ডোনাল্ড ট্রাম্প ওভাল অফিস আলো করে আবার ফিরে আসছেন। আগামী ২০ জানুয়ারি ২০২৫ তাঁকে ঘিরে থাকবে কিছু যুদ্ধবাজ, কিছু জায়নবাদী। এক ব্যর্থ হত্যা পরিকল্পনাকে পুঁজি করে ঘনিয়ে তোলা আবেগ এবং জাতিবিদ্বেষ, নারীবিদ্বেষ, শস্তা জাতীয়তাবাদ মিশ্রিত সুচতুর বাগ্মিতা ছিল তাঁর নির্বাচনী প্রচারের সারবস্তু। তা দিয়েই এই রিপাবলিকান প্রার্থী নির্বাচনে জিতলেন এবং দ্বিতীয়বারের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি পদের দাবিদার হলেন।

গত মে মাসে ৩৪টি অপরাধে দণ্ডিত বাণিজ্যসম্রাট ট্রাম্প প্রকৃতপক্ষে লুটেরা, পরজীবী, প্রতারক এক লুম্পেন পুঁজিপতি। প্রথমবারের রাজত্ব চালিয়েছেন ব্ল্যাকমেল আর হুমকি দিয়ে, ভয় উৎপাদনের রাজনীতিতে ভর করে। দ্বিতীয়বার দ্বিগুণ উৎসাহী ট্রাম্প রক্ষণশীল প্রকল্পগুলিকে আরও জোরদার করবেন, জোরদার করবেন সেই শক্তিগুলিকে যারা আদতে তাঁকে নির্মাণ করেছে। স্থিতাবস্থা বজায় থাকবে। সাম্রাজ্যবাদের যুক্তিগুলি নতুন করে শক্তিশালী হবে তার সাধারণ শ্রেণিভিত্তি অনুযায়ী। যে শ্রেণিভিত্তি বর্তমানে তুলনায় অধিক অভিজাত, অধিকতর বর্জনবাদী একচেটিয়া লগ্নি পুঁজিতন্ত্র।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

নির্বাচনের প্রাক্কালে ব্রিটিশ মার্কসবাদী অর্থনীতিবিদ মাইকেল রবার্টস এই বলে সতর্ক করেছিলেন যে ব্যাংকার, বৃহৎ লগ্নি পুঁজি এবং মেগা বিলিয়নেয়ার গোষ্ঠী যাদের ম্যাগনিফিসেন্ট সেভেন বলা হয় (অ্যাপল, মাইক্রোসফট [লিংকডইন], অ্যালফাবেট, অ্যামাজন, মেটা [ফেসবুক, হোয়াটস্যাপ, ইনস্টাগ্রাম], এনভিডিয়া ও টেসলা) – এদের কিছু এসে যায় না, ট্রাম্প বা কমলা হ্যারিস, যে-ই জিতুন না কেন। রবার্টসের মতে দুজন প্রার্থীই পুঁজিবাদের সেবায় উৎসর্গীকৃত। এঁদের কাজ পুঁজিতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করা, পুঁজিপতিদের পক্ষে কাজের পরিবেশ সহজতর করে তোলা। এই সূত্রে তিনি বিশ্বের বৃহত্তম ভালচার ফান্ড-এর প্রতিনিধি, ব্ল্যাকরকের সিইও, ল্যারি ফিংককে উদ্ধৃত করেছেন, ‘সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কে বিজেতা এই প্রশ্ন মূল্যহীন হয়ে যাবে।’

বাস্তব হল, কোনো একটি সরকারের নিজস্ব নির্দিষ্ট নীতির চেয়ে অনেক বেশি বলবান পুঁজিবাদী উৎপাদনতন্ত্রের অন্তর্নিহিত শক্তিগুলি – লগ্নি এবং মুনাফার আবর্তন চক্র। ট্রাম্প বা হ্যারিস ওয়াল স্ট্রিটের কাছে সমান আদরণীয়। একইরকম আদরণীয় রাষ্ট্রচালনার অন্দরে আধিপত্য বিস্তারকামী কর্পোরেশন এবং জায়নবাদী লবিগুলির কাছেও। নির্বাচনের ফলাফলে এদের প্রত্যেকেরই জয় হয়েছে। অবশ্য সিলিকন ভ্যালির দুই সম্রাট, রাষ্ট্রচালনার, বিশেষত গোয়েন্দা বিভাগের অন্দরে সবচেয়ে লম্বা হাত থাকা দুজনের কথা আলাদা করে উল্লেখ করতেই হবে। এক, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি ইলন মাস্ক। অন্যজন পিটার থিল (Palantir), যিনি তাঁর রাজনৈতিক ধর্মপুত্র জে ডি ভান্সের উপরাষ্ট্রপতি হওয়া নিশ্চিত করেছেন।

