‘২০০৫ সালে ঝাড়খণ্ডের প্রথম বিধানসভা নির্বাচনের সময়ে ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা (জেএমএম) শিবু সোরেনের (সাধারণত গুরুজি বলে ডাকা হত) জন্য একখানা চপার ভাড়া করেছিল। এক সপ্তাহ প্রচার চালানোর পরে যখন তার পাইলট মীরকে বিদায় জানানোর সময় এল, আমি তার সঙ্গে এক জায়গায় কফি খেতে বসেছিলাম। মীর একজন অভিজ্ঞ পাইলট, ৩০ বছর ধরে তিনি ভারতের বহু বড় বড় রাজনৈতিক নেতার চপার চালিয়েছেন। লালকৃষ্ণ আদবানি থেকে শুরু করে লালুপ্রসাদ, শরদ পাওয়ার থেকে জয়ললিতা। মীর আমাকে বললেন, গুরুজির মত নেতা তিনি কখনো দেখেননি।’

কথাগুলো গিরিডির বিধায়ক জেএমএমের সুদিব্য কুমার সোনুর। বলছিলেন ‘মীরের কথাটা আমরা প্রথমে বুঝতে পারিনি। ভেবেছিলাম উনি বোধহয় গুরুজির সারল্যে আপ্লুত হয়েছেন। তাই আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, এমন কী নতুন জিনিস পেলেন? তাতে মীর বললেন, সব নেতাই এমন বক্তৃতা দেন যাতে মানুষ হাসে। আপনাদের নেতা এমন বক্তৃতা দেন যাতে মানুষ কাঁদে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

উনি নিজের সংগ্রামের কথা বলেন, ঝাড়খণ্ডকে আলাদা রাজ্য করে তুলতে তিনি যে আত্মত্যাগ করেছেন সেসবের কথা বলেন, কেন মদ খাওয়া উচিত নয়, কেন লেখাপড়া শেখা দরকার – সেগুলো বলেন। ওঁর কথা শুনে মানুষ গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য হয়। আমরা এটা বহুবার দেখেছি, কিন্তু মীরের মত একজন বাইরের লোক কথাগুলো বলার পরে আমরা খেয়াল করলাম গুরুজির বক্তৃতা আসলে অন্যদের থেকে কতটা আলাদা।’

তবে বক্তৃতাই কিন্তু শিবু সোরেনের একমাত্র বিশেষত্ব নয়। আজীবন মদ্যপান না করা এবং নিরামিষাশী মানুষটা যৌথ খামার চালিয়েছেন, রাতে বয়স্ক শিক্ষা শিবির চালিয়েছেন এবং পারিবারিক অশান্তি মেটাতে পঞ্চায়েতের ব্যবস্থাও করেছেন সেই ১৯৭০-এর দশকে। তাঁর আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রে গিরিডি, ধানবাদ, বোকারো, জামতাড়ার জঙ্গল পার হতেন পায়ে হেঁটে। একাশি বছর বয়সে প্রয়াত শিবু সোরেন সেই বিরল নেতাদের একজন যাঁকে মূলধারার রাজনীতিতে নিয়ে এসেছিলেন একজন আইএএস অফিসার এবং শিবুর রাজনৈতিক অভিভাবকের কাজ করেছিলেন ইঞ্জিনিয়ার থেকে সমাজকর্মী এবং পরে সাংসদ হওয়া একজন মানুষ। পিছিয়ে পড়া শ্রেণি, বিশেষত আদিবাসী সমাজের মধ্যে, শিবুর প্রভাব অত্যন্ত জোরালো ছিল। ঝাড়খণ্ড এলাকার দুজন বিশিষ্ট নেতা – ধানবাদের তিনবারের সাংসদ অরুণকুমার রায় (একে বলে প্রসিদ্ধ) আর বিনোদবিহারী মাহাতো – শিবুর রাজনৈতিক পন্থা এবং বৃহত্তর আন্দোলনকে আকার দেওয়ায় বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তবে তাঁকে মূলধারার রাজনীতিতে নিয়ে আসেন ধানবাদের তৎকালীন ডেপুটি কমিশনার, আইএএস কুমার বাহাদুর সাক্সেনা।

