অরিজিৎ সেন
রবি দাঁড়িয়েছিল বাসের অপেক্ষায়। ফেরার বাস। বৃষ্টি পড়ছিল অবিরাম ধারায়। হঠাৎ সে দেখতে পেল একটা সাপকে। জানি না এভাবে ওসব হয় কিনা… গল্পে তো হতেই পারে… রবি ধীরে ধীরে পা বাড়িয়ে দিল সাপের ফণার দিকে। স্বেচ্ছামৃত্যুর অকস্মাৎ বাসনায় সায় দিল সাপটি। আমার পড়া অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস – ও ভি বিজয়নের খাসাকের ইতিহাস-এর শেষ অংশ এটা। সত্যি বলছি – ডাল লেকের বরফশীতল জল থেকে ভেসে আসা নিষ্ঠুর হাওয়া যখন আমার চামড়ার জ্যাকেট ভেদ করে হাড়ের মধ্যে আঘাত করছিল তখন আমি কতশত যোজন দূরের মালয়ালী বর্ষার দিনের এক কাল্পনিক মুহূর্তের কথা ভাবছিলাম।
সাপ এসে কামড়াল রবির পায়ে… “এ মিস্টার… রুকিয়ে রুকিয়ে – জনাব আপ হী কো বোল রহা হুঁ” আমায় যেন ডাকল কেউ… যেন কেউ এসে স্বপ্ন ভেঙে দিল – দুঃস্বপ্ন – অ্যাবসার্ড স্বপ্ন – তবুও স্বপ্ন তো – ভেঙে যেতে আমি কেমন যেন হতচকিত হয়ে গেলাম। সজোরে ব্রেক কষলাম মোটরবাইকে – বাইক থামল। পিছনে আরেকটা বাইক দাঁড়াল – একজন নামলেন – মিলিটারির পোষাক – পিঠে পেল্লায় বন্দুক।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
“হেলমেট উতারিয়ে…”
খুললাম।
“ও – কাশ্মীরী নহী হ্যাঁয় আপ। ইধর কা বাইক কাঁহা সে মিলা?”
“এক বন্ধু – এক দোস্ত দিয়া হ্যায় – কাশ্মীরী দোস্ত।”
“বাঙ্গালী?”
“ইয়েস।”
“ইয়া বাংলাদেশী?”
“কলকাতা।”
“অ্যায়সে হী কহতে হ্যাঁয় সব। কেয়া কর রহে হো ইধর?”
“কুছ নহী” আমি বললাম।
মিলিটারি সাহেবের গলা চড়ল এবার “মিস্টার, ফর দ্য লাস্ট ফিফটিন মিনিটস ইউ হ্যাভ বীন ওয়ান্ডারিং অ্যালং দ্য ব্যাঙ্কস অফ ডাল লেক লাইক এ হেডলেস চিকেন অ্যান্ড আই হ্যাভ বীন ফলোয়িং ইউ। আর্টিকেল উইথড্র হোনে কে বাদ রাত সাড়ে আট বজে শ্রীনগর সো যাতা হ্যায়। অভি সাড়ে নও বজে। এক বান্দা ভী বাহার নহী হ্যায়। অওর আপ ধর্মেন্দর কি তরহ ঘুম রহে হো। ডাসন্ট ইট অ্যাপিয়ার ফিশি?”
আমার মনে হল… কেন জানি না মনে হল- আমি ও ভি বিজয়নের কথা বলি… রবি আর সাপের শেষ দৃশ্যটার কথা বলি… তারপর বুঝলাম ও কথা এখানে বললে কেউ বুঝবে না… আমায় হয়ত টেররিস্ট ভাবছে… ওসব বললে পাগল টেররিস্ট ভাববে… কে জানে কোনটা বেশি খারাপ?