টেসলা সিইও, সোশাল মিডিয়া এক্সের (পূর্বতন টুইটার) কর্ণধার মাস্ক একজন অন্তর্ঘাত বিশেষজ্ঞ (২০১৯ সালে বলিভিয়ায় ইভো মোরালেসের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের প্রাক্কালে মাস্ক কী বলেছিলেন তা স্মর্তব্য – আমরা যার বিরুদ্ধে ইচ্ছে অভ্যুত্থান ঘটাতে পারি, পারলে আটকাও)। একদা এই লোকটির সযত্নে নির্মিত খ্যাপাটে, অরাজনৈতিক, উদারবাদী, প্রযুক্তি জিনিয়াস ভাবমূর্তি ছিল। সেই তিনি এবার ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচার তহবিলে ১১৮ মিলিয়ন ডলার দিয়েছেন। নির্বাচনী তহবিলের অন্যতম বৃহৎ ব্যক্তিগত চাঁদা, যার কিছু অংশ খরচ হবে মাগা (মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন) কর্মকাণ্ডে।

নির্বাচনী প্রচারে মাস্ককে নিয়মিত দেখা যেত। সাধারণত মার্কিন পুঁজিপতিরা পর্দার আড়ালে খেলতে (পড়ুন নীতিকে প্রভাবিত করতে) ভালবাসেন। সে ব্যাপারে মাস্ক ব্যতিক্রমী বলতে হবে। নির্বাচনের রাত থেকে প্রায় প্রতিদিনই মাস্ক ফ্লোরিডার পাম বিচে ভাবী রাষ্ট্রপতি এবং আমেরিকার ভাবী ফার্স্ট লেডি মেলানিয়ার সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন। এমনকি নির্বাচনের দিন পারিবারিক গ্রুপ ফটোতেও তিনি উপস্থিত ছিলেন। ট্রাম্পঘনিষ্ঠ নীতি নির্ধারক ছোট্ট দলটিতেও মাস্ক অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন, যেখানে নানা সময়ে ছিলেন ভাবী উপরাষ্ট্রপতি ভান্স, বিলিয়নেয়ার হাওয়ার্ড লুটিনিখ, আর্থিক পরিষেবা জগতের ক্যান্টর ফিটসজেরাল্ড, প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়র, ট্রাম্পের পুত্রদ্বয় ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র এবং তাঁর ভাই এরিক।

টেসলা এবং এক্সের মালিকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে ট্রাম্প তাঁকে নতুন সেক্রেটারিয়েটে ডিপার্টমেন্ট অফ গভমেন্ট এফিশিয়েন্সির (DOGE) প্রধান হিসাবে নিয়োগ করেছেন। এই দফতরের অন্য প্রধান হলেন বিবেক রামস্বামী। এঁর কাজ হবে ট্রাম্পের ‘ঘর পরিষ্কার’। অর্থাৎ সরকারের খরচ কমানো, পুঁজি সঞ্চালনায় অতিরিক্ত বিধিনিষেধ হালকা করা, সরকারি আমলাতন্ত্রে নিয়োগ অপসারণ, অতিরিক্ত ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং ফেডারেল এজেন্সিগুলির পুনর্গঠন। মাস্ক নিজেই DOGE এর ভবিষ্যৎ প্রধান হিসাবে নিজের কাজকে বর্ণনা করেছেন ‘আমলাতন্ত্রের জন্য বিপদ’ বলে।

অর্থনীতি রে বোকা, অর্থনীতি

ডেমোক্র্যাটরা আসলে জুয়ার বাজি ধরেছিল। একজন দণ্ডিত অপরাধী, যাঁকে তারা ফ্যাসিবাদী এবং নাজি বলে অভিযুক্ত করেছে, মার্কিনিরা কখনোই তাঁকে হোয়াইট হাউসে চাইবে না – এই ছিল ডেমোক্র্যাটদের ধারণা। ট্রাম্পের জয় বুঝিয়ে দিয়েছে যে হিসাবে ভুল ছিল। আসলে গণতন্ত্রের মিথ সম্পর্কে জনপ্রিয় কল্পনার উপরে বিশ্বাস, দাসপ্রথা থেকে উদ্ভূত নির্বাচনতন্ত্রের উপর নির্ভরতা এই ভুলের জন্য দায়ী। যে নির্বাচনতন্ত্রের চিহ্নক হচ্ছে জড়ত্ব এবং প্রত্যক্ষ নির্বাচনের আধুনিক মাপকাঠিগুলোর সঙ্গে গভীর অসঙ্গতি। লক্ষ লক্ষ ভোটারের ইস্যু তবে কী ছিল? পুরনো প্রবাদই ফিরে আসে – ‘অর্থনীতি রে বোকা, অর্থনীতি।’ অসংখ্য সাধারণ ভোটার যখন ভোট দিচ্ছেন (মনে রাখতে হবে, এর মধ্যে ৪৫% ল্যাটিনো ভোট) তখন মুদ্রাস্ফীতি বছরে ৮%। জিনিসপত্রের দাম ও পরিষেবা মূল্য হু হু করে বেড়েছে। কুড়ি শতাংশেরও বেশি বেড়েছে সাধারণ খাবারের দাম। মানুষের ক্ষেপে ওঠার জন্য এসব যথেষ্ট।

মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ফেডারেল রিজার্ভ বন্ধকী, বিমা প্রিমিয়াম, গাড়ির ভাড়া, ক্রেডিট কার্ড বিল – সর্বত্র সুদের হার ব্যাপকভাবে বাড়িয়েছে। সবেরই মূল্য উর্ধ্বমুখী। রবার্টস সঠিকভাবেই চিহ্নিত করেছেন যে গত চার বছরে সাধারণ মার্কিনি গৃহস্থের জীবনযাত্রার মানের যে অবনতি হয়েছে তা মিথ বা মিথ্যে নয়, মূলধারার অর্থনীতিবিদরা যতই উল্টো কথা বলুন।

সাধারণ মার্কিনিদের ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যে ফৌজদারি অভিযোগগুলি ছিল সেসব নিয়ে মাথাব্যথা নেই। ওসব লোক ফাঁসানো আইনি ব্যাপার বলে তাঁরা মনে করেন। ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হিলে আক্রমণও উদারবাদী মিডিয়া বেশি ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে তুলেছে বলে তাঁদের বিশ্বাস। ‘ক্যাপিটল হিলের অসম্মান’ অপরাধ বলে মনে করেন অনেকেই, তবে তা অর্থনৈতিক দুর্গতির চেয়ে মারাত্মক নয়। ট্রাম্প সমর্থকদের আধিপত্যবাদী ও উন্নাসিক জো বাইডেন ‘আবর্জনা’ বলে আক্রমণ করেছিলেন। হ্যারিস ফ্যাসিবাদী আখ্যা দিয়েছিলেন। সেসব মানুষ ভোলেননি। তাঁরা ট্রাম্প নয়, তাঁদের ‘আমেরিকান ড্রিম’-এর সাফল্য চেয়েছেন, যার অর্থ আরেকটু ভালভাবে বাঁচা।

ট্রাম্প দোদুল্যমান প্রদেশগুলিতে জয় পেয়েছেন, অর্থাৎ উইসকনসিন, পেনসিলভ্যানিয়া এবং মিশিগান। তথাকথিত ‘রাস্ট বেল্ট’ বা মরচে বলয়ের অংশ এইসব অঞ্চল। এগুলি একদা শিল্পাঞ্চল, এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য পশ্চিমে পড়ে থাকা রুগ্ন সামাজিক, অর্থনৈতিক ভূমিক্ষেত্র। সব শিল্প অন্যত্র সরে গেছে। দক্ষিণের বাইবেল বলয় জর্জিয়া, নর্থ ক্যারোলিনা, অ্যারিজোনা ও নেভাদার মত রাজ্যগুলিতেও ট্রাম্প জয়ী হয়েছেন।

ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারে বিষাক্ত পৌরুষের গুণকীর্তন চলেছে এবং ‘জাগরণবিরোধী কথাবার্তা’ (anti-woke) [বিভিন্ন সামাজিক সম্পর্কের মতাদর্শগত মডেল – যৌন বৈচিত্র্য, মৌলিক লিঙ্গতত্ত্ব, নারীবাদ ও অভিবাসীবিদ্বেষ বিরোধিতা] এসবই ট্রাম্পের প্রগতিবাদ বিরোধী সাংস্কৃতিক যুদ্ধের অংশ। এসব ট্রাম্পের প্রগতিবিরোধী সাংস্কৃতিক যুদ্ধের অংশ। রাষ্ট্রপতি পদের জন্য প্রয়োজন ২৭০-এর থেকে অনেক বেশি, ৩১২টি ইলেকটোরাল কলেজ ভোট পেয়েছেন ট্রাম্প। জনগণের ৩০ লক্ষ ভোট টেনে নিয়েছেন হ্যারিসের থেকে। মনে রাখা দরকার, ট্রাম্প মাত্র ৩০% (২৬২ মিলিয়ন) যোগ্য ভোটারের সমর্থন পেয়েই জিতেছেন, কারণ ১০৭ মিলিয়ন (৪০%) ভোটই দেননি।

রিপাবলিকানরা সেনেটেও জিতেছে। এই প্রবণতা বজায় থাকলে তারা হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভসও জিতে নেবে। ট্রাম্প সংসদীয় এবং বিচারবিভাগীয় ক্ষমতাসহ রাষ্ট্রচালনা করতে পারবেন। আগের পর্বে যাঁদের মন্ত্রী হিসাবে নিয়োগ করেছিলেন, তাঁদের নিয়ে গঠিত আইনসভা ও অতি রক্ষণশীল সুপ্রিম কোর্টও তাঁর সঙ্গে থাকবে। রিপাবলিকান পার্টিতেও থাকবে তাঁর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ। ট্রাম্পবিরোধীদের তিনি সরিয়ে ফেলছেন। সরকারের তিনটি শাখা – আইনসভা, প্রশাসন ও বিচারবিভাগের উপর ক্ষমতার এই ধরনের কেন্দ্রীকরণ হোয়াইট হাউসে ১৮৯২ সালে গ্রোভার ক্লিভল্যান্ডের আমলের পরে আর দেখা যায়নি। এখন শুধু এই ক্ষমতা প্রয়োগের অপেক্ষা।

