আফ্রিকার দার্শনিক অ্যাশিল অম্বেম্বে তাঁর বই নেক্রোপলিটিক্স-এ লিখেছিলেন “উদারপন্থী সাম্রাজ্য ও আধুনিক গণতন্ত্রগুলি [বন্দি]শিবিরের মাধ্যমে তাদের আদি-কাঠামোগত হিংসাকে নানান ‘অন্য স্থান’ কিম্বা ‘অস্থান’-এ বহির্ভূত করতে চিরকালই সচেষ্ট।” অর্থাৎ পশ্চিমের সাম্রাজ্যবাদী জাতিরাষ্ট্রগুলি তৃতীয় বিশ্ব থেকে আগত বাস্তুচ্যুত ও অভিবাসী মানুষজনকে শুধুমাত্র প্রবেশাধিকার থেকে বঞ্চিত করেই থেমে থাকে না, তাঁদের ঠিকানাহীন শাস্তি-শিবিরে নিক্ষেপ না করা পর্যন্ত সেসব দেশের সরকারগুলির বিরাম নেই। বর্তমানে নব্য উদারনৈতিক বিশ্ব অর্থনীতির করাল গ্রাসে যখন দূতাবাস থেকে কারাগার — সার্বভৌমত্বের প্রতিভূসম প্রায় সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পরিষেবাই পণ্যায়িত, তখন অযাচিত (রাষ্ট্রের ভাষ্যে ‘বেআইনি’) অভিবাসীবৃন্দকে নিয়ন্ত্রণ ও শাসন করার এক্তিয়ারও যে বেসরকারি ও অন্য সরকারি কর্পোরেট পরিচালকদের হাতে তুলে দেওয়া হবে, এতে আশ্চর্য হবার দিন বোধহয় গেছে। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের গৃহমন্ত্রী সুয়েলা ব্রেভারম্যান ঘোষণা করেছেন যে এবছর থেকেই ‘মাত্রাতিরিক্ত’ অভিবাসন প্রতিহত করতে ‘বেআইনি’ শরণার্থীদের রোয়ান্ডার ‘ইমিগ্রেশন ডিটেনশন সেন্টার’-এ নির্বাসিত করা হবে।
সেই রোয়ান্ডা, যেখানে নয়ের দশকে প্রায় আট লক্ষ সংখ্যালঘু টুটসি জাতির মানুষ সংখ্যাগুরু হুটু সেনার পরিকল্পিত গণহত্যার শিকার হয়েছিলেন। সেইসময় থেকেই রোয়ান্ডার সরকারি বেতার রেডিও রোয়ান্ডার বিদ্বেষমূলক প্রচার এবং গণহত্যার দৃষ্টান্ত আন্তর্জাতিক আইনে ‘জেনোসাইড’-এর দপ্তরি সংজ্ঞার সমার্থক হয়ে ওঠে। গৃহযুদ্ধ পরবর্তী রোয়ান্ডা মোটামুটি শান্ত থাকলেও সেদেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আজকের দিনেও অপ্রতুল নয়। কয়েকদিন আগে তাঁর ঝটিকা রোয়ান্ডা সফরে সুয়েলা বেছে বেছে ব্রিটেনের দক্ষিণপন্থী ও রক্ষণশীল সংবাদমাধ্যমগুলোকেই সাথে নিয়েছিলেন এবং কিছু প্রশ্নের জবাব উত্তরের বদলে রুচিহীন রসিকতার মাধ্যমেও দিয়েছিলেন। বলেছিলেন ডিটেনশন সেন্টারের ‘ইন্টিরিয়র ডিজাইনার’-কে লন্ডনেও দরকার হতে পারে। সুয়েলা নিজে ভারতীয় বংশোদ্ভূত এবং ব্রিটেনে দ্বিতীয় প্রজন্মের অভিবাসী হওয়া সত্ত্বেও রাজনৈতিক শরণার্থীদের প্রতি তাঁর বিন্দুমাত্র সহানুভূতি নেই। বরং কতকটা যেন ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ দলের ভিতর নিজের গাত্রবর্ণের কৈফিয়ত দিতেই এই ক্রমাগত ক্রূর ও সংবেদনহীন আচরণ।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
আরো পড়ুন ‘সুনক প্রবল দেশপ্রেমিক ব্রিটিশ প্রমাণিত হতে চাইবেন’