তখনি মানিব্যাগ থেকে আমার ভোটার কার্ডটা বের করলাম।
“উয়ো সব বাদ মে হোগা। পহলে পুলিস স্টেশন আইয়ে। সিধে আইয়ে – নো ট্রিকস…”
“একটা ফোন…”
“নট নাও। ফার্স্ট প্রুভ ইয়োরসেলফ ইনোসেন্ট।”
২
শ্রীনগরে আর কিছু না থাকুক, পুলিস স্টেশন বা মিলিটারি ব্যারাকের অভাব নেই। তার একটাতে আমি গেলাম… ছোট ঘর… অনুজ্জ্বল আলোয় দেখি এককোণে এক চৌকিদার গোছের লোক বসে… মাটিতে উবু হয়ে আর একজন… টেবিলে আমার বয়সী আরও একজন… তাঁর হাতেই হ্যান্ডেড ওভার হলাম। যিনি নিয়ে এলেন তিনি বললেন “ইয়ে বান্দা – ঘুম রহা থা… ইধর সে উধর… ফির ইউ টার্ন লেকে উধর সে ইধর… মুঝে লগা কিসি কে ইন্তেজার মে থে… কোঈ সিগনাল ভী হো সকতা হ্যায়… আপ টু ইউ… অ্যান্ড হি ক্লেইমস টু বি এ বেঙ্গলী। আপকে ঘরওয়ালে। অল ইয়োর্স। আপ টেগোর অওর গাঙ্গুলী কো লেকে স্টার্ট কর দো..গুড নাইট “
যাঁর হাতে এখন আমি, বুঝলাম তিনিও বাঙালি। মাথার চুল কমছে… চোখের রহস্য চশমায় ঢাকা… নিখুঁতভাবে কামানো দাড়িগোঁফ… ইশারায় বসতে বললেন।
আরো পড়ুন কাশ্মীর আর মণিপুরের হাল দেখে বাঙালির শিউরে ওঠা উচিত
আমি ভোটার কার্ড দিলাম। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন। তারপর আমায় দেখলেন অনেকক্ষণ ধরে – যেন সম্মোহন – যেন আমি ফ্রয়েড বা তাঁর কোনো শিষ্যের চেম্বারে বসে – জন্মজন্মান্তরের কথা বেআব্রু হয়ে যাচ্ছে অগোচরে। অনেকক্ষণ পর… মানে আমি যখন প্রায় সম্মোহিত… ভদ্রলোক বললেন
“একটা গজলের লাইন বলি – গজল ভালবাসেন তো?”
আমি মাথা নাড়লাম।
‘মুঝকো জিনহোনে কতল কিয়া হ্যায় কোঈ উনহে বতলায়ে ‘নাজির’,
মেরী লাশ কে পহলু মে উয়ো অপনা খঞ্জর ভুল গয়ে’
এর মানে কী?”
“আরেকবার বলবেন প্লিজ?” আমি আকাশ থেকে পড়লাম।
আরেকবার বললেন।
“আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। আসলে আমি খুব ভাল হিন্দি বলতে-বুঝতে পারি না।”
“এটা তো হিন্দি নয় – উর্দু। সেটা তো আপনার ভালই আসে মনে হয়। মানে হল… ক্যাটক্যাটে বাংলায় মানে হল… খুন করে খুনি লাশের পাশে ছুরি ফেলে গেছেন। এবার বুঝলেন?”
আমি বেশ বুঝতে পারছি আলোচনা কোন দিকে যাচ্ছে – কিন্তু এর গতি রোধ করার ক্ষমতা আমার নেই।
“উর্দুও আসে না? অথচ এমন কাশ্মীরী বন্ধু পাতালেন – সে বাইকটা আপনাকে দিয়ে দিল?”
“দুদিনের জন্য। আমি শুক্রবারই ফিরে যাব। আমার ভোটার কার্ড…”
“ভোটার কার্ড! অমন অজস্র ভোটার কার্ড হাওয়ায় ঘুরছে মিস্টার হোসেন…”
“সেন।”
“হোসেন… সেন… হোসেন… শেক্সপিয়র কী বলেছিলেন মনে আছে?”
