১৯৯৬-৯৭ মরসুমে ডারবান টেস্টে ভারতীয় দলের ব্যাটিং বিপর্যয়ের প্রতিবেদন লিখতে গিয়ে প্রখ্যাত ক্রীড়া সাংবাদিক লিখেছিলেন – প্র্যাকটিস নেই, ৬৬ অল আউট না হওয়াটাই তো অস্বাভাবিক। এত বছর পরে বাংলা সংবাদমাধ্যমে দশম ও দ্বাদশ শ্রেণির টেস্টে বিপুলসংখ্যক ছাত্রছাত্রীর অনুপস্থিতির খবর দেখে সেই লাইনগুলোই আজ মাথার মধ্যে ভাসছে। স্কুলে শিক্ষার পরিকাঠামোই আর নেই, স্কুলছুট না হওয়াটাই তো অস্বভাবিক।

রে রে করে আমায় আক্রমণ করার আগে একটু ধৈর্য ধরুন, আরও ভয়ানক কিছু কথা বলে নিই নিজের অভিজ্ঞতা থেকে। পচাগলা শবদেহ থেকে যেমন দুর্গন্ধ ছড়ানো স্বাভাবিক, ঠিক তেমনি এ রাজ্যের সরকারি শিক্ষাব্যবস্থায় স্কুলছুট হওয়াও স্বাভাবিক। যা হওয়ার ছিল তাই হচ্ছে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

সরকারি বাংলা মাধ্যম স্কুল থেকে বাঙালি মধ্যবিত্তের (বাঙালি উচ্চবিত্ত কোনোদিনই সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল নন, অতি অল্পসংখ্যক ব্যতিক্রম হিসাবেই আসে না) পরিযান নতুন কিছু নয়। বিগত দুই দশক ধরেই এই ধারার ক্রমশ গতিবৃদ্ধি হয়েছে। কিন্তু গত এক দশকে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার বিপর্যয় বহুমুখী, বহুধাবিস্তৃত এবং অনেকটাই ইচ্ছাকৃত। বাঙালি সমাজ আজ স্কুলছুট ছাত্রছাত্রীর পরিমাণ দেখে রিপ ভ্যান উইঙ্কলের মত হতভম্ব ভাব করলে সেটা ভাবের ঘরে চুরি। যদিও সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার এই সাড়ে সর্বনাশে মিডিয়ানির্ভর মধ্যবিত্ত বাঙালির কিছুই যায় আসে না, কারণ তার বাড়ির ছেলেমেয়ে অনেকদিন হল এই বিপর্যয়ের আওতার বাইরে। যদিও তাতে তারা নিরাপদ তো নয়ই, বরং অনিশ্চিত শিক্ষাজীবনের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কিছুটা অন্য প্রসঙ্গ হলেও সম্ভব হলে সেটাও আলোচনা করার চেষ্টা করব।

মূল বিষয়ে ফিরি। আজ দশম আর দ্বাদশের টেস্টে বিপুল অনুপস্থিতি দেখে আতঙ্কিত হলেও এর কারণ ভেবে দেখা প্রয়োজন, কারণ বিষবৃক্ষের শিকড় অনেক গভীরে।

২০১১ সালের নির্বাচনের অনেক আগে থেকেই সংবাদমাধ্যমের বদান্যতায় তৎকালীন বিরোধীদের প্রচারে বামফ্রন্ট সরকারের সার্বিক ব্যর্থতার কথা অত্যন্ত সফলভাবে প্রচারিত হয়েছিল। সেই প্রচারের একটা বড় জায়গা জুড়ে ছিল সরকারি শিক্ষায় অব্যবস্থা, যার বাজারি নাম ‘অনিলায়ন’। আম বাঙালি শিশুসুলভ সারল্যে সবকিছুই সোনামুখ করে মেনে নিয়ে সবুজ ঘাসে সাদা শাড়ির আঁচল ধরে স্বর্গের সিঁড়ি খুঁজতে চেয়েছিল। সেই সিঁড়ি খুঁজে পাওয়া গেছে কিনা জানা নেই, তবে বঙ্গের শিক্ষাব্যবস্থা স্বর্গের খুব কাছাকাছি চলে গেছে।

