৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৫। বাংলাদেশের মহম্মদ ইউনুস সরকারের প্রথম ছমাসের সাফল্য তুলে ধরার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারত এই দিনটা। পরিবর্তে সেদিন যা ঘটল, তাতে একথা স্পষ্ট যে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমশ নৈরাজ্যের দিকে এগোচ্ছে। ইউনুস সরকার কার্যভার গ্রহণ করার ঠিক পরপর যে ধরনের অরাজকতা শুরু হয়েছিল, কয়েক মাস পরে তা আবার স্বমহিমায় ফিরে এসেছে। শেখ হাসিনার আওয়ামী লিগের সমস্ত কুকীর্তির প্রতিশোধ নিতে জনগণ এখন মরিয়া, আর ইউনুসের সরকার আক্ষরিক অর্থে সেই উন্মত্ততার কাছে একরকম আত্মসমর্পণ করেছে।

৫ ফেব্রুয়ারি বিকালে হঠাৎ জানা গেল, আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্র লীগের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ থেকে হাসিনা (যিনি ৫ অগাস্ট থেকে ভারতে আছেন) ছাত্রদের উদ্দেশে ভাষণ দেবেন। প্রসঙ্গত বলে রাখা ভাল, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে আন্দোলনকারীদের উপর আক্রমণের জন্য ইউনুস সরকার সম্প্রতি ছাত্র লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই কয়েকজন অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট (যাঁদের মধ্যে কেউ কেউ বাংলাদেশের বাইরেও থাকেন) ঢাকায় মুজিবুর রহমানের ৩২ নম্বর ধানমণ্ডির ঐতিহাসিক বাসভবন ভেঙে ফেলতে উস্কানি দেন।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

প্রাক-মুক্তিযুদ্ধ যুগে ওই বাড়িতেই থাকতেন হাসিনার বাবা তথা ’৭১-এর লড়াইয়ের প্রধান নেতা মুজিব। স্বাধীনতার পরে রাষ্ট্রনেতা থাকাকালীনও তিনি ওই বাড়ি ছাড়েননি। ১৯৭৫ সালে যখন সেনা অভ্যুত্থান হল, সেইসময় বিপথগামী সেনাকর্তারা পরিবারসুদ্ধ মুজিবকে হত্যা করেন ওই বাড়িতেই। পরে ওই বাড়িটিকে জাদুঘরে পরিণত করা হয়। গত ৫ অগাস্ট হাসিনার দেশত্যাগের এক ঘন্টার মধ্যেই ওই বাড়িতে ভাংচুর চালায় বিক্ষোভকারীরা। ছমাস পরে তা ভেঙেই ফেলা হল।

৫ অগাস্ট বাংলাদেশে না ছিল কোনো সরকার, না ছিল আইনের শাসন। গোটা আন্দোলন জুড়ে আন্দোলনকারীদের উপর রক্তাক্ত দমনপীড়ন চালিয়েছে হাসিনার পুলিস ও সেনাবাহিনি। হাসিনাবিহীন দেশে এর শোধ তোলার চেষ্টা হতে পারে – এই ভয়ে আইনরক্ষকরাও নিজেদের পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় করে রাখেন। তিনদিন পরে, অর্থাৎ ৮ অগাস্ট, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসাবে দায়িত্ব নেন নোবেল শান্তি পুরস্কার জয়ী ইউনুস। একটি পূর্ণাঙ্গ উপদেষ্টা পরিষদ (বকলমে মন্ত্রিসভা) গঠন করতে আরও তিনদিন সময় লেগে যায়।

মুজিবের জনপ্রিয়তাকে ব্যবহার করে হাসিনা দীর্ঘকাল অপশাসন চালিয়ে এসেছেন। মানবাধিকার লঙ্ঘন, নৃশংস বিরোধী দমন, ব্যাপক নির্বাচনী কারচুপির জোরালো অভিযোগ আছে তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে। ফলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মত ছিল, অগাস্ট মাসে বিভিন্ন জায়গায় যে ভাংচুরের ঘটনা ঘটে, সেগুলো নেহাতই হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘকাল ধরে সঞ্চিত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু ৫ ফেব্রুয়ারি যা ঘটেছে তার ব্যাখ্যা ওভাবে হতে পারে না। বুলডোজার, হাতুড়ি ইত্যাদি নিয়ে মুজিবের বাড়ির সামনে জড়ো হয় কয়েকশো লোক। তাদের পরিকল্পিত ও উন্মত্ত আক্রমণে গুঁড়িয়ে যায় ওই ঐতিহাসিক বাড়ি। ওদিকে ঘটনার সময়ে সশস্ত্র বাহিনি নীরব দর্শকের ভূমিকা নেয়। একাধিক টেলিভিশন চ্যানেলে ঘটনার সরাসরি সম্প্রচার চলে, এমনকি টানা ১২ ঘন্টা সোশাল মিডিয়ায় ‘লাইভ’-ও চালানো হয়।

