বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর স্ত্রী সারার ঘনিষ্ঠ পরামর্শদাতা এবং অফিস ম্যানেজার জিপি নাভোন সম্প্রতি ইজরায়েলের সেনাবাহিনীর কাছে একটি আর্জি জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, অবরুদ্ধ গাজার বাসিন্দাদের হত্যা না করে বাঁচিয়ে রেখে বাড়ি বাড়ি ঢুকে অত্যাচার করা হোক। কিন্তু আটক ফিলিস্তিনিদের জিভ যেন না কেটে ফেলা হয়। কারণ ইজরায়েলিরা তাদের আর্তনাদ উপভোগ করতে চান। আটক আরবদের কান এবং চোখ যেন আস্ত রাখা হয়, যাতে তাঁরা দেখতে এবং শুনতে পারেন ইজরায়েলিদের উল্লাস।

ইজরায়েলের

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

খুব ভুল কিছু বলেননি নাভোন। এর আগেও ইজরায়েলের এমন বিকৃত উল্লাসের দৃশ্য গোটা পৃথিবী দেখেছে৷ প্যালেস্তাইনের নিরস্ত্র জনতার উপর যখন বোমা পড়ছে, রকেট বৃষ্টি হচ্ছে, ঝলসে যাচ্ছে ফিলিস্তিনি শিশুর দল, সেই অপরূপ মনোরম দৃশ্য দেখার জন্য তখন উঁচু পার্বত্য এলাকায় ইজরায়েলিদের ভিড়। পর্যাপ্ত পরিমাণে খাবার এবং পানীয় নিয়ে তাঁরা ‘উপভোগ’ করছেন মারণ উৎসব – ২০১৪ সালের এই ছবি কোনো বিচ্ছিন্ন দৃশ্য নয়। জায়নবাদী ইজরায়েল রাষ্ট্র এভাবেই দশকের পর দশক উদযাপন করে আসছে লাগাতার গণহত্যা। তাই ইজরায়েলি রাষ্ট্র স্পষ্টতই বলতে পারে, ফিলিস্তিনিরা মানুষ নয়, নরপশু।

কথা হচ্ছিল প্যালেস্তাইন সলিডারিটি নেটওয়ার্কের বেন জামালের সঙ্গে। ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের ইন্তিফাদায় হারিয়েছেন বেন। এখন চেষ্টা করছেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতিতে আন্দোলন গড়ে তুলতে। বেন বলছিলেন, গাজার শিশুরা কালি দিয়ে হাতে নিজের নাম লিখে রাখছে, যাতে মৃত্যুর পর বেওয়ারিশ লাশ হয়ে যেতে না হয়। প্রতিদিন শয়ে শয়ে বোমা পড়ছে সর্বত্র। হাসপাতাল, উদ্বাস্তু শিবির, বসতি এলাকা – সর্বত্র। উত্তর গাজার ১১ লক্ষ বাসিন্দাদের সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল ইজরায়েল। প্রাণভয়ে দক্ষিণের দিকে পালাচ্ছিলেন হাজার হাজার মানুষ। সেই পলাতক নিরস্ত্র বেসামরিক জনতার উপরেও বোমা ফেলেছে ইজরায়েল। তাতে ১২ জন শিশুসহ ৭০ জনের মৃত্যু হয়েছে। দেইর এল-বালাহ শহরে একটি বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন দক্ষিণ গাজা থেকে পালিয়ে আসা একদল মানুষ। সেই বাড়িটি বোমায় গুঁড়িয়ে গিয়েছে। জ্বালানি নেই, বিদ্যুৎ নেই, খাবার নেই। কার্যত নরককুণ্ডে পরিণত হওয়া গাজায় ফুরিয়ে আসছে পানীয় জল। সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের ফিলিস্তিনি শরণার্থী সংস্থা ইউএনআরডবলিউয়ের কমিশনার জেনারেল ফিলিপ লাজারানি বলেছেন, মানুষজন বাধ্য হয়ে তেষ্টা মেটাতে নোংরা নর্দমার জল খাচ্ছেন। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ বোমায় আহত হয়ে হাসপাতালে ভিড় করছেন, চিকিৎসা পাচ্ছেন না। গাজায় চিকিৎসা সরঞ্জাম তৈরির যে কটি কারখানা আছে, তার সবকটিই বন্ধ হয়ে গিয়েছে।