ক্যাবিনেটে যুদ্ধবাজ ও জায়নবাদীরা

নির্বাচনী প্রচারের সময়ে ৭৮ বছর বয়সী ধনকুবের ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে ‘মাগানমিক্স’ প্রকল্পের হাত-পা শক্তপোক্ত করা হবে। আন্তর্জাতিক আমদানির উপরে কঠোর শুল্ক চাপবে, বিশেষত চীন এবং মেক্সিকোর জন্য। বেআইনি অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাঁদের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের স্থূল জাতিবিদ্বেষপ্রসূত অভিযোগ – তাঁরা মার্কিন রক্তকে দূষিত করেন। তথাকথিত ‘ট্রিকল ডাউন’ অর্থনীতি প্রয়োগ করে ধনী ও বৃহৎ কর্পোরেশনগুলির জন্য বিরাট অঙ্কের কর ছাড়ের প্রতিশ্রুতি তিনি ইতিমধ্যেই দিয়ে রেখেছেন। অজুহাত লগ্নি বৃদ্ধি। একইসঙ্গে প্রায় সব সাধারণ মানুষের উপরে করের বোঝা বাড়বে। অসাম্য আরও বাড়বে।

ট্রাম্প বলেছেন, তাঁর শাসনের প্রথম দিনে তিনি ‘একদিনের একনায়ক’ হবেন। তিনি দেশে যা যা পরিবর্তন করতে চান রাষ্ট্রপতির ডিক্রির ঢল নামিয়ে সেগুলো বলবৎ করবেন। ট্রাম্পের বিষনজরে আছে মেক্সিকো এবং ইউক্রেন। তবে নিঃসন্দেহে সবচেয়ে বড় শত্রু চীন। ভাবী রাষ্ট্রপতির প্রাথমিক নিয়োগগুলি এই সম্পর্কে স্পষ্ট দিকনির্দেশ করছে। অভিবাসীবিরোধী অবস্থান, স্বরাষ্ট্রনীতির কঠোরতার পাশাপাশি তাঁর বিদেশ দফতরে যুদ্ধবাজ ও জায়নবাদীদের বাড়বাড়ন্ত। কংগ্রেস সদস্য মাইক ওয়াল্টজ ফ্লোরিডার রিপাবলিকান এবং অবসরপ্রাপ্ত গ্রীন ব্যারেট কর্নেল। তিনি হোয়াইট হাউস হোমল্যান্ড সিকিউরিটির উপদেষ্টা নিযুক্ত হচ্ছেন। ওয়াল্টজ ছিলেন জুনিয়র বুশের আমলে তৎকালীন উপরাষ্ট্রপতি ডিক চেনির সন্ত্রাসবাদবিরোধী উপদেষ্টা। ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেছেন যে চীন, রাশিয়া, ইরান এবং আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসের বিপদ মোকাবিলায় ওয়াল্টজ দক্ষতম ব্যক্তি।

যা ট্রাম্প উল্লেখ করেননি, তা হল ওয়াল্টজের মেক্সিকো সম্বন্ধে বিশেষ আগ্রহ আছে। সাংসদ হিসাবে তিনি এবং টেক্সাসের সাংসদ ড্যান ক্রেনশ ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে কংগ্রেসে একটি বিল এনেছিলেন, যার উদ্দেশ্য ছিল মেক্সিকান সিনালোয়া এবং খালিস্কো ‘ফেন্টানাইল ট্র্যাফিকিং’ কার্টেলের বিরুদ্ধে সেনা আক্রমণের অনুমোদন আদায় করা। এই কার্টেলগুলিকে তাঁরা আন্তর্জাতিক আধাসামরিক অপরাধী সংস্থা বলে দাগিয়ে দিয়েছিলেন। মেক্সিকোর বিরোধী দল ন্যাশনাল অ্যাকশন পার্টির বিদায়ী প্রেসিডেন্ট মার্কো কর্তেজ সংসদে চাপ সৃষ্টি করেছিলেন যাতে যে কোনো অপরাধ চক্রের সহিংস কাজকর্মকে নারকো-টেররিজম হিসাবে চিহ্নিত করার জন্য আইন আনা হয়। কর্তেজের এই রাজনৈতিক অবস্থানকে রাষ্ট্রপতি ক্লদিয়া শেইনবাউম বৈদেশিক হস্তক্ষেপের ফল বলে বর্ণনা করেছেন এবং কর্তেজকে এজন্য দেশবিরোধী বলে অভিযুক্ত করা উচিত বলে মত দিয়েছেন।

