শিরোনাম দেখে মনে হতে পারে, এ আবার কীরকম কথা! শিরোনামে কিছু ভুল নেই তো? জানুয়ারি থেকেই যে নতুন বছর শুরু হয়, এ তো জানা কথা। আর পাঁচ রাজ্যের ভোটের সঙ্গে সবার জানা এই তথ্যের সংযোগ কোথায়?
ভারতে নির্বাচনের শেষ নেই। প্রতি বছরই কোনো না কোনো রাজ্যে নির্বাচন লেগেই থাকে। তবে দেশের মেগা নির্বাচন কিন্তু লোকসভাই। দেশের মসনদে কে বসল, তা দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ ঠিক করে দেয়। ২০২৪ সালে তৃতীয়বারের জন্য কেন্দ্রে ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে নামবেন নরেন্দ্র মোদী। তাঁকে টেক্কা দেওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন রাহুল গান্ধী ও ইন্ডিয়া জোট।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
অনেকেই সদ্যসমাপ্ত পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনকে সেমিফাইনাল এবং ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনকে ফাইনাল বলে চিহ্নিত করছেন। দেখতে সেরকম মনে হলেও, ব্যাপারটি আদৌ তা নয়। গত দশ বছরে মোদী ও তাঁর দল রাজ্যগুলির বিধানসভা নির্বাচন আর কেন্দ্রের লোকসভা নির্বাচনকে একদম আলাদা করে দিয়েছেন।
২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের ঠিক আগেই এই পাঁচ রাজ্যে – তেলেঙ্গানা, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিসগড়, মিজোরাম – নির্বাচন হয়েছিল। পাঁচটার মধ্যে তিনটেতেই কংগ্রেস বিজেপিকে হারিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল। যদিও পরে বিজেপি ঘুরপথে কংগ্রেস নেতা জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়ার হাত ধরে মধ্যপ্রদেশের কংগ্রেস সরকারকে ফেলে দিয়ে ক্ষমতায় আসে। কিন্তু মূল বিষয় হল, এই নির্বাচনগুলো জেতার পরেও লোকসভা নির্বাচনে মোদীকে পর্যুদস্ত করতে পারেনি কংগ্রেস।
এবার বুথফেরত সমীক্ষার ফল খুবই গোলমেলে। একেকটা সংস্থা একেকরকম ফলাফলের ইঙ্গিত দিচ্ছে। শুধু মধ্যপ্রদেশই যদি ধরি, ২৩০ আসনের বিধানসভায় কংগ্রেসকে এগিয়ে রেখেছে পাঁচটা বুথফেরত সমীক্ষা। আবার সে রাজ্যেই বিজেপিকে এগিয়ে রেখেছে চারটে সমীক্ষা।
অন্যদিকে ১৯৯ আসনের রাজস্থানে তিনটে বুথফেরত সমীক্ষা বলছে কংগ্রেস এগিয়ে, সাতটা বলছে এগিয়ে বিজেপি।
ছত্তিশগড়ে (৯০ আসন) আর তেলেঙ্গানায় (১১৯ আসন) যদিও কংগ্রেস ক্ষমতায় আসতে চলেছে বলে দাবি করছে সমীক্ষাগুলো।
চল্লিশ আসনের মিজোরামে জেডএমপি আর এমএনএফের মধ্যে কেউ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না বলেই দাবি করছে সংস্থাগুলো। অর্থাৎ ত্রিশঙ্কু হবে বিধানসভা।
গতবারে রাজস্থানে কংগ্রেস ও বিজেপির মধ্যে ভোটের ফারাক ছিল মাত্র ০.৫%। এমনিতেই ওই রাজ্যে কংগ্রেস একবার আর বিজেপি পরেরবার ক্ষমতায় আসে। তবে লড়াই যে হাড্ডাহাড্ডি হয়েছে সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
একই কথা প্রযোজ্য তেলেঙ্গানায়। সেখানেও ক্ষমতাসীন ভারত রাষ্ট্র সমিতি আর বিরোধী কংগ্রেসের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। খুব কম ব্যবধানে কে চন্দ্রশেখর রাওয়ের বিআরএস আবার ক্ষমতায় এলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
মধ্যপ্রদেশেও যে বিজেপি ও কংগ্রেসের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়েছে তা বুথফেরত সমীক্ষাগুলোর মধ্যে ফারাক দেখলেই বোঝা যায়।
ছত্তিসগড়ই একমাত্র স্বস্তি দিচ্ছে কংগ্রেসকে। তাদের মুখ্যমন্ত্রী ভূপেশ বাঘেলই যে আবার ক্ষমতায় আসবেন, তা নিয়ে কংগ্রেস আত্মবিশ্বাসী।
