বিপুলজিৎ বসু

মৃত্যু মানুষকে এত রূপবান করে, ধারণা ছিল না।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৫। এসএসকেএম হাসপাতালের মেন বিল্ডিংয়ের তিনতলা। প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের নিঃসাড় দেহ সিসিএম কেবিন থেকে বের করে সামনের প্যাসেজে রাখা হয়েছে। আমি অপলকে মুখটা দেখছি। কপাল আরও উজ্জ্বল, ঝকঝকে। নাক যেন আরো তীক্ষ্ণ, চিবুক আরও সুঠাম। মৃত্যু যেন মুখের দ্যুতি বাড়িয়ে দিয়েছে।

দেহ লিফটে নামানো হল। নিচে ততক্ষণে থিকথিক করছে প্রেস আর মানুষের ভিড়। শব শকট অপেক্ষা করছে, দেহ রবীন্দ্র সদনে নিয়ে যাওয়া হবে। দু ঘন্টা ওখানেই রাখা হবে রাষ্ট্রীয় সম্মান জানানোর জন্য।

১৬ জানুয়ারি প্রতুলদা এসএসকেএম উডবার্ন ওয়ার্ডে ভর্তি হন। অন্ত্রে টিউমার, হয়ত ক্যান্সার। ডাক্তার ঝুঁকি নিতে চাননি। ২৯ জানুয়ারি অস্ত্রোপচার হল, কিন্তু দিনকয়েক গড়াতে না গড়াতেই শরীর গেল বিগড়ে, অঙ্গ বিকল হতে থাকল।

এসএসকেএম থেকে রবীন্দ্র সদনের দূরত্ব ৩৫০ মিটার। আমি হাঁটতে শুরু করি। পথ যেন ফুরোচ্ছে না। রাস্তাটা আমার কাছে ৩০০ মাইল মনে হচ্ছিল। শীত, বসন্ত, গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত আমি আর প্রতুলদা এভাবেই হাঁটতাম। কাঁকুড়গাছি, রামকৃষ্ণ সমাধি রোড, হরিয়ানা বিদ্যামন্দিরের রাস্তায়। ছোট ছোট দূরত্ব পেরিয়ে যেতাম একসঙ্গে। আমাদের দুজনকে কাছাকাছি এনেছিল মিষ্টি সিঙাড়া আর কালাকাঁদ। উনি পথ চেয়ে বসে থাকতেন – আমি সপ্তাহান্তে কবে আসব। এলে একসঙ্গে মুড়ি দিয়ে কালাকাঁদ খাওয়া যাবে। একা খেতে ভাল লাগে না যে।

একদিন এমনই বাড়ি থেকে মিষ্টির দোকানের ১০০ মিটারের দূরত্ব পেরোচ্ছি। সন্ধে নেমে এসেছে। উনি ট্রেসি চ্যাপম্যানের কথা বললেন। আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গ গায়ক, গীতিকার। খেটে খাওয়া মানুষের লড়াই, বর্ণবৈষম্য, কালোমানুষদের স্বপ্নভঙ্গের বেদনার কথা ট্রেসির গানে উঠে এসেছিল আটের দশকের শেষে। ডাঃ বারীন ঘোষাল প্রতুলদাকে আটের দশকের ওই সময়ে ট্রেসির গানের সঙ্গে পরিচয় করান। প্রতুলদার গানের সঙ্গে উনি ট্রেসির গানের আত্মিক সম্পর্ক আবিষ্কার করেন। আমাকে যখন প্রতুলদা ট্রেসির গল্প বলছেন, তখন উনি সঙ্গীতজীবনের সায়াহ্নে। ওঁর শেষ অ্যালবাম আন্ধার নামে, বিজল্প মিউজিক থেকে। সেটা সম্ভবত ২০০৮-০৯ সাল। এরপর দ্রুত বাংলা গান বদলে যাচ্ছিল। ক্যাসেট, সিডির যুগ শেষ, ইন্টারনেট যুগ শুরু। একটা একটা গান ইউটিউবে প্রকাশ পাচ্ছে, ভিউ থেকে টাকা। সে এক বিরাট বাঁকবদল।