ট্রাম্পের আরেকটি নিয়োগ এমনকি পেন্টাগনকেও অবাক করেছে – পরবর্তী সেক্রেটারি হিসাবে পিট হেগসেথের নিয়োগ। তাঁর সিনিয়র মিলিটারি অথবা জাতীয় নিরাপত্তা বাহিনীতে কাজ করার কোনো অভিজ্ঞতা নেই। পিট অবশ্য প্রাক্তন আর্মি ন্যাশনাল গার্ড মাইক ওয়াল্টজের মত আফগানিস্তানে এবং ইরাকে মার্কিন অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন। গুয়ান্তানামো কারাগারেও কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। গত আট বছর তিনি ফক্স নিউজের উপস্থাপক। ট্রুথ সোশাল মিডিয়ায় সম্প্রতি এক পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন ‘পিট খুব শক্তিশালী, সপ্রতিভ এবং ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির সৎ অনুগামী। পিটের নেতৃত্ব দেখে আমেরিকার শত্রুদের সাবধান হতে হবে। আমাদের সেনারা আবার শ্রেষ্ঠ হয়ে উঠবে। আমেরিকা কখনোই পিছিয়ে পড়বে না।’

প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় এবং হার্ভার্ডের গ্র্যাজুয়েট পিটের দুটি ব্রোঞ্জ স্টার রয়েছে। আর আছে কমব্যাট ইনফ্যান্ট্রি ম্যান ব্যাজ। ট্রাম্প তাঁর পরিচয় দিয়েছেন ‘একজন সাহসী ও দেশপ্রেমী আমাদের শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে শান্তি নীতির প্রচারক’ হিসাবে। সিএনএনে পরিচয় গোপন রেখে একজন প্রতিরক্ষা আধিকারিক জানিয়েছেন – এই নিয়োগ পেন্টাগনে সকলেই ‘শকড’। পিট চীনকে বিপদ হিসাবে দেখেন। মনে করেন বেজিং বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে হারানোর জন্য একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী তৈরি করছে। ২০২০ সালে ইরানের জেনারেল কাশেম সোলাইমানিকে হত্যার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছিলেন। তেহরানের প্রতি পিটের যুদ্ধং দেহি মনোভাব এবং দেশটিকে অশুভ বলে দাগিয়ে দেওয়ার জন্য তিনি সুপরিচিত বা কুখ্যাত। ইজরায়েলের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কেরও তিনি সমর্থক। হামাস, হিজবুল্লা এবং ইরানকে তিনি ইহুদি রাষ্ট্র ধ্বংসের ষড়যন্ত্রকারী বলে মনে করেন। সংবাদসংস্থা এপি জানিয়েছে, পিট যোদ্ধার ভূমিকায় মেয়েদের নিয়োগ পছন্দ করেন না। এতে সেনাবাহিনীর মান নেমে যায় বলে তাঁর অভিমত। বৈচিত্র্যের ধারণার বিরোধিতা করে বলেছেন, ওসব করলে সেনাবাহিনীতে woke সংস্কৃতির প্রচার বাড়বে।

এই ধরনের বিতর্কিত আরেকটি নিয়োগের উদাহরণ সিআইএ-র ডিরেক্টর পদে ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্সের প্রাক্তন প্রধান জন র‍্যাটক্লিফ। ট্রাম্পের মতে তিনি ‘সত্য ও সততার জন্য উৎসর্গীকৃত যোদ্ধা’, ‘তিনি শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে জাতীয় নিরাপত্তা এবং শান্তি নিশ্চিত করতে পারবেন’। ট্রাম্প প্রথমবার রাষ্ট্রপতি থাকার সময়ে তিনি ছিলেন প্রধান গোয়েন্দা উপদেষ্টা। কংগ্রেসের সদস্য হবার সূত্রে তিনি জাতীয় সুরক্ষা বিষয়ে সিনিয়র ফেলো, হোম ইন্টেলিজেন্সের জুডিশিয়াল কমিটির সদস্য, হোম ল্যান্ড সিকিউরিটির সাইবার সিকিউরিটি চেয়ারম্যান।

সামনে মেক্সিকো

হোমল্যান্ড সিকিউরিটিতে ট্রাম্পের অগ্রাধিকার হবে অভিবাসীবিরোধী ব্যবস্থাগুলিকে কার্যকর করা। তিনি বেছে নিয়েছেন সাউথ ডাকোটার গভর্নর ক্রিস্টি নোয়েমকে। অনথিভুক্ত শ্রমিকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবার ব্যাপারে তাঁর খ্যাতি আছে। তিনি কাজ করবেন ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টম এনফোর্সমেন্টের (ICE) প্রাক্তন প্রধান টম হোম্যানের সাথে। আর থাকবেন স্টিফেন মিলার। ট্রাম্পের প্রথম পর্বে তাঁর অভিবাসীবিরোধী নীতিগুলির রূপকার, দ্বিতীয় পর্বেও একই কাজ করার জন্য নিযুক্ত।

ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন যে হোম্যান দক্ষিণ (মেক্সিকোর সঙ্গে) সীমান্ত ও উত্তর (কানাডার সঙ্গে) সীমান্ত, নৌ এবং বিমান নিরাপত্তার প্রধান দায়িত্ব পালন করবেন। হোম্যানের কেরিয়ার শুরু সীমান্ত পাহারা দেওয়ার কর্মী হিসাবে। ক্রমে ল এনফোর্সমেন্টের প্রধান পদে উন্নীত হন বারাক ওবামার সময়ে। বেআইনি অভিবাসীদের ধরে তাদের দেশে ফেরত পাঠানোর দায়িত্ব পালন করবেন তিনি। আগের পর্বে সমালোচকরা তাঁকে ‘ডিপোর্টার-ইন-চিফ’ নাম দিয়েছিলেন। ট্রাম্পের প্রথম পর্যায়ে ICE-র প্রধান হিসাবে প্রথম দেড় বছরে অভিবাসী আটক এবং ফেরত পাঠানোর কঠোর বন্দোবস্তে অন্তত পাঁচ হাজার শিশুকে তাদের বাবা-মায়ের থেকে আলাদা করা হোম্যানের অন্যতম কীর্তি।

ফক্স নিউজের এই নিয়মিত বিশ্লেষক শেষ রিপাবলিকান ন্যাশনাল কনভেনশনে বলেছিলেন যে লক্ষ লক্ষ অবৈধ অভিবাসীদের প্রতি তাঁর একটি বার্তা আছে – ‘আপনারা মানে মানে নিজেদের প্যাকিং শুরু করুন।’ ট্রাম্প তাঁকে মনোনীত করার পরেই ফক্স নিউজে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন ‘আমি এবং ট্রাম্প দুজনেই বিশ্বাস করি যে জননিরাপত্তা ও জাতীয় সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, কারণ তাই দেওয়া উচিত। অভিবাসীরা আমাদের দেশের জন্যে সবচেয়ে বড় বিপদ।’ আরও বলেছেন, কর্মক্ষেত্রগুলিতে জোরদার অপারেশন চলবে।

ভাবী প্রশাসনের ভাষ্য হল – বাইডেন সরকার কর্মক্ষেত্র থেকে অভিবাসীদের আটক করা বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে মালিকরা সহজে বেআইনি শ্রমিক, এমনকি শিশু শ্রমিকও, নিয়োগ করতে পারছে। হোম্যান বলেছেন, অনথিভুক্ত শ্রমিক আটক করতে সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করা হবে না। ICE-ই তা করবে। কোনো কনসেনট্রেশন ক্যাম্প হবে না বা পাড়ায় পাড়ায় হানা দেওয়া হবে না। কর্মক্ষেত্রে চিরুনি তল্লাশি হবে।

স্টিফেন মুলারকে হোয়াইট হাউসে ডেপুটি চিফ পদে এনে আসলে ট্রাম্প অবৈধ অভিবাসীদের দ্রুত বিতাড়ন প্রক্রিয়াকে জোরদার করতে চাইছেন। যত দ্রুত সম্ভব কার্যকর করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক আদেশে ২০ জানুয়ারিই ট্রাম্প স্বাক্ষর করবেন। মুলার নিজেই বলেছেন, গণগ্রেফতার এবং ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরি করার হবে। দরকারে টাইটেল ৪২ প্রয়োগ করে জরুরি অবস্থা ঘোষণার মাধ্যমে তহবিল ও সরকারি আধিকারিকদের (যাঁরা এই ধরনের কাজের জন্য নিযুক্ত নন) এই কাজে ব্যবহার করার প্রস্তাবের খসড়া ইতিমধ্যেই তৈরি হয়ে গেছে। ট্রাম্পের ভাবী প্রশাসন ‘স্টে ইন মেক্সিকো’ (মেক্সিকোতে থাকো) কর্মসূচি আবার চালু করবে। আশ্রয় চাওয়া অভিবাসীদের মেক্সিকোতে অপেক্ষা করতে হবে, যতক্ষণ তাঁদের আবেদন অনুমোদিত না হচ্ছে। আইন বিশেষজ্ঞরা অবশ্য বলছেন, তার জন্য শেইনবাউম সরকারের অনুমোদন লাগবে।

অতি দক্ষিণপন্থী মার্কো রুবিও সেক্রেটারি অফ স্টেট

১৩ নভেম্বর ট্রাম্প আরও একটি বিতর্কিত নিয়োগের কথা ঘোষণা করেছেন। ফ্লোরিডার রিপাবলিকান সেনেট সদস্য মার্কো রুবিও (একজন কিউবান-আমেরিকান) সেক্রেটারি অফ স্টেট হবেন। ট্রাম্প বলেছেন ‘রুবিও আমাদের দেশকে অবিচলভাবে রক্ষা করবেন। তিনি আমাদের মিত্রদের সত্যিকারের বন্ধু। তিনি একজন ভয়হীন যোদ্ধা, প্রতিপক্ষের কাছে কখনোই আত্মসমর্পণ করবেন না।’ তিপ্পান্ন বছর বয়সী রুবিও কমিউনিজমের গোঁড়া শত্রু। এক্স হ্যান্ডেলে লিখেছেন ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নেতৃত্বে আমরা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠা করব। আমেরিকান ও আমেরিকার স্বার্থ সর্বদা অগ্রাধিকার পাবে।’

