সরকারি খয়রাতি মানুষের কাজের ইচ্ছে নষ্ট করে তাদের পরজীবীতে পরিণত করে বলে মন্তব্য করেছে সুপ্রিম কোর্ট। গত ১২ ফেব্রুয়ারি এক মামলায় বিচারপতিদ্বয়ের এই পর্যবেক্ষণ আবার খয়রাতি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক উস্কে দিল। দিল্লির গৃহহীন ব্যক্তিদের আশ্রয়ের অধিকার সংক্রান্ত এই মামলার চূড়ান্ত রায় অবশ্য ঘোষিত হয়নি। নগরের সৌন্দর্যায়নের জন্য গরিবদের আশ্রয় বিপন্ন হবে কিনা সেই প্রসঙ্গে বিচারপতি বি আর গাওয়াই ও বিচারপতি অগাস্টিন জর্জ মাসির বেঞ্চ বিনামূল্যে রেশন দেওয়ার মত প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে। বিচারপতিরা এভাবে দান খয়রাতির মাধ্যমে কর্মবিমুখ জনগোষ্ঠী তৈরি না করে, তাঁদের মূল স্রোতে ফেরানোর কথা বলেছেন। তাঁদের পর্যবেক্ষণে মহারাষ্ট্রের লাডকি বহেনের মত প্রকল্পকে অযৌক্তিক বলা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের অনুরূপ ওই প্রকল্পে মহারাষ্ট্রের মহিলারা সরকারের থেকে সরাসরি নগদ টাকা পান। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ, মামলার সওয়াল-জবাবে আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ বলেন, কাজের সুযোগ পেলে কাজ করবেন না এমন লোক দেশে বিরল। সেই যুক্তি খণ্ডন করে বিচারপতি গাওয়াই বলেন, মহারাষ্ট্রে চাষের কাজের জন্য শ্রমিক, অর্থাৎ মজুর, পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁর যুক্তি অনুযায়ী, খয়রাতিতে উপকৃত হয়ে লোকে কাজ করতে চাইছে না। যদিও বিচারপতিদ্বয় আশ্রয়ের অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসাবে মেনে নিয়েছেন। গরিবদের আশ্রয় সংক্রান্ত মামলায় নানা সরকারি প্রকল্পের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং উপকৃতদের পরজীবী, কর্মবিমুখ বলা কতখানি প্রাসঙ্গিক – সে প্রশ্ন কিন্তু থেকেই গেল। কারণ মামলাটা সরাকারি খয়রাতি সংক্রান্ত নয়।
বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের বৈধতা নিয়ে একাধিক মামলা হয়েছে। ২০১৩ সালে তামিলনাড়ুর প্রধান দুই রাজনৈতিক দল ডিএমকে ও এআইএডিএমকের দান খয়রাতির প্রতিযোগিতামূলক রাজনীতির বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট মতামত দিয়েছিল। সুব্রহ্মণ্যম বালাজি বনাম তামিলনাড়ু সরকারের সেই মামলায় সুপ্রিম কোর্ট বলে, এটা সংবিধানের অন্তর্গত রাষ্ট্রের নির্দেশমূলক নীতির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। সরকার মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের জন্য কোন নীতি নেবে – সেটা ঠিক করার কথা একান্তই সরকারের। সরকার কোনো অসাংবিধানিক কাজ করলে তবেই বিচারবিভাগ হস্তক্ষেপ করতে পারে। কিন্তু সরকারের কোন নীতি যুক্তিসম্মত নয়, কোন খরচ রাজ্যের পক্ষে ভাল নয় – তা নিয়ে বিচারবিভাগ কথা বলতে পারে না। এসব নিয়ে বিতর্ক ও সিদ্ধান্তগ্রহণ একমাত্র আইনসভাতেই হতে পারে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
