২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন শেষ হয়েছে। এই নির্বাচনে প্রায় ৬৪ কোটি নাগরিক তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন এবং এর মধ্যে প্রায় ৩১ কোটি মহিলা ভোটার। এই মহিলা ভোটাররা নির্বাচনের ফলাফলে নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করেছেন বলেই রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মত।
ফলাফল ঘোষণার পরে দেখা গেল, বিপুল সংখ্যক মহিলা ভোটার নির্বাচনে অংশ নিলেন, কিন্তু নির্বাচিত প্রায় সাড়ে পাঁচশো সাংসদের মধ্যে মাত্র ৭৪ জন বা মাত্র ১৪% হলেন মহিলা। ২০১৯ এর লোকসভায় ৭৮ জন মহিলা সাংসদ ছিলেন, সেই সংখ্যা কমে এবারে হল ৭৪। কাজেই প্রশ্ন ওঠে, রাজনীতিতে মহিলাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ, বিশেষ করে বিধানসভা এবং সংসদে তাঁদের প্রতিনিধিত্ব সেভাবে বৃদ্ধি না পাওয়ার কারণ কী?
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
আমরা দেখছি, দেশে মহিলা ভোটদাতার সংখ্যা ক্রমশ বেড়েছে। বর্তমানে পুরুষ ও মহিলা ভোটদাদের সংখ্যা প্রায় সমান এবং তাৎপর্যপূর্ণভাবে, ভোটদানের ক্ষেত্রে অনেকাংশে মহিলারাই এগিয়ে আছেন। তবুও নির্বাচনের ময়দানে সামগ্রিকভাবে মহিলা প্রার্থীরা সংখ্যার দিক থেকে বেশ পিছিয়ে। ২০২৪ নির্বাচনে মাত্র ৭৯৭ জন মহিলা প্রার্থী ছিলেন, যা মোট প্রার্থীর মাত্র ১০%। জয়ী হন ৭৪ জন মহিলা, যা জয়ী প্রার্থীর মাত্র ১৪%। অবশ্য ফিরে দেখলে স্পষ্ট হয় যে সংসদে মহিলা প্রতিনিধিদের সংখ্যা কখনোই খুব বেশি ছিল না। ১৯৫৭ সালে সংসদে মহিলা প্রতিনিধি ছিলেন ৫.৪%। সাত ও আটের দশকে মহিলা সাংসদদের সংখ্যা ছিল বেশ কম – ৩.৪% থেকে ৮.১% পর্যন্ত। মহিলা সাংসদদের সংখ্যা ২০১৪ সালে ছিল ৬২ (১১%) এবং ২০০৯ সালে ৫৯ (১১%)। কাজেই দেখা যাচ্ছে, গত ২০ বছরে মহিলা সাংসদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে দুই অঙ্কে প্রবেশ করেছে। কিন্তু এই সময়ে মহিলাদের ক্ষমতায়ন তথা নির্বাচনে অংশগ্রহণের পরিসংখ্যানের নিরিখে এই অগ্রগতি খুবই অল্প। আজও সংসদে মহিলারা দেশের অর্ধেক আকাশের প্রতিনিধি হিসাবে সংখ্যালঘুই রয়ে গেছেন।
এবারের মহিলা সাংসদদের দলগত চিত্রটা দেখলে পরিষ্কার হয়, যে প্রধান দলগুলোর মধ্যে শতাংশের হিসাবে সব থেকে বেশি মহিলা সাংসদ রয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের। এই দলের ২৯ জন সাংসদের মধ্যে ১১ জন মহিলা (৩৮%), আর মোট সংখ্যার বিচারে মহিলা সাংসদ সবচেয়ে বেশি বিজেপি দলে – ২৪০ জন সাংসদের মধ্যে ৩১ জন (১৩%) মহিলা। কংগ্রেসের ৯৯ জন সাংসদের মধ্যে ১৩ জন (১৩%) মহিলা। এছাড়া ক্ষমতাসীন এনডিএর মেজ ও সেজ শরিক টিডিপি ও জেডিইউয়ের মহিলা প্রতিনিধি যথাক্রমে একজন (৬%) ও দুজন (১৭%)। বাম দলগুলোর কোনো মহিলা সাংসদ এবারের লোকসভায় নেই। এই প্রসঙ্গে চট করে আমাদের রাজ্যের চিত্রটা দেখা যাক। এ রাজ্যের ৪২ সাংসদের মধ্যে এবার ১১ জন মহিলা নির্বাচিত হয়েছেন, সকলেই তৃণমূল কংগ্রেসের। ২০০৪ সাল থেকে দেখলে বোঝা যায়, এ রাজ্যে থেকে মহিলা সাংসদের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে, যদিও সেই বৃদ্ধির হার বেশ কম। ২০০৪, ২০০৯, ২০১৪ ও ২০১৯ সালে এ রাজ্যের ৪২ আসনে যথাক্রমে ৪, ৭, ১৪ ও ১১ জন মহিলা সাংসদ জয়ী হন। এবারের নির্বাচনে এই রাজ্যে মহিলা প্রার্থীদের দলগত চিত্রও উল্লেখযোগ্য। প্রধান দলগুলোর মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেসের ১২ জন, বিজেপির সাতজন, জাতীয় কংগ্রেসের দুজন এবং সিপিএমের ছজন মহিলা প্রার্থী ছিলেন। মোট প্রার্থী ছিলেন ৫০৭ জন, তার মধ্যে ৭২ জন মহিলা। সারা ভারতে মোট মহিলা প্রার্থীর মাত্র ৯.