আশ্চর্যের কথা, এত বড় ঘটনায় সরকারপক্ষ একেবারে চুপ। আরও দুঃখের বিষয়, শুধু কয়েকজন অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট যে এই ধ্বংসযজ্ঞের ডাক দিয়েছিলেন এমন নয়। হাসনাত আবদুল্লাহর মত ছাত্রনেতারও পরোক্ষ প্ররোচনা ছিল। বিকেল ৫:৫৫-য় এক ফেসবুক পোস্টে হাসনাত লেখেন ‘আজ রাতে বাংলাদেশ ফ্যাসিবাদের তীর্থভূমি মুক্ত হবে।’ ইঙ্গিত স্পষ্টতই মুজিবের বাসভবনের দিকে।

এরপর সন্ধ্যা ৬:৩৮ মিনিটে আরেক ছাত্রনেতা, যিনি বর্তমান সরকারের যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টাও বটে, সেই আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়াও তাঁর সোশাল মিডিয়া পেজে লিখে দেন ‘উৎসব হোক।’ বাক্যটা খুদে হতে পারে, কিন্তু বার্তাটা স্পষ্ট ও জোরালো।

সক্রিয়তা ও নিষ্ক্রিয়তা

৫ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার কিছু পরেই ভাঙার কাজ শুরু হয়। সেই মুহূর্তে যে কয়েকজন বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ জনতাকে সংযত হতে বলেছিলেন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন জামাত-ই-ইসলামীর আমীর শফিকুর রহমান। ঘটনাচক্রে এই জামাত আজও মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করার দায় বহন করে চলেছে। রাত ১০:৪৪ নাগাদ এক ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে শফিকুর জনতাকে ধৈর্য ধরতে অনুরোধ করেন। কিন্তু ততক্ষণে ভাঙার কাজ পুরোদমে শুরু হয়ে গেছে। তার জেরে নিজের দলের সমর্থকদের কাছেই, বিশেষত ছাত্রছাত্রীদের কাছে, ব্যাপক ‘ট্রোলিং’-এর শিকার হন জামাত প্রধান। চল্লিশ মিনিট পরে ফের একটি ফেসবুক পোস্ট করে তিনি বলেন, সার্বিক পরিস্থিতির জন্য হাসিনার উস্কানিমূলক ভাষণই সর্বতোভাবে দায়ী।

সরকারি তরফে প্রথম প্রতিক্রিয়া যখন এল, ততক্ষণে ছ ঘন্টা কেটে গেছে। ৬ ফেব্রুয়ারি রাত ১:৫৪ মিনিটে জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম নেতা মাহফুজ আলম, যিনি বর্তমানে ইউনুসের বিশেষ সহকারী হিসাবে কাজ করছেন, তিনি একটি নিরীহ অনুরোধ করেন। ফেসবুক পোস্টে তিনি সরাসরি জানতে চান ‘গড়ার তাকত আছে আমাদের?’ সঙ্গে বলেন, দেশের স্বার্থে মানুষকে এখন গঠনমূলক কাজে মন দিতে হবে। যদিও এসব আবেদন-নিবেদনে কোনো কাজ হয়নি।