প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের গানের দুটো পর্ব। প্রথম পর্ব সবার জানা, জনপ্রিয়তার আলোকে আলোকিত। তখন আমি অনেক ছোট। পারিবারিক সূত্রে যোগাযোগ থাকলেও, ঘনিষ্ঠতা নেই। আমার তাঁর জীবনে প্রবেশ দ্বিতীয় পর্বে, গানের এই ডিজিটাল যুগে।

দু-একজনের অনুরোধ, উপরোধের কাজ বা কোনো মহৎ উদ্দেশ্যের বিশেষ প্রকল্প ছাড়া প্রতুলদা ততদিনে গান রেকর্ড করা বন্ধ করে দিয়েছেন। কিন্তু গান নির্মাণ চলছে বিনা কোলাহলে। আবার অনেক পুরনো গান পড়ে আছে খাতার পাতায়। সেইসব গান অবশ্য মঞ্চ ছাড়া আর কোনো পথে মানুষের কাছে পৌঁছচ্ছে না। মঞ্চেও আবার ওঁর বহুশ্রুত গানগুলোর চাহিদাই বেশি।

কাঁকুড়গাছির প্রায়ান্ধকার ঘরটার মধ্যে আমি ধীরে ধীরে প্রতুলদার অশ্রুত, অপ্রকাশিত গানের জগতে ঢুকে পড়লাম। প্রতুলদা প্রেক্ষিত ব্যাখ্যা করেন, গাইতে থাকেন, সেসব গান নিয়ে নানা ছোটখাটো গল্প উঠে আসে। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছর ঘুরে যায়। জগৎ সংসারের যত কথা, অভিজ্ঞান, বোধ, শিক্ষণ – সব উপুড় করে ঢালতে থাকেন আমার কাছে।

শুনতে শুনতে আবিষ্কার করলাম – উনি মানুষটা যেমন, তার তিনটে প্রধান লক্ষণ ওঁর স্বরক্ষেপণে ঠিকরে বেরোয়। ওই মোলায়েম টেনর স্বর মানুষ হিসাবে উনি যেমন কোমল, মায়াময় এবং উৎসাহী – তার প্রতিফলন। আবার উনি নিজের মূল্যবোধ ও আদর্শের জায়গায় খুব জেদি, ঋজু। একচুল সরানো যাবে না। দেখলাম বিশেষ বিশেষ জায়গায়, সুর লাগানোর সময়ে সেই বলিষ্ঠতা ঝিলিক মারে। তৃতীয় বৈশিষ্ট্যটা আমার চোখে এক দৃশ্যকল্প তৈরি করল। অনেক সময় সুর যখন পঞ্চমে (পা) লাগে, vibrato তৈরির সময়ে, তখন আশ্চর্য মোলায়েমভাবে স্বরটা ছুঁয়ে যেতেন। আমার শুনে মনে হত ফড়িংয়ের পাতলা ডানা যেমন স্বচ্ছ হয়, চোখের সামনে রাখলে ফিনফিনে ডানা ভেদ করে এপার ওপার দেখা যায়, ওই স্বরেরও তেমন এপার ওপার দেখা যায়।

আরো পড়ুন আমাদের সুরহীন, অকিঞ্চিৎকর জীবনের সন্ধ্যারাগ

আমি জিজ্ঞেস করলাম ‘কীভাবে করেন এটা? পরের প্রজন্ম এই গান গাইলে এই ফড়িং নোট কীভাবে লাগাবে?’

‘সে আমি কী করে বলি!’ হাসছিলেন খুব।

‘মানে, স্বরলিপি বা স্টাফ নোটেশনে এটা কীভাবে লেখা হবে?’