এই বীভৎস অত্যাচারের ফিরিস্তি শেষ হওয়ার নয়। হাসপাতালগুলির মর্গে লাশ রাখার জায়গা নেই। বিভিন্ন কারখানা থেকে খাবার এবং আইসক্রিমের ফ্রিজার আনা হয়েছে। তাতে ঠাসাঠাসি করে ব্যাগে ভরে মৃতদেহ রাখা হচ্ছে। গোটা পৃথিবীর চোখের সামনে, গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার পশ্চিমী মিত্রদের প্রত্যক্ষ মদতে এই বীভৎসতা চালিয়ে যাচ্ছে ইজরায়েল। হামাসকে ধ্বংস করার নামে আসলে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে প্যালেস্তাইনকে মুছে দিতে চাইছে। গাজা নামক একটি উন্মুক্ত কারাগারের অদৃশ্য ফটক শক্ত করে আটকে চলছে নির্বিচার গণহত্যা। এটা কোনো যুদ্ধ নয়, কোনো আক্রমণ নয়। প্রতিরোধ নয়। নির্বিচার সুপরিকল্পিত গণহত্যা। জাতিপুঞ্জের যে স্কুলগুলোয় বোমা হামলা থেকে বাঁচতে আশ্রয় নিয়েছেন ফিলিস্তিনিরা, সেগুলোর উপরেও বোমাবর্ষণ চলছে। আহত শিশুদের নিয়ে হাসপাতালের দিকে ছোটা অ্যাম্বুলেন্সে বোমাবর্ষণ চলছে। ব্যবহার করা হচ্ছে হোয়াইট ফসফরাস, যাতে ফিলিস্তিনিদের হাড় পর্যন্ত পুড়ে যায়।

ইজরায়েল যে বীভৎস হত্যালীলা চালাচ্ছে, তা সন্ত্রাসবাদ ছাড়া আর কিছু নয়। অথচ সমগ্র পশ্চিমী সংবাদমাধ্যম গোটা পৃথিবীর সামনে ইজরায়েলকেই আক্রান্ত এবং ফিলিস্তিনিদের আক্রমণকারী হিসাবে তুলে ধরতে সচেষ্ট। আরবদের সন্ত্রাসবাদী হিসাবে দেখানোর সুপরিকল্পিত চেষ্টা চলছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমও তাতে শামিল। এর আড়ালে আপাতত গাজার বুকে ঘটে চলেছে সাম্প্রতিককালের নৃশংসতম গণহত্যা।

আমরা কজন হান্নান শাহীনের নাম শুনেছি? ছ বছর বয়সী হান্নান আমেরিকার ইলিয়নে থাকত। সে ফিলিস্তিনি মুসলমান। দিন কয়েক আগে তাকে কুপিয়ে খুন করেছে একজন শ্বেতাঙ্গ খ্রিস্টান আমেরিকান। ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টারে প্যালেস্তাইনের পতাকা তোলার অপরাধে গ্রেফতার করা হয়েছে কয়েকজনকে। উদার গণতান্ত্রিক পশ্চিমী রাষ্ট্রগুলি প্যালেস্তাইনের সমর্থনে কর্মসূচিতে নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞা জারি করছে।

ইহুদিদের ধর্মগ্রন্থ হিব্রু বাইবেল বা তানাখ অনুসারে নবী আব্রাহামকে ঈশ্বর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তাঁর বংশধরদের জন্য একটি ভূখণ্ড নির্দিষ্ট রয়েছে, যা তাদের পূণ্যভূমি। ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে বর্তমানের প্যালেস্তাইন এবং ইজরায়েলই সেই পূণ্যভূমি। যদিও বাইবেলের আরেকটি বিবরণ অনুসারে এই পূণ্যভূমি মিশর থেকে ইউফ্রেটিস নদীর তীর পর্যন্ত বিস্তৃত। সুপ্রাচীন কাল থেকেই এই অঞ্চলে ইহুদিরা বসবাস করে আসছিলেন। আনুমানিক ৭০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ রোমানরা জেরুজালেমে ইহুদিদের মন্দির ধ্বংস করে তাদের তাড়িয়ে দেয়। এরপর ইহুদিরা মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা এবং ইউরোপের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েন। কিন্তু শতাব্দীর পর শতাব্দী ইহুদি জাতির কৌমচেতনায় রয়ে গিয়েছিল পূণ্যভূমিতে ফিরে আসার স্বপ্ন। যে পবিত্র ভূমিতে আছে জেরুজালেম, আছে জায়ন পাহাড়, আছে প্রাচীন জুদিয়া ও সামারিয়া।