তখন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে দিয়েছেন। ভারত কোকিং কোল লিমিটেডের কর্মচারী তারাবাবু মান্ডি তুন্ডিতে পোখরিয়া আশ্রম চালানোর কাজে শিবুকে সাহায্য করছিলেন। তাঁর এখনো মনে আছে কীভাবে সাইকেলে চড়ে একজন অপরিচিত অতিথি এসে হাজির হন এবং বলেন তিনি বাইক সারাই করেন।

মারান্ডি স্মৃতিচারণ করলেন ‘উনি বলেছিলেন উনি গুরুজির বাইক সারাতে এসেছেন। আমি বাইকটা দেখালাম, তাতে জিজ্ঞেস করলেন, পয়সা দেবে কে? আমি বললাম, গুরুজি দেবেন। কিন্তু উনি কাজ করার আগে গুরুজির সঙ্গে দেখা করতে চাইলেন। তা আমি প্রশান্ত হিলসে গুরুজির কাছে নিয়ে গেলাম। সেখানে উনি আই ডি কার্ড বের করে নিজের আসল পরিচয় দিলেন।’

শিবু সেইসময় অত্যাচারী জমির মালিকদের বিরুদ্ধে একটা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন এবং আদিবাসীদের অধিকারের কথা বলছিলেন। সাক্সেনা তাঁকে পরামর্শ দেন আদালতে আত্মসমর্পণ করতে। বলেন জরুরি অবস্থা এবং ক্রমশ বেড়ে চলা হিংসার ফলে যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তাতে হয় শিবু খুন হয়ে যাবেন, নয় গোটা জীবন জঙ্গলে লুকিয়ে থেকেই কাটাতে হবে। ‘গুরুজি মন দিয়ে ডেপুটি কমিশনারের কথাগুলো শুনলেন। সাক্সেনা কিছুদিনের জন্যে গুরুজিকে জেলে যেতে বললেন, ফিরে এসে বৈধ রাজনৈতিক পথে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিলেন। সেদিনই গুরুজি আত্মসমর্পণ করেন’, বললেন মারান্ডি।

আরো পড়ুন ইন্দিরা হতে অর্ধশতক পরে মোদীর হাত ধরে ফিরেছে জরুরি অবস্থা

তারাবাবু একমাত্র লোক নন যাঁকে শিবুর স্বপ্ন অনুপ্রাণিত করেছিল। তাঁর মতই সরকারি চাকরি ছেড়ে শিবুর আন্দোলনে যোগ দেন শিক্ষক ছোটুরাম টুডু। কুড়কো জোড়া খুনের ঘটনার পরে তাঁর উপর জমির মালিকরা অত্যাচার চালায়। তাঁর মাথায় জ্বলন্ত সিগারেট ঠুসে পুড়িয়ে দেওয়া হয়, জিপের সঙ্গে বেঁধে টানতে টানতে নিয়ে যাওয়া হয়। উনি মরে গেছেন মনে করে দেহটা ফেলে রেখে অপরাধীরা চলে গিয়েছিল, তাই ছোটুরাম বেঁচে যান। অথচ ছোটুরাম বললেন ‘কুড়কোর খুনের ঘটনা যখন ঘটে আমি তখন ওখানে ছিলামই না, একটা বিয়েবাড়িতে গেছিলাম। কিন্তু ফেরার পরে আমার উপর অত্যাচার চলল।’ ছোটুরামের এখন ৭৩ বছর বয়স, তাঁর ছেলে এখন রাঁচিতে একজন ব্লক ডেভেলপমেন্ট অফিসার।