‘আমি তো স্বরলিপি জানি না। আমি জানি ভাবলিপি। আচ্ছা, সঙ্গীতে ভাবলিপি কেন হয় না?’

অবশেষে ২০১৭ সালের মাঝামাঝি আমি আর প্রতুলদা ১২ খানা গান বাছাই করলাম রেকর্ড করার জন্যে। প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের অপ্রকাশিত গান। সেগুলো আমি ইউটিউবে তুলে দেব, অন্য সোশাল মিডিয়ায় শেয়ার করা হবে। সেইমত প্রথমবার ওঁর বিভিন্ন সোশাল মিডিয়ায় অ্যাকাউন্ট খোলা হল। প্রতুলদা ডিজিটাল দুনিয়ায় প্রবেশ করলেন।

সেই দফায় যে গানগুলো রেকর্ড করা হবে বলে স্থির হয়েছিল, তার তালিকা এইরকম

১। ভোর – কথা ও সুর প্রতুল মুখোপাধ্যায়

২। প্রিয় ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য – কথা সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সুর প্রতুল মুখোপাধ্যায়

৩। প্রতুলদা যায় পুরুলিয়া – কথা ও সুর প্রতুল মুখোপাধ্যায়

৪। রবি ঘোষ – কথা ও সুর প্রতুল মুখোপাধ্যায়

৫। রাত যত হোক সঙ্গিন – কথা সাহির লুধিয়ানভি, অনুবাদ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়, সুর প্রতুল মুখোপাধ্যায়

৬। আশ্চর্য ভাতের গন্ধ – কথা বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, সুর প্রতুল মুখোপাধ্যায়

৭। তোমার মূর্তি গড়ছি – কথা অরুণ মিত্র, সুর প্রতুল মুখোপাধ্যায়

৮। আয় রে বীরেন – কথা ও সুর প্রতুল মুখোপাধ্যায়

৯। হে হৃদয় – কথা বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, সুর প্রতুল মুখোপাধ্যায়

১০। গাছ – কথা ও সুর প্রতুল মুখোপাধ্যায়

১১। নোলক – কথা ও সুর প্রতুল মুখোপাধ্যায়

১২। বেহুলার গান – কথা ও সুর প্রতুল মুখোপাধ্যায়

ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহ, ২০২৫। এসএসকেএম উডবার্ন ওয়ার্ড। প্রতুলদার বমি শুরু হয়েছে। সারাদিন ধরে দমকে দমকে বমি হচ্ছে। বেডের পাশে ঠায় ওঁর স্ত্রী বসে আছেন, মুখ মুছিয়ে দিচ্ছেন প্রত্যেকবার। ডাক্তার বারবার এসে দেখে যাচ্ছেন।

প্রতুলদা আচমকা নিচু স্বরে বললেন ‘সর্বাণী, আমাকে শ্মশানে নিও না।’

দিদি বিরক্ত হলেন ‘এসব কথা বললে উঠে যাব কিন্তু।’

প্রতুলদা চুপ করে থাকলেন। তারপর বললেন ‘আমার দেহ এসএসকেএমকে দিয়ে দিও।’

‘তুমি কি চাও আমি চলে যাই? আর আসব না।’

‘আমার কথা শোনো।’

প্রতুলদা স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন দিদির চোখের দিকে। গোটা কেবিনে হিরণ্ময় নীরবতা। প্রতুলদা এর আগেও তিন দফায় এসএসকেএমে ভর্তি হয়েছেন। বুকে স্টেন্ট, পেসমেকার বসেছে। কোনোদিন মৃত্যু নিয়ে কথা বলেননি। প্রতুলদার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন সর্বাণীদি। বমির ধকলে ক্লান্ত প্রতুলদা পাশ ফিরে শুলেন।

