ত্রিয়াশা লাহিড়ী

আমি যখন এই লেখা লিখছি, এই লেখা যখন আপনার মোবাইল অথবা ল্যাপটপের পর্দায় ভেসে উঠছে, যখন আপনি এই লেখা পড়ছেন অথবা স্ক্রোল করছেন – তখন এটুকু নিশ্চিত যে আমাদের প্রত্যেকের রাতে ফেরার একটা আস্তানা আছে। সে আস্তানা যেমনই হোক, আছে। আর কিছু না থাক, আমাদের পাতে দুবেলা দুমুঠো ভাত আছে। আর যাদের নেই? যাদের রক্ত শুষে এই সমাজ, এই সভ্যতা তৈরি হচ্ছে রোজ?

ভারত থেকে গাজার ভৌগোলিক দূরত্ব আমার জানা নেই। আমি শুধু জানি, খিদে কোনো মানচিত্র মানে না, সীমান্ত মানে না। ইতিমধ্যে গাজায় অনাহার, অপুষ্টিজনিত কারণে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯৭ জন। যার মধ্যে ৯৬ জনই শিশু।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

মাহমুদ নাজেম ২০১০ সালে গাজার শেখ রাদওয়াম শহরে বসে লিখেছিলেন

সেদিন প্রথমবারের মত গাজার রাস্তাঘাট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন দেখেছিলাম। রাস্তায় কাগজ বা কার্ডবোর্ড কিছুই পড়েছিল না। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় লোকজন রাস্তা থেকে কাগজ নিয়ে গিয়ে রান্নার জন্য ব্যবহার করত। আমার মা রুটি সেঁকতে চাননি। তাই আমাকে চুলা থেকে রুটি আনতে বলেন। চুলার সারি গাজা থেকে একেবারে পশ্চিম সীমানা পর্যন্ত বিস্তৃত। সকলে তাদের পরিবারের জন্য আধ প্যাকেট রুটি নেবে বলে আট ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে আছে।

কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ওই অঞ্চলে একটি প্যালেস্তিনীয় রকেট পরিষেবা স্থাপন করা হয়। তার প্রায় এক সেকেন্ডেরও কম সময়ের মধ্যে ইজরায়েলি বিমানগুলো সেখানে বোমাবর্ষণ শুরু করে। অসহায় মানুষগুলো বিভ্রান্ত হয়ে চারদিকে ছুটতে শুরু করে। অ্যাম্বুলেন্স আসছে। একের পর এক মানুষ মারা যাচ্ছে, অন্যরা আহত হচ্ছে। আমি হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। রাস্তায় অনেক অপরিচিত মানুষ আমাকে বলছিলেন, ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানাও, তুমি নিরাপদে আছ।

আমি রুটি না নিয়ে ঘরে ফিরেছিলাম। মা আমার উপর খুব চিৎকার করেছিলেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত, তিনি জানেন না, কেন আমি সেদিন রুটি আনতে পারিনি!

(দ্য গাজা মোনোলগস, ২০১০-২০১৫)

১৮৮১ সালে অটোমান শাসনে প্যালেস্তাইনে প্রথম ইহুদিদের অভিবাসন দেখতে পাওয়া যায়। বহু ইহুদি প্যালেস্তাইনে চলে আসে এবং বসতি স্থাপন করে। ইহুদিদের সবচেয়ে পবিত্র ধর্মীয় স্থান ছিল প্যালেস্তাইনের জেরুজালেম। তাই প্যালেস্তাইনকেই ইহুদিরা স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য বেছে নেয়। অটোমান সাম্রাজ্যে মুসলমান, খ্রিস্টান এবং ইহুদিদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানও দেখা যায়। ১৮৯৭ সালে জায়নবাদের জনক থিওডোর হার্টসলের নেতৃত্বে ওয়ার্ল্ড জায়োনিস্ট অর্গানাইজেশন আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে। হার্টসল প্যালেস্তাইনে ইহুদিদের জন্য একটি পৃথক রাষ্ট্র তৈরি করতে চেয়েছিলেন। ১৯১৫ সালে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন অটোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং আরব মুসলমানরা যুদ্ধ চালায়। সেইসময় ব্রিটিশরা আরব মুসলমানদের বলে, যদি তারা যুদ্ধে ব্রিটেনকে সমর্থন করে, তাহলে তাদের হাতেই প্যালেস্তাইনকে তুলে দেওয়া হবে। সিরিয়া থেকে ইয়েমেন পর্যন্ত বিস্তৃত একটি পৃথক আরব রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে আরব মুসলমানরা ব্রিটেনের সমর্থনে লড়ে।

