আজ থেকে ১৩৫ বছর আগে (নভেম্বর ১৮৮৯) রবীন্দ্রনাথ পারিবারিক সূত্রে তাঁদের পূর্ব বাংলার জমিদারি পরিদর্শন ও পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে পৌঁছন শিলাইদহে। সঙ্গে ছিলেন তার স্ত্রী, পুত্র, কন্যা ও বলেন্দ্রনাথ। এর আগে বাবার সঙ্গে যে রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহে দু-একবার যাননি তা নয়, তবে আইনি অধিকার বলে পাওয়া জমিদারির দায় নিয়ে সেই প্রথম যাওয়া। তার আগে যে কয়েকবার গেছেন তাতে স্থানীয় গায়কদের সঙ্গে স্বল্প পরিচয় ঘটেছিল, কিন্তু সেবারের পরিস্থিতি আলাদা। স্বয়ং জমিদারমশাই কুঠিবাড়িতে এসে সপরিবারে অবস্থান করছেন, তাই এলাকার গ্রাম্য গাইয়েরা সন্ধেবেলা তাঁকে এসে গান শুনিয়ে যেতেন। রবীন্দ্রনাথের সফরসঙ্গী বলেন্দ্রনাথ সেইসব গানের কিছু কিছু একটা খাতায় টুকে রাখতেন। এই সময়েই লালনশাহ, ফিকিরচাঁদ প্রমুখের গানের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের পরিচয় হয়। লালনের শিষ্যপ্রতিম গগন মণ্ডল (গগন হরকরা নামে পরিচিত) ও আরেক স্থানীয় গায়ক সুনউল্লাও সেইসময় কবিকে গান শোনাতে আসতেন। মহানগরী কলকাতার অভিজাত পরিবারের ৩০ না পেরনো এক ঝকঝকে যুবকের সঙ্গে বাংলার বাউল গানের যে আপাত পরিচয় ঘটেছিল, তারই যেন দুয়ার হাট করে খুলে গেল এবার।
সেই পর্বে মাসখানেকের বেশি রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহে থাকেননি, পরের বছর জানুয়ারিতে (১৮৯০) গেলেন সাজাদপুরে। সেখানেই লিখিত হল বিসর্জন নাটক, আর সেই নাটকেই ব্যবহার করা হল ‘আমারে কে নিবি ভাই, সঁপিতে চাই আপনারে’ গানটি, যা আদপে গগন হরকরা রচিত ‘দেখেছি রূপসাগরে মনের মানুষ কাঁচাসোনা’ গানটির সুরের অবিকল প্রতিফলন। এই গান কোথায় শুনলেন কবি, কোথায় পেলেন এই সুর?
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
প্রশ্নটা ওঠে এই কারণে যে, ভ্রাতুষ্পুত্র বলেন্দ্রনাথ যে খাতায় সেইসময় শোনা গানগুলি লিখে রেখেছিলেন তার মধ্যে এই গানটি নেই। আর শান্তিদেব ঘোষ লিখছেন, ১৮৮৮-৮৯ সালের আগে রচিত গুরুদেবের গানে সমকালীন অভিজ্ঞতালব্ধ লৌকিক গানের সুরের তেমন কোনো প্রভাব নেই। মূলত প্রাক-১৮৮৯ গানে পাশ্চাত্য সুরের কাঠামোকে বাদ দিলে কলকাতা অঞ্চলে প্রচলিত কীর্তন ও রামপ্রসাদী সুরের কাঠামো ব্যবহার করা হয়েছে বলেই শান্তিদেব সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কিন্তু এই গানটির সুর এই দুই ধরনের সঙ্গে যায় না। একটি সূত্র বলছে, বিসর্জন নাটকে এই গানটি ব্যবহারের বছর ছয়েক আগে ব্রাহ্মসমাজের প্রকাশনা থেকে সঙ্গীতসংগ্রহ শিরোনামের একটি সংকলন প্রকাশিত হয়। সেখানে আনন্দচন্দ্র মিত্র (১৮৫৪-১৯০৩) নামের এক ব্রাহ্মসমাজের প্রচারক ও গীতিকার এই গানের রচয়িতা বলে উল্লিখিত হন। এই তথ্য একেবারে এড়িয়ে