জাতভিত্তিক জনগণনা, যাকে আমরা একটি শব্দে বর্ণশুমারি বলতে পারি, তার দাবি অনেক দিনের। বিশেষ করে ১৯৯০ সালে ভিপি সিংয়ের সরকার যখন মন্ডল কমিশনের রিপোর্টের ভিত্তিতে সামাজিকভাবে বঞ্চিত অংশের জন্যে ২৭% সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নেয়, তখন থেকে অত্যন্ত জোরের সঙ্গে বর্ণশুমারির দাবি জাতীয় রাজনীতিতে উঠতে থাকে। কিন্তু সেই দাবিতে কখনোই খুব একটা কর্ণপাত করা হয়নি। কেন্দ্রে কংগ্রেসের দীর্ঘ রাজত্বেও নয়। এমনকি মন্ডল কমিশনের রিপোর্টের সুপারিশগুলি ড্রয়ারবন্দি ছিল এক দশক। মন্ডল কমিশন গঠন করা হয়েছিল ১৯৭৯ সালে মোরারজি দেশাইয়ের অকংগ্রেসি সরকারের আমলে। ১৯৮০ সালেই কমিশন তার রিপোর্ট প্রস্তুত করে ফেলে। কিন্তু তার সুপারিশগুলি রূপায়ণ করা হয় এক দশক পর আরেকটি অকংগ্রেসি সরকারের জমানায়। অধুনা জমানা বদলেছে। ভারতের রাজনীতিতে অতি দক্ষিণপন্থা চিরকালই ছিল। কিন্তু আজ তা একেবারে পত্রে পুষ্পে বৃদ্ধি পেয়ে ফ্যাসিবাদী চরিত্র ধারণ করে দেশের ক্ষমতায় জাঁকিয়ে বসেছে। ফলে তাকে আটকাতে গেলে কংগ্রেসকে বাম মার্গে সরতেই হত। পার্টি নেতৃত্বের দূরদৃষ্টিসম্পন্ন এবং নমনীয় অংশ তাই বেশ কিছুদিন ধরেই জাতভিত্তিক জনগণনার দাবিতে তুলছিলেন। নিঃসন্দেহে এই অংশের একেবারে শীর্ষস্থানীয় নেতা রাহুল গান্ধী। ইন্ডিয়া জোট তৈরি হওয়ার পর থেকেই বেশ জোরের সঙ্গে তিনি এই দাবি করে আসছিলেন। এই আবহে অতি সম্প্রতি নীতীশ কুমারের বিহার সরকার সে রাজ্যের বর্ণশুমারির ফলাফল প্রকাশ করে একেবারে হইচই ফেলে দিয়েছে। বিরাট প্যাঁচে পড়ে গিয়েছে বিজেপি।

কেন বর্ণশুমারি বিজেপির পক্ষে বিপজ্জনক? এর একমাত্র কারণ হল, বিজেপি মতাদর্শগতভাবে একটি ব্রাহ্মণ্যবাদী দল, অর্থাৎ উচ্চশ্রেণি ও উচ্চবর্ণের দল, যারা একমাত্র তথাকথিত নিম্নবর্ণের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে বিভক্ত রেখেই শাসন করতে পারে। আর বর্ণশুমারি ব্যাপারটিকে ঠিকঠাক ব্যবহার করতে পারলে তা সংখ্যাগরিষ্ঠ দলিত ও নিম্নবর্গের মানুষের মধ্যে এক ধরনের ঐক্য তৈরি করে দিতে পারে – বঞ্চিত মানুষের ঐক্য, শোষিতজনের ঐক্য। সেই ঐক্য নিশ্চিতভাবেই বিজেপির বিরুদ্ধে যাবে। ফলে নরেন্দ্র মোদী ইতিমধ্যেই বলতে শুরু করেছেন, বর্ণশুমারিকে হাতিয়ার করে বিরোধীরা বিভাজনের রাজনীতি করছে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

বিভাজনের রাজনীতি?

