সন্তোষ সেন
সবুজে মোড়া সুউচ্চ পাহাড়, খরস্রোতা নদী, জলপ্রপাতের শব্দ, অসংখ্য প্রজাতির গাছপালা, পাখি, বন্যপ্রাণ, নাম না জানা শত শত পাহাড়ি ফুল, সুনীল আকাশ, সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের মনোরম দৃশ্য দেখতে দেখতে প্রকৃতিপ্রেমিক একদল মানুষ নির্জন হিমালয়ের বুকে পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়াতেন, মাসের পর মাস কাটিয়ে দিতেন দুর্গম প্রকৃতির কোলে। অনেকে আবার যেতেন ধর্মীয় আবেগে হিমালয়কে শিবজ্ঞানে পূজা করতে। ঝর্নার বিশুদ্ধ জল এবং রাস্তার ধারের সরাইখানায় বা গ্রামে যেটুকু যা পাওয়া যেত, তা দিয়েই এঁরা খাওয়াদাওয়া সারতেন। নামি দামি রেস্তোরাঁ বা তারকাচিহ্নিত হোটেলের প্রয়োজন পড়ত না। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সংযোগের কথা মনের কোণেও উঁকি দিত না।
পাহাড়ের সঙ্গে মানুষের এই ভালবাসার সম্পর্ক বদলে গেল অর্থনীতির কুটিল আবর্তে। ভ্রমণপিয়াসীর বা ধার্মিকের শান্তিভঙ্গ হল পর্যটনশিল্পের চাপে। এখন বেড়াতে যাওয়া বাবু-বিবিদের জন্যে পাহাড়ে চাই মাখনের মত রাস্তা, বিলাসবহুল গাড়ি, দামি হোটেল, ২৪ ঘন্টা গরম জল, দেশি বিদেশি গরমাগরম খাবার, শপিং মল, মোবাইলের নেটওয়ার্ক, আরও কত কী। বিলাসী পর্যটক টানতে, সরকারি মদতে মুনাফা লুটতে কর্পোরেট বাহিনী যত্রতত্র হোটেল, রিসর্টের ডালা সাজিয়ে বসেছে। এশিয়ার উচ্চতম ও দীর্ঘতম চারধাম প্রকল্পের চকচকে রাস্তা দিয়ে পিলপিল করে উঠে আসছে পর্যটকরা। তাদের আরামের জন্য বিস্ফোরণ ঘটিয়ে, ধস নামিয়ে, উত্তরাখণ্ডের আদিমতা ও নির্জনতা ধ্বংস করে তৈরি হয়ে গেল সবকিছু। পর্যটকদের চাহিদা মেটাতে গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকতে হয় যোশীমঠ, উত্তরকাশী, সিমলা-কুলু-মানালি, গ্যাংটক, ইটানগর বা লাদাখকে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
পর্যটকদের চাই অপর্যাপ্ত বিদ্যুৎ। সুতরাং মাটির নিচে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে এগোতে থাকল জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। এসবের ফল নৈসর্গিক হিমালয় এবং তার বাসিন্দাদের জীবনে বিপর্যয়। তারই এক একটি খণ্ডচিত্র উত্তরাখণ্ডের যোশীমঠে ফাটল, হিমাচল প্রদেশ এবং সিকিমে প্রবল বৃষ্টিতে ধ্বস ও প্লাবন, হিমবাহ দ্রুত গলে যাওয়া। এখন পাহাড়ের বাসিন্দাদের ঘরবাড়ি এবং চাষের জমি ভেসে যাওয়া, মানুষের সলিল সমাধি চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া আর উপায় নেই।
জম্মু-কাশ্মীর থেকে লাদাখ, হিমাচল প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, সিকিম ও অরুণাচল প্রদেশের একটা অংশ পর্যন্ত বিস্তৃত হিমালয় জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ। অন্যদিকে হিমালয়ের হিমবাহগুলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জলের আধার। হিমালয়ে আছে ২০ হাজারের বেশি হিমবাহ। এশিয়ার অনেক বড় বড় নদী, যেমন ইয়াংসি, মেকং ইত্যাদির উৎস হিমালয়। গঙ্গা, অলকানন্দা, ধৌলি, ব্রহ্মপুত্র, সিন্ধু সহ একাধিক নদীর উৎসও হিমালয়ের হিমবাহগুলো। একশো কোটির বেশি মানুষ বেঁচে থাকার জন্য সরাসরি হিমালয়ের উপর নির্ভর করেন, দক্ষিণ এশিয়ার ৫০ কোটিরও বেশি এবং চীনের ৪৫ কোটি মানুষ তুলনায় নবীন ও ভঙ্গুর এই পর্বতমালার স্বাস্থ্যের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জলবায়ু নিয়ন্ত্রণেও হিমালয় অদ্বিতীয়।
