কাকতালীয়ভাবে গত ৪ ডিসেম্বর নাগাল্যান্ডে ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাতে ছজন খনি শ্রমিকের হত্যা এবং সেই হত্যার বিরুদ্ধে বিক্ষোভকারী আরো সাত গ্রামবাসীর হত্যা, সব মিলিয়ে ১৩ জন নাগরিকের হত্যার চার দিনের মাথায় তামিলনাড়ুর কুন্নুরে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় চিফ অফ ডিফেন্স স্টাফ বিপিন রাওয়াত, তাঁর স্ত্রী মধুলিকা রাওয়াত সহ ১৩ জনের মৃত্যু হল।

বিপিন রাওয়াতের বাবা লক্ষ্মণ সিং রাওয়াত ১৯৮৮ সালে ভারতের স্থলসেনার উপ-সেনাপতি পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। অভিজাত যুদ্ধজীবী পরিবারের সন্তান বিপিন রাওয়াত ১৯৭৮ সালে সেনাবাহিনীতে নিযুক্ত হন। ভারতীয় সেনা সূত্রে জানতে পারা যায়, সিমলার সেন্ট এডওয়ার্ড স্কুল থেকে পড়াশোনা করার পর, খরকওয়াসলার ন্যাশনাল ডিফেন্স অ্যাকাডেমিতে (NDA) পড়াশোনা করেছিলেন। এর পর দেরাদুনের ইন্ডিয়ান মিলিটারি অ্যাকাডেমি (IMA) থেকে পাস করার পর তিনি গোর্খা ব্রিগেডে ২য় লেফটেন্যান্ট পদে চাকরি জীবন শুরু করেন। পরবর্তীকালে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সামরিক কলেজে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

গোর্খা ব্রিগেড থেকে স্থলসেনার সর্বোচ্চ পদে পৌছেছেন এমন চতুর্থ ব্যক্তি ছিলেন রাওয়াত। ২০১৬ সালে ১ সেপ্টেম্বর তিনি দেশের উপ-সেনাপতি নিযুক্ত হন। ওই বছর ৩১ ডিসেম্বর পদোন্নতি পেয়ে সেনাবাহিনীর ২৬তম প্রধান সেনাপতি হন। এই পদে বহাল থাকেন ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। এর মধ্যে নরেন্দ্র মোদীর ক্যাবিনেট ২৪ ডিসেম্বর চিফ অফ ডিফেন্স স্টাফ পদটি তৈরির সিদ্ধান্তে সিলমোহর বসায়। মনমোহন সিংয়ের ইউপিএ-২ সরকারের আমলে শুরু হওয়া প্রক্রিয়া এইভাবে সম্পূর্ণ হয়। তারপর ৩১ ডিসেম্বর রাওয়াতকে চিফ অফ ডিফেন্স স্টাফ নিযুক্ত করা হয়।

ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলোতে একাধিকবার সেনা অভ্যুত্থান হলেও, ভারতে তেমন পরিস্থিতি তৈরি না হওয়ার কারণ হিসাবে বিশেষজ্ঞরা স্থল, বায়ু, নৌবাহিনীর কাঠামো আলাদা হওয়ার কথা বলেন। এদের মধ্যে যে শুধু কোনো কাঠামোগত সংযোগ নেই তা নয়, সাংবিধানিকভাবে এই তিন বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হলেন রাষ্ট্রপতি। আর তিনি মন্ত্রিসভার নির্দেশ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি কাজ করতে বাধ্য। ফলত ভারতে সামরিক অভ্যুত্থান অসম্ভব মনে করতেন বিশেষজ্ঞদের অনেকে। কিন্তু চিফ অফ ডিফেন্স স্টাফ তৈরির মধ্যে দিয়ে তিন বাহিনীর সমন্বয় সাধন আদতে ভবিষ্যতে ভারতকে সেনা অভ্যুত্থানের দিকে ঠেলবে কিনা, এই নিয়ে জল্পনা হয়েছিল।

চার দশকেরও বেশি লম্বা কর্মজীবনে তাঁর বীরত্ব এবং অবদানের জন্য রাওয়াতকে উত্তম যুদ্ধ সেবা মেডেল, অতি বিশিষ্ট সেবা মেডেল, উস সেবা, সেনা মেডেল সহ বিভিন্ন মেডেল বা উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছিল।