ব্রিটিশ কোষাগার থেকে প্রায় দেড় কোটি পাউন্ড ব্যয়ে নির্মিত রোয়ান্ডার বন্দিশিবিরে নির্বাসনের ব্যবস্থাপনা আপাতত আইনি পর্যালোচনার কারণে স্থগিত থাকলেও যুক্তরাজ্যের সংসদে সুয়েলা প্রস্তাবিত অভিবাসন বিল যদি আইনে পরিণত হয়, তাহলে এক লহমায় বিরাট সংখ্যক শরণার্থী ও বাস্তুচ্যুত অভিবাসী তাঁদের ‘অ্যাসাইলাম’ বা আশ্রয়ের অধিকার হারাবেন। এঁদের মধ্যে অধিকাংশই মধ্যপ্রাচ্যের মানুষ, যাঁদের পরিবার গৃহহারা এবং সর্বস্বান্ত হয়েছে মার্কিনি ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী নানা যুদ্ধেরই কারণে। কখনো ওসামা বিন লাদেন, কখনো সাদ্দাম হুসেন, কখনো কর্নেল মুয়াম্মর গদ্দাফি, কখনো বা আইসিস — যখনই পশ্চিমের ন্যাটো (উত্তর-অতলান্তিক চুক্তি সংগঠন) কোনো শত্রু খাড়া করে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে সামরিক ও আর্থরাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করেছে, তখনই সেখানকার নিরপরাধ বাসিন্দারা সমূলে উৎপাটিত হয়েছেন। নির্বিচার বোমাবর্ষণ ও হিংসার হলাহল থেকে রেহাই পেতে টালমাটাল ভাসমান জীবন বেছে নিয়েছেন উত্তর আফ্রিকার কোনো শরণার্থী শিবিরে কিম্বা ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়া বিপজ্জনক কোনো ছোট ভেলায়।
অনেকেই দালালের চক্রান্তে বাধ্য হয়েছেন ইউরোপের নানা দেশে ন্যূনতম মজুরির থেকেও কম উপার্জনের পথ বেছে নিতে — শুধুমাত্র গ্রাসাচ্ছাদনের তাগিদে। কোনোরকম শ্রম আইনের সুরক্ষা ছাড়াই অভিবাসী হয়ে গেছেন। একসময় যাঁদের দেশের সম্পদ ভাগবাটোয়ারা করে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যগুলি সাচ্ছল্যের শিখরে পৌঁছেছিল, আজ সেই প্রাক্তন উপনিবেশগুলির বাস্তুচ্যুত ও সর্বস্বান্ত মানুষকে কোনোরকম আইনি অধিকার বা স্বীকৃতি দিতে যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপের অধিকাংশ সরকারই নারাজ। অথচ জাতিসঙ্ঘের ১৯৫১ শরণার্থী সম্মেলন ও ১৯৬৭ সালের মুসাবিদায় স্বাক্ষরকারী যুক্তরাজ্যের সংসদে প্রস্তাবিত খসড়া আইন সামগ্রিকভাবে আন্তর্জাতিক আইনেরও পরিপন্থী। কারণ তা ‘নন-রিফাউলমেন্ট’ নীতি লঙ্ঘন করে। এই নীতির সারমর্ম এই, যে কোনো শরণার্থীকে বলপূর্বক এমন দেশে ফেরত পাঠানো অথবা বিতাড়ন করা যায় না, যেখানে তাঁর নিপীড়িত বা নির্যাতিত হবার সম্ভাবনা আছে। সুয়েলা মানুন বা না মানুন, নাগরিক অধিকার না থাকলেও যুক্তরাজ্যে শরণার্থীদের মানবাধিকার সে দেশের আন্তর্জাতিক বহুপাক্ষিক চুক্তি-কর্তব্য ও বাধ্যবাধকতা দ্বারাই সুরক্ষিত।
অবশ্য একথা যুক্তরাজ্যের সরকারকে মনে করানোর জন্য খেসারত দিতে হতে পারে, যেমন হয়েছে ইংল্যান্ডের প্রবাদপ্রতিম ফুটবলার ও খ্যাতিমান ফুটবল সাংবাদিক-সঞ্চালক-ধারাভাষ্যকার গ্যারি লিনেকারকে। সংসদে সুয়েলা বিতর্কিত অভিবাসন বিল উত্থাপন করার খানিক পরেই লিনেকার টুইট করেছিলেন “এ এক অসম্ভব নিষ্ঠুর নীতি, যা সবচেয়ে দুর্বল মানুষকে এমন ভাষায় আঘাত করে যা ১৯৩০-এর দশকের জার্মান ভাষ্যের থেকে খুব আলাদা নয়।”
There is no huge influx. We take far fewer refugees than other major European countries. This is just an immeasurably cruel policy directed at the most vulnerable people in language that is not dissimilar to that used by Germany in the 30s, and I’m out of order?