২০২২ সালের জানুয়ারি মাসে সরকারি খয়রাতির বিরুদ্ধে একটা জনস্বার্থ মামলা দায়ের করা হয়। অশ্বিনীকুমার উপাধ্যায় বনাম ভারত সরকারের সেই মামলায় অভিযোগ করা হয়, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের খয়রাতির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ভোটারদের অনৈতিকভাবে প্রভাবিত করে। সরকারি তহবিলের অপব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। মামলাকারীর দাবি ছিল, নির্বাচন কমিশনকেও এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। সুপ্রিম কোর্ট সেই মামলা গ্রহণ করে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কমিটি গঠনের কথা বলে। সেই মামলার এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। প্রসঙ্গত বলা যায়, ২০২২ সালেরই জুলাই মাসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বিরোধী দলগুলোর দান খয়রাতির রাজনীতিকে তীব্র ভাষায় কটাক্ষ করেছিলেন।
বিচারপতি গাওয়াই আর বিচারপতি মাসির বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ মানলে এটাও মেনে নিতে হয় যে, সরকারের নানা প্রকল্পে গরিব মানুষ খুব ভাল আছেন। তাই তাঁরা কাজ করতে চাইছেন না। ক্ষুধা ও বেকার সমস্যায় জর্জরিত গরিবের ভারত কিন্তু উল্টো কথা বলছে। ২০২৪ সালের বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে ভারতের স্থান ১২৭ খানা দেশের মধ্যে ১০৫তম। সরকারি পরিসংখ্যানই বলছে কোটি কোটি দেশবাসী অপুষ্টিতে দিন কাটাতে বাধ্য হন। সংবিধানে সকলের সসম্মানে বেঁচে থাকার অধিকারকে মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ২০১৩ সালের জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইন অনুসারে গ্রামের ৭৫% ও শহরের ৫০% মানুষের বিনামূল্যে খাদ্যশস্য পাওয়ার কথা। মোদীর আমলে গরিব কল্যাণ অন্ন যোজনায় ৮০ কোটি মানুষকে বিনামূল্যে খাদ্যশস্য দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। রাজ্য সরকারগুলোও রেশনে বিনামূল্যে খাদ্যশস্য দেওয়ার দাবি করছে। যেমন পশ্চিমবঙ্গে রয়েছে রাজ্য খাদ্য সুরক্ষা যোজনা। বিচারপতিদ্বয়ের পর্যবেক্ষণ ও সরকারের দাবি ঠিক হলে দেশজুড়ে এত অপুষ্টি কেন? আসলে এই দাবির মধ্যে বড় ফাঁকি রয়ে গেছে।
কেন্দ্রের প্রকল্পে অধিকাংশ মানুষ চাল, গম ছাড়া কিছুই পান না। পশ্চিমবঙ্গে রাজ্য খাদ্য সুরক্ষা যোজনায় শুধুমাত্র চাল দেওয়া হয়। তাও ডিজিটাল রেশন কার্ডের লীলায় অধিকাংশ মানুষই পর্যাপ্ত পরিমাণ চাল, গমও পান না। অন্য খাদ্যশস্য বিনামূল্যে তো নয়ই, কম মূল্যেও দেওয়া হয় না। রেশন ব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে লাটে তুলে দিয়ে বিনামূল্যে খাদ্যশস্য দেওয়ার প্রচার চলছে।
খাদ্যে ভর্তুকি বৃদ্ধির বদলে কমছে। পাশাপাশি খাদ্যদ্রব্যের দাম বেড়েই চলেছে। প্রত্যেক বছর কেন্দ্রের অর্থমন্ত্রক আর্থিক সমীক্ষা রিপোর্ট প্রকাশ করে। ২০২৪-২৫ সালের আর্থিক সমীক্ষার রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে গতমাসে। সেই রিপোর্ট থেকে জানা যাচ্ছে, ২০২৩-২৪ সালে খাদ্যদ্রব্যে মুদ্রাস্ফীতি ছিল ৭.৫%। ২০২৪-২৫ সালের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বরে সেই মুদ্রাস্ফীতির হার বেড়ে দাঁড়ায় ৮.৪%।