যাওয়ার মত নয়। কারণ ওই সংকলনে প্রকাশিত গানে লেখা হচ্ছে ‘পথিক কয় ভেবো না রে/ ডুবে যাও রূপসাগরে/বিরলে বসে করো যোগ সাধনা/একবার ধরতে পেলে মনের মানুষ/ছেড়ে যেতে আর দিও না’। এই ‘পথিক’ ভণিতাটি কিন্তু একেবারেই নাগরিক। গ্রামীণ লোকগায়করা এমন প্রয়োগ করেন না। কার্যত আনন্দচন্দ্রের অন্যান্য গানেও এই ভণিতার ব্যবহার আছে। কিন্তু এই গানের সুর তিনি পেলেন কোথায়? পল্লীর গৌণধর্মী বাউলদের গান কি তিনি শুনেছিলেন কোথাও? কেউ কেউ অবশ্য অনুমান করেন সরলা দেবীই এই গানের সুর সংগ্রহ করেন এবং রবীন্দ্রনাথকে শোনান। আজ অবশ্য এইসব অনুমানকে সত্যের কষ্টিপাথরে যাচাই করে নেওয়ার আর কোনো সুযোগ আর নেই।
কিন্তু রবীন্দ্রনাথের গানের ভুবনে এই গানের সুরটি একটি আশ্চর্য ব্যতিক্রম, যার তুলনীয় উদাহরণ আর একটিও নেই। এখানে দুটি কথা বলে নেওয়া দরকার। প্রথমত, বিসর্জন নাটকে ব্যবহৃত গানটিই তাঁর প্রথম গান, যেখানে বাউল গানের সুর ব্যবহৃত হয়। দ্বিতীয় কথা, রবীন্দ্রনাথের সারাজীবনের গানে বিভিন্ন সূত্র থেকে সুর আহরণ করার ঘটনা বিরল নয়। কিন্তু প্রায় প্রতি ক্ষেত্রেই তিনি একটি সুরকে আধার হিসাবে ব্যবহার করলেও তা একেবারে এক রাখেননি। সেটিকে অবলম্বন করে তৈরি করে নিয়েছেন সুরের এক স্বতন্ত্র কাঠামো। কিন্তু এই গানের ক্ষেত্রে তেমন পরিবর্তন ঘটানো হয়নি।
বিসর্জন নাটকের কাহিনির পারম্পর্য ও অভিমুখ বিচার করলে বুঝতে অসুবিধা হয় না, নাটকে কবি এই গানের ব্যবহার করেছেন খুব সচেতনভাবে। কেননা নাটকের স্তরে স্তরে রয়েছে অনেকরকম বিসর্জনের ইশারা। হত্যার স্ফূর্তিতে দেবীপূজার আয়োজনে যে বিসর্জনের ইঙ্গিত, রঘুপতি-জয়সিংহ-গোবিন্দমাণিক্য ও অন্যান্য চরিত্রগুলির যাতায়াত ও টানাপোড়েনে সেই বিসর্জনের ব্যঞ্জনা ছড়িয়ে যেতে থাকে নাটকের পরতে পরতে। তাঁর অন্যান্য নাটকে এমন কিছু অমোঘ গানের ব্যবহার আমরা পরেও দেখব। কিন্তু পাশাপাশি একথাও ঠিক যে রবীন্দ্রনাথের নাটকের অনেক গানকে নাটকের আখ্যানের বাইরে এনে শুনলেও তাঁর অতল প্রতিভার দীপ্তি আমরা অনুভব করতে পারি। রক্তকরবী নাটকের ‘ও চাঁদ, চোখের জলের লাগল জোয়ার’ বা শারদোৎসব নাটকের ‘আমরা বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ’ আলাদা করে শুনলেও রস গ্রহণে কোনো অসুবিধা হয় না। আমাদের আলোচ্য গানটির ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে। কিন্তু আলাদা অভিনিবেশের জায়গা এই যে, এই আশ্চর্য সুরটি বারবার ফিরে আসে তাঁর গানের ভেলায়, নতুন করে একেকটি গানের আধারে তিনি ধরে রাখতে চান এই সুরের অনুরণন।
আরো পড়ুন বাঙালির রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনা: অনুভবের ছবি