৯ জুন ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক সীমানা পেরিয়ে মায়ানমারে ঢুকে ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট কাউন্সিল অফ নাগাল্যান্ড (খাপলাঙ) এর ৩৮ জন গেরিলা যোদ্ধাকে হত্যা করা হয়েছে বলে ভারতীয় সেনা সূত্রে দাবি করা হয়। এই দুর্ধর্ষ এবং গোপন অপারেশনের নেতৃত্বে ছিলেন স্বয়ং রাওয়াত। ভারতের সংবাদমাধ্যম এবং জাতীয়তাবাদীরা যখন সেনার বীরত্বের প্রশংসায় পঞ্চমুখ, ঠিক সেই সময় নাগা বিদ্রোহীরা প্রেস বিজ্ঞপ্তি জারি করে ভারতীয় সেনার হাতে মৃত ৩৮ জনের মধ্যে অন্তত একজনের মৃত দেহ দেখাবার চ্যালেঞ্জ জানায়। বিদ্রোহীদের দাবি ছিল, এরকম কোনো অপারেশনের মুখোমুখি তাদের হতে হয়নি, তাদের র‍্যাঙ্ক এবং ফাইল সম্পূর্ণ সুস্থ ও সুরক্ষিত। তারা দাবি করে, ওই সময়ে তারা মায়ানমারে নয়, নাগাল্যান্ডেই সাংগঠনিক কাজে ব্যস্ত ছিল। নাগা বিদ্রোহীদের এই প্রেস বিজ্ঞপ্তি উত্তর পূর্বাঞ্চলের কিছু সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হলেও ভারতের জাতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো বেশিরভাগই এই খবর ব্ল্যাক আউট করে।[১]

পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দুটো সার্জিকাল স্ট্রাইক নিয়েও প্রশ্ন আছে। ২০১৬ সালের প্রথম সার্জিকাল স্ট্রাইকের সত্যতা বেশকয়েকটি খ্যাতিসম্পন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা প্রশ্ন তোলে। [২] [৩] দ্বিতীয় যে বিমান আক্রমণ, সেটার ক্ষেত্রেও ভারত সরকারের দাবির সাথে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর এলাকা পর্যবেক্ষণের কোনো মিল নেই।[৪][৫] উপরন্তু দেখা যায় ভারতের মিডিয়ায় যে সমস্ত ইসলামিক জেহাদি নেতাদের সার্জিকাল স্ট্রাইকে মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছিল, তাদের কাউকে কাউকে পরবর্তীকালে পাকিস্তান গ্রেফতার করেছে। যদিও ভারতের সংবাদমাধ্যমের এক বড় অংশ সেনাবাহিনীকে প্রশ্নের উর্ধ্বে মনে করায় এক্ষেত্রেও খুব একটা সমস্যায় পড়তে হয়নি।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কমান্ড অ্যান্ড জেনারেল স্টাফ কলেজ (CGSC) তার কৃতি ছাত্রদের ইন্টারন্যাশনাল হল অফ ফেম সম্মান দিয়ে থাকে। ২০১৯ সালের ৪ এপ্রিল যে তিনজন সেনানায়ককে ওই হল অফ ফেমে যুক্ত করা হয়েছিল, তাঁরা হলেন ১৯৯৫ সালের ক্লাসের ছাত্র আর্জেন্টিনার জেনারেল বারি দেল ভাল্লে সসা, ১৯৯৭ সালের ক্লাসের ছাত্র জেনারেল রাওয়াত এবং ২০০৩ সালের ছাত্র জামাইকার জেনারেল রকি রিকার্ডো মেদে। এই সম্মান প্রদান অনুষ্ঠানে রাওয়াত মার্কিন সামরিক কলেজে কাটানো সময়গুলো তাঁর জীবনের সেরা সময় বলে উল্লেখ করেন এবং চাকরিজীবনে এই কলেজ থেকে পাওয়া শিক্ষার প্রতি কৃতজ্ঞতার কথা জানান। এ ছাড়াও তিনি বলেন, নতুন বিশ্ব ব্যবস্থার উদ্ভব নিয়ে আমেরিকার মত ভারতও উদ্বিগ্ন। ভারত মহাসাগর-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আমেরিকার অবস্থানের গুরুত্বের কথা তুলে ধরেন। বলা বাহুল্য, নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা বলতে আমেরিকাপ্রধান এক মেরু বিশ্ব প্রতিষ্ঠা হওয়া সত্ত্বেও চীন-রাশিয়া জোটের শক্তি সঞ্চয়, বা আমেরিকার লেজুড় অবস্থা থেকে সরে এসে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ক্রমাগত স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টাকে বোঝায়।

