সম্প্রতি গৃহহীন মানুষের পুনর্বাসন সম্পর্কিত এক মামলা চলাকালীন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি বি আর গাওয়াই ও বিচারপতি অস্টিন জর্জের বেঞ্চ গৃহহীন মানুষকে পরজীবী বলে অভিহিত করেছেন। বিচারকদের মতে, এই মানুষগুলো অলস, কাজ করতে চান না। রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের আগে যে খয়রাতি ঘোষণা করে তার উপর নির্ভরশীল থাকতে পছন্দ করেন। বিচারপতিদের এই অসংবেদনশীল মন্তব্যে আপত্তি জানিয়ে দেশের তিনশোর বেশি নাগরিক এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এছাড়াও সিপিএম নেত্রী বৃন্দা কারাত বিচারকদের উদ্দেশে খোলা চিঠিতে এই মন্তব্য প্রত্যাহার করার দাবি জানিয়েছেন।

ভারতের গরিব মানুষ সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা থাকলে এই ধরনের মন্তব্য করা কারোর পক্ষে করা সম্ভব নয়। আমাদের দেশের গৃহহীন মানুষ সম্পর্কে সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া খুবই কঠিন। ২০১১ সালের জনগণনা অনুসারে দেশের ০.১৫% মানুষ গৃহহীন, যদিও হাউজিং অ্যান্ড ল্যান্ড রাইটস নেটওয়ার্কের মত স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন মনে করে যে ভারতের ১% মানুষ রাস্তা বা রেলওয়ে স্টেশন বা অন্য কোনো খোলা চত্বরে রাত কাটান। বলাই বাহুল্য, এই সংখ্যা যথেষ্ট উদ্বেগজনক। গরিব মানুষ শখ করে উপার্জন করব না স্থির করে শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা অগ্রাহ্য করে রাস্তায় শুয়ে থাকেন – একথা বিশ্বাস করা অন্যায়। বলা বাহুল্য, সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতিদের মন্তব্যে গড় উচ্চবিত্ত মানুষের গরিব মানুষ সম্পর্কে যে ধারণা, তা-ই প্রকাশ পেয়েছে। সবথেকে বেশি চিন্তার কথা, বিচারক সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পগুলোকে খয়রাতি বলে চিহ্নিত করেছেন। এই মন্তব্য বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। এ সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না যে এই মন্তব্য শুনে বেশকিছু মানুষ ইতিমধ্যেই প্রভাবিত হয়েছেন এবং আরও মানুষ প্রভাবিত হবেন। ফলে এই দাবি আরও জোরদার হবে যে সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পগুলো বন্ধ করে দেওয়া হোক।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

বিচারপতি গাওয়াই বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন মহিলাদের জন্য লাডকি বহেন প্রকল্পের কথা। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই প্রকল্পের টাকা প্রতি মাসে পাওয়া যায় বলে মহিলারা কাজ করতে ইচ্ছুক নন। এই বক্তব্যের সমালোচনা করে বৃন্দা লিখেছেন, মহিলারা বিনা বেতনে সারাদিন নানাবিধ কাজ করে থাকেন। এইটুকু টাকা হাতে দিয়ে তাঁদের একটু সম্মান দেওয়া হয় মাত্র। মহিলাদের পরিশ্রমবিমুখ বলা একেবারেই ঠিক নয়। বৃন্দার বক্তব্যকে সম্পূর্ণ সমর্থন করেও বলা যায় যে, তাঁর দলেরই কর্মী-সমর্থকরা পশ্চিমবঙ্গ সরকারের লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্প সম্পর্কে বিচারপতি গাওয়াইয়ের সুরেই কথা বলে থাকেন।

আরো পড়ুন কেউ মনে রাখেনি জীব-তারা খসে যাওয়া প্রবাসী শ্রমিকদের

তবে বিচারপতি গাওয়াইয়ের বক্তব্য শুধুমাত্র মহিলাদের বিরুদ্ধে নয়। দেশের বড় বড় শহরে যে প্রবাসী শ্রমিকরা বিভিন্ন গ্রাম থেকে কাজের খোঁজে আসেন, তাঁরা অনেকসময়েই শহরে মিস্ত্রির কাজ, জোগাড়ের কাজ বা রিকশা চালানোর মত বিভিন্ন ভারি কাজ করেন। কিন্তু নিজের আশ্রয় না থাকার কারণে রাস্তায় রাত কাটান। যাঁদের পরিশ্রমের উপর ভর দিয়ে শহরের উন্নতি হয়, তাঁদের অলস বলা কোনমতেই মেনে নেওয়া যায় না।