এবার আপনাদের একটু কষ্ট করে নিজের স্মৃতির উপর চাপ দিতে হবে। ঘাস চাষের আদিযুগে ফিরতে হবে। মনে করতে হবে অনুপ্রেরণার মহান কীর্তিগুলো। আমি পরপর ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করব।

স্কুলছুট নিয়ে আলোচনার শুরুতেই বলতে হয়, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের হিসাবটা পাওয়া যায় কারণ কেন্দ্রীয়ভাবে ছাত্রছাত্রীদের রেজিস্ট্রেশন হয়ে থাকে যথাক্রমে নবম ও একাদশ শ্রেণিতে। সেই সংখ্যার সঙ্গে কত পরীক্ষার্থীর অ্যাডমিট কার্ড তৈরি হয়েছে, সেই সংখ্যার তুলনা করলেই স্কুলছুটের পরিমাণ সহজে জানা যায়।

গতবছর মাধ্যমিকে (২০২২) স্মরণাতীতকালের মধ্যে প্রথম, আগের বছরের (২০২১) তুলনায় চার লক্ষ – আজ্ঞে হ্যাঁ, ঠিকই পড়ছেন – ৪,০০,০০০ পরীক্ষার্থী কমে গিয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের ব্যাখ্যা ছিল, করোনার জন্য একটা বড় অংশের ছাত্রছাত্রী স্কুলছুট হয়ে গেছে। সে ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ ভুল নয়। একটা মহল থেকে অন্য ব্যাখ্যায় বলা হয়, ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের শুরুতে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির বয়সে প্রবল কড়াকড়ি শুরু হয় এবং তাতে বয়সের প্রমাণপত্র অনুযায়ী অনেক ছাত্রছাত্রীই নির্দিষ্ট বয়স না হওয়ার কারণে আগের ক্লাসেই রয়ে যায় । যেহেতু সেই ব্যাচই ২০২২ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসেছে, সেহেতু মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী এত কমে গেছে। তবে পর্ষদ কিন্তু নবম শ্রেণির রেজিস্ট্রেশনের সংখ্যা প্রকাশ করে তেমন কিছু জানায়নি। বয়সের কারণে এই হ্রাস হয়ে থাকলে তা নবম শ্রেণিতেই ধরা পড়ার কথা।

এখানে একটা ভীষণ জরুরী কথা বলার আছে। ২০১৫-১৬ থেকেই মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের সংখ্যা কিছুটা হলেও কমছিল। অর্থাৎ এই প্রবণতা শুরু হয়েছে করোনা অতিমারীর আগেই। এখানে তুলনীয়, আগের সরকারের আমলে প্রতি বছর মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধিই ছিল নিয়মিত এবং স্বাভাবিক ব্যাপার। অথচ ২০২০-২১ সালে মাধ্যমিক স্তরে এ রাজ্যের স্কুলছুটের হার (১৫%)কিন্তু জাতীয় গড়ের (১৪%) চেয়ে বেশি।

কেন্দ্রের রিপোর্ট অনুযায়ী, ১৫-৪৯ বছরের মধ্যে ছেলেদের সাক্ষরতায় বাংলা জাতীয় গড়ের চেয়ে অনেক পিছিয়ে। একই বয়সের পুরুষ ও মহিলাদের মধ্যে দশ বছর স্কুলে যাওয়ার হিসাব দেখলে বাংলা খুবই নিচের দিকে। অর্থাৎ স্কুলছুট হওয়া এই রাজ্যের এক বড় সমস্যা, বিশেষ করে ছেলেদের মধ্যে।

২০-২৪ বছরের মেয়েদের মধ্যে দেখা গেছে যে ৪২% মেয়ের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর বয়স হওয়ার আগেই। জাতীয় গড় ২৩.৩%। আবার ১৫-১৯ বছরের মেয়েদের ১৬% এরই মধ্যে সন্তানের জন্ম দিয়েছেন বা সন্তানসম্ভবা হয়েছেন। জাতীয় গড় ৭%। এক দশক কন্যাশ্রীর ঢাকঢোল পিটিয়ে তাহলে কী পেলাম?

মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিকের কথা ছেড়ে দিলেও অন্যান্য শ্রেণিতে স্কুলছুটের সংখ্যা বেশ কিছুদিন ধরে আশঙ্কাজনক। সে তথ্য অনেকসময়েই সঠিক ভাবে পাওয়া যায় না। কারণ স্কুল স্তর থেকে সঠিক তথ্য উঠে আসে না এবং স্কুলের খাতায় নাম লেখানো থাকলেও বিরাট সংখ্যক ছেলেমেয়ের স্কুলের সঙ্গে কোনোরকম সম্পর্ক নেই। সেই সংখ্যার কেবল একটা গড় ধারণাই করা সম্ভব।

কেন এই অবস্থা?

ইংরিজি মাধ্যমে যাওয়ার প্রবণতা কিন্তু সরকারি স্কুলে ছাত্র কমে যাবার জন্য দায়ী, স্কুলছুটের জন্য নয়। কারণ সরকারি স্কুলের ছাত্রসংখ্যার বেশিরভাগটাই রয়েছে গ্রাম ও মফস্বলে। সেখানে এখনো পর্যন্ত বেসরকারি স্কুলের দাপাদাপি কয়েকটা অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ। তবে সাম্প্রতিক অতীতে রাজ্যের গ্রামাঞ্চলেও ব্যাঙের ছাতার মত বেসরকারি স্কুল গড়ে ওঠার নিদর্শন দেখা যাচ্ছে। এই প্রসঙ্গে প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক, উন্নয়নপ্রেমী মুখ্যমন্ত্রী তো স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের জন্য বহু প্রকল্প চালু করেছেন। তাহলে স্কুলছুটের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে কেন?

যে উত্তর শুনলে অনেকেরই ভাল লাগবে না, তা হল, সরকারি প্রকল্পগুলো ছাত্রছাত্রীদের স্কুলে ধরে রাখার চেয়ে একটা বিরাট অংশের জনগণকে কিছু পাইয়ে দেওয়ার পন্থায় পরিণত হয়েছে। ঠিক সেই কারণেই আগে উল্লেখ করেছি, অনেক ছেলেমেয়ের স্কুলে নামটা লেখানো আছে সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার জন্য, কিন্তু সারাবছরে উপস্থিতির বালাই নেই। সরকারি প্রকল্পের কথা বলতে হলে এই সরকারের ‘ফ্ল্যাগশিপ প্রোজেক্ট’ কন্যাশ্রীর কথা আসবেই। সরকার এবং শাসকদলের চিৎকৃত দাবি, মেয়েদের জন্য এই অভূতপূর্ব প্রকল্প মুখ্যমন্ত্রীর মস্তিষ্কপ্রসূত এবং তা এ রাজ্যের মেয়েদের শিক্ষায় সংখ্যা বৃদ্ধিতে এবং নাবালিকাদের বিয়ে আটকানোর ব্যাপারে বৈপ্লবিক কাণ্ড ঘটিয়েছে। তবে তথ্যের দিকে তাকালে এই দাবির সারবত্তা বড়সড় প্রশ্নের মুখে পড়বে। প্রথমত, এ ধরনের প্রকল্প দেশের একাধিক রাজ্যে চালু আছে। এ রাজ্যে চালু হওয়ার আগে থেকেই আছে। দ্বিতীয়ত, এই প্রকল্প নাবালিকাদের বিয়ে আটকাতে পারেনি। ২০১৯ সাল থেকে কেন্দ্রীয় তথ্য অনুযায়ী নাবালিকা বিবাহে এবং নাবালিকাদের মাতৃত্বের সংখ্যায় পশ্চিমবঙ্গের স্থান সবার উপরে। শেষ যুক্তি – সরকারি স্কুলশিক্ষায় ছাত্রীদের সংখ্যা বৃদ্ধি। এখানেও গোলমাল আছে। দুবছর আগে স্কুল শিক্ষা দফতর একটা তুলনামূলক হিসেব দিয়ে বলেছিল, রাজ্যে স্কুলছাত্রীর সংখ্যায় বিপুল বৃদ্ধি হয়েছে, ছাত্রের সংখ্যা বৃদ্ধিকেও ছাপিয়ে গিয়েছে। তথ্য নিয়ে খেলা করার মুশকিল হল, এই খেলা সহজেই ধরে ফেলা সম্ভব। সেই ধরে ফেলা তথ্য আমাদের জানাচ্ছে, ছাত্রীর সংখ্যা বৃদ্ধি আসলে ছাত্রের সংখ্যার তুলনায়, কারণ ছাত্রের সংখ্যা বিপুলভাবে কমেছে। এই অংশটা শিক্ষা দফতর লুকিয়ে রেখেছিল। এর সঙ্গে যোগ করুন ভুয়ো অ্যাকাউন্ট খুলে কন্যাশ্রীর আর সংখ্যালঘু শিক্ষার্থীদের স্কলারশিপের টাকা চুরি করে নেওয়া।