১৮৯৫ সালে অস্ট্রিয়ার লেখক নাথাম বারমবুম প্রথম ‘জায়নিজম’ শব্দটি ব্যবহার করেন। তার দুবছর পর ১৮৯৭ সালে আরেক অস্ট্রিয়ান ইহুদি থিওডর হারজেলের উদ্যোগে সুইজারল্যান্ডের বাসেল শহরে প্রথম বিশ্ব জায়নবাদী কংগ্রেস হয়। এর ২০ বছর বাদে ১৯১৭ সালে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী লর্ড আর্থার ব্যালফোর জায়নবাদী নেতা ব্যারন রথসচাইল্ডকে চিঠি লিখে জানান, প্যালেস্তাইনে ইহুদি আবাসভূমি গড়ে তুলতে যা প্রয়োজন তাই করবে ব্রিটিশ সরকার। জায়নবাদের সঙ্গে পশ্চিমী সাম্রাজ্যবাদী শক্তির গাঁটছড়ার সেই সূচনা।

ব্যালফোর ঘোষণা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অটোমান সাম্রাজ্যের দখলে থাকা প্যালেস্তাইন ভূখণ্ড প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে ইংরেজদের হাতে চলে যায়। এই ভূখণ্ডে আগে থেকেই আরব মুসলমানদের পাশাপাশি সংখ্যায় কম হলেও খ্রিস্টান এবং ইহুদিরা বসবাস করতেন। এই ইহুদিরা ছিলেন অধিকাংশই প্রাচ্যের ইহুদি, যাঁরা মিজরাহি নামে পরিচিত ছিলেন। উনবিংশ শতকের শেষ দিক থেকে এই ভূখণ্ডে ইউরোপ থেকে ইহুদিরা আসতে থাকেন, যাঁরা আশকেনাজি নামে পরিচিত। ব্যালফোর ঘোষণাপত্রের পরে বহিরাগত ইহুদিদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। তাঁরা স্থানীয় আরবদের থেকে জমিজমা কিনে বসবাস করতে শুরু করেন।

ধীরে ধীরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে থাকে। স্থানীয় আরব-ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে ইহুদিদের সংঘাত বাড়তে থাকে। ১৯২১ সালেই ব্রিটিশদের প্রত্যক্ষ মদতে হাগনাহ নামে আধাসামরিক বাহিনী তৈরি হয়। পরে আরও দুটি জায়নবাদী সশস্ত্র সংগঠন – ইরগুন এবং স্টার্ন গ্যাং – গড়ে ওঠে। এদের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে ভারতের রণবীর সেনার। চিত্তাকর্ষক বিষয় হল, ১৯৪৮ সালে ইজরায়েল রাষ্ট্র গঠনের পর এগুলি ইজরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনীতে মিশে যায়।

আরো পড়ুন ভারতীয় সেনাবাহিনী কি রাওয়াতের দেখানো রাজনৈতিক পথে হাঁটবে?