ইউনুস স্বয়ং এ প্রসঙ্গে মুখ খোলেন ৬ ফেব্রুয়ারি বিকেল চারটেয়। এমন বিশৃঙ্খলার নেপথ্য কারণ হিসাবে হাসিনার ‘উস্কানিমূলক’ ভাষণকেই দায়ী করেন তিনিও। অথচ সরকারি সম্পত্তি রক্ষা করা কিংবা প্রয়োজনমাফিক আইন প্রয়োগ যে সরকারেরই দায়িত্ব, সেকথা বোধহয় প্রধান উপদেষ্টা ইচ্ছা করেই এড়িয়ে গেছেন। ওইদিন রাত ১১:৫৩ মিনিট নাগাদ মাহফুজ আরেকটি ফেসবুক পোস্টে জনগণকে শান্ত থাকতে বলেন। অনুরোধ করেন, সরকারের কাজ সরকারকেই করতে দেওয়া হোক। ততক্ষণে এই ভাংচুরের ব্যাপারে সরকারের সম্মতি বা বাধ্যবাধকতা বিক্ষোভকারীদের কাছে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। ফলে আগুন ছড়াল দাবানলের মত। অন্তত ৩৫ জেলায় আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা, নেত্রীদের বাড়িতে হামলা হয়েছে। কিছু বাড়ি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, কোথাও কোথাও আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলেও খবর। মুজিবের কয়েক ডজন ভাস্কর্য ও ম্যুরাল নষ্ট করা হয়েছে। গুঁড়িয়ে গিয়েছে ১৯৫০-এর দশকের বাংলা ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিধন্য নারায়ণগঞ্জের বায়তুল আমান ভবন। আক্রমণ হয়েছে বগুড়ার জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল ও বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের পার্টি অফিসে। এমনকি জনতার রোষের হাত থেকে রক্ষা পায়নি সুনামগঞ্জের একজন কৃষকের মূর্তিও।

এই ধারাবাহিক আক্রমণের প্রতিবাদে গত ৭ ফেব্রুয়ারি নাগরিক সমাজের ২৬ জন বিশিষ্ট প্রতিনিধি একটি বিবৃতি দেন। সেই বিবৃতিতে তাঁরা দাবি করেন, মুজিবের ‘ঐতিহাসিক বাসভবন’ যে ভাঙা হবে – এ খবর প্রশাসনের কাছে ছিল। স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে ছিলেন আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী সুলতানা কামাল, শিক্ষাবিদ ও লেখক রাশেদা কে চৌধুরী, অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ, সমাজকর্মী খুশি কবীর, শিক্ষাবিদ ও সমাজকর্মী পারভীন হাসান, ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্টিভিস্ট ইফতেকারুজ্জামান এবং আইনজীবী সারা হোসেন। তাঁরা সকলেই বলেছেন যে সরকার এই ঘটনার দায় এড়াতে পারে না।

১০ ফেব্রুয়ারি রাতে মাহফুজ এক ফেসবুক পোস্টে জানান, কেউ ‘যদি মব করেন’, তাহলে সরকার তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু এই পোস্টের ফলে তাঁকে ইসলামিক কর্মী ও রাজনীতিকদের তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়তে হয়। পরিস্থিতি ঠান্ডা করতে তাঁকে ২৪ ঘন্টা পরেই আবার একটি পোস্ট করে আগের বক্তব্য লঘু করে দিতে হয়।

সুনির্দিষ্ট নকশা

এই মুহূর্তে যে ধরনের ভাংচুর বা সংঘবদ্ধ হিংসার ঘটনা ঘটছে, তা ব্যতিক্রম নয়। ইসলামিক মৌলবাদ যে মাথা চাড়া দিচ্ছে তার নানা ইঙ্গিত ছিলই। এই মৌলবাদীরা নিজেদের সুবিধা মত ইসলামকে ব্যাখ্যা করে। যা কিছু সেই ব্যাখ্যার পরিপন্থী, তাই তাদের কাছে ইসলামবিরোধী।