উত্তরে হিমালয় এবং বাকি তিনদিকে সাগরবেষ্টিত ভারতবর্ষে ছয় ঋতুর আলাদা বৈশিষ্ট্য পরিষ্কার দেখা যেত। হিমালয় বিপন্ন হওয়ার কারণে ঋতুছন্দও বিঘ্নিত হচ্ছে। শরৎ, হেমন্ত, বসন্ত তো কবেই হারিয়ে গেছে; শীতকালও ক্রমশ ছোট হচ্ছে। দক্ষিণ-পূর্ব মৌসুমি বায়ু হিমালয়ের বুকেই ধাক্কা খেয়ে বৃষ্টি নামায়, কৃষিনির্ভর আমার দেশ হয় সুজলা সুফলা শস্যশ্যামলা। দানবীয় ঝড়ঝঞ্ঝার হাত থেকেও ভারতকে হিমালয়ই রক্ষা করে।
অথচ হিমালয় এবং গঙ্গা সমেত দেশের বড় নদীগুলো বিপন্ন হওয়ার কারণে এ দেশের কৃষির সংকট ঘনীভূত হচ্ছে। কৃষক এবং মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, হিমালয়ের পাদদেশে বসবাসকারী জনজাতির জীবনযাত্রার উপর ভয়ঙ্কর প্রভাব পড়ছে। হিমালয় না থাকলে, বড় নদীর প্রবাহ দূষিত ও বাধাপ্রাপ্ত হলে নদীমাতৃক ভারতীয় সভ্যতা, সংস্কৃতি, ভাষা, পোশাক পরিচ্ছদ, হারিয়ে যাবে কালের গর্ভে। হিমালয়ের বড়সড় ক্ষতি হলে ভারতের মহানগরগুলোও টিকতে পারবে না। এসব বুঝেই সরাসরি পরিবেশ আন্দোলনের সংগঠক বা রাজনীতিবিদ না হলেও সোনম ওয়াংচুক, মাতৃসদন আশ্রমের সাধুসন্তরা আজ হিমালয় বাঁচাতে, নির্মল গঙ্গার দাবিতে আন্দোলন করছেন। হিমালয়কে বিপর্যস্ত করার বিপক্ষে দাঁড়াচ্ছেন যোশীমঠের শঙ্করাচার্য, এমনকি বিজেপি নেত্রী উমা ভারতীও।
কর্পোরেট বাহিনী এবং তাদের সেবাদাস রাষ্ট্র এই হিমালয়কেই ধ্বংস করতে উদ্যত। অর্থপুঁজি আর বাজারের কানাগলিতে অন্ধভাবে ছুটতে ছুটতে উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত সমাজের এক বড় অংশ আজ হিতাহিতজ্ঞানশূন্য। স্থাবর, অস্থাবর সম্পত্তি প্রতিষ্ঠার প্রাণপণ প্রচেষ্টায় সে আজ প্রকৃতি থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বার্থপর জীবের দঙ্গলে পরিণত হয়েছে। আজ হিমালয়ের বাস্তুতন্ত্রকে রক্ষা করা অবশ্য কর্তব্য। মেনে চলতে হবে প্রকৃতির অমোঘ নিয়ম – সব পথে সব পথিকের অধিকার নেই। সড়ক, সুড়ঙ্গ, শহর – উন্নয়নের এই তিন করাত থেকে রেহাই দিতে হবে হিমালয়কে।
পৃথিবীর সর্বত্রই নদীমাতৃক সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। পানীয় জলের সুবিধা, কৃষিকাজের জন্য উর্বর জমি, পশুপালনের জন্য বিস্তীর্ণ চারণভূমি, মৎস্য শিকার এবং জলসেচের সুবিধা থাকার কারণেই এমনটা হয়েছিল। প্রায় ৮,০০০ বছর আগে নীলনদের তীরে মিশরীয় সভ্যতা, সিন্ধু নদীর তীরে হরপ্পা সভ্যতা, টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর তীরে মেসোপটেমিয়া ও ব্যাবিলনীয় সভ্যতা, হোয়াঙ হো নদীর তীরে চৈনিক সভ্যতা গড়ে ওঠে। পরবর্তীকালে গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের অববাহিকায় গাঙ্গেয় সভ্যতা গড়ে ওঠে। এইসব অঞ্চলের বাসিন্দাদের সঙ্গে প্রকৃতি ও অন্যান্য প্রাণির অকৃত্রিম মিথষ্ক্রিয়া ছিল। পাহাড়ের কোলে এবং জঙ্গলে বসবাসকারী আদিবাসী মানুষের জীবনযাত্রায় এই বোধ আজও টিকে আছে বলেই পাহাড়, জঙ্গল এখনো অনেকাংশে সজীব।
