রবিবার নরেন্দ্র মোদীর মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে ভারতে ফিরে এল জোট সরকার। দেশের নির্বাচনী ইতিহাসের প্রায় ৩২ বছর কেটেছে জোট সরকারের শাসনে। বাকি ৩১ বছর কেন্দ্রীয় সরকার এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ কোনো না কোনো দলের হাতে ছিল। গত দশবছর কেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রী মোদীর নেতৃত্বে এনডিএ সরকার ক্ষমতায় থাকলেও, তাঁর দল বিজেপি কিন্তু লোকসভায় এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল। এবারের হিসাবটা আলাদা। অন্ধ্রপ্রদেশের তেলুগু দেশম (টিডিপি) ১৬ আর বিহারের জনতা দল ইউনাইটেডের (জেডিইউ) ১২ আসন ছাড়া, শিবসেনা আর এনসিপির একাংশ, আপনা দল ইত্যাদি না থাকলে বিজেপি এবার ২৪০ আসনে জিতেও একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার থেকে ৩২ আসনে পিছিয়ে ছিল। মোদী প্রায় ১২ বছর সাত মাস গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, তারপর দশবছর প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। কখনোই জোটসঙ্গীদের চাপের কথা ভাবতে হয়নি। তাই প্রশ্ন উঠছে, জোটের দলগুলোর আলাদা আলাদা চাহিদার সঙ্গে কি তিনি টানা পাঁচবছর মানিয়ে নিতে পারবেন? যদিও রাজনীতি বা কূটনীতিতে তিনি যে কতটা সক্ষম তা আর নতুন করে বলে দেওয়ার দরকার নেই।
মোদী মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণে যা দেখা গেল, তাতে আপাতত পদ বন্টনে হয়ত কোনো সমস্যা হয়নি, কিন্তু সরকারের নীতি ও কর্মপন্থা নিয়ে ভবিষ্যতে সমস্যা দেখা দিতে পারে। টিডিপি সাংসদ, ৩৬ বছরের কিঞ্জারাপু রামমোহন নাইডু শপথ গ্রহণের আগে সাংবাদিকদের বলেন, তিনি আশা করেন যে এই সরকার তাঁর রাজ্যকে ‘সাহায্য’ করবে। তাঁর দলের নেতা চন্দ্রবাবু নাইডুর ছেলে এন লোকেশ নাইডু ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস কাগজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, টিডিপি নিশ্চিত করবে যে ডিলিমিটেশন এবং অভিন্ন দেওয়ানি বিধির মত বিতর্কিত বিষয়ে যেন একতরফা সিদ্ধান্ত না নেওয়া হয় বা কোনো সম্প্রদায়ের সংরক্ষণ কেড়ে না নেওয়া হয়।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
ওদিকে জেডিইউ দলের নেতা কেসি ত্যাগী বলেছেন যে তাঁর দল যদিও বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএকে নিঃশর্ত সমর্থন জানিয়েছে, তাও অগ্নিপথ প্রকল্পের ত্রুটিগুলো নিয়ে বিশদে আলোচনা দরকার। তিনি আবার এমন ইঙ্গিতও দিয়েছেন যে যদিও তাঁর দল অভিন্ন দেওয়ানি বিধির বিরুদ্ধে নয়, তবে সে বিষয়ে আগে সবার সঙ্গে আলোচনা করা উচিত; বিশেষ করে যাঁরা এর দ্বারা প্রভাবিত হতে পারেন তাঁদের সঙ্গে।
তাছাড়া বিহার ও অন্ধ্রপ্রদেশের সরকার জাতিভিত্তিক আদমশুমারি শুরু করেছে, যাতে বিজেপির সোজাসুজি সম্মতি নেই। অন্ধ্রে অবশ্য জগন্মোহন রেড্ডির পূর্বতন সরকার এই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছিল। চন্দ্রবাবু বিধানসভা নির্বাচনে জয়লাভ করলেও এখনো মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেননি। তাই দেখা দরকার, তিনি এ ব্যাপারে কোন পথে হাঁটেন।
উপরন্তু এই দুই রাজ্যই কিন্তু বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত রাজ্যের মর্যাদার দাবিদার। কিন্তু জোটভুক্ত দলের জন্য এহেন বিশেষ ব্যবস্থা করতে গেলে অন্যান্য রাজ্যগুলো কি হাত গুটিয়ে বসে থাকবে? কাজেই অপেক্ষা। কী হয়, কী হয়?
