উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দশকে, ১৮৯৫ সালে, কলকাতার টাউন হলে ঘর ভর্তি লোকের সামনে এক বাঙালি যুবক পরীক্ষা করে দেখিয়েছিলেন – কোনোরকম তার ছাড়াই বিদ্যুৎ তরঙ্গ প্রায় ৭০ ফুট দীর্ঘ পথ নিমেষে পেরিয়ে একটা ঘরে রাখা বারুদের স্তূপে আগুন ধরিয়ে দিতে পারে। সভাপতির আসনে তৎকালীন বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নর উইলিয়াম ম্যাকেঞ্জি। সবাই হতবাক। তারবিহীন যোগাযোগ ব্যবস্থা! সেদিনই আনুষ্ঠানিকভাবে যুবকটি ঘোষণা করেন, কোনো মাধ্যম ছাড়াই বৈদ্যুতিক তরঙ্গের সাহায্যে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে খবর পাঠানো যায়। যে যুবকের দু-তিন বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফল সেদিন শহরের বিদ্বজ্জন তন্ময় হয়ে দেখেছিলেন, তিনি আর কেউ নন, পরাধীন ভারতবর্ষের বিজ্ঞানচর্চার অন্যতম স্তম্ভ জগদীশচন্দ্র বসু।

সেইসময় জার্মান বিজ্ঞানী হাইনরিখ হার্জের বেশ নামডাক। তিনি কাজ করেন অদৃশ্য আলোকতরঙ্গ নিয়ে। আসলে আমরা যে বিভিন্ন বর্ণের আলো দেখি, তাদের তাদের তরঙ্গদৈর্ঘ্য আলাদা আলাদা । লাল আলোর সবচেয়ে বেশি (৬২০-৭৫০ ন্যানোমিটারের মধ্যে) নীল আবার কম (৪৫০- ৪৯৫ ন্যানোমিটারের মধ্যে)। এই ন্যানোমিটার আসলে খুব ছোট দৈর্ঘ্য, এটি সাধারণত তরঙ্গদৈর্ঘ্য মাপার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। এক মিটারকে ১০০০০০০০০০ দিয়ে ভাগ করলে তবে পৌঁছনো যাবে ন্যানোর ঘরে। হার্জ সেইসময় একটু বড় তরঙ্গ (পদার্থবিদ্যার পরিভাষায় যাকে বলে লং ওয়েভ অর্থাৎ দীর্ঘ তরঙ্গ) নিয়ে কাজ করছেন। তিনি একটা তরঙ্গ তৈরি করলেন যার তরঙ্গদৈর্ঘ্য প্রায় ০.৯৬ মিটার। ছোট তরঙ্গ, তথা শর্ট ওয়েভও তৈরি করেছিলেন হার্জ, যার তরঙ্গদৈর্ঘ্য ছিল ০.০৬৬ মিটার।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

এদিকে জগদীশচন্দ্র তখন প্রেসিডেন্সি কলেজের নামি অধ্যাপক। পড়ানোর পাশাপাশি উৎসাহী মৌলিক গবেষণায়। স্বদেশি প্রচেষ্টায় যদি কিছু বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি তৈরি করা যায়, সেই তাড়নাও কাজ করছে ভিতরে। ১৮৯৪ সালে তিনি দৃশ্যমান ও অদৃশ্য আলোক প্রকৃতি সম্পর্কে এক মৌলিক বক্তৃতা দেন এশিয়াটিক সোসাইটিতে। হাতের টর্চ জ্বালালে আলো সোজা পথে চলে আমরা সবাই জানি, কিন্তু অদৃশ্য আলোও সোজা পথে চলে – একথা তিনি দাবি করেন ওই বক্তৃতায়। পরের বছর আলোর দিক পরিবর্তন নিয়ে তাঁর মৌলিক চিন্তাভাবনার বহিঃপ্রকাশ হল এশিয়াটিক সোসাইটির আরেকটা সভায়। তাঁর চিন্তাভাবনা প্রকাশিত হল তখনকার বিখ্যাত ইলেকট্রিশিয়ান জার্নালে। আস্তে আস্তে বিলেতের বিজ্ঞানী মহলে পরিচিত হতে শুরু করলেন তিনি। জগদীশচন্দ্রের কাজের গুরুত্ব বুঝে তৎকালীন রয়্যাল সোসাইটি তাঁকে আর্থিক অনুদান দিতেও আগ্রহী হল। সেইসময়েই লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি বিশেষ সম্মান পান। হঠাৎ করে বহির্বিশ্বে এহেন পরিচিতি এখানকার শিক্ষা দফতরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে কিছুটা অপ্রস্তুত করে দেয়। কারণ বাংলার কৃতী সন্তান জগদীশচন্দ্র অনেকবারই গবেষণার জন্য অর্থ চেয়ে পাননি। লন্ডনের স্বীকৃতির পর উচ্চশিক্ষা দফতর তাঁর গবেষণার জন্য অর্থ বরাদ্দ করল বাৎসরিক আড়াই হাজার টাকা।