গতমাসে বিশ্ব সুফি সংস্থা অভিযোগ করেছে, ৫ অগাস্টের পর থেকে বাংলাদেশে প্রায় ৮০টির মতো মাজার ও দরবারে আক্রমণ হয়েছে। লুঠপাট ও আগুন ধরিয়ে দেওয়ার মত ন্যক্কারজনক ঘটনাও ঘটেছে। এক অভিনেত্রীর শোরুম উদ্বোধনে বাধা দিয়েছে ধর্মান্ধ জনতা। তাদের তাণ্ডবে কোনো কোনো জায়গায় মহিলাদের ফুটবল ম্যাচ অবধি বন্ধ করে দিতে হয়েছে। বন্ধ করতে হয়েছে বাউল-ফকিরি গানের একাধিক আসর। বাউল-ফকিরি গান গাঙ্গেয় বদ্বীপ অঞ্চলের এক নিজস্ব সংস্কৃতি। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ, দুই বাংলাতেই এই গানের চল রয়েছে। সুফি ইসলাম ও বৈষ্ণব হিন্দু – দুই ধর্মের দ্বারাই পুষ্ট এই গান আসলে সর্বজনীন মানবতাবাদের প্রচারক। স্বাভাবিকভাবেই বাউল-ফকিরি গান বাংলার স্বতন্ত্র মিশ্র সংস্কৃতির উজ্জ্বল প্রতিনিধি।

১০ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত একটি কলামে আনু মুহাম্মদ উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন ‘কোনো কোনো ঘটনায় মনে হচ্ছে দেশে যেন সরকারের অস্তিত্ব নেই।’ তাঁর বক্তব্য, এই ধরনের ঘটনা ঘটতে থাকলে আন্তর্জাতিক স্তরে এই সরকারের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। সরকারের কাছে আনুর প্রশ্ন ‘কোন দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বাংলাদেশকে? কখনো বাউলগান, কখনো মাজার, কখনো ভাস্কর্য – এগুলো নানাভাবে আক্রান্ত হচ্ছে। এগুলো যারা আক্রমণ করছে, তারা কারা? তাদের ঠেকাতে সরকারের ভূমিকা কী?’ আনুর মত এ উদ্বেগ আরও বহু বিশিষ্ট মানুষেরই, কারণ ৫-৮ ফেব্রুয়ারি যা ঘটল তেমন বেশকিছু ঘটনা গত অগাস্টেও ঘটেছিল, মাঝের সময়েও ঘটেছে। এঁরা অনেকেই কিন্তু হাসিনা সরকারের কড়া সমালোচক।

বাংলাদেশের বহুল প্রচারিত দৈনিক প্রথম আলো গত ২০ অগাস্ট একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। সেখানে লেখা হয়েছে, ৫-৭ অগাস্ট, মাত্র তিনদিনে গোটা বাংলাদেশ জুড়ে যে পরিমাণ ভাস্কর্য, ম্যুরাল ও স্মৃতিস্তম্ভ হয় ভাঙা হয়েছে বা পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে তার সংখ্যা প্রায় দেড় হাজার।

ময়মনসিংহ জেলার শশী লজের ১৫০ বছরের পুরনো মার্বেল পাথরের তৈরি ভেনাসের মূর্তি, কিংবদন্তি শিল্পী জয়নাল আবেদিনের মূর্তি, সুপ্রিম কোর্ট চত্বরে থাকা লেডি অফ জাস্টিসের মূর্তি (যা দীর্ঘদিন ধরেই মুসলমান মৌলবাদীদের চক্ষুশূল), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের স্বাধীনতা সংগ্রাম ভাস্কর্য চত্বরের একশোর কাছাকাছি মূর্তি, মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্সের প্রায় ৫০০ ভাস্কর্য নষ্ট হয়েছে বিক্ষোভকারীদের আক্রমণে। এমনকি উনিশ শতকের সাঁওতাল বিদ্রোহের দুই নেতা সিধু-কানুর মূর্তিও বাদ যায়নি।

খুব স্বাভাবিকভাবেই ফেব্রুয়ারির ঘটনার পর উদ্বেগ ক্রমশ বাড়ছে। ১১ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত একটি নিবন্ধে বিশ্লেষক জাহেদ উর রহমান, যিনি পেশায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকও বটে, লিখেছেন যে হাসিনার ৫ ফেব্রুয়ারির ভাষণ ‘মানুষকে ক্ষুব্ধ করেছে নিশ্চয়ই”। কিন্তু একইসঙ্গে তাঁর সঙ্গত প্রশ্ন, সেদিনের ক্ষোভ কি ‘৫ অগাস্টের ক্ষোভ-ক্রোধের তুলনায় বেশি? নিদেনপক্ষে কাছাকাছি?’