আসল কথা ছাত্রছাত্রীদের স্কুলে আনা বা ধরে রাখার সহায়ক সরকারি প্রকল্প নয়, স্কুলে শিক্ষার পরিকাঠামো এবং শিক্ষক সংখ্যা। শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে বিগত দশ বছরে এ রাজ্যে যা যা হয়েছে তেমন কুকীর্তি সারা দেশে খুব সুলভ নয়।

প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চ প্রাথমিক হয়ে নবম-দশম এবং একাদশ-দ্বাদশ। ২০১১ সালের পর থেকে স্কুলের প্রত্যেক ধাপেই শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি শুরু হয়ে সেটা পাহাড়ে পরিণত হয়েছে। সারা দেশে এমন নিদর্শন আর একটাও নেই, যেখানে শিক্ষা দফতরের এক সময়ের সমস্ত পদাধিকারী – শিক্ষামন্ত্রী থেকে শুরু করে – বিচারাধীন বন্দি হিসাবে জেলে রয়েছে। এদিকে বিপুল সংখ্যক যোগ্য, নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীরা তিনবছর হতে চলল কলকাতার রাজপথে ধর্নায় বসে আছেন, আর অযোগ্য ব্যক্তিরা সাদা খাতা জমা দিয়ে বহাল তবিয়তে চাকুরিরত। এখনো তদন্ত চলছে, অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। কিন্তু এই কাণ্ড শুধু শিক্ষক নিয়োগে নয়, শিক্ষাকর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রেও। শেষপর্যন্ত তদন্তে যা-ই উঠে আসুক, জনতার দরবারে পশ্চিমবঙ্গের স্কুলশিক্ষা দুর্নীতি চিরস্থায়ী কালো দাগ হয়ে গেছে। সাধারণ মানুষের সহজ প্ৰশ্ন , অযোগ্য ব্যক্তি কী করে আমার সন্তানকে শিক্ষা দেবে? কী শিক্ষা দেবে?

যদি একটু খেয়াল করেন, তাহলে দেখবেন পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তির ভুল থেকে মামলা করা শুরু হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে এত ভুল ছিল কেন? কেন শেষ যে প্রাথমিকে নিয়োগের টেট পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে তার বিজ্ঞপ্তির বয়ান ছবার বদলাতে হল? চাকরিপ্রার্থীদের অভিযোগ, সরকার ইচ্ছাকৃতভাবেই ভুলগুলো করেছে, যাতে মামলার ফলে নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত থাকে। সম্ভাবনাটা উড়িয়ে দেওয়া যায় কি?

এর সঙ্গে আছে গোদের উপর বিষফোঁড়ার মত শিক্ষকদের সাধারণ বদলি। ১৯৯৬-৯৭ সালে স্কুল সার্ভিস কমিশন তৈরি করার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল রাজ্যের সর্বত্র সমমানের শিক্ষক নিয়োগ। তাতে বদলির সুযোগ ছিল না। যা ছিল তা হল চাকরি পাওয়ার দুবছর পর আবার পরীক্ষায় বসার সুযোগ। তৃণমূল সরকার ২০১৪ থেকেই সেই সুযোগ বন্ধ করে দিয়েছে।