ইজরায়েলের গুণমুগ্ধ, ইরানের বিরুদ্ধে বড় আকারের অর্থনৈতিক অবরোধের সমর্থক, ভেনিজুয়েলা, কিউবা, নিকারাগুয়া ও বলিভিয়ার বাম সরকারগুলির কঠোর সমালোচক রুবিও চীনের ঘোষিত শত্রু। ২০২২ সালে আয়োজিত আমেরিকান শীর্ষ সম্মেলনে মেক্সিকোর প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি লোপেজ ওব্রাদোরকে ‘কিউবার অত্যাচারী, নিকারাগুয়ার খুনি একনায়ক এবং ভেনিজুয়েলার ড্রাগ পাচারকারীদের সমর্থনকারী’ বলে বর্ণনা করেন। সেই সম্মেলনের চেয়ারম্যান ছিলেন বাইডেন এবং ওব্রাদোর সম্মেলনে অনুপস্থিত ছিলেন। অতীতে রাশিয়ার ঘোর প্রতিপক্ষ রুবিও, রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনে আমেরিকার প্রক্সি যুদ্ধের দ্রুত অবসান চান। এই মর্মে ট্রাম্পের উদ্যোগকে তিনি সমর্থন জানিয়েছেন। তিনি মনে করেন যে দুই দেশের বিরোধ এক অচলাবস্থায় পৌঁছেছে।

ট্রাম্পের অভিষেকের আগে রুবিও ২০১৬ সালে রাষ্ট্রপতি পদে রিপাবলিকান প্রাইমারিতে ছিলেন। কোভিডের সময়ে মেক্সিকোতে কিউবান ডাক্তারদের কাজ করেছিলেন এবং পেমেক্স (মেক্সিকান অয়েল কর্পোরেশন) কিউবাতে তেলের জাহাজ পাঠিয়েছিল বলে মেক্সিকোর বিরুদ্ধে কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। ১৯৫৬ সালে এই কিউবা থেকেই রুবিওর বাবা-মা আমেরিকায় অভিবাসী হয়ে এসেছিলেন। শেইনবাউম মেক্সিকোর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবার পর রুবিও কিছুটা সংযত হলেও বলতে ছাড়েননি যে ‘ফেন্টানাইল ট্র্যাফিকিং’ এবং বেআইনি অভিবাসনের চাপ আমেরিকায় ক্রমাগত বেড়েই চলেছে।

অগাস্ট মাসে এক্স হ্যান্ডেলে তাঁর পোস্ট ছিল, ‘রাষ্ট্রপতি লোপেজ ওব্রাদোর এবং ভাবী রাষ্ট্রপতি শেইনবাউমের সংস্কার কর্মসূচি আমাদের দেশের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পক্ষে বিপজ্জনক।’ শুধু রুবিও নন, আরও অনেক সেনেটার মেক্সিকোর বিচারবিভাগীয় সংস্কার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ২০১৫ সালে রুবিও রবার্টা জ্যাকসনের মেক্সিকোয় মার্কিন দূত হিসাবে নিয়োগ আটকে দিয়েছিলেন। কারণ রেবেকা ওবামার আমলের শেষ দুবছরে কিউবার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। কারাকাসের জন্য নির্ধারিত নীতি, বিশেষত ভেনেজুয়েলার তেলের উপর অবরোধ তুলে নেওয়ার জন্য বাইডেন রুবিওর কঠোর সমালোচনার শিকার হয়েছিলেন।

রুবিওর নির্বাচন বেশ রহস্যময়। ২০১৬ সালে ট্রাম্পের মনোনয়নের জন্য প্রচারের সময়ে রুবিও ট্রাম্পের কঠোর সমালোচক ছিলেন। বিশেষত বৈদেশিক নীতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থান ছিল দুজনের। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, ২০২৪ সালে রুবিও সেনেটে একটা আইন পাস করাতে সফল হন যে ন্যাটো থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করতে হলে রাষ্ট্রপতিকে আগে কংগ্রেসের অনুমোদন নিতে হবে। ট্রাম্প সর্বদাই সেনা প্রত্যাহারের এই ভয় সম্মিলিত জাতিপুঞ্জকে দেখিয়ে এসেছেন। তবে ফ্লোরিডার এই সেনেটর ট্রাম্পের অনুকূল বেশ কয়েকটি কাজও করেছেন। যেমন ৪৫ শতাংশের বেশি ল্যাটিনো ভোট (৫৪% ল্যাটিনো পুরুষ) জোগাড় করে দিয়েছেন। ট্রাম্প বলতে পারবেন যে তিনি আমেরিকার ইতিহাসে প্রথম ল্যাটিনো সেক্রেটারি অফ স্টেট নিয়োগ করেছেন।