১৯১৭ সালের ২ নভেম্বর ব্রিটিশ পররাষ্ট্রসচিব আর্থার জেমস ব্যালফোর ইহুদিদের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতা ব্যারন রথসচাইল্ডকে একটি চিঠি লেখেন। সেই চিঠিতে প্যালেস্তাইনে ইহুদিদের জন্য একটি জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা ঘোষণা করা হয়। ব্যালফোরের ঘোষণার পর থেকে প্যালেস্তাইনে ইহুদিদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ৩% থেকে ৩০% হয়ে যায়। এই দ্রুত বৃদ্ধি প্যালেস্তিনীয়দের মধ্যে অস্তিত্বের সংকট তৈরি করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোমানরা হেরে গেলে ব্রিটিশ এবং ফরাসিরা নিজেদের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য ভাগাভাগি করে নেয়। ফলে প্যালেস্তাইন চলে যায় ব্রিটিশদের হাতে। ১৯১৮-১৯৪৮ পর্যন্ত প্যালেস্তাইন তাদের দখলেই ছিল। ইতিমধ্যে জার্মানিতে হিটলার ইহুদি নিধন শুরু করে। সেই গণহত্যা থেকে বাঁচতে অনেকেই প্যালেস্তাইনে চলে যায়। ইংরেজরা ইহুদিদের প্রথমে বাধা না দিলেও, পরে প্যালেস্তাইনে ইহুদিদের প্রবেশে বিধিনিষেধ আরোপ করে। ১৯৪৮ সালে ইহুদি এবং প্যালেস্তিনীয়দের দুটি পৃথক দেশ গঠনের পরামর্শ দিয়ে ইংরেজরা প্যালেস্তাইন থেকে বিদায় নেয়।

১৯৪৭ সালের ২৯ নভেম্বর সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের সাধারণ সভায় প্যালেস্তাইনকে দ্বিখণ্ডিত করা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। ইহুদিদের জন্য আর প্যালেস্তাইনের আরব মুসলমানদের জন্য দুটি আলাদা রাষ্ট্র গঠন করার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ যেভাবে ইহুদি আর আরব মুসলমানদের মধ্যে জমি বন্টন করে, তাতে দুই জাতির মধ্যে নতুন করে বৈরিতা হয়। ১৯৪৮ সালের ১৪ মে ইহুদিরা ইজরায়েলকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে ঘোষণা করে। ১৫ মে পাঁচটি আরব দেশ – মিশর, লেবানন, ইরাক, সিরিয়া ও জর্ডন মিলে ইজরায়েল আক্রমণ করে। এই যুদ্ধকে ইতিহাসে প্রথম আরব-ইজরায়েল যুদ্ধ বলা হয়। সেই যুদ্ধে আরবদের সৈন্যসংখ্যা ছিল প্রায় ৩০,০০০। অন্যদিকে ইহুদিরা ছিল ৩৫,০০০-এর কাছাকাছি। ইজরায়েল জয়ী হয়। আরব মুসলমানরা হেরে যাওয়ায় প্রায় ৭,৫০,০০০ প্যালেস্তিনীয় নিজভূমে বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়ে। এই বিপর্যয়কে ‘নাকবা’ বলা হয়ে থাকে। ওই সময়ে ইহুদিরা প্যালেস্তাইনের প্রায় ৭৫% জমি দখল করে নেয়। তখনই প্যালেস্তাইন দুটি অংশে ভাগ হয়ে যায় – গাজা উপত্যকা আর ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক। গাজা উপত্যকা মিশরের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক জর্ডনের। তখন থেকেই প্যালেস্তিনীয়রা নিজেদের দেশ পুনরুদ্ধারের জন্য বিদ্রোহী হয়ে ওঠে।