৩% এবার জয়ী হয়েছেন। এই জয়ের হার আরও একবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, নির্বাচনী রাজনীতির ময়দানে মহিলাদের অবস্থান এখনো কত পিছনে।
অন্যদিকে নির্বাচকদের মধ্যে মহিলাদের সংখ্যার রেখচিত্র কিন্তু বলিষ্ঠভাবে উর্ধ্বমুখী। ১৯৬২ সালের নির্বাচনে ৬৩.৩% পুরুষ এবং ৪৬.৬% মহিলা ভোট দেন। ২০২৪ সালে হিসাবটা দাঁড়িয়েছে ৬৫.৮% পুরুষ এবং ৬৫.৭৮% মহিলা। কয়েকটি রাজ্যে আবার মহিলাদের ভোটদান জাতীয় গড়ের থেকেও বেশি। যেমন আসাম (৮১.৭১%), অন্ধ্রপ্রদেশ (৮০.৩%), পশ্চিমবঙ্গ (৮০.১৮%), উড়িষ্যা (৭৫.৫৫%), ছত্তিসগড় (৭২.২৩%) ইত্যাদি। সুতরাং পরিসংখ্যান বলছে নির্বাচনের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় মহিলা নির্বাচকদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং সেখানে একপ্রকার লিঙ্গসাম্য স্থাপিত হয়েছে। কিন্তু নেতৃত্বের প্রশ্নে, জনপ্রতিনিধি হওয়ার প্রশ্নে, এখনো পুরুষদের একাধিপত্য কায়েম রয়েছে।
আরো পড়ুন কর্মস্থলে যৌন হেনস্থার জন্য ভারতে কমছে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা
রাজনীতিতে মহিলাদের সক্রিয় অংশগ্রহণের বিষয়টাকে তাঁদের আর্থসামাজিক বিকাশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না। পরিসংখ্যান বলছে দেশে এখনো মহিলাদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন দুর্বল। বর্তমানে দেশের কর্মীবাহিনীতে মহিলাদের অংশগ্রহণ মাত্র ৩৭% (যা ২০১৭ সালে ছিল ২৩%)। অন্যদিকে মহিলাদের মধ্যে সাক্ষরতার হার বেশ খানিকটা বেড়েছে– ৬৪.৬৩% (১৯৯১ সালে ছিল ৩৯.৪%)। বেড়েছে গ্রামীণ ভারতে মহিলাদের স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সংখ্যা, যার মাধ্যমে মহিলারা ধীরে ধীরে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার দিকে এগিয়ে চলেছেন। এর পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সরকার এবং রাজ্য সরকারগুলো এনেছে একগুচ্ছ কল্যাণকামী প্রকল্প, যার লক্ষ্য মহিলারাই। যেমন লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, উজ্জ্বলা যোজনা। দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলোতে চালু রয়েছে একাধিক প্রকল্প যার মাধ্যমে মহিলারা খাদ্যশস্য থেকে শুরু করে পড়াশোনা করার জন্য নানা সরকারি সাহায্য পাচ্ছেন। অনেক রাজ্যেই নানা প্রকল্পের মাধ্যমে মহিলারা সরাসরি অর্থসাহায্য পাচ্ছেন। এইসব প্রকল্পের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হয়ত ভোটারদের প্রভাবিত করা। কিন্তু এসবের ফলে মহিলাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন যে কিছুটা হলেও সদর্থকভাবে প্রভাবিত হয়েছে তা অনস্বীকার্য। এই ‘ভোটব্যাঙ্ক’ অগ্রাহ্য করা আজ কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষেই সম্ভব নয়।