ভারতের সর্বোচ্চ সেনানায়কের এভাবে আমেরিকার পক্ষাবলম্বন যথেষ্ট গুরুত্বের দাবি রাখে। আমেরিকান সেনার নিজের দেশের সীমানা থেকে বহু দূরে দক্ষিণ এশিয়ায় উপস্থিতিকে সমর্থন করা, ভারত মার্কিন নীতিগত জোটকে প্রাধান্য দেওয়া নিঃসন্দেহে আন্তর্জাতিক সমীকরণ বদলাবার সময়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিজেপি সরকার আমেরিকা ইজরায়েল লবির দিকে একটু বেশি ঝুঁকলেও জোটনিরপেক্ষতার পুরনো বিদেশনীতি সম্পূর্ণ ত্যাগ করেনি। সেটা প্যালেস্তাইন প্রশ্নে মোদী সরকারের অবস্থান বা রাশিয়া, ইরানের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্কেই স্পষ্ট। বৈদেশিক নীতির ব্যাপারে সরকারের মধ্যেই যে মতপার্থক্য আছে, আন্তর্জাতিক সমীকরণ বদলের সময় ভারতের বিদেশনীতির দোদুল্যমানতা থেকে তা বোঝা যায়। চীনের সাথে গালওয়ান উপত্যকায় উত্তেজনার সময়ে চীন সরকার এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদী যখন আলোচনার মাধ্যামে উত্তেজনা প্রশমনের চেষ্টা করছিলেন, ঠিক তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেক্রেটারি অফ স্টেট এবং গুপ্তচর সংস্থা CIA-র কর্তা মাইক পম্পেওর উস্কানিতে সরকারের এক অংশ, সেনাবাহিনীর প্রধান ব্যক্তিত্বরা প্রধানমন্ত্রীর উল্টো সুরে গরম গরম বক্তব্য রেখে চীনের সাথে যুদ্ধ বাধাবার চেষ্টায় আছেন বলে মনে হচ্ছিল। আফগানিস্তান প্রশ্নেও এই দ্বন্দ্ব দেখা যায়। জুলাই মাসের শেষদিকে দিল্লিতে আমেরিকার নতুন সেক্রেটারি অফ স্টেট অ্যান্টনি ব্লিঙ্কনের সাথে ভারতের বিদেশমন্ত্রী সুব্রহ্মণ্যম জয়শঙ্করকে যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনে আফগানিস্তানের পটপরিবর্তন কোনোভাবেই মেনে না নেওয়ার হুঙ্কার দিতে দেখা গেল। একে ভারতের কাঁধে আফগান যুদ্ধের বোঝা চাপিয়ে আমেরিকার কেটে পড়ার ফন্দি ভাবাটা অস্বাভাবিক নয়। এরপর দেখা গেল ভারত সরকার আফগানিস্তানে সাহায্য প্রেরণ করতে পাকিস্তানের সাথে প্রতিযোগিতায় নেমেছে। আফগান প্রশ্নেও সেনাপ্রধান রাওয়াতকে দেখা উত্তেজক বক্তব্য রাখতে দেখা গিয়েছিল। চীনকে ঘিরতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সামরিক জোট Quadrilateral Security Dialogue বা কোয়াড গঠন করেছিলো আমেরিকা। এই কোয়াডের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন রাওয়াত। কিন্তু কোয়াড ঠিকঠাক না দাঁড়াতেই ভারতকে বাদ দিয়ে নতুন জোট অকাস গঠন করে ফেললো আমেরিকা। ফলত কোয়াডের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত বলে বলে মনে করছে বিশেষজ্ঞরা। প্রশ্ন উঠছে, আমেরিকা কি বন্ধু ভারতের উপর ভরসা রাখতে পারছে না?

কাকতালীয়ভাবে ৬ ডিসেম্বর ভ্লাদিমির পুতিন ঝটিকা সফরে দিল্লি ঘুরে গেলেন। দীর্ঘ দোদুল্যমানতার পরে আমেরিকার Countering America’s Adversaries Through Sanctions Act বা কাটসার আওতায় নিষেধাজ্ঞার হুমকি উপেক্ষা করে রাশিয়ার কাছ থেকে ভারত S-400 এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম কেনার সিদ্ধান্ত নিল। দু দিনের মাথায় ৮ ডিসেম্বর আমেরিকাপন্থী CDS বিপিন রাওয়াতের দুর্ঘটনায় মৃত্যু হল।

স্পষ্টত, ভারত রাষ্ট্রের বিদেশনীতি সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের ব্যাপারে সেনাপ্রধান বারবার মুখ খুলে নিজের পক্ষপাতিত্ব স্পষ্ট করেছেন। ১৯৫৪ সালের আর্মি রুলের চ্যাপটার ৪ উপেক্ষা করে বারবার তিনি প্রকাশ্যে রাজনৈতিক বক্তব্য পেশ করে গেছেন। শুধু আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নয়, দেশের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারেও বারবার সরকারী দলের পক্ষে মতামত ব্যক্ত করে বিতর্কে জড়িয়েছেন। ভারতের ইতিহাসে হয়ত তিনিই প্রথম সেনাবাহিনীতে কর্মরত থাকাকালীন রাজনৈতিক বয়ান দেওয়া ব্যক্তি। আগামী দিনে রাওয়াতের পথ ধরে এ দেশের সেনাবাহিনী প্রতিবেশী দেশগুলোর মত রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে, নাকি দূরত্ব বজায় রাখে, সেটাই এখন দেখার।

তথ্যসূত্র :
[১]টাইমস অফ অসম
[২]বিবিসি
[৩]ডেকান ক্রনিকল
[৪]ইন্ডিয়া টুডে
[৫]বিবিসি
~মতামত লেখকের ব্যক্তিগত।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.