যদিও শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের দাবি মেনে বামফ্রন্ট সরকার সাধারণ বদলির খসড়া তৈরি করেছিল, কার্যকর করার সুযোগ হয়নি। বর্তমান সরকার সেই খসড়া অনুযায়ী ২০১২ সালে প্রথম সাধারণ বদলি প্রক্রিয়া শুরু করে। প্রথম ধাপের বদলি নিয়ে বিরাট কোনো অভিযোগ ছিল না, কিন্তু দীর্ঘ বিরতির পর ২০১৯-২০ থেকে যে বদলি প্রক্রিয়া শুরু হয় তাতে ভুরি ভুরি অভিযোগ এবং তার ক্ষতিকর ফলাফল স্পষ্ট। কী সেই ফল? এ রাজ্যের গ্রামাঞ্চলের স্কুলগুলো শিক্ষকশূন্যতার দিকে চলে গেছে। বিশেষ করে গ্রামের দিকে আপনি বাঘের দুধ পেলেও পেতে পারেন, কিন্তু অঙ্ক আর বিজ্ঞানের মাস্টার পাবেন না। বহু স্কুল একাদশ শ্রেণিতে বিজ্ঞান বিভাগ তুলে দিতে বাধ্য হয়েছে শিক্ষকের অভাবে। এমন স্কুল বিরল নয় যেখানে ছাত্র সংখ্যা পাঁচশোর বেশি হলেও শিক্ষক সংখ্যা এক বা দুই। সেখানে বিষয়ভিত্তিক পড়াশোনা করানো দূর অস্ত, নাম ডাকাই যথেষ্ট চাপের ব্যাপার।

আপনি সেই এলাকার বাসিন্দা হলে কী করবেন? সন্তানকে কোথায় পাঠাবেন? রাজ্য সরকারের স্কুলে সাধারণ বদলি নীতি বা দুর্নীতি যে চূড়ান্ত বিপর্যয় ডেকে এনেছে তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ বৰ্তমান শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য, যেখানে তিনি বলেছেন ডাক্তারদের মত শিক্ষকদেরও চাকরির প্রথম তিন বছর বাধ্যতামূলকভাবে গ্রামের স্কুলে কাজ করার নিয়ম চালু করা হবে দ্রুত।

আসলে স্কুলছুটের কোনো একটা বা দুটো কারণ থাকে না। বেশকিছু সময় ধরে অনেক ছোট, বড় কারণ জড়ো হতে হতে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয় যে সাধারণ ছাত্রছাত্রী আর অভিভাবক – উভয়ের কাছেই পড়াশোনাটা প্রয়োজন নয়, বিলাসিতায় পরিণত হয়। পশ্চিমবঙ্গে এই মুহূর্তে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা আর পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতি সমার্থক হয়ে গেছে। এর সঙ্গে আছে করোনাকালীন বিপর্যয় আর গ্রামীণ অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যাওয়া।

কোনো রাজ্য বা অঞ্চলের সামাজিক উন্নয়নের যে কটা মাপকাঠি আছে তার মধ্যে শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য অন্যতম। স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনার পরিসর আলাদা, এখানে শিক্ষাব্যবস্থার চিত্র কিছুটা তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

গ্রামীণ অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ফলে বিরাট অংশের মানুষের পক্ষে আর সন্তানের পড়াশোনার জন্য খরচ করা সম্ভব হচ্ছে না। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে নাবালিকাদের বিয়ে দিয়ে দেওয়া হচ্ছে (খেয়াল করুন নাবালিকা বিবাহে এ রাজ্যের স্থান) এবং ১৫ বছরের বেশি বয়সী ছেলেদের যে কোনো ধরনের কাজে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এখন রাজ্যে যে কোনোরকম কাজেরই যে চূড়ান্ত অভাব তা বোঝা যায় পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা দেখলে। এই ছেলেরা স্কুলে নাম লিখিয়ে রেখে ভিনরাজ্যে কাজে চলে যাচ্ছে, ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে ক্লাসঘর। স্কুলশিক্ষার বাইরে তাকালে আরও মর্মান্তিক ছবি ধরা পড়বে। ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে পশ্চিমবঙ্গের কলেজগুলোতে ভর্তির সময়সীমা অনেকটা বাড়ানোর পরেও ৪০% আসন ফাঁকা রয়ে গেছে। ভাবতে পারছেন? তিনবছর পর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কারা বা কজন ক্লাস করবে?