১৯৮০ সালে শিবু দুমকা থেকে সাংসদ নির্বাচিত হওয়ার পর গিরিডির পিরটান্ডে সঙ্গীদের সঙ্গে দেখা করতে আসেন। ধান কাটনি আন্দোলনের শুরু থেকে শিবুর সঙ্গে থাকা বাবুরাম হেমব্রম বললেন ‘গুরুজি এসে ঠাট্টা করে বললেন আমি এখন বড় চাপরাশি আর এমএলএ-রা হল ছোট চাপরাশি। আজকাল তো অনেক নেতা নিজেকে চৌকিদার বলেন, দাবি করেন তাঁরাই কথাটা চালু করেছেন। কিন্তু গুরুজিই প্রথম এই ধরনের কথাবার্তা বলতে আরম্ভ করেছিলেন।’

শিবুর জীবনে সংগ্রামের ইতিহাস শুরু সেই ছোটবেলায়। তাঁর বাবা সোবরান মানঝি ছিলেন শিক্ষক। তাঁকে জমি মালিকরা যখন খুন করে দেয়, তখন শিবুর বয়স ১৩। তিনি ক্লাস এইটে পড়তেন। স্কুলে বসে খবরটা পান এবং স্কুল থেকে সোজা বাবাকে যেখানে খুন করা হয়েছিল সেখানে যান। তারপর আর কোনোদিন ক্লাসে ফেরেননি। ওই মুহূর্তটাই তাঁর জীবন বদলে দেয় এবং তাঁকে প্রতিরোধের পথে নিয়ে যায়।

আজীবন সংগ্রাম এবং নির্বাচনী জয় সত্ত্বেও শিবু কোনোদিন দীর্ঘ সময় ক্ষমতা ভোগ করতে পারেননি। মন্ত্রী হয়েছেন, মুখ্যমন্ত্রীও হয়েছেন। কিন্তু কোনোদিনই মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি। তবে সেটা তাঁর লক্ষ্য ছিল না। সাধারণ মানুষ তাঁকে ভালবেসে গুরুজি বা দিশম গুরু বলত। উনি আসলে তাদেরই লোক। তিনি সমাজ সংস্কার করার ভাবনা কোনোদিন ছাড়েননি। ১৯৭০-এর দশকে তিনি জনজাতির গ্রামবাসীদের মদ খাওয়া ছেড়ে দিতে বলেন। চেতাবনি দেন, মদ তাদের দুর্বল করে দিচ্ছে এবং তারা জমি মালিকদের সহজ শিকারে পরিণত হচ্ছে। বহু দশক পরেও ভোটের প্রচার করার সময়ে শিবু মানুষকে মদ খাওয়া ছাড়তে বলতেন।

পাঁচ দশকের লম্বা রাজনৈতিক জীবনে শিবু আটবার লোকসভার সাংসদ, দুবার রাজ্যসভার সাংসদ, তিনবার বিধায়ক আর তিনবার ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন। তবে তাঁর রাজনৈতিক জীবন বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়। জমি মালিকদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময়ে দু-দুটো খুনের মামলায় তিনি অভিযুক্ত ছিলেন। পরে জাতীয় রাজনীতিতে থাকার সময়ে অভিযোগ ওঠে যে শিবু তাঁর সেক্রেটারিকে খুন করেছেন। নরসিমা রাওয়ের সরকারে অনাস্থা প্রস্তাবের ভোটাভুটিতে হেরে যাওয়া আটকাতে ঘুষ নিয়েছেন বলেও অভিযোগ ওঠে।

তাহলেও ঝাড়খণ্ডের রাজনৈতিক ইতিহাসে শিবু একজন মহীরুহ। একজন মানুষ যিনি জঙ্গল থেকে, তৃণমূল স্তর থেকে প্রতিবাদের রাজনীতি করে সংসদে পৌঁছেছিলেন একটাই লক্ষ্য নিয়ে – ঝাড়খণ্ডের আদিবাসী মানুষের জন্য ন্যায়বিচার আর সম্মান প্রতিষ্ঠা। এই সত্যিকারের আদিবাসী নেতার কাহিনি বহু প্রজন্ম ধরে মানুষের অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।

ইনিউজরুম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত মূল নিবন্ধ থেকে ভাষান্তরিত। মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.