একটা কথা স্পষ্ট – বিগত দুই দশকে মহিলাদের আর্থসামাজিক উন্নয়ন এবং প্রায় সব রাজনৈতিক দলের দ্বারা মহিলাদের বিশেষ স্বীকৃতি প্রদান তাঁদের বড় সংখ্যায় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে এবং ইভিএমে নিজস্ব মতামত প্রতিফলিত করতে সাহায্য করেছে। পরিবারের পুরুষদের কথামত ভোট দেওয়ার যে চিত্র আগে গ্রামীণ ভারতে স্বাভাবিক ছিল, তা ক্রমশ পাল্টেছে। সুতরাং একটা স্তর পর্যন্ত রাজনীতিতে মহিলাদের অংশগ্রহণ নিঃসন্দেহে বেড়েছে। কিন্তু রাজনীতির সর্বস্তরে মহিলাদের নির্ণায়ক ভূমিকা নেওয়ার জন্য যে ক্ষমতায়ন দরকার তার জন্য অনেক পথ চলা বাকি। সে পথে চলার জন্য তেমন রাজনৈতিক সদিচ্ছাও আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে চোখে পড়ে না। এবারের নির্বাচনের ফলাফল সেটাই আরও একবার প্রমাণ করেছে।
এই প্রসঙ্গে ২০২৩ সালের সংরক্ষণ আইনের কথা আসবেই। সেই আইনে সংসদ ও বিধানসভায় মহিলাদের জন্য ৩৩% আসন সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি আছে। স্বাধীনোত্তর ভারতে সংসদে মহিলাদের উপস্থিতির খতিয়ানই বুঝিয়ে দেয়, কেন সংসদে মহিলাদের জন্য ৩৩% আসন সংরক্ষণ একান্ত জরুরি। পঞ্চায়েত ও পৌরসভা স্তরের নির্বাচনে নয়ের দশক থেকে মহিলাদের জন্য ৩৩% আসন সংরক্ষণ করা গেছে। সেখানে স্বাভাবিকভাবেই মহিলাদের রাজনীতির মূল স্রোতে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ বেড়েছে এবং সর্বোচ্চ ৪৪.৪% মহিলা নির্বাচিত হওয়ার রেকর্ড রয়েছে। এর ফলে তাঁদের কর্মক্ষমতা ও পারদর্শিতা স্থানীয় সরকারের কাজকর্মে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। একই যুক্তিতে বিধানসভা ও সংসদে মহিলাদের উপস্থিতি বাড়াতে সংরক্ষণের বিকল্প আছে বলে মনে হয় না। আইনটা নাকি ‘ডিলিমিটেশন’ হলে তারপর বাস্তবায়িত হবে, এমনটাই দ্বিতীয় মোদী সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। এমতাবস্থায় সব রাজনৈতিক দলই মহিলাদের প্রভাবিত করতে সচেষ্ট। পাকেচক্রে ধর্ম, জাতপাত ইত্যাদির মত মহিলারাও একটি বিশেষ ভোটব্যাঙ্ক হিসাবে আজ বিবেচিত হচ্ছেন। আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ মহিলাদের ভালমন্দের অভিমুখ স্থির করে দেওয়ার দায়দায়িত্ব রেখে দেয় নিজেদেরই হাতে। সেই একশো বছর আগে রবিঠাকুরের তোলা প্রশ্ন ‘নারীকে আপন ভাগ্য জয় করিবার/কেন নাহি দিবে অধিকার’, একবিংশ শতাব্দীতেও নির্বাচনী গণতন্ত্রের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে প্রতিধ্বনিতই হতে থাকে শুধু।
এরপরেও প্রশ্ন থেকে যায়, মহিলা ভোটব্যাঙ্ক কি কোনো সমসত্ত্ব একক; নাকি ধর্ম, জাত, অর্থনৈতিক শ্রেণিভেদ এক্ষেত্রেও আছে? সে বিষয়টি পৃথক আলোচনার দাবি রাখে।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ডিলিমিটেশন কবে হবে তা অজানা। যতদিন না আসন সংরক্ষণ আইন কার্যকরী হচ্ছে, অন্তত ততদিন রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত মহিলাদের শুধু ভোটব্যাঙ্ক হিসাবে না দেখে, রাজনৈতিক সদিচ্ছার পরিচয় দিয়ে ৫০% মহিলাকে নির্বাচনে প্রার্থী করা। তবেই তো জয়ী জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে লিঙ্গবৈষম্য বা ফারাক ক্রমশ দূর হবে এবং মহিলাদের মধ্যে রাজনৈতিক নেতৃত্ব আরও বিকশিত হবে।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