১৯৫৬ সালের দ্বিতীয় আরব-ইজরায়েল যুদ্ধ, ইয়াসের আরাফতের প্যালেস্তাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশনের জন্ম, হামাসের জন্ম ইত্যাদি রক্তাক্ত ইতিহাস অনেকেরই জানা। ইতিমধ্যে ইজরায়েল ক্রমশ নিজের এলাকা সম্প্রসারিত করেছে আর প্যালেস্তিনীয়দের উপর অত্যাচার চালিয়েছে, কারারুদ্ধ করেছে, বোম ফেলে প্রাণনাশ করেছে, ন্যূনতম মানবাধিকার পর্যন্ত কেড়ে নিয়েছে। ফলে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস ইজরায়েলে যে অতর্কিত আক্রমণ চালায় তা আকাশ থেকে পড়েনি। পরদিন থেকেই ইজরায়েল গাজায় হামলা শুরু করে। অতীতের সব আক্রমণের সীমা অতিক্রম করে এবারের নৃশংসতা। দীর্ঘ ১৫ মাস ধরে লাগাতার গণহত্যা চালানোর পর এবছরের ১৯ জানুয়ারি যুদ্ধবিরতি ঘোষণা গাজাবাসীকে সাময়িক স্বস্তি দিয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধবিধ্বস্ত শিশুরা যখন মায়ের পাশে অনেকদিন পরে নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে, ঠিক সেইসময় যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে গাজায় ফের বোমাবর্ষণ শুরু করে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সরকার। রাফা, খান ইউনিস, জাবালিয়া, দেইর আল বালা সহ সর্বত্র ড্রোন এবং বিমান থেকে বোমা ফেলা হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ষড় করে এই হত্যালীলা চালু হয়। গাজার স্বাস্থ্যমন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, সেদিনের হামলায় অন্তত ৫৬২ জন প্যালেস্তিনীয় আহত হন। প্রায় চারশো মানুষের মৃত্যু হয়, যাদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু।

গত ২ মার্চ থেকে খাবার, জল, ওষুধ সহ যাবতীয় জরুরি পণ্যের গাজাপ্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে ইজরায়েল। এগারো সপ্তাহ পরে সীমিত পরিমাণ খাবার প্রবেশ করতে দিলেও তা সঠিকভাবে বণ্টন করতে দিচ্ছে না ইজরায়েল। সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের মতে, গাজায় প্রতিদিন অন্তত ৫০০ ট্রাক ত্রাণ প্রয়োজন। বুভুক্ষু মানুষের খিদে মেটাতে প্রচুর খাবার দরকার। গাজার মোট কৃষিজমির প্রায় ৮০% ইজরায়েলের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ফসল ফলানোর উপায় নেই। তাই এখন গাজাবাসী সম্পূর্ণভাবে ত্রাণের উপর নির্ভরশীল। ক্ষুধার্ত শিশুরা খাবারের খোঁজে মাইলের পর মাইল হেঁটে বেড়াচ্ছে। ত্রাণকেন্দ্রে বহুদূর থেকে হেঁটে মানুষ আসছে সামান্য খাবার এবং জল নিতে। আকাশপথে আসা ত্রাণের বাক্স তাঁবুতে পড়ে শিশুমৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। একজন নার্সও একইভাবে মারা গেছেন। আকাশ থেকে ফেলা ত্রাণ এখন প্যালেস্তিনীয়দের কাছে ত্রাস হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে বারংবার বলা হচ্ছে, আকাশপথে ত্রাণ পাঠানো এই সমস্যার কোনো সমাধান হতে পারে না। বরং অনাহারে থাকা সাধারণ মানুষের জন্য বিপজ্জনক, ব্যয়বহুল, অকার্যকর। স্থলপথে মানবিক সহায়তাই গাজাবাসীর এই দুর্দিনে একমাত্র পথ।

আপনারা অনেকেই হয়ত স্কুইড গেম ওয়েব সিরিজ দেখেছেন। ইজরায়েলি সেনাবাহিনি সরকারের নির্দেশে নিরস্ত্র প্যালেস্তিনীয়দের উপর একই কায়দায় গুলি ছুড়ছে। গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশনের এক কর্মকর্তা ২৮ মে দক্ষিণ গাজায় একটি ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রে কর্মরত ছিলেন। তাঁর সামনে একটি হাড়গিলে চেহারার, ছেঁড়া জামা পরা ছোট্ট ছেলে এসে দাঁড়ায়। ছেলেটির নাম আমির। ১২ কিলোমিটার হেঁটে ত্রাণকেন্দ্রে পৌঁছে সে পেয়েছিল সামান্য খাবার আর উচ্ছিষ্ট। ইজরায়েলি সেনাবাহিনি হঠাৎই সেখানে উপস্থিত প্যালেস্তিনীয়দের উপর গুলি চালায়। আমিরের দিকে কাঁদানে গ্যাস, স্টান গ্রেনেড ছোড়ে। তার পায়ের কাছে গুলি করে। আমির মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।