— Gary Lineker 💙💛 (@GaryLineker) March 7, 2023
এর আগে ইউক্রেনের যুদ্ধ পরিস্থিতি ও তাতে ব্রিটিশ সামরিক-কূটনৈতিক অবস্থান নিয়ে টুইটারে মন্তব্য করার ফলেও লিনেকার সমালোচিত হয়েছিলেন। তবে এই টুইটটি করার পরে বিবিসি তাঁকে কোনোরকম আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘ম্যাচ অফ দ্য ডে’ থেকে সরিয়ে দেয়। খাতায় কলমে অভিযোগ ছিল লিনেকার ব্রিটেনের বিবিসির নিরপেক্ষতার শর্ত ভেঙেছেন। আসল অপরাধ সরকারি নীতির প্রকাশ্য সমালোচনা, যদিও তিনি তা করেছিলেন ব্যাক্তিগতভাবে, সোশাল মিডিয়ায়। টিভির পর্দায় নয়।
লিনেকারের সতীর্থরা এবং আরও অনেক ক্রীড়াবিদ বিবিসির এই হঠকারী পদক্ষেপের তীব্র প্রতিবাদ করার ফলে অবশ্য তাঁকে খুব খুব বেশীদিন বাদ দিয়ে রাখা যায়নি। কিছুদিনের মধ্যেই বিবিসি এই প্রাক্তন ইংল্যান্ড অধিনায়ককে পুনর্বহাল করতে বাধ্য হয়। এই ঘটনাক্রম থেকে অন্তত এটুকু পরিষ্কার, যে যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্রমশ খর্ব করা হচ্ছে। কয়েক মাস আগেও চার্লস উইন্ডসরের রাজ্যাভিষেকের প্রতিবাদ করার ফলে কয়েকজন রাজতন্ত্রবিরোধী প্রতিবাদীকে আটক করা হয়েছিল, যা কয়েক বছর আগেও সে দেশে কল্পনাতীত ছিল।
উল্লেখ্য, সুয়েলার বিল ইউক্রেন থেকে আগত শরণার্থীদের জন্য প্রযোজ্য নয়। এমন করা হয়েছে কারণ তাঁদের আগমন এই মুহূর্তে যুক্তরাজ্যের ভূরাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। শরণার্থীদের মধ্যেও কাম্য ও অবাঞ্ছিত – এমন ভাগাভাগি করার ফলে বিলটি এখন আর শুধু অমানবিক নয়, বৈষম্যমূলকও বটে। বর্তমান ব্রিটেনে বেআইনি অভিবাসন নিয়ে তরজা মোটেও অভিবাসীদের প্রতি সহানুভূতির প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই, বরং হয়ে উঠেছে সাধারণ গণতান্ত্রিক পরিসরে সমালোচনার নাগরিক অধিকার রক্ষার লিটমাস পরীক্ষা।
বলাই বাহুল্য যে গত কয়েক মাসে তিনবার প্রধানমন্ত্রী বদল করে নানা বিতর্কে নাজেহাল, রাজনৈতিকভাবে নাজেহাল টোরি সরকার বেআইনি অভিবাসন বিলটিকে আঁকড়ে ধরেছিল দেশে ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধি ও ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব থেকে নজর ঘোরানোর জন্য। বাজারসর্বস্ব রক্ষণশীলদের এক বড় সমস্যা হল অর্থনৈতিক মন্দার একটি সর্বজনগ্রাহ্য ব্যাখ্যা দেওয়া, যাতে জনরোষের আঁচ নীতিনির্ধারকদের