২০১৭ সালে জীবনের শেষ যে বড় কাজটা করবেন বলে মনস্থির করেছিলেন, সেই নির্বাচিত ১২ খানা গানের মধ্যে মৃত্যুচেতনা অন্তর্নিহিত ছিল। মৃত্যুকে প্রত্যক্ষ করার কথা ওঁর গানের কথায় এসেছে, সুরেও মর্বিডিটি ছিল। শ্মশান, মৃত্যু, আগুন প্রতুলদাকে পেড়ে ফেলেছিল। বন্ধুবর কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মারা গিয়েছিলেন ১৯৮৫ সালে। প্রতুলদা শ্মশানযাত্রী ছিলেন। বন্ধুর চিতা দেখতে দেখতে প্রতুলদা যা লিখেছিলেন তা ৩০ বছর পরে আবার বের করে আনলেন। অন্তরায় লিখলেন

আগুন ডাকে আয় রে বীরেন
তুই তো আমার ভাই
হাজার মানুষ দেখুক কেমন
দুইয়ে মিশে যাই।

কবির চিতার আগুন দেখতে দেখতে প্রতুলদার পরম উপলব্ধি ঘটে গেছে। দ্বিতীয় অন্তরায় লিখছেন

যে আগুনে ফুটপাথে মা
ফোটায় গরম ভাত
যে আগুন জ্বেলে গরিব মানুষ
কাটায় শীতের রাত
সেই আগুন বরণ করে আগুন
বাড়িয়ে দেয় হাত।

যেদিন রাতে গানটার রেকর্ডিং শেষ হল, উল্টোডাঙ্গার ধুন স্টুডিও থেকে পায়ে হেঁটে দুজনে কাঁকুড়গাছি ফিরছি। প্রতুলদা বললেন ‘চুঁচড়ো যাবে?’ আমি জিজ্ঞাসু নয়নে তাকালাম।

‘চলো আমার জন্মভূমি ছুঁয়ে আসি।’

সেই রবিবার চুঁচুড়ার খাড়ুয়া বাজারের অলিতে গলিতে হাঁটলাম দুজনে। প্রতুলদার বাস্তুভিটে ধ্বংসস্তূপ হয়ে পড়ে আছে। পুরনো দেশি বন্দুকের দোকান গুঁড়িয়ে মোবাইলের দোকান হয়েছে। প্রতুলদার মা সেজো ছেলেকে নিয়ে যে দয়াময়ী কালীমন্দিরে পুজো দিতেন, সেটা অবশ্য অটুট। বাবা হুগলী মাদ্রাসায় পড়াতেন। স্কুলের গেটের সামনে অনেকক্ষণ অপলক দাঁড়িয়ে থাকলেন। সবশেষে, তখন বিকেল, গঙ্গার তীরে এক ঘাটে এসে দাঁড়ালেন। ওঁর কৈশোরের ক্রীড়াভূমি। অদূরে শ্মশান, শবদাহের আগুন থেকে ধিকি ধিকি ধোঁয়া উঠছে। সেদিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন ‘পৃথিবীর নির্লিপ্ততম মানুষ কে বলতে পারবে?’

আমি নিরুত্তর।

‘ডোম।’ নম্র স্বরে কথাটা বলে আমার দিকে তাকালেন।

‘দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর, শয়ে শয়ে দেহ দাহ করতে করতে জীবন, সম্পর্ক, জগৎসংসারকে সে নিজে কীভাবে দেখে? তার উপলব্ধি কী? আমার জানা হয়নি।’

এর দুদিন পরে, প্রতুলদা বেহুলা-লখিন্দরের গান রেকর্ড করতে স্টুডিওতে ঢুকলেন।

এ এক মৃত্যুর গান। মঙ্গলকাব্য থেকে উঠে আসা এক চিরন্তন সুরে বাঁধা মৃত্যু আর জীবনের পাশাপাশি বয়ে চলার গান। বেহুলা লখাইয়ের দেহ নিয়ে গাঙুড়ের জলে ভেলা ভাসিয়েছে। ঘাটের পর ঘাট পেরিয়ে চলে যাচ্ছে তারা। প্রত্যেক ঘাটে একটা গল্প অপেক্ষা করছে বেহুলার জন্য। ওদিকে লখিন্দরের মা সনকার চোখে জল, হাহাকার। বেহুলার চোখে জল নেই। প্রতুলদা প্রথম অন্তরায় লিখছেন