প্যালেস্তাইনের জাতীয় দলের প্রাক্তন ফুটবলার সুলেমান আল-ওবেইদও ত্রাণ নেওয়ার লাইনে দাঁড়িয়ে ইজরায়েলের আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছেন। ৪১ বছরের সুলেমানকে বলা হত ‘প্যালেস্তাইনের পেলে’। ইজরায়েলের আক্রমণে এখন পর্যন্ত মোট ৬৬২ জন নিহত হয়েছে, যাদের মধ্যে ৪২১ জন ফুটবলার। এই দৃশ্যগুলো যেন ইজরায়েলের বিনোদন। সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের তথ্য বলছে, মে মাসের শেষদিক থেকে গাজায় ত্রাণকেন্দ্রে খাবার নিতে গিয়ে ইজরায়েলি বাহিনীর হাতে প্রায় এক হাজারের বেশি প্যালেস্তিনীয় নিহত হয়েছেন।

গাজায় খাদ্য সংকটের কারণে সবচেয়ে বেশি বিপদে রয়েছে শিশুরা। গর্ভবতী মহিলারাও যথেষ্ট খাবার পাচ্ছেন না, ফলে দুর্বল শিশুর জন্ম দিচ্ছেন। তাদের বুকের দুধ পর্যন্ত জুটছে না। টিনের দুধও অমিল, তাই তাদের স্রেফ জল খাওয়ানো হচ্ছে। পেটে ব্যথা হবে জেনেও কখনও রুটি বেটে কিংবা ছোলা গুঁড়ো করে সন্তানকে খাওয়াতে বাধ্য হচ্ছেন ওই মায়েরা। বলা বাহুল্য, শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য জোগাড় করতে পরিবারগুলো হিমশিম খাচ্ছে। দুধ, খাবার, ওষুধের অভাবে অথবা ডায়রিয়ার মত রোগের সংক্রমণে অগণিত শিশুর মৃত্যু হচ্ছে। যারা এখনো প্রাণে বেঁচে রইল, তাদের ভবিষ্যৎ অনুমান করা শক্ত নয়। অনেক শিশু আবার মায়ের পেটেই মরে যাচ্ছে।

অবরুদ্ধ গাজায় হাসপাতালগুলো কার্যত অচল। ইজরায়েল ক্রমাগত স্কুল, হাসপাতাল, ত্রাণকেন্দ্র, প্রার্থনার জায়গায় বোমাবর্ষণ করে চলেছে। ইজরায়েলি বিমান হামলায় উত্তর গাজার সর্বশেষ হাসপাতালটিও পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। কোমায় থাকা রোগীদের ভেন্টিলেশন মেশিনের প্রয়োজন। বিমান হানা শুরুর ১৫ মিনিট আগে থেকে হাসপাতাল খালি করতে থাকলে মুমূর্ষু রোগীদের কোথায় নিয়ে যাওয়া হবে? উত্তর নেই। ২০২৩ সালের ৩০ অক্টোবর গাজার একমাত্র ক্যান্সার হাসপাতালের তৃতীয় তলায় ইজরায়েল বিমান হামলা চালায়। এরপর জ্বালানি সংকটে ২০২৪ সালের ১ নভেম্বর হাসপাতালটি বন্ধ হয়ে যায়। এভাবেই একাধিক হাসপাতাল বন্ধ হয়ে গেছে বা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। মুহুর্মুহু হামলা চালিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালের রোগী, চিকিৎসক, কর্মীদের নির্বিচারে হত্যা করছে ইজরায়েল। অন্যদিকে, পরিষ্কার পানীয় জল ও পরিচ্ছন্নতার অভাবে নারী, শিশু ও নবজাতকদের মধ্যে রোগ সংক্রমণের হার বাড়ছে।

হাসপাতালগুলোতে রক্তের সংকটও ঘনীভূত। ব্লাড ব্যাংকে রক্ত নেই। এই ভয়ানক অবস্থায় গুরুতর অবস্থার রোগীদের জন্যেও রক্তের ব্যবস্থা করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে। চিকিৎসা নিতে আসা অসংখ্য রোগী রক্তের অভাবে বিনা চিকিৎসায় প্রাণ হারাচ্ছেন। রক্তদাতারাও অপুষ্টিতে ভুগছেন। অনেকদিন অনাহারে থাকার জন্য অনেকেরই আর রক্ত দেওয়ার ক্ষমতা নেই। আল আকসা, আল শিফা হাসপাতাল থেকে প্রতিদিন প্রতিনিয়ত রক্তের জন্য হাহাকার শোনা যাচ্ছে। মৃত্যু এসে দাঁড়িয়েছে হাসপাতালের দোরে।