১৯৩৩ সালেই স্থানীয় ফিলিস্তিনিরা সাম্রাজ্যবাদী মদতে জায়নবাদী দখলদারি প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে বড় আকারের প্রতিবাদ আন্দোলন করেন। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ তা কঠোর হাতে দমন করে। এরপর ১৯৩৭ সালে ব্রিটিশ সরকার নিযুক্ত পিল কমিশন প্যালেস্তাইনকে দুই ভাগে ভাগ করে তিন চতুর্থাংশে আরব এবং বাকি অংশে ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব দেয়। সেই প্রস্তাবে জেরুজালেম এবং বেথলেহেমকে দুই দেশের মধ্যবর্তী একটি ছিটমহল হিসাবে রাখার কথা বলা হয়। আরবরা এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেও জায়নবাদীরা সমর্থন করে।

হিটলারের আমলে নাজি জার্মানিতে ইহুদিদের উপর হওয়া ভয়াবহ অত্যাচার যুদ্ধাবসানের পর একটি ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের জায়নবাদী দাবিকে জোরদার করে। হলোকস্টের বীভৎসতা এই দাবির পিছনে গোটা বিশ্বের সমর্থন জোগাড়ে সহায়ক ভূমিকা নেয়। যুদ্ধ চলাকালীন ১৯৪২ সালে জায়নবাদীদের বাল্টিমোর সম্মেলনে প্যালেস্তাইনে ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব পাশ হয়। যুদ্ধের পরে ১৯৪৭ সালের ২৯ নভেম্বর সদ্যগঠিত জাতিপুঞ্জের সাধারণ পরিষদের বৈঠকে প্যালেস্তাইন ভূখণ্ডকে ইহুদি এবং আরবদের মধ্যে দুই ভাগ করার প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। আরব লিগ এতে আপত্তি তোলে। যথার্থ আপত্তি। ইউরোপের অপরাধের শাস্তি কেন তাদের পেতে হবে?

এরপর থেকে ওই ভূখণ্ডে শুরু হয় হিংস্র জায়নবাদী তৎপরতা। ইজরায়েলের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন গুরিয়ান প্ল্যান দালেত বা প্ল্যান ডি পরিকল্পনার মাধ্যমে আরবদের নিশ্চিহ্ন করার ছক কষেন। ১৯৪৮ সালের ১০ মার্চ প্ল্যান ডি চূড়ান্ত হলে হাগনাহ, স্টার্ন গ্যাং সমেত জায়নবাদী সংগঠনগুলি হত্যা, ধর্ষণ, লুটতরাজের মাধ্যমে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। মার্চ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সাত লক্ষ ফিলিস্তিনি আশপাশের আরব দেশগুলিতে উদ্বাস্তু হিসাবে আশ্রয় নেয়। বেশ কিছু জায়গায় দুপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে কিছু ইহুদিও মারা যান। এর মধ্যেই মে মাসে ব্রিটিশ শাসনের অবসান হলে গুরিয়ান স্বাধীন ইজরায়েল রাষ্ট্র ঘোষণা করেন। ১৯৯৮ সালে জায়নবাদীরা যখন ইজরায়েলের জন্মের ৫০ বছর পালন করছেন, তখন থেকেই আরবরা ১৫ মে তারিখটিকে আল নকবা বা বিপর্যয় হিসাবে পালন করেন।

গত ৭৫ বছরে চারটি আরব-ইজরায়েল যুদ্ধের প্রতিটিতে আরবরা পরাজিত হয়েছে। ক্রমাগত তীব্র থেকে তীব্রতর হয়েছে জায়নবাদী দখলদারি। ১৯৬৭ সালে গোলান উপত্যকা, পূর্ব জেরুজালেম এবং ওয়েস্ট ব্যাঙ্কে ইজরায়েল তার কর্তৃত্ব স্থাপন করে। প্যালেস্তাইন ভূখণ্ডে অবৈধভাবে জমি দখল, বসতি নির্মাণ, ফিলিস্তিনিদের সব রকমের নাগরিক অধিকার হরণ, পানীয় জলের সরবরাহ বন্ধ করা – সবকিছুই করে চলেছে ইজরায়েলের জায়নবাদী সরকার।