জাহেদ আরও প্রশ্ন তুলেছেন ‘শেখ হাসিনার পতন এবং পালিয়ে যাওয়ার পর জনগণের তীব্রতম ক্রোধের সময়েও যে বাড়িগুলো হামলা, ভাংচুর কিংবা অগ্নিসংযোগের শিকার হয়নি, সেই বাড়িগুলো কেন ছমাস পরে তুলনামূলকভাবে কম ক্ষোভের সময়ে আক্রান্ত হল?’ তাঁর অনুমান – এসবের নেপথ্যে নানা স্তরের ষড়যন্ত্র ও ইন্ধন ছিল। তিনি লিখেছেন ‘একথা স্পষ্ট যে কোনো সুযোগসন্ধানী মহল এক্ষেত্রে সক্রিয়। তাদের বিরুদ্ধে সরকার কী পদক্ষেপ নিচ্ছে আমরা জানি না।’

জাহেদের মতে, বিদেশি শক্তিগুলি কী ধরনের সমস্যা তৈরি করতে পারে তা নিয়ে ভাবার চেয়ে এই মুহূর্তে দেশের আভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি খুঁটিয়ে দেখা বেশি জরুরি। তাঁর স্পষ্ট কথা ‘একটা দুর্বল, ঠুঁটো সরকার ক্ষমতায় থাকলে নানারকম কায়েমি স্বার্থসম্পন্ন গোষ্ঠী নানা অপকর্ম করতে উৎসাহিত হয়। এর ফলে আমাদের রাষ্ট্র গণতন্ত্রের দিকে এগোতে পারবে কিনা তা নিয়ে গুরুতর শঙ্কা তৈরি হচ্ছে।”

ক্ষমতার লড়াই

ধর্মান্ধ জনতার বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নিতে ইউনুস সরকার ব্যর্থ হচ্ছে কেন? বহু রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকের মতে, কারণটা পরিষ্কার। ধারে ও ভারে জামাত-ই-ইসলামী বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইসলামিক রাজনৈতিক দল। তার উপরে এবং অন্যান্য ইসলামিক দল ও সংগঠনের উপর সরকারের অতিরিক্ত নির্ভরতাই এর কারণ।

পাশাপাশি গত তিন দশকে বাংলাদেশের ক্ষমতায় থেকেছে হয় আওয়ামী লীগ, নয় বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (বিএনপি)। অথচ ইউনুস সরকারে সেই দুই দলের কোনো প্রতিনিধি নেই। দুই বড় দলের অনুপস্থিতিতে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, বর্তমান সরকারের অংশীদার দলগুলি সেই শূন্যতা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে।

বিএনপি বাংলাদেশের ক্ষমতায় ছিল দুবার। প্রথমবার ১৯৯১-১৯৯৬ এবং পরে ২০০১-২০০৬। স্বাভাবিকভাবেই হাসিনার পতনের পর ক্ষমতার মূল দাবিদার তারাই। এমনিতেও গত শতকের আটের দশকের শেষদিক থেকে বাংলাদেশের রাজনীতি আওয়ামী লীগ ও বিএনপি – এই দ্বিদলীয় ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছিল। ২০০৮ সাল থেকে হাসিনাবিরোধী যত আন্দোলন হয়েছে তার বেশিরভাগের নেতৃত্বে ছিল বিএনপি।

কিন্তু সম্প্রতি যে ছাত্র নেতৃত্ব হাসিনাকে সরাল, তারা বিএনপি বা সেনা – কাউকেই ক্ষমতায় দেখতে চায় না। তাদের নিজেদের রাজনৈতিক উপস্থিতি নামমাত্র কিছু নাগরিক পরিসরে সীমাবদ্ধ। এমনকি নিজেদের কোনো দলও নেই। ফলে ছাত্রশক্তি সমর্থিত ইউনুস সরকারকে নির্ভর করতে হচ্ছে জামাতের উপর। অগাস্ট-পরবর্তী যুগে তারাই বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল। সেনাপ্রধানও এই সরকারকে সমর্থন করেছেন।

অন্যদিকে বিএনপি আর জামাতের পুরনো জোট ভেঙে গিয়েছে। এখন তারা রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী। হাসিনার পতনের পরে যে আওয়ামীবিরোধী ধর্মনিরপেক্ষ-উদারবাদী-বামপন্থী পরিসর তৈরি হয়েছে, নিজেদের যথাসম্ভব উদারবাদী গণতান্ত্রিক শক্তি হিসাবে তুলে ধরতে মরিয়া বিএনপি এখন সেই পরিসরটিকে কব্জা করতে চাইছে। বিএনপি আর জামাতের রাজনৈতিক ফায়দা তোলার এই খেলার জাঁতাকলে আটকা পড়েছে দিশাহারা ছাত্রসমাজ।