উপার্জনের জন্য মানুষ কতখানি মরিয়া তা কয়েক বছর আগে কোভিড অতিমারীর সময়ে আমরা দেখেছিলাম। পেটের জ্বালায় অন্য রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া মানুষের প্রতি কেন্দ্রীয় সরকার ও বিভিন্ন রাজ্য সরকারের আচরণ প্রমাণ করে দিয়েছিল তারা কতটা দেশভক্ত। কিন্তু লকডাউন উঠে যাওয়ার পর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বেশিরভাগ প্রবাসী শ্রমিক কর্মস্থলে ফিরে গেছেন। বিভিন্ন রাজ্যে চাকরির পরীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, প্রচুর শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে অনেক কম বেতন বা মজুরির চাকরির জন্য দেশের কোটি কোটি বেকার আবেদন করছেন। তীব্র বেকার সমস্যাকে মূলধন করে রাজ্যে রাজ্যে চাকরির পরীক্ষা নিয়ে সীমাহীন দুর্নীতি চলছে। মানুষ কর্মবিমুখ হলে চাকরির এত চাহিদা থাকত না। বেকার সমস্যা সৃষ্টি করছে সস্তা শ্রমের বাজার। কর্মরত মানুষের জীবিকা ও আয়ের নিশ্চয়তা ক্রমশ কমছে। ২০২৪ সালের মার্চ মাসে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) রিপোর্ট জানাচ্ছে, ভারতে বেকারদের মধ্যে ৮৩ শতাংশের বয়স ৪০ বছরের নিচে। কেন্দ্র বা রাজ্য, কোনো সরকারই আজকাল সরকারি ক্ষেত্রে কর্মী নিয়োগের কথা বিশেষ বলে না। বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়লে কর্মসংস্থান বাড়বে বলে গল্প শোনায়। বড় বড় কোম্পানির মুনাফা বাড়ে, বিনিয়োগও হয়। কিন্তু কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় খুব কম। আবার মালিকের মুনাফা বৃদ্ধির তুলনায় শ্রমিক, কর্মচারীদের মজুরি বা বেতন বৃদ্ধির হার যৎসামান্য। কেন্দ্রের আর্থিক সমীক্ষাই জানাচ্ছে, ২০২৩-২৪ সালে কর্পোরেট সংস্থাগুলোর মুনাফা বৃদ্ধির হার ছিল ২২.৩%। কিন্তু শ্রমিক, কর্মচারীদের মজুরি বৃদ্ধির হার মাত্র ১.৫%। মুদ্রাস্ফীতির নিরিখে প্রকৃত মজুরি কমেছে। সমীক্ষাই বলছে, এতে বৈষম্য আরও বাড়বে। শিল্পায়ন নিয়ে এত গপ্পের পর দেখা যাচ্ছে, কারখানায় চার বছরে অতিরিক্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে মাত্র ২৫ লক্ষ। বেকারের সংখ্যার তুলনায় যা অতি নগণ্য। তাহলে কোথায় কাজ করবেন নীল কলার ও সাদা কলারের শ্রমিক?
সরকার আজকাল স্বনিযুক্তির কথা বলে। এতেই নাকি কর্মসংস্থান হবে। কাজ না পেয়ে স্বনিযুক্ত মানুষের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। ২০১৭-১৮ সালে দেশের মোট কর্মরত মানুষের মধ্যে স্বনিযুক্তদের হার ছিল ৫২.২%। ২০২৩-২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৮.৪%। সরকার কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হওয়াতেই বিপুলসংখ্যক মানুষ স্বনিযুক্ত হতে বাধ্য হচ্ছেন। কেমন উপার্জন করছেন তাঁরা? সরকারি সমীক্ষা জানাচ্ছে, ২০২৩-২৪ সালে তাঁদের গড়পড়তা মাসিক আয় ছিল মাত্র ১৩,২৭৯ টাকা। গ্রামীণ ভারতে মাসে ১১,৪২২ টাকা। আর নিয়মিত বেতনভুক কর্মীদের গড়পড়তা মজুরি সেবছর ছিল মাসে ২০,৭০২ টাকা। সেটাও আহামরি নয়। দেশে নিয়মিত বেতনভুক কর্মীর অনুপাত ২০১৭-১৮ সালে ছিল মোট কর্মীর ২২.৮%, ২০২৩-২৪ সালে তা কমে দাঁড়ায় ২১.৭%। দেশের বহু মানুষ অনিয়মিত কাজ করেন। তাঁদের কাজ ও মজুরির ন্যূনতম কোনো নিশ্চয়তা নেই। ২০২৩-২৪ সালে মোট কর্মীর ১৯.৮% ছিলেন এমন অনিয়মিত বা অস্থায়ী কর্মী। পেটের জ্বালায় এঁরা ভেসে বেড়ান এখান থেকে ওখানে। তাঁদের দৈনিক গড় আয় ২০২৩-২৪ সালে ছিল মাত্র ৪১৮ টাকা। গরিব মানুষ যে কর্মবিমুখ নন, পেটের জ্বালায় অত্যন্ত কম মজুরিতে উদয়াস্ত পরিশ্রম করেন আর তাঁদের সস্তা শ্রমের বিনিময়ে কোম্পানিগুলোর মুনাফা বাড়ে, সেটা সরকারি আর্থিক সমীক্ষা থেকেই বোঝা যায়। দেশের শ্রমিক, কর্মচারীদের প্রকৃত মজুরি (মুদ্রাস্ফীতির নিরিখে প্রাপ্ত মজুরির অর্থমূল্য) কমে চলেছে। দেখা যাচ্ছে, নিয়মিত বেতনভুক ও স্বনিযুক্তদের প্রকৃত উপার্জন কমে চলেছে। অনিয়মিত কর্মীদের বেড়েছে অতি সামান্য।