কেমন সেই ফিরে ফিরে আসা? বিসর্জন নাটকের প্রায় কুড়ি বছর পরে মুক্তধারা (১৯০৯) নাটকে ধনঞ্জয়ের গলায় আবার আমরা পেলাম ‘আমারে পাড়ায় পাড়ায় খেপিয়ে বেড়ায় কোন্ খ্যাপা সে!’ – একেবারে একই সুর। যেন সুরের চলনে রবীন্দ্রনাথ পুনরাবৃত্ত করলেন নিজেকে।
এর ঠিক নয় বছর পরে (১৯১৮) তিনি লিখবেন আমাদের খুব চেনা একটা গান ‘ভেঙে মোর ঘরের চাবি নিয়ে যাবি কে আমারে’। আবার সেই সুর।
বিসর্জন নাটকের ‘আমারে কে নিবি ভাই সঁপিতে চাই আপনারে’ গানের সুরের সঙ্গে একেবারে খাপে খাপে বসে যায় এই গানের সুর-মানচিত্র। এই লেখার মাত্র দুবছরের মধ্যে আবার কবির ভিতর অল্প অল্প জেগে উঠতে থাকবে এই সুরের মায়া। প্রকৃতি পর্যায়ের একটি গানে তিনি আবার মেলে দেবেন সেই সুরের পাখনা ‘মেঘের কোলে কোলে যায় রে চলে বকের পাঁতি’।
১৮৯০-১৯২০, এই ৩০ বছরের দীর্ঘ পরিসরে নিজের চিন্তা, মনন, চেতনাকে বারবার বদলে নিয়েছেন তিনি। তাঁর গানের সমৃদ্ধ জগৎ সমৃদ্ধতর হয়ে উঠেছে নানা সুরের নিরীক্ষায়, ভাঙাগড়ায়। গানের সমান্তরালে সুরও এগিয়েছে ক্রম পরিণতির বিচিত্র বিভঙ্গে। অথচ প্রথম যৌবনে শোনা এক লৌকিক সুর কেমন করে যেন শিকড় গেড়েছে সতত পরিক্রমারত এক কবি ও গীতিকারের মনের গভীরে।
ব্রাহ্মসমাজ প্রকাশনার ‘সঙ্গীতসংগ্রহ’ সংকলনটি, যেটিতে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ‘দেখেছি রূপসাগরে মনের মানুষ কাঁচাসোনা’, হাতে পেয়ে রবীন্দ্রনাথ ভারতী পত্রিকায় তার একখানি নিবন্ধ লিখেছিলেন। সেখানে এই গানটির উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি লেখেন, ‘ইহাকে দেখিলেই এমনি আত্মীয় বলিয়া মনে হয় যে, কিছুমাত্র চিন্তা না করিয়া ইহাকে প্রাণের অন্তঃপুরের মধ্যে প্রবেশ করিতে দিই’। এ এমন এক বিচিত্র রসায়ন যে সেই গোপন প্রাণের একলা সুর সময়ের একেক স্তরে নতুনতর চেহারায় আত্মপ্রকাশ করেছে কথার সাহচর্যে। রবীন্দ্রনাথের ৬১ বছরের গান রচনার ইতিহাসের প্রায় অর্ধাংশ জুড়ে বারবার ফিরে এসেছে এই একটি সুর, যে সুরের আবেশ তাঁকে প্রণোদিত করেছে নতুন নতুন গান রচনায়। অনুমান করা অসঙ্গত নয়, যে সুরের এক শর্তহীন আত্মীয়তাই এখানে মেনে নিয়েছেন তিনি। যে আত্মীয়তার স্পর্শ পরের তিন দশক তাঁকে বারবার উজ্জীবিত করবে নতুন গান রচনায়। একটিমাত্র সুর ফিরে ফিরে আসবে তাঁর গানের শরীরে, আলাদা আলাদা বিষয়ের ভাবনা সংহত হতে চাইবে এক অতীতশ্রুত সুরের আশ্লেষে। সুরকার রবীন্দ্রনাথের পক্ষে এ এক বিচিত্র ব্যতিক্রম।
সূত্র:
১। গীতবিতান কালানুক্রমিক সূচি: প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
২। রবিজীবনী (চতুর্থ খণ্ড): প্রশান্তকুমার পাল
৩। রবি বাউলের উৎসমুখে: অরুণকুমার বসু (পশ্চিমবঙ্গ সরকার প্রকাশিত ১২৫তম রবীন্দ্রবার্ষিকী স্মারক সংকলন)
৪। রবীন্দ্রসঙ্গীতে লোকায়ত সুর: শংকর চট্টোপাধ্যায় (হৃদয় পত্রিকা, বিশেষ সংখ্যা)
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