বর্ণশুমারি নিয়ে ইতিমধ্যেই বেশকিছু লেখা মূলধারার সংবাদমাধ্যম, সোশাল মিডিয়া এবং বিকল্প সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এই লেখায় আমরা বিশেষ করে মোদীর এই অভিযোগটি নিয়েই আলোচনা করব। কারণ, বর্ণশুমারি নিয়ে এই কথাটা শুধু ফ্যাসিবাদীদের কথাই নয়। যদি তা হত তাহলে এই যুক্তিটিকে নিয়ে অতশত আলোচনার প্রয়োজন হত না। আসলে এই যুক্তিটি বা ধারণাটি আমাদের দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের মনের কথা। এমনকি বামপন্থীদেরও। আমাদের উচ্চবর্ণ ও উচ্চবর্গের আধিপত্যাধীন সমাজের আধিপত্যকারী ধারণা এটাই। এইজন্যেই স্বাধীনতার পর কখনোই বর্ণশুমারি হয়নি, যদিও এই কালপর্বের একটা বড় অংশ কংগ্রেসের শাসনে কেটেছে। কোনো কোনো সময়ে কেন্দ্রীয় সরকারের উপর বামপন্থীদের যথেষ্ট প্রভাব থাকা সত্ত্বেও তা হয়নি। বামপন্থীরা কখনই খুব জোর দিয়ে এই দাবি করেনও নি। তাঁদের পরিচালিত রাজ্যগুলিতেও কখনই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

জাতভিত্তিক আদমশুমারীর দাবি কি এক ধরণের বিভাজনের রাজনীতি? এর উত্তর হল, হ্যাঁ, এটি বিভাজনের রাজনীতি। আসলে রাজনীতি মানেই হচ্ছে কোনো না কোনো ধরনের বা প্রকারের বিভাজনেরই রাজনীতি। যেদিন পৃথিবীতে মানুষে মানুষে তেমন কোনো মৌলিক বিভাজন থাকবে না, সেদিন রাজনীতিরও দরকার হবে না। সেদিন রাজনীতি শুকিয়ে মরবে। কিন্তু এখানে প্রশ্ন হল, কোন ধরনের বিভাজনের রাজনীতি সমাজকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়, অর্থাৎ প্রগতিশীল? আর কোন ধরনের বিভাজনের রাজনীতি সমাজকে পিছনের দিকে ঠেলে দেয়, অর্থাৎ প্রতিক্রিয়াশীল? বিচার্য এটাই। মার্কস যখন শ্রেণিসংগ্রামের রাজনীতির উপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন তখন তাঁর মনে হয়েছিল, এই রাজনীতিই সমাজকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তিনি দেখেছিলেন, প্রথমত, এই বিভাজনটি একটি বাস্তব বিভাজন। আরোপিত নয়, তত্ত্ব দ্বারা নির্মিতও নয়। দ্বিতীয়ত, এই বিভাজনের রাজনীতিই সমাজের চালিকাশক্তি। ফলে তিনি শ্রেণিসংগ্রামের রাজনীতিকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছিলেন। যারা শ্রেণিবিভাজনকে ভুলিয়ে দিতে চাইত, এক ধরনের শ্রেণি-ঊর্ধ্ব রাজনীতির পক্ষে ওকালতি করত, মার্কস তাদের তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছিলেন।

শ্রেণিসংগ্রামের রাজনীতির মতই আরও কিছু বিভাজনের রাজনীতি রয়েছে যা সমাজে প্রগতিশীল ভূমিকা পালন করেছে। যেমন দখলদার সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র বনাম অধিকৃত রাষ্ট্র, একই রাষ্ট্রের মধ্যেকার আধিপত্যকারী জাতি বনাম নিপীড়িত জাতি, আধিপত্যকারী লিঙ্গ (পুরুষ) বনাম নিপীড়িত লিঙ্গ (নারী, রূপান্তকামী প্রমুখ), আমাদের দেশে আধিপত্যকারী বর্ণ (ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়) বনাম নিপীড়িত ও বঞ্চিত বর্ণ (শূদ্র, দলিত প্রমুখ) ইত্যাদি। এইসব বিভাজনের ক্ষেত্রে নিপীড়িত অংশগুলির রাজনীতি অবশ্যই প্রগতিশীল ভূমিকা পালন করেছে।

বিজেপি তথা আরএসএসের রাজনীতি

বিজেপিও এক ধরনের বিভাজনের রাজনীতিই করে। সেটি হল ধর্মীয় বিভাজনকে কেন্দ্র করে সংখ্যাগুরু তথা আধিপত্যকারী ধর্মের রাজনীতি। আরএসএসের প্রতিষ্ঠাতারা প্রথম থেকেই পরিষ্কার করে বলে এসেছেন, যে তাঁদের লড়াই মুসলমানদের বিরুদ্ধে। সুতরাং তাঁদের মতানুযায়ী বর্তমান ভারতবর্ষে একদিকে ৮০% হিন্দু এবং অন্যদিকে ২০% মুসলমানের মধ্যে দ্বন্দ্বই হল একমাত্র দ্বন্দ্ব এবং এটাই বিজেপির রাজনীতি।