কান্দিছে সনকা মাতা
লখাই আমার গেলি কোথা
বেহুলার চোখেতে জল নাই
দুঃখতে সে হইল না কাতর
শোক তারে করিল পাথর
পণ করিল জিয়াইবে লখাই।

বেহুলার ভেলা যেন বহমান জীবন। মৃত্যু, শোক, দুঃখ, প্রলোভন তার চলা আটকাতে পারে না।

ডুবায়ে জলে লাজ, ঘৃণা, ভয়
তুচ্ছ করে লোকে কী কয়
ছাড়ে না সে মরণ জয়ের আশা।
মরণে আগুলি কোলে
কালের কোলে জীবন দোলে
এরই নাম বুঝি ভালবাসা।

স্টুডিওতে বসে শুনতে শুনতে কিছু সময় পরে বেহুলা-লখিন্দরের গল্প আমার কাছে গৌণ হয়ে গেল। চুঁচুড়ার গঙ্গার ঘাটে দাঁড়িয়ে প্রতুলদার সেদিনের কথাটা হৃদয়ঙ্গম করলাম। জীবন যেখানে শেষ হয়, সেই মহাশ্মশানের ঠিক পাশ দিয়েই নদীটা কিন্তু বয়ে চলতেই থাকে। অবিকল, সামনের দিকে। গানটা সেদিন আমাকে এই উপলব্ধি দিয়ে গেল।

১৫ ফেব্রুয়ারি, রবীন্দ্র সদন। আমি এসএসকেএম থেকে হাঁটা শেষ করে লম্বা বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। ততক্ষণে প্রতুলদার নিথর দেহ শোয়ানো হয়েছে বারান্দায়। মানুষজনের ভিড় বাড়ছে, প্রায় সবার চোখ সজল। প্রতুলদার মাথার কাছে সর্বাণীদি নিশ্চুপে বসে আছেন। পাথরের মত। চোখ শুকিয়ে গেছে শোকে। ফুলের পাহাড়ের ফাঁক দিয়ে ছুঁয়ে আছেন প্রতুলদাকে। একটু পরেই সদন প্রাঙ্গণে নামানো হবে দেহ, যাত্রা শুরু হবে মহাপ্রস্থানের দিকে। দিদি বসেই আছেন মাথাটা ছুঁয়ে। দুজনের কাছেই আজ যেন সামনের রাস্তাটা খুব পরিষ্কার।

আমি অদূরে দাঁড়িয়ে দুজনকে দেখছি।

সদনের সামনে লখাইয়ের দেহ, বিকেলের পড়ন্ত রোদে চিরশয্যায়। বেহুলা তার মাথাটা আগলে বসে, শোকে সে পাথর। চোখে আর জল নেই। মা সনকার মত অসংখ্য নারী পুরুষ দাঁড়িয়ে, সবার চোখ থেকে নামছে অশ্রুধারা। বেহুলা নিশ্চুপ। তার স্তব্ধতার মধ্যে মরণ জয়ের আশা না ছাড়ার জেদ। এই বুঝি মহাকালের স্রোতে পাড়ি দিয়ে লখিন্দরকে সে ফিরিয়ে আনবে।

২০১৭ সালে রেকর্ড করা সেই ‘বেহুলার গান’ সেদিন আমার চোখে এভাবেই সত্যি হয়ে গেল।

নিবন্ধকার চলচ্চিত্র পরিচালক। মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

1 মন্তব্য

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.