এই দীর্ঘকালীন গণহত্যা গর্ভবতী মায়েদের শরীরে-মনে বিরূপ প্রভাব ফেলছে, ফলে জন্ম-সম্পর্কিত জটিলতাও বাড়ছে। শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যও মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত। এ অবশ্য গাজার শিশুদের বহুকালের যন্ত্রণা। ২০১১ সালের গবেষণায় দেখা যায়, প্যালেস্তিনীয় শিশুদের মধ্যে পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (PTSD)-এর হার ছিল ২৩%-৭০%। ২০২১ সালের ইজরায়েল-প্যালেস্তাইন সংঘাতের আগে ইউনিসেফ জানিয়েছিল, গাজায় প্রতি তিনজন শিশুর একজনের উচ্ছেদের মরশুমে মানসিক আঘাত কাটিয়ে ওঠার জন্য সাহায্যের প্রয়োজন ছিল। ২০২২ সালে সেভ দ্য চিলড্রেন সংগঠন গাজার প্রায় ৫০০ শিশু এবং ১৬০ জন অভিভাবকের সাক্ষাৎকার নেয়। দেখা যায়, ৮০% শিশু মানসিকভাবে যন্ত্রণায় রয়েছে। তাদের প্রায় অর্ধেক আত্মহত্যার কথাও ভাবতে শুরু করেছে। পাঁচজনের মধ্যে তিনজনের নিজের ক্ষতি করার প্রবণতা রয়েছে।

আরো পড়ুন রমজান মাসে ইফতার নয়, দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গাজা

অবশ্য যেখানে শুদ্ধ পানীয় জলেরই অভাব, সেখানে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ভাবার ফুরসত কোথায়? ইজরায়েলের দখলদারি কায়েম হওয়ার পর থেকে গড়ে প্রতিদিন ব্যক্তি পিছু ২-৩ লিটার জল পাওয়া যেত। এখন সেখানে ৯৭% জলই ব্যবহারের অনুপযোগী। পরিশ্রুত জলের জন্য যেসব পাম্প ব্যবহার করা হত, জ্বালানি সংকটের কারণে সেসব পাম্পও আর চালানো যাচ্ছে না। নিকাশি ব্যবস্থার বেহাল দশা। বর্জ্য পদার্থ সমুদ্রে ফেলতে হচ্ছে। জলের উৎসগুলো পয়ঃপ্রণালীর জলে দূষিত হচ্ছে। ফলে গাজার অসহায় বাসিন্দাদের প্রাণের দায়ে দূষিত, লবণাক্ত জলই পান করতে হচ্ছে। ফলে পেট ব্যথা, কলেরা, জ্বর, বমি, ডায়রিয়া চতুর্দিকে। এরও সবচেয়ে বড় শিকার শিশুরা। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে জলবসন্তের মত সংক্রামক রোগও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এর উপর জল সরবরাহ ব্যবস্থার উপরেও ইজরায়েল হামলা চালাচ্ছে।

সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ জানিয়েছে, গাজায় প্যালেস্তিনীয়দের কাছে ত্রাণ পৌঁছে দিতে তাদের বেনজির বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে। ইতিহাসে এমন ঘটনা বিরল। দুর্ভিক্ষপীড়িত গাজায় ত্রাণ সহায়তা করতে গিয়ে রীতিমত সমস্যার মুখে পড়ছে অন্য নানা সংগঠনও। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক চাপের মুখে যতই নেতানিয়াহু গাজায় ‘সীমিত’ ত্রাণসামগ্রী নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিক, বাস্তব চিত্রটা দিনের আলোর মত স্পষ্ট।

এই অমানবিক পরিস্থিতি দেখে ফ্রান্স, ইংল্যান্ডের মত ইজরায়েলের পক্ষ নেওয়া দেশগুলো পর্যন্ত প্যালেস্তাইনে ত্রাণ পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে। অথচ নরেন্দ্র মোদী সরকার ভারতের অতীতের সব সরকারের প্যালেস্তাইন নীতি অগ্রাহ্য করে ইজরায়েলের স্যাঙাত হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্যালেস্তাইন হয়ত একদিন মুক্ত হবে, স্বাধীন হবে। কিন্তু এই গণহত্যার সময়ে যারা নির্বাক, যেসব রাষ্ট্র আজও খুনি ইজরায়েলের পক্ষে দাঁড়িয়ে সওয়াল করে, তাদের হাতে যে রক্ত লেগে গেল, সেই রক্ত মুছবে কে?

নিবন্ধকার বামপন্থী ছাত্র আন্দোলনের সংগঠক। মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.