গায়ে না লাগে। তা করার সবচেয়ে শস্তা কৌশল হল অভিবাসী শ্রমিকদের উপর দোষারোপ করা এবং প্রকারান্তরে অভিবাসনকেই কাঠগড়ায় তোলা। ভূমিসন্তানদের সুযোগসুবিধা অভিবাসী মানুষ অতর্কিতে দখল করেছে – এই ধুয়ো তুলে দিলেই যে পুঁজিপতিরা দেশের সম্পদ আত্মসাৎ করছে তারা ছাড় পেয়ে যায়। এই কাজে সুয়েলা-ঋষি সুনক জুটি সচেষ্ট হলেও এবার সফল হতে পারেনি। ২০০৮ সালের বিশ্বজোড়া আর্থিক মন্দার পর থেকেই যুক্তরাজ্যে শ্রমিকদের গড় আয় (মূল্যবৃদ্ধির নিরিখে পরিমাপ করলে) লাগাতার কমেছে। অথচ কোভিড পরিস্থিতির সময়েও শ্রমিক ও মালিকদের আয়ের ফারাক জ্যামিতিক প্রগতির হারে বেড়েছে। ফলত গতবছর গ্রীষ্মকাল থেকেই ব্রিটেন ধর্মঘটে জর্জরিত।
রেলকর্মী থেকে শুরু করে জুনিয়র ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মী, দমকলকর্মী থেকে শুরু করে অধ্যাপক ও শিক্ষাকর্মী, ডাককর্মী থেকে শুরু করে সরকারি কেরানি ও পাসপোর্ট বিভাগের কর্মী – সবাই সামিল হয়েছেন ঘনঘন ধর্মঘটে। প্রধান বিরোধী দল হিসাবে ‘স্যার’ কাইর স্টার্মারের নেতৃত্বে লেবার পার্টি একের পর এক রাজনৈতিক সুযোগ নষ্ট করা সত্ত্বেও ধারাবাহিক ধর্মঘটের ধাক্কায় টোরি সরকারের জনপ্রিয়তা যে একেবারে তলানিতে এবং থ্যাচার পরবর্তী যুক্তরাজ্যে জঙ্গি ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের উপযোগী উর্বর রাজনৈতিক জমি যে এই প্রথম সত্যি সত্যিই প্রস্তুত – একথা বললে অতিশয়োক্তি হবে না। ইংলিশ চ্যানেলের অন্য পারে পারি অচল করে দিয়েছেন ফরাসি শ্রমিকরা। কারণ রাষ্ট্রপতি এমানুয়েল ম্যাক্রঁ তাঁদের অবসরের বয়স বাড়িয়ে প্রাপ্য পেনশন থেকে বঞ্চিত করার অন্যায্য ও অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আগামী সপ্তাহে জার্মানিতেও পরিবহন শ্রমিকদের ধর্মঘটের ফলে জনজীবন স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা। শরণার্থী ও শ্রমিকদের রাজনৈতিকভাবে লড়িয়ে দেওয়ার নানা চালের অন্যতম ব্রিটেনের বেআইনি অভিবাসন বিল আপাতত ধর্মঘটের সামনে মুখ থুবড়ে পড়েছে। ন্যাটো-রাশিয়া যুদ্ধের যূপকাষ্ঠে বলিপ্রদত্ত ইউরোপ উপর্যুপরি দুটি অসন্তোষের গ্রীষ্মের সম্মুখীন হয়ে কোন ভূরাজনৈতিক এবং আভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পথ ধরে এখন সেটাই দেখার।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








