বিদ্যাভূষণ রাওয়াত

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

সেদিন কিছু মনুধারার সংবাদমাধ্যমের প্রথম পাতায় প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বিশ্বনাথ প্রতাপ সিংকে দেখে যুগপৎ বিস্মিত এবং আনন্দিত হলাম। এমনিতে এরা তাঁকে কখনোই জায়গা দিত না। কিন্তু এক্ষেত্রে না দিয়ে উপায় ছিল না কারণ তিনি ছিলেন তামিলনাড়ু সরকারের বিজ্ঞাপনে, আর বানিয়া ব্রাহ্মণ সংবাদমাধ্যম টাকার জন্যে সবকিছু করতে তৈরি। একমাত্র ওই ব্যাপারটাতেই তাদের দায়বদ্ধতা শতকরা একশো ভাগ। আমি অবাক হয়ে দেখলাম, উত্তর ভারতের সবচেয়ে সাম্প্রদায়িক এবং ঘৃণা উদ্গীরণকারী খবরের কাগজ দৈনিক জাগরণ-এর পাতা আলো করে রয়েছেন ভিপি সিং। যখন ভিপির সরকার মন্ডল কমিশনের সুপারিশ কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তখন এই কাগজটা ভিপি, মুলায়ম সিং যাদব, লালুপ্রসাদ যাদব, রামবিলাস পাসোয়ান আর শরদ যাদবকে নিত্য গালাগালি দিত। দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হল, মুলায়ম পরবর্তীকালে এদের সঙ্গে সমঝোতা করে নেন এবং দৈনিক জাগরণের মালিক নরেন্দ্রমোহনকে রাজ্যসভায় পাঠান। কিন্তু তাতেও কাগজটার আচরণ বদলায়নি। আজও তারা প্রচণ্ড সাম্প্রদায়িক এবং সামাজিক ন্যায়ের বিপক্ষে। এমন একটা কাগজের প্রথম পাতায় ভিপি সিংকে দেখা অবশ্যই তাদের জন্যে বিরাট আঘাত, যারা মানুষটা নেই বলে খুশি। ২৭ নভেম্বর ২০০৮ তারিখে ভিপি যখন মারা যান, তখন কাগজগুলো তাঁকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করেছিল কারণ তখন মুম্বাইয়ে সন্ত্রাসবাদী হামলা নিয়ে ব্যস্ততা চলছিল। কিন্তু এতদিন পরে তাঁকে বিজ্ঞাপন হিসাবে নিতে হওয়ায় নিশ্চয়ই তারা আহত।

মনুধারার সংবাদমাধ্যম বা বিজেপি আর কংগ্রেসের বর্ণবাদী, ব্রাহ্মণ্যবাদী নেতারা ভিপিকে অগ্রাহ্য করতেই পারেন কারণ তিনি উচ্চবর্গীয় অভিজাতদের দখলে থাকা ভারতের মূলধারায় সামাজিক ন্যায়ের রাজনীতিকে নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু যাঁরা সেই রাজনীতির সুবাদে ক্ষমতার ফল খেয়েছেন, ভিপি সম্পর্কে তাঁদের নীরবতা এবং ভিপিকে তাঁরা যেভাবে অগ্রাহ্য করেছেন তাও কম নিন্দনীয় নয়। লালুপ্রসাদ আর রামবিলাস অবশ্য শেষপর্যন্ত ভিপির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রেখেছিলেন। কিন্তু ভিপিকে আসল শক্তি জুগিয়েছিল করুণানিধির দল ডিএমকে। তারা যখন মন্ডল কমিশনের রিপোর্টের সমর্থনে এক বিরাট সমাবেশের আয়োজন করে, তখনো উত্তর ভারতের নেতারা মন্ডল রাজনীতির লাভক্ষতির হিসাব করছিলেন।