ইজরায়েলি দখলদারির বিরুদ্ধে পাঁচের দশকে তৈরি হয় ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দল ফতাহ। ইয়াসের আরাফত ছিলেন তার নেতৃত্বে। ১৯৬৪ সালে ফাতাহ সমেত বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক শক্তি যৌথভাবে গড়ে তোলে প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন – পিএলও। তারাই হয়ে ওঠে ফিলিস্তিনি জনতার প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন। গুরুত্বপূর্ণ হল, পিএলওর মধ্যে ছিল একাধিক বামপন্থী সংগঠন। তাদের অন্যতম পপুলার ফ্রন্ট ফর দ্য লিবারেশন অফ প্যালেস্টাইন-পিএফএলপি। মার্কসবাদী-লেনিনবাদী এই সংগঠনের গেরিলারা সাত এবং আটের দশকে সাড়া ফেলেছিলেন। বিমান হাইজ্যাক করার মত অপারেশনও তাঁরা সফলভাবে করেছিলেন। শক্তি কমলেও এখনো লড়াইয়ের ময়দানে আছে পিএফএলপি।

পিএলও প্রথম থেকেই ইজরায়েলি দখলদারির বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ শুরু করে। সমাজতান্ত্রিক শিবিরের সমর্থন পান আরাফত। পিএলওর প্রতিরোধের ধরণ ছিল দ্বিবিধ – একদিকে বিপুল গণজমায়েত, তার সঙ্গে গেরিলা পদ্ধতিতে প্রতিরোধ। বলা বাহুল্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মদতপুষ্ট ইজরায়েলের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণভাবে লড়ার কোনো সুযোগ পিএলওর ছিল না। ইজরায়েলের সঙ্গে প্রতিরোধ সংগ্রামে বিশ্বের বিরাট অংশের সমর্থন পেয়েছিল পিএলও। এমনকি বাংলাদেশ থেকেও একঝাঁক বামপন্থী যুবক প্যালেস্তাইনে যান আরব গেরিলাদের হয়ে লড়তে। পশ্চিমবঙ্গের কবি লেখেন “আমি মৃদুল দাশগুপ্ত, আমি আরব গেরিলাদের সমর্থন করি।”

আরব-ইজরায়েল যুদ্ধের দুই দশক পর শুরু হয় পিএলওর নেতৃত্বে প্রথম ইন্তিফাদা বা গণজাগরণ। টানা ছ বছর চলে এই অসম প্রতিরোধ সংগ্রাম। ইন্তিফাদার সময়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ইজরায়েলি সেনাদের দিকে ফিলিস্তিনি যুবকদের পাথর ছোঁড়ার দৃশ্য। আন্দোলনের সংহতিতে পাথর ছেঁড়েন বিশিষ্ট তাত্ত্বিক এডওয়ার্ড সাঈদও। ইন্তিফাদার সমর্থনে, ইজরায়েলের দখলদারির বিরুদ্ধে মিছিলে মিছিলে উত্তাল হয়ে ওঠে প্রথম বিশ্বের রাজপথ।

এই প্রথম ইন্তিফাদার অবসান ঘটে ১৯৯৩ সালে অসলো চুক্তির মাধ্যমে। নরওয়ের রাজধানীতে অত্যন্ত গোপনে ইজরায়েলের সঙ্গে এই চুক্তিতে সই করে পিএলও, স্বীকৃতি দেয় ইজরায়েলকে। অসলো চুক্তির মাধ্যমে স্থির হয়, ইজরায়েল গাজা এবং ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক থেকে সরে আসবে। হিংসা বন্ধ হবে। দুঃখজনক হলেও সত্যি, এই চুক্তির আগে পিএলও নেতৃত্ব প্যালেস্তাইনের সংগ্রামী জনগণের মতামত নেননি। যাঁরা বছরের পর বছর বুকের রক্ত ঢেলে দখলদার ইজরায়েলের বিরুদ্ধে লড়লেন, তাঁরা কী চান, জানতে চাননি পিএলও নেতারা। এই সময়টি প্যালেস্তাইনের প্রতিরোধ আন্দোলনের জলবিভাজিকা। পিএলও কার্যত নিজের হাতেই হামাস এবং ইসলামিক জিহাদের মত সংগঠনের উত্থানের বীজ বপন করে।