প্রেসিডেন্সি কলেজে (অধুনা প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়) স্বতন্ত্রভাবে শুরু করলেন তাঁর কাজ। কিন্তু কাজের জন্য তো গবেষণাগার লাগবে। কর্তৃপক্ষ একটা পরিত্যক্ত বাথরুম সংস্কার করে ল্যাবের ব্যবস্থা করলেন কোনো মতে। হার্জের মত অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি সেখানে জোগাড় করা দুঃসাধ্য। সম্পূর্ণ দেশিয় প্রযুক্তির উপর নির্ভর করে তাঁর আর এক সহকর্মী, বরেণ্য আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের ঘরে ০.০০২৫ থেকে ০.০০৫ মিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্যবিশিষ্ট বৈদ্যুতিক তরঙ্গ সৃষ্টি করলেন জগদীশচন্দ্র। পাশের ঘরে তখন অপেক্ষমান অধ্যাপক ফাদার ল্যাফো। সেই ঘর অতিক্রম করে ওপাশে অধ্যাপক পেডলারের ঘরে পৌঁছল সেই তরঙ্গ। এই বৈদ্যুতিক তরঙ্গ আবার খবর তথা তথ্য বহনে সক্ষম। এর সাহায্যেই জগদীশচন্দ্র একবার তাঁর গবেষণাগার থেকে এক কিলোমিটার দূরে বাড়িতে পর্যন্ত খবর পাঠিয়েছিলেন। বেতারে সংবাদ পাঠানোর সেই শুরু। পরাধীন ভারতের এক বিজ্ঞানী প্রবল প্রতিকূলতাকে পাশ কাটিয়ে মাইক্রোওয়েভ আবিষ্কার করে ফেললেন।

১৮৯৬ সালে জগদীশচন্দ্র ইউরোপে গেলেন বিজ্ঞানীদের মাঝে তাঁর এই বিস্ময়কর আবিষ্কারের কথা ঘোষণা করতে। সেখানে গিয়ে আলাপ হল ইলেকট্রনের আবিষ্কর্তা জোসেফ জন থমসন, বিখ্যাত পদার্থবিদ লর্ড কেলভিনের সাথে। শর্ট ওয়েভ তথা মাইক্রো ওয়েভ সম্পর্কিত জগদীশচন্দ্রের এই গবেষণা সেইসময় বিলেতের বিজ্ঞানী মহলে হইচই ফেলে দেয়। ফলস্বরূপ ১৮৯৬ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডক্টর অফ সায়েন্স উপাধিতে ভূষিত করে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, জগদীশচন্দ্র তাঁর এই কাজের জন্যে পেটেন্টের আবেদন করেননি। এদিকে সেবছর ইতালীয় বিজ্ঞানী গুলিয়েলমো মার্কোনি পেটেন্টের আবেদন করেন। ফলত পরের বছর মাইক্রো ওয়েভ সংক্রান্ত পেটেন্ট যায় তাঁর ঝুলিতে।