সিডনিবাসী বাংলাদেশি গবেষক মুবাশার হাসানের বক্তব্য, গত ছমাস বাংলাদেশ মিশ্র অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে গিয়েছে। একসময় সরকারি মদতে পুলিশ, আধা-সামরিক বাহিনি বা সেনাবাহিনিকে ব্যবহার করে যে ধরনের বিচার-বহির্ভূত হত্যা বা গুম করে দেওয়ার মত ঘটনা আকছার ঘটত, বর্তমান সরকার যে সেই ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধ করতে পেরেছে। মুবাশারের মতে এটি এক ‘বিরাট অর্জন’।

হাসিনার ১৬ বছরের শাসনে যতগুলি বলপূর্বক গুম করার ঘটনা ঘটেছে, সেসবের তদন্ত করার জন্য পাঁচ সদস্যের যে কমিশন গঠন করা হয়েছে, তাও তাঁর মতে, ‘এক মাইলফলক’। বাংলাদেশের কুখ্যাত আয়না ঘরে সাংবাদিকদের নিয়ে যাওয়াও মুবাশার ‘অসাধারণ পদক্ষেপ’ বলে মনে করেন। কিন্তু মূল চক্রীদের খুঁজে বার করতে ইউনুস সরকার যে ব্যর্থ – একথাও তিনি মানেন।

আরো পড়ুন ট্রাম্পের দ্বিতীয় ইনিংসে ট্রাম্পেনস্টাইন হয়ে ওঠার যাবতীয় ইঙ্গিত বর্তমান

এই প্রতিবেদককে তিনি জানিয়েছেন, ‘এই সরকার আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না, ব্যবসায়ী সমাজের আস্থাও অর্জন করতে পারেনি। এই মুহূর্তে এগুলোই সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের। এছাড়াও সংখ্যালঘুর আস্থা অর্জন করতে বা অতি দক্ষিণপন্থী ধর্মীয় মৌলবাদীদের বাড়বাড়ন্ত রুখতে আরও বেশি কাজ করা প্রয়োজন ছিল।’

এই পরিস্থিতিতে ১২ ফেব্রুয়ারির ঘটনা হয়ত ইউনুস সরকারকে খানিকটা স্বস্তি দেবে। সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনারের দপ্তর (ওএইচসিএইচআর) যে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে, সেখানে হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’-এর অভিযোগ আনা হয়েছে। ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং রিপোর্ট: হিউম্যান রাইটস ভায়োলেশনস অ্যান্ড অ্যাবিউসেজ রিলেটেড টু দ্য প্রোটেস্টস অফ জুলাই অ্যান্ড অগাস্ট ২০২৪ ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক রিপোর্টে আন্দোলন দমনে হাসিনা সরকারের সীমাহীন বর্বরতার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে।

আওয়ামী লীগের হাত থেকে নিস্তার পেলেও অগণতান্ত্রিক, ধর্মোন্মাদ শক্তির হাত থেকে এখনই নিস্তার পাচ্ছে না ইউনুস সরকার। ১২ ফেব্রুয়ারিই আবার একটি বাউল-ফকিরি গানের আসর বাতিল করতে হয়েছে। নেপথ্যে প্রভাবশালী ধর্মীয় সংগঠন হেফাজত-এ-ইসলামের আপত্তি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঢাকাবাসী লেখক বললেন ‘হাসিনার নরকের মত পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি। কিন্তু আমাদের ভয়, এই সুযোগে আরেক দল দানব সক্রিয় হয়ে উঠেছে। আবার সেই বিভীষিকার দিনগুলো না ফিরে আসে!”

লেখকের অনুমতিক্রমে আউটলুক পত্রিকায় প্রকাশিত মূল প্রতিবেদনের এই ভাষান্তর প্রকাশিত হল। মতামত প্রতিবেদকের

ভাষান্তর: সোহম দাস

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

মতামত জানান

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.