এখানেই শেষ নয়। বারবার জোটসঙ্গী বদলানোর পর বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমারকে অনেকেই ‘পাল্টুরাম’ বলে সম্বোধন করে থাকেন। ফলে সোশাল মিডিয়া ইতিমধ্যেই ছেয়ে গেছে তিনি কী করতে চলেছেন তাই নিয়ে মিমে। ওদিকে ২০১৮ সালে টিডিপির এনডিএ ত্যাগ করার কারণই ছিল অন্ধ্রপ্রদেশকে বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত রাজ্যের মর্যাদা না দেওয়া। টিডিপি মোদী সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব পর্যন্ত এনেছিল। সেইসময় অন্ধ্রের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু কেন্দ্রের সমালোচনা করে বলেছিলেন যে তাঁরা দলের স্বার্থে এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন না, নিচ্ছেন রাজ্যের স্বার্থে।
এবার একটু অতীতের দিকে তাকানো যাক। মোদী জোট রাজনীতির বাধ্যবাধকতায় জড়িয়ে পড়া বিজেপির প্রথম প্রধানমন্ত্রী নন। তাঁর পূর্বসূরি অটলবিহারি বাজপেয়ী এ জিনিস সামলাতে সিদ্ধহস্ত ছিলেন। তিনি যাকে বলতেন ‘জোট ধর্ম’, তা পালন করতে সোজা চলে গিয়েছিলেন ক্ষুব্ধ মমতা ব্যানার্জির বাড়িতে। তৎকালীন এনডিএ জোটের সদস্যা মমতা বাংলার কিছু ‘রুগ্ন’ রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বন্ধ করার সরকারি সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন। কালীঘাটের বাড়িতে বাজপেয়ী মমতার মায়ের সঙ্গে বসে গল্প করেন অনেকক্ষণ, আলোচনা হয় তাঁর মেয়ের গুণ নিয়েও। পাশাপাশি বাজপেয়ী মমতার রগচটা, হঠকারী স্বভাব নিয়ে অভিযোগও করেন। মা নাকি হালকা হাসির মধ্যেই স্বীকার করেন সেসব দোষ। রণং দেহি মমতা ততক্ষণে বিগলিত। বিচক্ষণ নেতা তাঁর রাজধর্ম পালন করে ফিরে এলেন দিল্লি, মমতা রইলেন এনডিএতেই। যদিও বছরখানেক পরে বেরিয়ে এসে কংগ্রেসের সঙ্গে হাত মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠন করার দিকে নজর দেন। সফল হতে অবশ্য আরও প্রায় এক দশক লেগেছিল।
সে যা-ই হোক, জোট সরকার বাজপেয়ীর আগেও হয়েছে। স্বাধীন ভারতে প্রথমবার কেন্দ্রে জোট সরকার হয়েছিল ১৯৭৭ সালে, জরুরি অবস্থার ঠিক পরে। বিজেপির পূর্বসূরি ভারতীয় জনসংঘ সহ এগারোটা দল একত্রিত হয়ে জনতা সরকার গঠন করে। সেই সরকার চলে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত।
আরো পড়ুন ভিপি স্মরণ: বিলম্বিত, কিন্তু প্রয়োজনীয়
তারপর ১৯৮৯ সালে বিশ্বনাথ প্রতাপ সিংয়ের নেতৃত্বে তৎকালীন জনতা দলের সরকার। বোফর্স কেলেঙ্কারির অভিযোগ তুলে রাজীব গান্ধীর কংগ্রেস সরকারের তথাকথিত দুর্নীতি দমন করতে দিল্লির মসনদে বসেন ভিপি সিং। শেষপর্যন্ত কিন্তু তেমন কোনো শক্ত প্রমাণ দিতে পারেননি। সেবার ধৰ্মভিত্তিক রাজনীতি, বা ‘কমণ্ডল’-কে রুখতে বসিয়েছিলেন জাতিভিত্তিক মণ্ডল কমিশন। সংবিধান সংশোধন করে ১৯৮৯ সালে তফসিলি জাতি ও উপজাতির জন্য সংরক্ষণ বৃদ্ধি করে তাঁর সরকার। দেশ জ্বলে উঠেছিল সেই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে। আবার ১৯৯০ সালে কাশ্মীরে জঙ্গি হামলার ফলে ঘরছাড়া হতে শুরু করেন উপত্যকার হিন্দুরা। বিজেপি তখন ভিপির জোটসঙ্গী। সুযোগ বুঝে তারা ওই পরিস্থিতিতে তোলে অযোধ্যায় রামমন্দিরের দাবি। ১৯৯০ সালে লালকৃষ্ণ আদবানি সেই দাবি নিয়ে রথযাত্রায় বেরিয়ে বিহারের সমস্তিপুর থেকে জনতা দলেরই মুখ্যমন্ত্রী লালুপ্রসাদের পুলিসের হাতে গ্রেফতার হওয়ায় বিজেপির সমর্থন খুইয়ে কেন্দ্রের সরকার পড়ে যায়।
আবার এ ধরনের সরকারকে বাইরে থেকে সমর্থনের রেওয়াজও আছে। যেমন ১৯৯৮ সালে বাজপেয়ী সরকারকে বাইরে থেকে সমর্থন করেছিলেন মমতা। যদিও সে সরকার ১৩ মাসের মাথায় সংসদে অনাস্থা প্রস্তাব নিয়ে বিতর্কের পর ভোটাভুটির আগেই পদত্যাগ করে। আবার ১৯৯৯ সালের নির্বাচনের পরে বাজপেয়ীর সরকারেই মন্ত্রী হন মমতা। তার পর ২০০৪ লোকসভা নির্বাচনের পর গঠন হয় মনমোহন সিংয়ের নেতৃত্বাধীন প্রথম ইউপিএ সরকার, যাকে বাইরে থেকে সমর্থন দিয়েছিল বামেরা। সেই বামেরাই দ্বিতীয় ইউপিএ সরকারের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরমাণু চুক্তির বিরোধিতা করে সমর্থন প্রত্যাহার করে। কিন্তু সরকার টিকে যায়।
কাজেই ইতিহাস বলে যে জোট ধৰ্ম মেনে, শরিকদের সামান্য খুশি করেও চালানো যায় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতাহীন সরকার। কিন্তু সকলের হাত ধরে পথ চলা কঠিন। প্রশ্ন উঠতেই পারে যে এই ‘যত মত, তত পথ’ অবলম্বনকারী নেতাদের নিয়ে সরকার পরিচালনা করতে কি পারবেন মোদী-অমিত শাহের মত নেতৃত্ব, যাঁরা এতদিন একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে রাজত্ব চালালেন? ভবিষ্যৎ জবাব দেবে। রাজনীতির মাঠে গোলমুখ সামান্য খুলে যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে ইন্ডিয়া জোট – যদি সময় মত পাসটা পাওয়া যায়!
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