কিন্তু ঘুরে ফিরে সেই কথাতেই ফিরে আসতে হবে। এই পাঁচ রাজ্যে যা-ই হোক, লোকসভার খেলার মাঠ অন্যরকম হবেই। হ্যাঁ, যদি চারটে রাজ্যে ক্ষমতায় এসে যায় কংগ্রেস, তাহলে তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়বে। যদি ফল বিজেপি ও কংগ্রেসের মধ্যে ২-২ হয়, অর্থাৎ বিজেপি মধ্যপ্রদেশ দখলে রাখল আর রাজস্থানে ক্ষমতায় এল আর অন্যদিকে কংগ্রেস ছত্তিসগড় দখলে রাখল এবং তেলেঙ্গানায় ক্ষমতায় এল – তাহলেও কংগ্রেসের মান রক্ষা হবে। কিন্তু তাতে লোকসভা নির্বাচনের লড়াইয়ে বিশেষ ফারাক হবে না।
কারণ গত দশ বছরে মোদী লোকসভা নির্বাচনে নিজের আধিপত্য কায়েম করেছেন। তার সঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনগুলোর কোনো যোগ নেই। তাই ২০১৮ সালে রাজস্থানে কংগ্রেস জিতলেও ২০১৯ লোকসভায় সে রাজ্যের ২৫টা লোকসভা আসনই জিতে নেয় বিজেপি। তেলেঙ্গানাতেও কংগ্রেস প্রধান বিরোধী হলেও তাদের পিছনে ফেলে চারটে আসন জেতে গেরুয়া শিবির।
অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গেও ২০১৬ বিধানসভা নির্বাচনে হাতে গোনা কয়েকটা আসন জিতলেও ২০১৯ লোকসভায় ১৮টা আসন জিতে নেয় মোদীর দল। এমনকি ওড়িশার মত রাজ্যে একইসঙ্গে বিধানসভা আর লোকসভার নির্বাচন হলেও সেখানে দুটো নির্বাচনের পৃথক ফল হয়। শুধুমাত্র ভুবনেশ্বর আসনটা ধরলেই দেখতে পাওয়া যায়, ওই লোকসভা এলাকার অন্তর্ভুক্ত বিধানসভা আসনগুলোতে বিজু জনতা দল জিতলেও লোকসভা আসনে নির্বাচিত হয়েছিলেন বিজেপির অপরাজিতা সারেঙ্গী।
এখন বলা যেতেই পারে, ২০১৯ আর ২০২৪ সালের মধ্যে তফাত রয়েছে। এবার রাহুল গান্ধী অনেকটা পাল্টেছেন নিজেকে। ভারত জোড়ো যাত্রার মধ্যে দিয়ে নিজের ভাবমূর্তি বদলে ফেলেছেন। কর্ণাটকে কংগ্রেস দেখিয়ে দিয়েছে সাম্প্রদায়িকতা দিয়ে নির্বাচন জেতা যায় না। বিজেপিবিরোধীরাও এবারে একসঙ্গে এসে ইন্ডিয়া জোট তৈরি করেছে। দশ বছর পরে বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে একটা প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়া তো থাকবেই।
আরো পড়ুন ভারত বনাম ইন্ডিয়া: আমাদের সেই তাহার নামটি
কিন্তু ভারতের গণতন্ত্রের জন্য দুর্ভাগ্যের বিষয়, রাহুল গান্ধী বা কোনো বিরোধী নেতাই জাতীয় স্তরে মোদীর জনপ্রিয়তার কাছাকাছি আসতে পারেননি। বিজেপি নির্বাচনে লড়েই এই একনায়কতন্ত্রের ছায়ায়। সঙ্গে যুক্ত হয় উগ্র জাতীয়তাবাদ, হিন্দুত্ব, অগাধ টাকার জোগান এবং অবশ্যই সংগঠন। এর একটার সঙ্গেও কী বিরোধীরা যুঝতে পারবে? পাল্টে দিতে পারবে ভারতীয় রাজনীতির আলেখ্য? রাহুল যে চেষ্টা করছেন তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু হিন্দুত্ব অ্যাজেন্ডার বিরুদ্ধে কোনো আলেখ্য কি তৈরি হবে?
এবার খোলসা করে বলি – ২০২৪ কেন জানুয়ারি থেকেই শুরু হবে। জানুয়ারি মাসেই অযোধ্যায় রামমন্দির উদ্বোধন করে মোদী আবার এমন হিন্দুত্বের ডঙ্কা বাজাবেন, সেখানে পাঁচ রাজ্যের নির্বাচনের ফলাফল ম্লান হয়ে যাবে। নরম হিন্দুত্বে বিশ্বাসী বিরোধী দলগুলো কীভাবে তার মোকাবিলা করে সেটাই দেখার।
তাছাড়া বিজেপি পাঁচবছর ধরে লোকসভা নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত হয়। ইন্ডিয়া জোট (যদি আদৌ তারা একজোট থাকতে পারে) কয়েক মাসেই তার মোকাবিলা করে ফেলবে – এমনটা ভাবা কঠিন। যে যার মত করে রাজ্যে রাজ্যে বিজেপিকে আটকাতে চেষ্টা করতে পারে। ব্যক্তির লড়াই থেকে ইস্যুর লড়াইয়ে পুরো নির্বাচনী প্রচারকে নামিয়ে আনতে পারলে লাভ বিরোধীদের। কিন্তু ‘মোদী বনাম কে?’ এই লড়াইয়ে নামতে গেলেই খেলা একপেশে হয়ে যাবে। বিধানসভা নির্বাচনগুলোর ফলাফলকে উপেক্ষা করে এই ব্যক্তিকেন্দ্রিক লড়াইয়েই দুবার সফল হয়েছেন মোদী, এবার সঙ্গে যুক্ত হবে রামমন্দির। আগামী ছয় মাসে আরও কী কী হবে, তাই বা কে জানে!
কাজেই ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনের লড়াই শুরু হবে জানুয়ারি থেকেই। পাঁচ রাজ্যে যা-ই হোক, শূন্য থেকেই শুরু করবে সব রাজনৈতিক দল।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







