্যে কাজ করার অন্য কোনো পথ খুঁজে নিয়েছেন। নিজের পার্টির লোকেদের নাম করে বা আকারে ইঙ্গিতে কটু কথা বলে, যাদের বিরুদ্ধে সারাজীবনের লড়াই, যাদের হাতে খুন হয়ে গিয়েছিলেন আরেকটু হলেই, তাদের দলেই মিশে যাননি ওঁরা।

লেখার শুরু করেছিলাম ক খ গ ঘ দিয়ে। চারজনই প্রতীক-উরের থেকে বয়সে বড়, কোনোদিন এরিয়া কমিটি পেরোবেন বলেও মনে হয় না। অথচ তাঁদের নিজের দলের বিরুদ্ধে রুষ্ট হয়ে ক্ষমতাসীন দলে যেতে ইচ্ছা করে না, করল তিরিশে পা দেওয়ার আগেই রাজ্য কমিটির সদস্য হয়ে যাওয়া একজনের। কেন? একটাই কারণ থাকা সম্ভব। ওঁরা নিজের জন্যে কিছু প্রত্যাশা করে রাজনীতি করতে আসেননি, প্রতীক-উর এসেছিলেন। ওঁরা প্রতীক-উরের থেকে লেখাপড়া কম জানেন, ওঁর তুলনায় মার্কসবাদী বইপত্রও কিছুই পড়েননি বলা যায়। কিন্তু ব্যক্তির আগে সমষ্টিকে স্থান দেওয়ার যে প্রাথমিক পাঠ, সেটা খুব ভালো করে নিতে পেরেছেন। প্রতীক-উর পারেননি। সুমন দে-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বারবার তিনি ‘ব্যক্তি’ আর ‘ব্যক্তিগত’ শব্দ দুটো ব্যবহার করছিলেন। একখানা এ আই টুলকে জিজ্ঞেস করলাম— শব্দ দুটো কতবার ব্যবহৃত হয়েছে এই ৫৪ মিনিট ৩০ সেকেন্ডের ভিডিওতে? উত্তর এল— ‘ব্যক্তি’ চারবার, ‘ব্যক্তিগত’ সাতবার। অর্থাৎ দুটো মিলিয়ে ১১ বার। মানে প্রায় পাঁচ মিনিট অন্তরই ব্যক্তিস্বার্থের কথা এসে পড়ে গতকাল পর্যন্ত কমিউনিস্ট পার্টির রাজ্য কমিটির একজন সদস্যের সঙ্গে কথা বলতে গেলে।

দুঃখের বিষয়, সিপিএম নেতৃত্বের অনেকেই ব্যক্তির আগে সমষ্টিকে রাখার পাঠটাকে গুরুত্ব দেন না। সেই কারণেই তাঁদের কাছে পরিশ্রমী শ্রমিক, কৃষক ফ্রন্টের পার্টিকর্মীদের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেছেন সুদর্শন ছাত্রনেতা, যুবনেতারা। এঁরা যে স্রেফ ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষী এবং পার্টির স্বার্থের পরিপন্থী, তা অগ্রজ নেতারা হয় বোঝেন না, নয় নিজেরাও উচ্চাকাঙ্ক্ষী বলে ওরকম ছেলেমেয়েদেরই পছন্দ হয়। শৃঙ্খলা গোল্লায় যায়। বিজেপির মুসলমানবিদ্বেষী মিউজিক ভিডিওতে মুখ দেখানো অভিনেতাদের পার্টির কমিউনিটি ক্যান্টিনে নিয়ে এসেও শাস্তি পান না শতরূপ ঘোষ; লাল পতাকার সামনে বসে সাংবাদিক সম্মেলন করে বলতে পারেন— বিলাসবহুল গাড়ি চড়ি আমার বাবার টাকায়, তাতে কার বাবার কী? সিপিএমের যে সদস্য সমর্থকরা ওই আচরণকে কোনো যুক্তিতে সমর্থন করেন, তাঁদের মেনে নিতে হবে— যে পার্টি থেকে শতরূপরা উঠে আসেন, সে পার্টি থেকে প্রতীক-উররাও উঠে আসবেন।

এই দ্বন্দ্বে জয়ী পক্ষের নাম তৃণমূল কংগ্রেস। সিপিএম এমন এক বিরোধী দল, যারা নির্বাচন এসে পড়লেই ব্যস্ত হয়ে পড়ে কী করে কার সঙ্গে কটা আসনে সমঝোতা করে কোনোমতে কিছু নেতাকে বিধায়ক বা সাংসদ বানানো যায় তার তাল করতে। সরকারের কাজের সমালোচনা গৌণ হয়ে যায়। নিজেরা মানুষের স্বার্থে কী করবেন তা কেবল ইশতেহারে লেখা হয়, যা আমাদের দেশে প্রায় কেউ পড়ে না। তাতেও যে খুব সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা লেখা থাকে তা নয়। ২০১৬ সালের নির্বাচনে এই ঘটনা ঘটানো হয়েছিল কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করতে গিয়ে, ২০২১ সালে সঙ্গে যোগ হল ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্টের সঙ্গে জোট করার প্রয়াস নিয়ে ডামাডোল, এবারে একা হুমায়ুন কবীরে রক্ষে নেই, প্রতীক-উরকে নিয়ে উত্তেজনা দোসর। এমন বিরোধী থাকতে মমতা ব্যানার্জির আর চিন্তা কী?

বিজেপির মত ফ্যাসিবাদী দলেরও চিন্তা নেই। দেশের এবং বাংলার চরম সংকট মুহূর্তে যখন বামপন্থীদের দিক থেকেই সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ আসার কথা, তখন দেশের সবচেয়ে বড় সংসদীয় কমিউনিস্ট পার্টি ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদীদের গুঁতোয় টলমল করছে দেখে মোহন ভাগবত, নরেন্দ্র মোদী আর অমিত শাহ নির্ঘাত খুব হাসছেন।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.