ভিপি পদত্যাগ করার পরে ৩৫ বছরের বেশি সময় অতিক্রান্ত। কিন্তু তিনি আজও সামাজিক ন্যায় এবং ধর্মনিরপেক্ষতার লড়াইয়ের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে উত্তর ভারতের সামাজিক ন্যায় নিয়ে লড়াই করা দলগুলো সবর্ণ হিন্দুদের ভোট পেতে ভিপিকে অগ্রাহ্য করা শুরু করে। বিশেষ করে ব্রাহ্মণ আর বানিয়াদের ভোট পেতে সমাজবাদী পার্টি তথা মুলায়ম তাদের বড় বড় পদ দিতে থাকেন। উচ্চবর্গীয় সাংবাদিকরাও বরাবর সমাজবাদী পার্টির সৌজন্য উপভোগ করে এসেছেন। কল্পনা করতে পারেন, যিনি দুবার উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন, দেশের অর্থমন্ত্রী ছিলেন একসময়, উত্তরপ্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি ছিলেন, পরে দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী এবং শেষে প্রধানমন্ত্রী হন, গোটা দেশের কোথাও তাঁর কোনো স্মৃতিচিহ্ন নেই? সঞ্জয় গান্ধী কোনোদিন মন্ত্রী পর্যন্ত ছিলেন না, অথচ তাঁর স্মৃতিচিহ্ন রয়েছে। এদিকে যে মানুষ দেশের রাজনৈতিক বয়ানই বদলে দিয়েছিলেন, তাঁর কোনো স্মৃতিচিহ্ন নেই।

কংগ্রেস আর বিজেপিকে এর জন্যে দায়ী করাই যায়। কিন্তু সত্যিই বেদনাদায়ক রাষ্ট্রীয় জনতা দল সমেত অন্য দলগুলোর আচরণ। গত ৩৫ বছরের বেশিরভাগটাতেই উত্তরপ্রদেশ আর বিহারের শাসনভার জনতা-সমাজবাদী পরিবারের দলগুলোর হাতে থেকেছে। কিন্তু তারা এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। চেন্নাইয়ের রাজনীতি আমার জানা নেই। জানি না লালুপ্রসাদ, তেজস্বী যাদব বা নীতীশকুমারকে ভিপির মূর্তি উন্মোচনের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল কিনা। জানা কথাই যে কংগ্রেসের ব্যাপারটা পছন্দ হবে না। কংগ্রেসের ব্রাহ্মণ্যবাদী ধর্মনিরপেক্ষ উদারপন্থীরা ভিপিকে স্মরণ করতে যাবেন কেন? তাঁদের অধিকাংশই মন্ডল ‘পাপ’ করার জন্যে ভিপিকে ঘৃণা করেন।

বিশ্বনাথ প্রতাপ
ভিপি সিং। ছবি উইকিমিডিয়া কমন্স থেকে

কংগ্রেসের সমস্যা হল তারা কিছুতেই ভুল থেকে শিক্ষা নেয় না। আমি বহুবার লিখেছি যে বিজেপি যখন ভিপি সরকারের প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করল, তখন যদি রাজীব গান্ধী সমর্থন দিতেন তাহলে আজ ভারতের ইতিহাস অন্যরকম হত। কিন্তু সেইসময় রাজীব কী করেছিলেন? সংসদে মন্ডল কমিশনের রিপোর্টের সমালোচনা করতে ব্যস্ত ছিলেন। ওটা এক ভয়াবহ সিদ্ধান্ত। মন্ডল ছিল এমন এক সুযোগ যা কংগ্রেস হেলায় হারায়। আজ এত বছর পরে রাহুল গান্ধী বর্ণশুমারির কথা বলছেন, কিন্তু কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্দারামাইয়া ছাড়া অন্য কংগ্রেস নেতারা রাহুলের কথার পুনরাবৃত্তি করছেন না। বর্ণশুমারি নিয়ে একইরকম উৎসাহ কিন্তু কমলনাথের মধ্যে দেখা যাচ্ছে না। দুঃখের কথা, রাহুল আর অন্য কংগ্রেস নেতাদের ভিপি সম্পর্কে দুটো ভাল কথা বলার সময় নেই।

আরো পড়ুন বর্ণশুমারি কৌশল থেকে মতাদর্শ হয়ে উঠলে তা বিজেপির শেষের শুরু

সত্যি কথা বলতে, ভিপির পদত্যাগের সময়ে কংগ্রেস বিজেপির মত ব্যবহার করেছিল। আমরা জানি কীভাবে কল্পনাথ রাই, রত্নাকর পাণ্ডে, কে কে তিওয়ারির মত ব্রাহ্মণ্যবাদী কংগ্রেস নেতারা ভিপিকে আক্রমণ করেছিলেন। ভিপিকে কোণঠাসা করতে কীভাবে নির্লজ্জের মত সংবাদমাধ্যমকে কাজে লাগানো হয়েছিল (সেই পথ আজ বিজেপি দারুণ অধ্যবসায়ে অনুসরণ করছে) তাও দেখেছি। ব্যাপারটাকে এতদূর নিয়ে যাওয়া হয়েছিল যে রাজীবের দারুণ ঘনিষ্ঠ সাংবাদিক এম জে আকবর সেন্ট কিটসে ভিপির ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট আছে – এমন এক আজগুবি কাহিনিও প্রচার করেছিলেন।