অসলো চুক্তির পর আরাফত এবং ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী ইৎঝাক রাবিন নোবেল পুরস্কার পান। পিএলওর সঙ্গে ইজরায়েলের সমঝোতা।র ভিত্তিতে গঠিত হয় ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ বা প্যালেস্টাইন ন্যাশনাল অথরিটি (পিএনএ)। চুক্তিতে স্থির হয়, পরবর্তী পাঁচ বছর ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ অস্থায়ী সরকার হিসাবে সংঘাত নিরসনে আলেচনা চালিয়ে যাবে। কিন্তু ফিলিস্তিনিদের জন্য সার্বিকভাবে এই চুক্তি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। এমনিতেই চুক্তিতে ফিলিস্তিনি শরণার্থী, ওয়েস্ট ব্যাঙ্কের ইহুদি বসতি বা জেরুজালেম প্রসঙ্গে কোনো স্পষ্টতা ছিল না। তার উপর ইজরায়েল অসলো চুক্তিতে আমল দেয়নি। গাজা এবং ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক থেকে সরে আসেনি। চুক্তির সময় ওই এলাকায় লাখখানেক ইহুদির বসবাস থাকলেও এখন তা অনেক বেড়েছে। এরপর পূর্ব জেরুজালেমকে আমেরিকা ইজরায়েলের রাজধানী হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। অসলো চুক্তি পিএলওকে নৈতিকভাবেও দুর্বল করে দেয়। এই চুক্তির প্রতিবাদে বামপন্থী পিএফএলপি গেরিলারা পিএলও ছেড়ে বেরিয়ে আসেন।

অসলো চুক্তি ফিলিস্তিনিদের বিরাট অংশের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। পিএলও নেতৃত্বের দুর্বলতা, ব্যাপক অংশের ফিলিস্তিনির হতাশা এবং ক্ষোভ কাজে লাগিয়ে জনসমর্থন বাড়াতে থাকে হামাস এবং ইসলামিক জিহাদের মতো সংগঠনগুলি। হামাসের জন্ম আটের দশকে, মুসলিম ব্রাদারহুডের ফিলিস্তিনি শাখা হিসাবেই৷ আল কায়দার জন্ম যেমন সোভিয়েত ইউনিয়নকে রুখতে মার্কিন মদতে, ঠিক তেমনই একদম শুরুতে হামাসকে মদত দিয়েছিল ইজরায়েল। উদ্দেশ্য ছিল দুটি। প্রথমত, পিএলওর মত ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির পরিবর্তে হামাসের মত কট্টর মৌলবাদী শক্তি যদি প্যালেস্তাইনের সংগ্রামে সামনের সারিতে থাকে, তাহলে প্যালেস্তাইনের পক্ষে আর্ন্তজাতিক সমর্থন পাওয়া কঠিন। দ্বিতীয়ত, ফিলিস্তিনিদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন পিএলও এবং তার নেতা আরাফতকে প্যালেস্তাইনের ভিতর থেকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক ঐক্য খতম করা। অসলো চুক্তির আপোস হামাসের সামনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়। তারা প্রথম থেকেই অসলো চুক্তির তীব্র বিরোধিতা করে।

ইজরায়েলের একটানা অবরোধ ও অত্যাচারের ধারাবাহিকতায় চলতি শতকের শুরুতে ঘটল দ্বিতীয় ইন্তিফাদা। তবে এবার আর পিএলওর নিয়ন্ত্রণ রইল না। হামাসসহ ইসলামিস্টদের শক্তি বাড়ল অনেক। আরাফতের মৃত্যুর পর মাহমুদ আব্বাসের নেতৃত্বাধীন পিএলও ফিলিস্তিনি জনতার স্বাধীনতাকামী আকাঙ্ক্ষার ভরকেন্দ্র রূপে নিজেকে তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়। পিএলওর বিরুদ্ধে বিপুল দুর্নীতি এবং ইজরায়েল ও তার পশ্চিমী মিত্রদের সঙ্গে বোঝাপড়ার অভিযোগও উঠতে থাকে। এই সবকিছুর পরিপ্রেক্ষিতে ইজরায়েলকে হটানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২০০৬ সালের সংসদীয় নির্বাচনে জিতে গাজার ক্ষমতায় আসে হামাস। ওয়েস্ট ব্যাঙ্কে থাকে পিএলও/ফাতাহ নেতৃত্বাধীন প্যালেস্টাইন কর্তৃপক্ষ। এরপর গাজা থেকে পিএলও কার্যত বিতাড়িত হয়, হামাসই গাজা নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে।