আরো পড়ুন ইজরায়েলের গাজা আক্রমণ যুদ্ধ নয়, সুপরিকল্পিত গণহত্যা

ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্সের ডিরেক্টর পদে ট্রাম্প বেছে নিয়েছেন প্রাক্তন মার্কিন আর্মি রিজার্ভের লেফটেন্যান্ট কর্নেল তুলসী গাবার্ডকে (ভারতীয় বংশোদ্ভূত নন)। তেতাল্লিশ বছর বয়সী তুলসী চারবারের কংগ্রেস সদস্য। ২০২০ সালে ডেমোক্র্যাটদের রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী ছিলেন। মধ্য এশিয়া আর আফ্রিকার যুদ্ধক্ষেত্রে কাজ করেছেন। ২০২২ সালে ডেমোক্র্যাট পার্টি থেকে বেরিয়ে এসে নিজেকে নির্দল বলে ঘোষণা করেন। এবছর অগাস্টে তিনি ট্রাম্পের প্রশংসা করে তাঁর ফের রাষ্ট্রপতি হওয়াকে সমর্থন করেন। তারপরেই ট্রাম্পের ‘ট্রানজিশন টিম’-এর সহযোগী চেয়ারপার্সন হিসাবে কাজ করতে শুরু করেন। এরপরই অক্টোবর মাসে রিপাবলিকান পার্টিতে যোগ দেন। ট্রাম্পের ট্রানজিশন টিম ইতিমধ্যেই প্রাক্তন আরকানসাস গভর্নর জায়নবাদী মাইক হাকাবিকে ইজরায়েলের ভাবী রাষ্ট্রদূত বলে ঘোষণা করেছে। মাইকের কন্যা সারা হাকাবি স্যান্ডার্স হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের প্রথম পর্যায়ে প্রেস সেক্রেটারির পদ সামলেছেন। মাইক ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট পদের দৌড়ে ছিলেন। ধর্মপ্রচারক খ্রিস্টান এবং ওয়েস্ট ব্যাংকে ইজরায়েলি উপনিবেশের এই আগ্রাসী সমর্থক মনে করেন না যে প্যালেস্তাইন বলে কোনোকিছুর অস্তিত্ব আছে। তিনি সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ প্রস্তাবিত দ্বিরাষ্ট্রতত্ত্বের ঘোর বিরোধী। স্বভাবতই বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু সরকারের সদস্যরা এই মনোনয়নে উল্লসিত।

চীন প্রধান শত্রু

চীনের বিরুদ্ধে বাণিজ্য যুদ্ধ ২০১৮ সালে ট্রাম্প তাঁর প্রথম শাসনকালেই শুরু করেছিলেন। বাইডেন সেই প্রক্রিয়াকে প্রাতিষ্ঠানিক ও পদ্ধতিগত রূপ দেন এবং চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করার নীতিটিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সুরক্ষার অজুহাতে জোরদার করেন। ওয়াশিংটনের পক্ষে এই বিষয়টি একটি আন্তর্জাতিক কৌশল রূপায়ণের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এখন পাখির চোখ সোভিয়েত ইউনিয়নের মতই চীনকে ভেঙে ফেলা। এই উদ্দেশ্যে ট্রাম্পের পরিকল্পনা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আমদানিকৃত চীনা পণ্যের উপর ১০% লেভি এবং ৬০% শুল্ক চাপানো। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, এতে দুটি দেশের মধ্যে যে উচ্চ প্রযুক্তির পরস্পর নির্ভরশীল সরবরাহ চক্র কাজ করে তা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বেজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরই অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে পারে।

চীনা সংবাদপত্র গ্লোবাল টাইমস বলেছে যে জি জিনপিং সরকার এরপর মার্কিন অবরোধ কর্মসূচি, অবৈধ ও বিরূপ পদক্ষেপের বিরুদ্ধে শুধু রক্ষণ নীতি নেবে না, উল্টে আগ্রাসী পদক্ষেপ নেবে। পাল্টা লড়াই শুরু করলে মার্কিন অর্থনীতির পক্ষে তা সুবিধার হবে না। মার্কিন অবরোধ চীনের প্রযুক্তিগত উন্নতি ঠেকাতে পারেনি। বরং বেজিংয়ের স্বনির্ভরতা ও উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধির জেদকে সংহত করেছে। এর উদাহরণ বৈদ্যুতিক পরিবহন, কৃত্রিম মেধা এবং অপরাপর অত্যাধুনিক প্রযুক্তির বিকাশ, চীনা পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার বৃদ্ধি, উৎপাদন ভিত্তি মজবুত হওয়া, আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলকে সংহত করার মাধ্যমে বিশ্বের বাজারে ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি।

উপসংহার টানতে গেলে প্রশ্ন ওঠে, যে ট্রাম্পকে বিরোধী রিপাবলিকানরা বিদ্রূপ করে বলতেন ‘ট্রাম্পেনস্টাইন’, এখন তাঁরা কী ভাবছেন? এই প্রত্যাবর্তন কি মার্কিন ‘ডিপ স্টেট’ এবং অভিজাততন্ত্রের অনুমোদন ছাড়া সম্ভব ছিল?

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.