এটিও বিভাজনের রাজনীতি। কিন্তু আগেরগুলোর মতো এটি প্রগতিশীল রাজনীতি নয়, বরং প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতি। কারণ এই রাজনীতি সমাজকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায় না। তাকে পিছনের দিকে ঠেলে দেয়। কেন? এই যে বারবার বলছি অমুক বিভাজনের রাজনীতি প্রগতিশীল কারণ তা সমাজকে সামনে এগিয়ে দেয় কিংবা অমুক রাজনীতি পিছনে ঠেলে দেয় – এর মানে কী, কীভাবে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায়? এর সহজ উত্তর পেতে গেলে কোনো একটি বিশেষ বিভাজন সমাজে কোন ভূমিকা পালন করে তা অনুধাবন করতে হয়। শ্রেণিবিভাজন তথা শ্রেণিদ্বন্দ্ব একসময় সমাজকে এগিয়ে দিয়েছে কারণ তা ছাড়া সমাজের উৎপাদন ও পুনরুৎপাদন এগোতে পারছিল না। আজ সেই শ্রেণিবিভাজনই উৎপাদন ও পুনরুৎপাদনের পক্ষে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, তার শৃঙ্খল হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই শ্রেণিবিভাজনের রাজনীতি শ্রেণিদ্বন্দ্বকে শেষ করতে চায় বলেই প্রগতিশীল। একইভাবে লিঙ্গদ্বন্দ্ব, জাতদ্বন্দ্ব, জাতিদ্বন্দ্ব প্রভৃতিও তাই। কিন্তু ধর্মীয় দ্বন্দ্ব এযাবৎকালের ইতিহাসে কখনোই উৎপাদন ও পুনরুৎপাদনে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এমন দেখা যায়নি। অন্তত বলা যায় বর্তমান ভারতবর্ষে হিন্দু-মুসলমান বিভাজন ও দ্বন্দ্ব এরকম কোনো ভূমিকা পালন করে না। সুতরাং সেই দ্বন্দ্বের উপর দাঁড়িয়ে থাকা রাজনীতি, তদুপরি সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মের পক্ষের রাজনীতি, কখনোই প্রগতিশীল হতে পারে না। তাই সামাজিক অগ্রগতির বিচারে এই দ্বন্দ্ব একটি আরোপিত দ্বন্দ্ব, কৃত্রিম দ্বন্দ্ব এবং এর উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা রাজনীতি প্রতিক্রিয়াশীল। এই রাজনীতি প্রগতিশীল বিভাজনের রাজনীতিকে দুর্বল করে, ধ্বংস করে। তাই শেষ বিচারে এই রাজনীতি শাসকশ্রেণির রাজনীতি।

মন্ডল বনাম কমন্ডল

এবার নির্দিষ্ট করে জাতিবর্ণের প্রশ্নে আসা যাক। ১৯৯০ সালে মন্ডল কমিশনের রিপোর্ট সামনে আসার পরই ভারতে জাতিবর্ণের আন্দোলনের দ্বিতীয় ঢেউ তৈরি হয়। এর আগে ১৯৩০ এবং ৪০-এর দশকে আম্বেদকরের নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের সঙ্গে এই আন্দোলনের বেশকিছু পার্থক্য ছিল। আম্বেদকর জোর দিয়েছিলেন দুটি বিষয়ের উপর। এক, জাতিবর্ণ ব্যবস্থার নির্মূলকরণ; দুই, দলিত-শূদ্রদের রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল। কিন্তু দ্বিতীয় দফার আন্দোলন মূলত পরিচালিত হতে শুরু করল শিক্ষা ও চাকরিতে তথাকথিত নিচু জাতিবর্ণগুলির সংরক্ষণের দাবিতে। পাশাপাশি সংসদে এবং অন্যান্য নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানগুলিতে ‘পিছিয়ে পড়া’ মানুষের জন্য বেশি বেশি আসন সংরক্ষণের দাবিও উঠল। যেহেতু ভারতে বর্ণশুমারি দীর্ঘদিন হয়নি, তাই মন্ডল কমিশন অতীতের হিসাবের আনুমানিক আপডেট করে ভারতে তথাকথিত নিচুবর্ণজাতির সংখ্যা জনসংখ্যার ৫২% বলে ধরে নিয়েছিল। কেন্দ্রে তখন জনতা দলের ভিপি সিংয়ের নেতৃত্বাধীন সরকার। তাঁরা দ্রুত সরকারি চাকরি এবং শিক্ষাক্ষেত্রে ‘অন্যান্য পিছিয়ে পড়া জাত’ (ওবিসি)-এর জন্যে ২৭% সংরক্ষণ ঘোষণা করেন। এর ফলে উচ্চবর্ণের ছাত্রছাত্রী এবং অন্যরা প্রবল বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিলেন সেকথা সবারই স্মরণে থাকার কথা। এই সংঘাতের আবহে দলিত-নিম্নবর্গীয়রাও ঐক্যবদ্ধ হতে শুরু করেন এবং রাজ্যে রাজ্যে জাতিবর্ণের লড়াইভিত্তিক আঞ্চলিক দলগুলি শক্তিশালী হতে শুরু করে। আম্বেদকরের নেতৃত্বাধীন প্রথম পর্যায়ের আন্দোলনের তুলনায় এই দ্বিতীয় আন্দোলনের অনেক সীমাবদ্ধতা ছিল তা আমরা আগেই বলেছি। কিন্তু তা বলে তা মূল্যহীন নয়। সমাজের নিচের স্তরের মানুষ তাঁদের কণ্ঠস্বর খুঁজে পাচ্ছিলেন, কিছুটা অধিকার দাবিদাওয়া মানসম্মানও অর্জিত হচ্ছিল। এর পিছনে মন্ডল রাজনীতির বিপুল ভূমিকা ছিল।