আজ বিজেপি সেই কৌশলই অবলম্বন করছে। কংগ্রেসের এবার অন্তত শিক্ষা নেওয়া উচিত। ভিপি-কংগ্রেস সম্পর্কে কংগ্রেসই খলনায়কের ভূমিকা পালন করেছিল, ভিপি করেননি। তিনি বরং আজীবন কংগ্রেসের আদর্শের প্রতি বিশ্বস্ত ছিলেন এবং গান্ধী পরিবারের কাউকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করেছেন এমন ঘটনা বিরল।

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া যা-ই হোক, তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিনের ভিপির মূর্তি স্থাপন ঐতিহাসিক। স্ট্যালিন প্রমাণ করলেন যে তিনি কংগ্রেস বা সামাজিক ন্যায়ের জন্যে লড়াই করা অন্যান্য শক্তিগুলোর সমসাময়িক নেতৃবৃন্দের চেয়ে অনেক বেশি পরিণত। তামিলনাড়ু বরাবর ভিপিকে প্রাপ্য সম্মান দিয়েছে এবং তাঁর ভূমিকাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। তাদের দ্রাবিড়ীয় সরকার ভিপিকে বাবাসাহেব ভীমরাও আম্বেদকর, পেরিয়া, আন্নাদুরাই এবং করুণানিধির পাশে বসিয়েছে। এ এক বিরাট সম্মান। উত্তরপ্রদেশের সামাজিক ন্যায়ের রাজনীতি করা শক্তিগুলো প্রাথমিকভাবে ভিপির অবদান স্বীকার করতে চায়নি, কারণ তিনি তাদের একজন ছিলেন না। এর চেয়ে দুঃখের কিছু হয় না। যদি আমরা ভিপির ভূমিকাকে স্বীকৃতি দিতে না পারি, তাহলে কেনই বা কেউ সামাজিক ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াবে? স্ট্যালিন যা করলেন তাতে উত্তর ভারতের যে নেতারা বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতা থেকেও তাঁকে ভুলে থেকেছেন তাঁদের ক্ষুদ্রতা প্রকাশ হয়ে পড়ল।

ভিপি মাত্র ১১ মাস প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, কিন্তু তাঁর কাজ ক্ষমতার কাঠামো নড়িয়ে দিয়েছিল। তিনিই প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দেশের প্রতি আম্বেদকরের অবদানকে স্বীকৃতি দেন। তিনি কেবল নেলসন ম্যান্ডেলার সঙ্গে সঙ্গে বাবাসাহেবকে ভারতরত্নই দেননি, সংসদের ভিতরে তাঁর প্রতিকৃতিও টাঙানোর ব্যবস্থা করেন। তার আগে পর্যন্ত কিন্তু কাজটা করেননি। আজ ভেবে দেখা দরকার, সংসদে ভিপির প্রতিকৃতিও থাকা উচিত কিনা। সামাজিক ন্যায়ের রাজনীতি করা দলের সরকার যে রাজ্যগুলোতে আছে তারা ভিপির একটা বড় স্মারক তৈরি করুক না। তিনিই তো সেই মানুষ যাঁর সম্পর্কে একসময় বলা হত “রাজা নহি ফকীর হ্যায়, দেশ কা তকদীর হ্যায়”। আমরা যারা সামাজিক ন্যায় এবং ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাস করি, তাদের কাছ থেকে ভিপির আরও অনেক সম্মান প্রাপ্য।

নিবন্ধকার একজন সমাজকর্মী। এই মুহূর্তে হিমালয় ও ভারতের সমভূমির উপর গঙ্গা ও তার শাখানদীগুলোর প্রভাব নিয়ে কাজ করছেন। মতামত ব্যক্তিগত

ইনিউজরুমে প্রকাশিত মূল প্রবন্ধ থেকে অনূদিত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.