স্কুলশিক্ষা বিভাগের অধীন প্রশাসনিক দফতরগুলোর একমাত্র কাজ স্কুলে সরকারি প্রকল্প ঠিকঠাক লাগু হচ্ছে কিনা তা দেখা এবং প্রবল চাপ দিয়ে একই তথ্য বারবার সংগ্রহ করা। যদিও তাতে কী লাভ হচ্ছে তা নিয়েও প্রশ্ন আছে। কারণ স্কুলে চালু থাকা অন্যতম প্রধান সরকারি প্রকল্প মিড ডে মিলে এ রাজ্যে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ফাঁপিয়ে দেখিয়ে অন্তত ২০ কোটির বেশি টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। এর সঙ্গে অত্যন্ত নিম্নমানের খাবার দেওয়ার পুরনো অভিযোগ তো আছেই। সেই অভিযোগের তদন্তে কেন্দ্রীয় দল এসে তদন্ত করে রিপোর্টও জমা দিয়েছে। তাতে অভিযোগ সঠিক বলা হয়েছে, আর স্বাভাবিকভাবেই রাজ্যের তরফ থেকে রিপোর্টে আইনি ফাঁক দেখিয়ে তা মানা হয়নি। অর্থাৎ এখানেও তদন্ত চালু আছে, ফলাফল অনির্দিষ্ট।

এক প্রবীণ প্রধানশিক্ষক দুঃখ করে বলছিলেন, বগত একবছরে অসংখ্য মিটিংয়ের একটাতেও তিনি তাঁর স্কুলের শিক্ষকসংখ্যার অপ্রতুলতা নিয়ে আলোচনা করতে পারেননি। দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক সরকারি প্রকল্পগুলোর বাইরে কোনো কিছু নিয়ে আলোচনায় রাজি ছিলেন না।

প্রাথমিকে স্তরের অবস্থা কী? সেই শিশুদের তো কাজে ঢুকে যাওয়ার ব্যাপার নেই। সেখানেও কিন্তু বদলি নীতি ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে। শহরের সরকারি প্রাথমিক স্কুলগুলোতে অতি অল্প ছাত্রছাত্রীর বিপরীতে বিপুল সংখ্যক শিক্ষক উপস্থিত, অন্যদিকে শিক্ষক এবং ছাত্রের অভাবে এই রাজ্যেই ৮২০৭ খানা স্কুল (প্রাথমিক আর জুনিয়র হাই মিলিয়ে) বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

আরো পড়ুন সরকারি স্কুলে লালবাতি: শেষের সে দিন ভয়ঙ্কর

ছাত্রসংখ্যা কম কেন? মূলত দুটো কারণ। প্রথমত, অপরিকল্পিতভাবে পুরনো স্কুলের কাছাকাছি নতুন স্কুল তৈরি। দ্বিতীয় কারণটা মারাত্মক। রাজ্যের দুর্গম এলাকাগুলোতে জনসংখ্যার স্বল্পতার জন্য খুব স্বাভাবিকভাবেই ছাত্রসংখ্যা কম হবে, হয়ে থাকে। সেই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে শুধু সংখ্যার স্বল্পতা দেখিয়ে স্কুল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে জঙ্গলমহলে, অযোধ্যা পাহাড় অঞ্চলে, ডুয়ার্সের বনবস্তিতে, পাহাড়ে। ফলে ওইসব অঞ্চলের শিশুদের শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে ঠেলে দেওয়া হল। কারণ তাদের পক্ষে অন্তত ১৫-২০ কিলোমিটার দূরের মফস্বলে গিয়ে স্কুলে পড়া অসম্ভব। এই ব্যবস্থা কি ইচ্ছাকৃত নয়?