২০২৩ সালে দিল্লি শহরে অবস্থিত মানুষদের জন্য তৈরি নখানা ‘নাইট শেল্টার’ সরকার ভেঙে দেয়। তার কারণ জি২০ শীর্ষ সম্মেলনের জন্য দিল্লি শহরকে সুদর্শন করা প্রয়োজন। সেখানে গৃহহীন মানুষের জন্যে ওরকম রাত্রিবাসের আশ্রয় থাকলে চলে না। ওই জায়গাগুলোর কোনো বিকল্প ব্যবস্থা সরকার করেনি। ফলস্বরূপ প্রবল শৈত্যপ্রবাহে দিল্লি শহরেই কয়েকশো গৃহহীন মানুষ মারা যান। দিল্লি শহরে প্রতিবছরই বেশকিছু গৃহহীন মানুষ ঠান্ডার চোটে মারা যান। এবছরেই একটা রিপোর্ট বলছে শীতের ৫৬ দিনে ৪৭৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।

গৃহহীন মানুষের প্রতি সরকারের দায়বদ্ধতা বাড়ানোর বদলে সুপ্রিম কোর্টের এই ধরনের মানসিকতা উদ্বেগজনক।

শুধু প্রবাসী শ্রমিক নয়, বহু মানসিক প্রতিবন্ধীও গৃহহীন। তাঁরাও রাস্তাতেই থাকেন। দিল্লিতে অবস্থিত সরকারি সংস্থা ইনস্টিটিউট অফ হিউম্যান বিহেভিয়ার অ্যান্ড অ্যালায়েড সাইন্সেস এক সমীক্ষার পর জানিয়েছে, অন্তত ৫০% মানুষের মানসিক চিকিৎসার প্রয়োজন আছে। কলকাতায় গৃহহীন মানুষদের সঙ্গে কাজ করার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, আমাদের শহরে নানা ধরনের প্রতিবন্ধী মানুষ রাস্তায় থাকেন। এর মধ্যে কেউ কেউ মানসিকভাবে অসুস্থ। তাঁরা জানিয়েছেন যে পথ ভুলে শহরে চলে এসেছিলেন, আর ফিরতে পারেননি। চলাফেরায় অক্ষম কিছু মানুষ জানিয়েছেন যে পরিবারের লোকই তাঁদের রাস্তায় ফেলে রেখে চলে গেছে। রাস্তায় যেসব প্রতিবন্ধী মানুষ থাকেন, তাঁদের জন্য কোনোভাবে প্রতিবন্ধী হওয়ার শংসাপত্র (সরকারি পরিচয় পত্র) বের করা সম্ভব হয়নি বলে প্রতিবন্ধী ভাতা পাওয়ার ব্যবস্থাও করা সম্ভব হয় না। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এক উচ্চপদস্থ আধিকারিক একবার আশ্রয়হীন প্রতিবন্ধী মানুষের পুনর্বাসন সম্পর্কে আর্জি জমা দেওয়ার পর আমাকে বলেছিলেন ‘এদের জন্য তো মাদার টেরেসা আছেন, আবার সরকারকে এদের দায়িত্ব নিতে বলছেন কেন?’

আসলে মূল কথা হল, সরকার দ্বায়িত্ব নিতে চায় না। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের তো ভারতের সংবিধানের সমস্ত অনুচ্ছেদ জানা থাকার কথা। দরিদ্র মানুষের জীবন সম্পর্কে অজ্ঞতা যদি বা মেনে নেওয়া যায়, দেশের সংবিধান সব মানুষকে বেঁচে থাকার জন্য যে মৌলিক অধিকারগুলো দিয়েছে, সেগুলোকে পাত্তা না দেওয়া মেনে নেওয়া হবে কেন?

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.