“আছে।”
“একটা গল্প বলি। শোনা গল্প। এখানে সবাই জানে। কাছেই একটা ছোট শহর আছে… সোপোর নাম… চেনেন তো?”
“না”
“সে কি! ওই বরাহনন্দন গিলানীর ভিটে। গিলানীরও নাম শোনেননি তো… কী ইনোসেন্ট আপনি! তো সোপোরে একটা বাড়িতে মা আর ছেলে থাকে। মার অসুখ। ডাক্তার লম্বা প্রেসক্রিপশন ধরিয়ে দিয়েছে। ছেলে লিস্ট নিয়ে ওষুধের দোকানে… রাস্তার উপর দোকান… গল্পটা জানেন তো?”
“জানি না।”
“শেষটা একদম আপনার মনের মত। ওষুধের দোকানে দাঁড়িয়ে ছেলে দেখল একটা ট্রাক… ট্রাকবোঝাই ওর বয়সী ছেলের দল… ছেলেটা হাত নাড়িয়ে জিজ্ঞেস করল কোথায় যাচ্ছে… একজন ইশারা করল ‘ওপারে’… ব্যাস, কী যে হল ছেলেটার…
‘প্রহরশেষের আলোয় রাঙা সেদিন চৈত্রমাস—
তোমার চোখে দেখেছিলাম আমার সর্বনাশ।’
মায়ের প্রেসক্রিপশন সোপোরের ধূলোয় মিশে গেল… ছেলে চলে গেল জেহাদিদের ট্রাকে। কিউট, না? ভোটার কার্ডটা ফেরত নিন – মোবাইলটা দিন।”
“মোবাইল? এটা তো খুবই ব্যক্তিগত।”
ইশারা করলেন। কেউ একজন ছিনিয়ে নিল মোবাইলটা পিছন থেকে।
ভদ্রলোক গুনগুন করে গাইতে লাগলেন “‘গোপন কথাটি রবে না গোপনে।’ আরেকটা কী লাইন ছিল যেন ‘নিয়ন আলোয় পণ্য হল/যা কিছু আজ ব্যক্তিগত।’”
৩
“একটা ফোন করলেই তো ভেরিফিকেশন হয়ে যায়… ‘বাবা’… বাবাকে করি?”
আমি হাতজোড় করলাম
“প্লিজ না। বাবা যদি জানে আমি এই পরিস্থিতিতে তাহলে বাবার এই মুহূর্তে…”
“হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাবে – তাই তো? সব সিনেমার গল্প। আব্বা না লিখে বাবা… বেশ… ক্লেভার ডেভিল। মাকে তো আপনারা ‘মা’-ই বলেন, না?”
“মাকে ফোন করলে বাবা জানতে পারবে। বাবা খুবই অসুস্থ, বাবা বাঁচবে না বেশিদিন।”
“আহা রে” ভদ্রলোক চুকচুক করে শব্দ করলেন একটা। “একদম… কী যেন নাম ছিল লোকটার… আরে… ভুলে যাচ্ছি… তাপস পাল না… সুখেন দাস… হ্যাঁ সুখেন দাসের সিনেমা দেখেছেন? দেখেন? ওসব আপনার রুচিতে বাধে… আপনি বোধহয় জেএনইউয়ের ছাত্র। ঠিক আছে…” একটু থেমে আবার বললেন
“স্ত্রী? বিয়ে করেছেন? বয়স তো বেশ হল। একা এসেছেন নাকি বউ এসেছে?”