হামাস ক্ষমতায় আসার পর থেকে গাজায় বারবার হামলা চালিয়েছে ইজরায়েল। ২০০৮, ২০১২, ২০১৪, ২০২১ সালে নৃশংস আক্রমণ হয়েছে। পাল্টা হামাসও হামলা করেছে ইজরায়েলে। সম্প্রতি আল আকসা মসজিদে ইজরায়েলি সেনার তাণ্ডবের পর সম্ভবত হামাসের বড়সড় আক্রমণ করা ছাড়া গতি ছিল না। অন্যদিকে বৃদ্ধ আব্বাসের নেতৃত্বাধীন ওয়েস্ট ব্যাঙ্কের পিএলও পরিচালিত সরকারি (রাষ্ট্রপুঞ্জ স্বীকৃত) ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ কার্যত জড়ভরত ও দুর্বল। তাদের পক্ষে এই মুহূর্তে যুদ্ধ বা প্রতিরোধ সংগ্রাম করা সম্ভব নয়। আবার হামাসের বিরোধিতা করার উপায়ও নেই।

হামাসের সাম্প্রতিকতম হামলা ইজরায়েলের প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত বহু মিথ গুঁড়িয়ে দিয়েছে। বহুচর্চিত আয়রন ডোম ভেদ করাও যে সম্ভব তা প্রমাণ হয়ে গিয়েছে।। হামাসকে সমর্থন জানিয়েছে প্যালেস্তাইনের বামপন্থী গেরিলা সংগঠন পিএফএলপি, সমর্থন জানিয়েছে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লা। শক্তির বিচারে হামাসের তুলনায় বহুগুণে শক্তিশালী হিজবুল্লা। লেবাননের বিরাট অংশে তারা কার্যত স্বাধীন সরকার পরিচালনা করে। গাজায় ইজরায়েলের হামলার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে হামাস, হিজবুল্লা এবং ইসলামিক জেহাদের মধ্যে ঐক্য গড়ে উঠতে পারে। ইতিমধ্যেই সেই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। শক্তিশালী ইরান এবং হিজবুল্লার নিবিড় সম্পর্কের কথা কার্যত ‘ওপেন সিক্রেট’। ২০১২ সাল থেকে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের সঙ্গেও হিজবুল্লার সুসম্পর্ক। ফলে এই দুই দেশও ইজরায়েলবিরোধী যোদ্ধাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থন দিতে পারে। ওয়েস্ট ব্যাঙ্কেও যে কোনো সময় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে পারে। মার্কিন মিত্র সৌদি আরবের সঙ্গে শুরু হওয়া ইজরায়েলের কূটনৈতিক আলোচনাও আপাতত ভেস্তে গিয়েছে।

ইজরায়েল শক্তির দিক থেকে অনেক এগিয়ে থাকলেও তাদের জন্য এবারের সংঘর্ষ অন্যবারের মতো সহজ নাও হতে পারে। জাতিপুঞ্জে ইজরায়েলের রাষ্ট্রদূত বলেছেন, গাজায় অভিযান চালিয়ে তাঁরা হামাসের মেরুদণ্ড ভেঙে দেবেন। এই ধরনের দাবি কতখানি বাস্তবোচিত তা নিয়ে সংশয়ের অবকাশ আছে। ২০১৪ সালে ইজরায়েল যখন গাজায় অভিযান চালিয়েছিল, তখন কয়েক মিটার জায়গা দখল করতে দু সপ্তাহ সময় লেগেছিল তাদের। এবারের পরিস্থিতি আরও জটিল, কারণ একে তো গাজার সর্বত্র ইজরায়েলের উপস্থিতি নেই। তার উপর হামাসের হাতে বন্দি হয়ে রয়েছেন অসংখ্য ইজরায়েলি। এই ধরণের অভিযানে আরও ব্যাপক প্রাণহানি ঘটবে। পশ্চিমী দুনিয়ার পক্ষে তখন সরাসরি জায়নবাদীদের পক্ষে দাঁড়ানো সমস্যার হতে পারে। ইজরায়েলে গিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি জো বাইডেনের সুরও ক্রমশ নরম হয়েছে। নেতানিয়াহুকে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২০০১ সালের ভুলের পুনরাবৃত্তি না করতে বলেছেন।