সিপাহী বিদ্রোহের পরের বছর অবিভক্ত বঙ্গের ঢাকা জেলার রাড়িখাল গ্রামে জন্মানো একটা ছেলের পক্ষে ওই জায়গায় পৌঁছনো সহজ ছিল না। স্কুলকলেজের পাট শেষ করে বিলেতে পাড়ি জমিয়েছিলেন জগদীশচন্দ্র। বাবা ভগবানচন্দ্র প্রথমে ভেবেছিলেন ছেলে ম্যাজিস্ট্রেট হবে। পরে ঠিক হল ডাক্তার হবে। ডাক্তারি পড়তেই জগদীশচন্দ্র বিলেতে গিয়েছিলেন, কিন্তু কী নিয়ে পড়বেন তা ঠিক করতে পারছিলেন না। শেষে দ্বিতীয় বছরে পদার্থবিদ্যা, উদ্ভিদবিদ্যা ও রসায়ন নিয়ে পড়া শুরু করেন। আলাপ হয় দুই দিকপাল – লর্ড র‍্যালে এবং ভাইন্সের সঙ্গে। ১৮৮৫ সালে দেশে ফিরে আসেন। প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ানোর সুযোগ মিলল বটে, কিন্তু ব্রিটিশ সরকারের অন্যায্য বেতন বৈষম্যের কারণে প্রথম তিন বছর কোনো বেতনই নেননি তিনি। পরে অবশ্য ব্রিটিশরা ইউরোপিয়দের হারেই বেতন দিতে রাজি হয়।

আপাদমস্তক ভাবুক মানুষ ছিলেন জগদীশচন্দ্র। বিজ্ঞান গবেষকরা সাধারণত অল্প বয়সেই গবেষণার কাজ শুরু করেন। জগদীশচন্দ্র সেদিক দিয়ে একটু আলাদা। তিনি গবেষণায় এসেছেন প্রায় ৩৬ বছর বয়সে। তবে চিন্তাভাবনায় এতটুকু ভাটা পড়েনি। প্রথম প্রথম পদার্থবিদ্যা নিয়ে কাজ করলেও পরে নিজের তৈরি যন্ত্রপাতি দিয়ে পরখ করতে শুরু করলেন গাছ এবং জড়পদার্থগুলোকে। বুঝতে চাইলেন গাছেদের ভাষা। কাজের তাগিদে একে একে ঘরোয়া যৎসামান্য প্রযুক্তির উপর নির্ভর করে তৈরি করেছেন ক্রেস্কোগ্রাফ, রেজন্যান্ট রেকর্ডার, ফাইটোগ্রাফ প্রভৃতি। বিংশ শতাব্দীর একেবারে গোড়ার দিকে লন্ডনে রয়্যাল সোসাইটির সভাঘরে তিনি এক পরীক্ষার মাধ্যমে দেখানোর চেষ্টা করেছিলেন যে অনুভূতি শুধু আমাদেরই আছে তা নয়, উদ্ভিদ ও জড়ের মধ্যেও এই ধর্ম বিদ্যমান।

ক্রেস্কোগ্রাফ
ছবি লেখকের

নিজের তৈরি একটা যন্ত্রকে একটা গাছের সঙ্গে লাগিয়ে সেটাকে একটা ব্রোমাইড ভর্তি পাত্রে রাখলেন। যন্ত্রটা থেকে আলোকবিন্দু সামনের পর্দায় এসে পড়ে। প্রথম প্রথম আলোকবিন্দুর নড়াচড়া অনেকটা দোলকের মত ছিল। কয়েক মুহূর্ত পরে সেই আলোড়ন বাড়তে থাকে। একসময় খুব বেশি আন্দোলিত হয়ে বন্ধ হয়ে যায়। অনেকটা কোনো পাখির মৃত্যুর আগে ডানা ঝাপটানোর মত ব্যাপার। গাছটা নুয়ে পড়তেই বোঝা গেল ব্রোমাইড বিষে তার মৃত্যু হয়েছে। আজব কাণ্ড! গাছের ভিতরের অবস্থা বুঝতে পারছি আমরা! সবাই যখন জগদীশচন্দ্রকে বাহবা দিচ্ছে, তখন জনাকয়েক উদ্ভিদবিজ্ঞানী বেঁকে বসলেন। একজন পদার্থবিজ্ঞানী হয়ে জগদীশচন্দ্র কী করে এত তাড়াতড়ি এরকম সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন? তাঁরা রয়্যাল সোসাইটির কাছে আর্জি জানান, জগদীশচন্দ্রের গবেষণা যেন প্রকাশ না করা হয়।