“এসেছে।”
“বউয়ের নাম… আপনি বলবেন না… আমি দেখছি… বউ বলে কেউ সেভড নেই… ডার্লিং বলে কেউ নেই… সুইটহার্ট বলে কেউ নেই… প্রচুর মহিলার নাম আছে… জাস্ট দু মিনিট দিন… এসব ব্যাপারে আমি একেবারে সিদ্ধহস্ত।”
আমার কান লাল হল, আরও লাল হল, টকটকে লাল হল, গনগনে লাল হল… যেন প্রহর শেষের ডাল লেক।
“পেয়েছি… ইনিই তো?”
চোখের ইশারায় সম্মতি দিলাম।
“প্লিজ আমায় পাঁচটা মিনিট দিন। ইন্টারেস্টিং কনভার্সেশন… কতদিন এসব দেখি না… একা থাকি এই বিদেশ বিভুঁইয়ে… বোঝেনই তো… কবিতা… নাটক… কলেজ স্ট্রিট… ডিকেন্স-ডস্টয়েভস্কি… সব ছেড়ে এখানে। কি আছে জীবনে বলুন তো… একটু খোরাক ছাড়া… যেমন আপনি… আর আপনার হোয়াটস্যাপ মেসেজেস।”
দ্যূতসভা… কেন জানি না মহাভারত ঘিরে ধরল আমায়… নিজেকে যুধিষ্ঠিরের মত লাগছিল। বস্ত্রহরণের দিনের যুধিষ্ঠির… যে যুধিষ্ঠিরকে আজীবন ঘৃণা করেছি আমি – যাঁকে সবাই ঘৃণা করে – যিনি নিজেকে বাজিতে তোলার পরে স্ত্রীকেও বাজি রেখেছিলেন… আজ নিজেকে তেমন লাগছে – ডাল লেকের তীরে – হজরতবালের ছায়ায়… চিনার বনের নিচে… আজ হেমন্ত রাতে আমায় কে খুলে আম কত্ল করছে!
আমার মোবাইল আমার জীবন ইতিহাস জানিয়ে যাচ্ছে – একের পর এক হোয়াটস্যাপ মেসেজ আমায় উলঙ্গ করছে – দুঃশাসন গেয়ে চলেছে
“জানে না জানে গুল হী না জানে
বাগ তো সারা জানে হ্যায়।”
“মনে হয় ম্যাডামের সাথে সম্পর্ক ঠিক নেই – কী নিয়ে চলছে… সব জেনে গেছি… বেডরুমে উঁকি মেরেছি… ওকে ওকে… আর এগোব না… আপনি লোক ভাল – একটু পাগলাটে এই যা… বোকা একটু… সেটাও বলতে হবে… নাঃ, আপনি ইয়াসিন মালিকের চর নন… রঘুবীর একে ছেড়ে দাও… চা খাবেন?”
“নাঃ…”
“ওকে… হোটেল কোথায়?”
“নাসিমবাগ…”
“কাছেই… গুড নাইট।”
৪
রবি দাঁড়িয়েছিল। মুষলধারায় বৃষ্টি পড়ছিল। রবি বাড়িয়ে দিল পা। সাপটা কামড়াল। সব অপমান ধুয়ে গেল গরলে।
হোটেল ফিরছি। কেউ জানে না আমি জানি, আসলে মৃত মানুষ আমি।
আরেকজন জানে… সব জানে… সবকিছুর সাক্ষী… ডাল লেক!
কী ছিল যেন ভূপেন হাজারিকার গানটা? নাঃ… ডাল তো বইছে না… মরা-নিথর সাপের মতন আমার ডানদিকে পড়ে আছে শুধু।
ডাল লেকের এদিকটাতে হাউসবোট নেই, দোকান নেই, আভিজাত্য নেই। এদিকের ডাল লেক যেন শীতঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে আছে বিরাট সরীসৃপের মতন। শুধু মাঝে মাঝে তার বুক ছুঁয়ে হাওয়া বরফকুচি বয়ে এনে আমার বুকে বিঁধিয়ে দিচ্ছে। দূরে কালো জলে ছায়া ফেলেছে হজরতবাল।
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