আরো পড়ুন যোশীমঠ বিপর্যয় কেবল পরিবেশ সংকট নয়
অথচ আমাদের নদীমাতৃক দেশের নদনদীগুলো আজ শুধু দূষিত ও বিষাক্তই নয়, তা লুঠ হয়ে যাচ্ছে প্রতি মুহূর্তে। গঙ্গা তার অববাহিকায় লালন করেছে ভারতীয় সভ্যতাকে। অথচ হিমালয়ের বিপর্যয়ের হাত ধরে তার উৎসমুখের একের পর এক হিমবাহ বিলুপ্ত হচ্ছে। গঙ্গার উৎসমুখের নটা হিমবাহ কমতে কমতে এখন পাঁচটায় এসে ঠেকেছে। সেগুলোর দশাও করুণ। গঙ্গাকে বর্ষার জলধারা জুগিয়ে জীবিত রেখেছে যে অসংখ্য নদী, উপনদী, শাখা নদী, উন্নয়নের দোহাই দিয়ে জল লুঠ করে, জমি দখল করে সেগুলোকেও ধ্বংস করা হচ্ছে। বাঁধ বেঁধে অবরুদ্ধ করা হচ্ছে নদীকে। ২০২৩ সালে দীপাবলির প্রাক্কালে আমরা যখন আলোয় বন্যায় ভাসার প্রস্তুতি নিচ্ছি, ঠিক সেইসময় সিকিমের বহু নিরপরাধ মানুষ বানের জলে ভেসে গেলেন। ঘরবাড়ি, গাড়ি, গবাদি পশু – সব খড়কুটোর মত ভাসতে থাকল তিস্তার বাঁধ ভেঙে যাওয়ার কারণে। অন্যদিকে বড় বড় বাঁধের ফলে নদীর নিম্ন অববাহিকায় স্বাভাবিক স্রোত শুকিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি বর্ষায় অতিবৃষ্টিতে প্রায় প্রতিবছর প্রবল বন্যার কবলে পড়েন লক্ষ লক্ষ মানুষ।
গঙ্গাকে শুকিয়ে মারার চক্রান্তের বিরুদ্ধে হরিদ্বারের মাতৃসদন আশ্রমের সাধুরা গত কয়েকবছর ধরেই শান্তিপূর্ণ অনশন কর্মসূচি চালিয়ে আসছেন। অনশনে চারজন শহিদ সন্ন্যাসীর একজন হলেন কানপুর আইআইটির ভূতপূর্ব অধ্যাপক ডঃ জিডি আগরওয়াল। গঙ্গারক্ষায় গেরুয়া ধারণ করে তিনি স্বামী সানন্দ নাম গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর মনে হয়েছিল, ভারতের মানুষের কাছে ধর্মীয় চিন্তাভাবনা, আচার অনুষ্ঠান অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই গঙ্গাকে বাঁচাতে ধর্মের ছায়ায় আসতেও তিনি দ্বিধাবোধ করেননি। এই আন্দোলনের সঙ্গী হিসাবে ‘নদী বাঁচাও জীবন বাঁচাও’ আন্দোলনের সদস্য এবং পরিবেশ কর্মীরা নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে নদী রক্ষায়, নদী সচেতনতা বৃদ্ধিতে সক্রিয় দীর্ঘদিন। গ্রামবাংলার মজে যাওয়া, খালে বা ক্লেদাক্ত নালায় পরিণত হওয়া ছোট নদীগুলোর সংস্কার করে, নদী প্রবাহের সমস্ত বাধা সরিয়ে তাদের পুনরুজ্জীবিত করার অভিযান ডালপালা মেলে বিকশিত হচ্ছে। হিমালয়, জঙ্গল, নদী, জলাশয় এবং মানুষের জীবন-জীবিকা সহ সভ্যতা সংস্কৃতি রক্ষা করার অভিযান আমাদের রাজ্য সমেত সারা দেশে সহস্র ধারায় আরও গতিশীল হয়ে ওঠার সম্ভাবনা বাড়ছে দিনদিন।
নিবন্ধকার বিজ্ঞান শিক্ষক, বিজ্ঞান ও পরিবেশ আন্দোলনের সংগঠক। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