এসব বড় বড় কারণ বাদ দিলেও অসংখ্য সমস্যা পড়ে থাকে। এক, পাঠক্রম। এই সরকার ক্ষমতায় এসেই পুরনো পাঠক্রম বদলে নতুন পাঠক্রম তৈরি করিয়েছিল সিলেবাস কমিটির তত্ত্বাবধানে। তাতে কী দেখা যাচ্ছে? প্রাথমিক স্তরের পাঠক্রম যথেষ্ট উঁচুমানের এবং শিক্ষকের বিপুল যত্ন ও মনোযোগ প্রয়োজন। কিন্তু যেখানে ছাত্রের আধিক্য সেখানে শিক্ষকের অভাব। অযোগ্যতার অভিযোগ তো আছেই।

উচ্চ প্রাথমিকে পাঠক্রম এতটাই প্রয়োগমুলক যে শিক্ষক নিজেই বিভ্রান্ত কীভাবে পড়াবেন। ছাত্রছাত্রীদের কথা সহজেই অনুমেয়। নবম-দশমে কেন্দ্রীয় নিয়মানুযায়ী বইয়ের পৃষ্ঠা সংখ্যা নির্দিষ্ট, কিন্তু বিষয়ভিত্তিক পাঠ্যসূচি বিপুল। ফলে বোঝানোর জায়গা কম। এরপর রইল একাদশ-দ্বাদশ। নতুন সময় সারণিতে দ্বাদশ শ্রেণির ছেলেমেয়েরা সময় পাচ্ছে ছয় মাসের মত। এরমধ্যেই তাদের উচ্চমাধ্যমিক এবং প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি। নতুন সরকারের শিক্ষানীতি তথা বিদ্যালয়ে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ দশম এবং দ্বাদশের টেস্টকে হাস্যকরভাবে গুরুত্বহীন করে দিয়েছে। এদিকে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিকে নম্বরের ছড়াছড়ি। ফলাফল? সর্বভারতীয় ডাক্তারি, ইঞ্জিনিয়ারিং এমনকি রাজ্যের জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষার মেধা তালিকাতেও রাজ্যের সরকারি স্কুলের ছেলেমেয়েদের সংখ্যা নিম্নমুখী।

করোনা কালে অনলাইন ক্লাস নামক বিভেদমূলক পদ্ধতি চালানোর জন্য রাজ্য সরকারের তরফে একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণীর জন্য ট্যাব বরাদ্দ করা হয়েছিল। তার ফল কী? ছেলেমেয়েদের মধ্যে ইন্টারনেট আসক্তি বৃদ্ধি পাওয়া আর আর্থিক কারণে নেট রিচার্জ করতে না পেরে কিছু মর্মান্তিক আত্মহত্যা ছাড়া বিশেষ কিছু নয়। করোনাকাল সমাপ্ত হলেও সেই প্রকল্প চালু আছে, কারণ আগামীদিনের ভোটারদের চটানো চলে না।

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে স্কুলে স্কুলে টেস্ট চলাকালীন আপনি এই লেখা পড়ছেন। পড়ে হয়ত ভাবলেশহীন থাকছেন অথবা হতাশ কিম্বা ক্রুদ্ধ হচ্ছেন। লেখকের উপরেও ক্রুদ্ধ হতে পারেন। কিন্তু যদি দয়া করে ভেবে দেখেন, বিপুল পরিমাণ স্কুলছুটের কারণ কী? একটাই উত্তর পাবেন, এ রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থার সার্বিক ধ্বংস। তার কারণ কী? উত্তর আছে বর্তমান শাসকদলের দুর্নীতির ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে।

তাহলে এই মুহূর্তে করণীয় কী? সাধারণের করণীয় সম্পর্কে বলার অধিকারী এই লেখক নন। সে শুধু এটুকু বলতে পারে, একজন প্রকৃত শিক্ষকের একমাত্র দায়বদ্ধতা ছাত্রছাত্রীর কাছে। তার পেশাগত তীব্র অপ্রাপ্তি থাকতে পারে, ক্ষোভ থাকতে পারে , কিন্তু দায়িত্ব পালনে অপারগতার কোনো অজুহাত থাকতে পারে না। বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ শিক্ষার্থীদের জন্যে এই দগ্ধ দেশে ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়েও তাকে চেষ্টাটুকু চালিয়ে যেতে হবে। আশঙ্কাজনক ফ্যাসিবাদী অন্ধকার আর আগামী প্রজন্মের মধ্যে শুধু সে-ই দাঁড়িয়ে আছে। এই দায়িত্ব এড়ানো যায় না।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

মতামত জানান

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.