শিল্প ও পরিষেবা – দুই ক্ষেত্রেই কর্মী সংখ্যার অনুপাত কমছে, বাড়ছে কৃষিক্ষেত্রে। আর্থিক সমীক্ষা জানাচ্ছে, ২০১৭-১৮ সালে মোট কর্মরত মানুষের ৪৪.১% কৃষিক্ষেত্রে যুক্ত ছিলেন। ২০২৩-২৪ সালে সেটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৬.১%। কৃষক ফসলের ন্যায্য মূল্য, ক্ষেতমজুর ন্যায্য মজুরি না পেলেও কৃষিক্ষেত্রে কাজের লোক বাড়ছে কেন? বিকল্প রুজি রোজগারের ব্যবস্থা নেই বলে। তাঁদের শ্রমে সৃষ্ট ফসল যাঁদের খাদ্য যোগায়, তাঁরাই নাকি চাষে কাজের লোক পাচ্ছেন না! মাননীয় বিচারপতি তো তাই বললেন। লাডকি বহেন বা লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মত প্রকল্পে টাকা পেয়ে মহিলারা যদি সত্যিই পরজীবী হয়ে অন্য কোনো কাজ না করতেন, তাহলে দেশের অর্থনীতি আরও দুর্যোগের মধ্যে পড়ত।
কৃষিক্ষেত্রে কাজ করা মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি কিন্তু পুরোপুরি মহিলাদের অবদান। ২০১৭-১৮ সালে কাজ করা মহিলাদের মধ্যে ৫৭% যুক্ত ছিলেন কৃষিক্ষেত্রে। ২০২৩-২৪ সালে সেই অনুপাত বেড়ে হয় ৬৪.৪%। এই সময়কালে মোট কর্মরত পুরুষদের মধ্যে কৃষিক্ষেত্রে যুক্ত থাকার অনুপাত ৪০.২% থেকে কমে হয়েছে ৩৬.৩%। এই পুরুষদের একটা বড় অংশ শ্রমিক হিসাবে পাড়ি দিচ্ছেন শহরে। তাঁরা পরজীবী নন, সস্তা শ্রমের জোগানদার। ফলে মহিলা ক্ষেতমজুরের সংখ্যা বাড়ছে। এমনকি তাঁদের অনেকে ক্ষেতমজুরি করতে নিজের গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র যাচ্ছেন। পুরুষদের মত মরশুমি মহিলা প্রবাসী শ্রমিক যাঁরা, তাঁদের সংখ্যাও কম নয়। তাঁরা বছরের একটা নির্দিষ্ট সময়ে অন্য জেলা বা রাজ্যে রুজি রোজগারের জন্য যান। বাকি সময়ে নিজের গ্রাম বা আশেপাশে ক্ষেতমজুরি বা অন্য কোনো ক্ষেত্রে দিনমজুরি করেন।
দেখা যাচ্ছে, গ্রাম ও শহর দুই জায়গাতেই নিয়মিত বেতনভুক মহিলা কর্মীর অনুপাত কমেছে। গ্রামে ২০১৭-১৮ সালে কর্মরতা মহিলাদের মধ্যে ১০.৫% নিয়মিত বেতন পাওয়া কর্মী ছিলেন। ২০২৩-২৪ সালে সেই অনুপাত কমে হয় ৭.৮%। শহরে এই সময়কালে মহিলা বেতনভুক কর্মীর অনুপাত ৫২.১% থেকে কমে হয়েছে ৪৯.৪%। কোভিডে কাজ হারানো বহু মহিলা এখনো নিয়মিত কাজ পাননি। পাশাপাশি বেড়েছে স্বনিযুক্ত ও বিনা মজুরিতে পারিবারিক উদ্যোগে যুক্ত থাকা মহিলাদের অনুপাত। গ্রামে ২০১৭-১৮ সালে স্বনিযুক্ত মহিলাদের অনুপাত ছিল ১৯%। ২০২৩-২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১.২%। শহরে এই সময়কালে এই অনুপাত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩.৭% থেকে ২৮.৫%। তাঁদের উপার্জন কেমন? সরকারি সমীক্ষাই জানাচ্ছে, স্বনিযুক্ত মহিলাদের আয় কমছে। ২০১৭-১৮ সালে তাঁদের গড় মাসিক আয় ছিল ৫,৯৩৫ টাকা। ২০২৩-২৪ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ৫,৪৯৭ টাকা। বেতনভুক মহিলা কর্মীদের গড় মাসিক আয় ১৬,৪৯৮ টাকা, অর্থাৎ তিনগুণেরও বেশি। তাহলে নিয়মিত বেতনভুক মহিলা কর্মীর অনুপাত কমে, স্বনিযুক্তদের অনুপাত বাড়ছে কেন? কাজের সু্যোগ ক্রমশ কমার ফলে। অথচ সরকারি আর্থিক সমীক্ষা এই পরিবর্তনকে ইতিবাচক বলেছে। কর্মরতা মহিলাদের জন্যে এর চেয়ে বড় সরকারি প্রহসন আর কী হতে পারে?