হামাস বনাম ইজরায়েলের যুদ্ধ সংক্রান্ত আলোচনায় নেতানিয়াহুর একটি মন্তব্য খুব বেশি আলোচিত হচ্ছে না। হামাসের হামলার ঠিক পরেই দেশের দক্ষিণাংশের মেয়রদের উদ্দেশে তিনি বলেছিলেন, “ইজরায়েল যা প্রতিক্রিয়া দেখাবে, তা গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে বদলে দেবে। আগামী কয়েক দিনে আমরা শত্রুদের বিরুদ্ধে যে ব্যবস্থা নেব, তার স্মৃতি তাদের কয়েক প্রজন্ম ধরে তাড়া করবে।”

নেতানিয়াহুর এই উচ্চারণের সঙ্গে অক্ষরে অক্ষরে মিল পাওয়া যায় আফগানিস্তান যুদ্ধের আগের জর্জ বুশের বক্তৃতার। ইজরায়েলের বিরোধী নেতা বেনি গানৎসও বলেছেন, তাঁরা এই যুদ্ধে জিতবেন এবং গোটা অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থার স্ট্র্যাটেজিক কাঠামো বদলে দেবেন। এই মধ্যপ্রাচ্যকে বদলে দেওয়ার প্রকল্পটি বেশ পুরনো। ২০০৬ সালে টানা ১১ দিন ধরে লেবাননে হামলা চালিয়েছিল ইজরায়েল। তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কন্ডোলিজা রাইস বলেছিলেন, ইজরায়েলের উচিত যুদ্ধবিরতির দাবিকে পাত্তা না দেওয়া, কারণ একটি অন্যরকম মধ্যপ্রাচ্য তৈরি করা দরকার।

একথা না বোঝার কোনো কারণ নেই, প্যালেস্টাইনে জাতিগত গণহত্যা চায় ইজরায়েল। সেই লক্ষ্যেই মার্কিন মদতে এক পা এক পা করে এগোচ্ছে তারা। তবে কাজটা খুব সহজও নয়। এক মেরু বিশ্বের পরিবর্তিত বাস্তবতায় সম্প্রতি একাধিক আরব দেশের সঙ্গে ইজরায়েলের সম্পর্ক স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। হামাসের আক্রমণ-পরবর্তী ইজরায়েলের সামরিক আগ্রাসনে সেই প্রক্রিয়া ধাক্কা খেয়েছে। অন্যদিকে নির্বিচারে গণহত্যা চালালেও গাজায় স্থল অভিযানের অভিজ্ঞতা ইজরায়েলের পক্ষে সুখকর নাও হতে পারে। সবমিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল ও বহুমাত্রিক।

যা নিয়ে কোনো সংশয় নেই তা হল, এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ সংঘর্ষ বন্ধের দাবি তোলা। সেই সঙ্গে স্পষ্ট করে বলা, এই সংকটের শিকড়ে রয়েছে ইজরায়েলের দখলদারির আগ্রাসী রাজনীতি। ইতিমধ্যেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে লক্ষ লক্ষ মানুষ যুদ্ধ বন্ধের দাবিতে পথে নেমেছেন। হোয়াইট হাউজের সামনে বিক্ষোভ হয়েছে, লন্ডনে প্রতি শনিবার লক্ষ লক্ষ মানুষ মিছিল করছেন। পথে নামছে আফ্রিকা, এশিয়া, লাতিন আমেরিকার যুদ্ধবিরোধী জনতা। জায়নবাদবিরোধী ইহুদিরাও পথে নামছেন। ইজরায়েলের অভ্যন্তরে যুদ্ধ বন্ধের দাবিতে মিছিল হচ্ছে। ইজরায়েলের কমিউনিস্ট পার্টিও যুদ্ধ বন্ধের দাবি জানিয়েছে। এইসব ছবি দেখে মনে হয়, হিংসা এবং রক্তপাত, দখলদারি এবং অত্যাচার সত্য ঠিকই, তবে শেষ সত্য নয়।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.