কিন্তু পিছু হটার বান্দা জগদীশচন্দ্র নন। প্রায় দুবছরের গবেষণা শেষে আবার প্রবন্ধ পাঠ করলেন লন্ডনের লিলিয়ান সোসাইটিতে। সেবার আর কেউ বিশেষ আপত্তি করল না। তিনি নিজের সাক্ষ্যপ্রমাণ তুলে ধরেন ‘জীব ও জড়ের সংবেদনশীলতা’ নামক প্রবন্ধে। ১৯০২ সালে রয়্যাল সোসাইটি তাঁর প্রবন্ধ প্রকাশ করে। তাঁর কাজ জানতে পারে গোটা বিশ্ব, বাংলার বিজ্ঞানীর গবেষণা স্বীকৃতি পেতে থাকে উন্নত দুনিয়ার বিজ্ঞানী মহলে। এই সময়েই তিনি লেখেন রেসপন্স ইন দ্য লিভিং অ্যান্ড নন লিভিং নামক বিখ্যাত বই, প্রকাশক লংম্যান গ্রিন অ্যান্ড কোং। তাঁর উদ্দেশে রবি ঠাকুর লেখেন

জয় তব হোক জয়!
স্বদেশের গলে দাও তুমি তুলে
যশোমালা তুমি অক্ষয়!

উদ্ভিদের উপরে পদার্থবিদ্যা প্রয়োগের ফলে আস্তে আস্তে গড়ে উঠতে থাকল বিজ্ঞানের এক নতুন শাখা – জীব পদার্থবিদ্যা বা বায়োফিজিক্স। সে আজ থেকে একশো বছরেরও বেশি আগের কথা। আজ এই শাখাকে আধুনিক বিজ্ঞানের এক শাখা হিসাবে ধরা হয়। যে রয়্যাল সোসাইটির কিছু সদস্যের আপত্তিতে তাঁর কাজ প্রথমে প্রকাশ করেনি সোসাইটি, সেখানেই তিনি ১৯২০ সালে ফেলো নির্বাচিত হন।

শুধু মাইক্রো ওয়েভ বা বায়োফিজিক্সই নয়, তিনিই প্রথম ওয়েভগাইড তৈরি করেন, যা আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থার সঙ্গে এখন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাঁর তৈরি ক্রেস্কোগ্রাফ এতই সূক্ষ্ম এক যন্ত্র যে ওইসময় তা দিয়ে শামুকের গতির থেকে ২০,০০০ গুণ ধীরবেগের গতিও মাপা যেত। এর সাহায্যেই তিনি গাছের বৃদ্ধি মেপেছিলেন।

আরো পড়ুন যুক্তিবোধ সমূলে উৎপাটিত করতেই ডারউইন বিদায়

একইসঙ্গে অধ্যাপনা এবং গবেষণা করার জন্যে তিনি একটা উন্নত গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। সেজন্য প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে অবসর নেওয়ার পর নিজের জমানো টাকা দিয়ে একটা গবেষণাগার গড়তে শুরু করেন। এই কাজে তাঁর পাশে দাঁড়ান তৎকালীন বরোদার মহারাজা, বিশিষ্ট শিল্পপতি খৈতানজি সহ আরও অনেকে। ১৯১৭ সালের ৩০ নভেম্বর, জগদীশচন্দ্রের জন্মদিনে, তাঁর স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান বসু বিজ্ঞান মন্দিরের পথচলা শুরু হয়।

জীবনের শেষ দশকে তিনি দুবার ইউরোপে যান। উদ্দেশ্য একটাই – বিজ্ঞানচর্চা এবং তার প্রসার। বক্তব্য রাখেন ইম্পিরিয়াল কলেজ অফ লন্ডন, লন্ডন ইউনিভার্সিটি কলেজ, প্রাগ বিশ্ববিদ্যালয়, মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয় এবং আরও অনেক নামকরা প্রতিষ্ঠানে। দেশেও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বক্তৃতা দিতে থাকেন। ১৯৩৭ সালের ২৩ নভেম্বর, আশি বছরে পা দেওয়ার ঠিক এক সপ্তাহ আগে জগদীশচন্দ্র গত হন।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.