আরো পড়ুন এবারের বাজেট: লক্ষ্য আমজনতার বিনাশ, পুঁজির বিকাশ
এর চেয়েও দুর্দশায় রয়েছেন বিনা মজুরিতে পারিবারিক উদ্যোগে যুক্ত মহিলারা। এঁদের বড় অংশ পরিবারের কৃষিকাজে যুক্ত থাকেন। কেউ বা বাড়ির গরু পালন করেন বা ছাগল চরান। ছোট পারিবারিক ব্যবসাতেও এমন বিনা মজুরির মহিলা কর্মী হামেশাই দেখা যায়। বিনা মজুরিতে কাজ করা এমন মহিলার অনুপাত ছয় বছরে গ্রামে প্রায় ৪% বেড়ে ২০২৩-২৪ সালে হয়েছে ৪২.৩%; শহরে প্রায় ৩% বেড়ে হয়েছে ১৩.৮%। বিনা মজুরিতে কাজ করা মহিলাদের কর্মরত ধরে নিয়ে বেকারত্বের হার কমিয়ে দেখানো হচ্ছে। কিন্তু তাঁদের মজুরির কী হবে? লাডকি বহেন বা লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মত প্রকল্পে তাঁরা যে অর্থ পান, সেটা তাঁদের ন্যায্য মজুরির ভগ্নাংশ মাত্র। বিনা মজুরিতে নিজের বাড়িতে গৃহস্থালির কাজ করা মহিলা বা অত্যন্ত কম আয়ের স্বনিযুক্ত, বেতনভুক কর্মীদের কাছেও তাই। ন্যায্য মজুরির অধিকার না দিয়ে তাঁদের সামান্য অর্থ দেওয়া হচ্ছে। গরিব মানুষের কাছে সেটাই অগতির গতি। পাশাপাশি মহিলাদের সামাজিক স্বীকৃতির দিক থেকেও সরকারের থেকে সরাসরি টাকা পাওয়ার একটা গুরুত্ব রয়েছে।
নয়া উদারনীতিতে এভাবেই মানুষের অধিকারগুলোকে খয়রাতিতে পরিণত করা হচ্ছে। এভাবে ন্যায্য উপার্জন থেকে বঞ্চিত শ্রমিক, কৃষক, স্বনিযুক্তদের শাসকের উপর নির্ভরতা বাড়ানো হচ্ছে। খয়রাতির প্রতিযোগিতায় ভোট রাজনীতিতে অধিকারের প্রসঙ্গ গুরুত্বহীন হয়ে যাচ্ছে। পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের যেটুকু জনকল্যাণমূলক ভূমিকা থাকে, নয়া উদারনীতি তাকেও ছেঁটে দিতে চায়। অন্যদিকে সান্ত্বনা পুরস্কারের মত কিছু প্রকল্প চালু করে রাজনীতিতে স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে চায়। খয়রাতির প্রতিযোগিতায় সরকারের পরিবর্তন হলেও হতে পারে, কিন্তু অধিকারের দাবিতে এই ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মত গণআন্দোলন গড়ে ওঠে না। একমাত্র বঞ্চিত শ্রমজীবী মানুষের লড়াই-ই প্রকৃত পরজীবীদের বিরোধিতা করতে পারে। শ্রমিক, কৃষক সমেত বিভিন্ন পেশার মানুষের সৃষ্ট উদ্বৃত্ত মূল্য আত্মসাৎ করে যাদের সম্পদ বেড়ে চলেছে তারাই আসলে পরজীবী। সওয়াল জবাবে বিচারকদ্বয় নাকি আদালত রাজনৈতিক বক্তৃতার জায়গা নয় বলে আইনজীবীকে তিরস্কার করেছেন। গরিবদের পরজীবী, কর্মবিমুখ বলাও কিন্তু রাজনীতি। সেই রাজনীতি পরজীবী পুঁজিপতিদের স্বার্থরক্ষা করে। কোনো বিচারক ব্যক্তিগতভাবে সেই রাজনীতির সমর্থক হতেই পারেন, কিন্তু বিচার প্রক্রিয়ায় তার প্রভাব পড়লে সে বিচারকে কি নিরপেক্ষ বলা যায়?
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