আরো পড়ুন বিকল্প পথে আম্বেদকর

কিন্তু এই ঘটনার দুবছরের মধ্যে ঘটে গেল বাবরি মসজিদ ভাঙার সুপরিকল্পিত ঘটনা এবং তাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সাম্প্রদায়িক বাতাবরণ তৈরি হল। ফলে ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতি শক্তিশালী হয়ে উঠল রাজনৈতিক হিন্দুত্ববাদী বিজেপির হাত ধরে। ব্রাহ্মণ্যবাদীরা চুপ করে বসে থাকার পাত্র ছিল না। ফলে কমন্ডল রাজনীতির নতুন ঝড় আমরা প্রত্যক্ষ করতে শুরু করলাম। এরপর থেকেই ধীরে ধীরে একদিকে কংগ্রেস দুর্বল হতে শুরু করে, অন্যদিকে জাতিবর্ণভিত্তিক আঞ্চলিক দলগুলিও দুর্বল হতে শুরু করে। শক্তিশালী হতে শুরু করে বিজেপি। কংগ্রেসের ভোট শতাংশ ১৯৯৬ সালের ২৮.৮% থেকে কমে ২০১৪ সালে ১৯.৩% এসে দাঁড়ায়। অন্যদিকে আঞ্চলিক দলগুলির ভোট শতাংশ ১৯৯৬ সালের ৪১.৩% থেকে কমে ২০১৪ সালে ৩৯% আসে এবং ২০১৯ সালে আরও কমে ২৬.৪% হয়ে যায়। বিজেপি কিন্তু ১৯৯৬ সালের ২০.৩% থেকে ২০১৯ সালে ৩৭.৪% পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

কংগ্রেসের এই শক্তিক্ষয়ের নানা কারণ আছে। কিন্তু একটা বড় কারণ হল, ১৯৯২ থেকে ২০১৯ – এই ২৭ বছরে কমন্ডল রাজনীতির দাপটে উচ্চবর্ণের সমর্থন ক্রমশ কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপির পক্ষে সংহত হয়েছে। ১৯৯২ সালের পর থেকেই ক্রমে ক্রমে তা ঘটতে থাকে। ১৯৯৬ সালে বিজেপির পক্ষে উচ্চবর্ণের ভোট ছিল ৩৫%। ২০১৯ সালে তা দাঁড়ায় ৬১ শতাংশে। বাবরি মসজিদ ঘটার পরও ১৯৯৬ সালে ২৫% উচ্চবর্ণের ভোট কংগ্রেস পেয়েছিল, কিন্তু ২০১৯ সালে তা কমে ১২% হয়ে যায়।

যদিও এর অর্থ এই নয়, যে শুধুমাত্র উচ্চবর্ণের ভোটকে সংহত করেই বিজেপি শক্তিশালী হল। তা সম্ভবও ছিল না। ভারতের বিপুল সংখ্যক মানুষ তথাকথিত পিছিয়ে পড়া জাতিবর্ণের অন্তর্গত। কিন্তু কমন্ডল রাজনীতি মুসলমানবিদ্বেষী ব্যাপক হিন্দু সাম্প্রদায়িক প্রচার ছড়িয়ে এই তথাকথিত পিছিয়ে থাকা অংশের ভোটকেও নিজের দিকে টেনে আনতে সমর্থ হল। ১৯৯৬ সালে আঞ্চলিক দলগুলির পক্ষে ওবিসি ভোট ছিল ৪৯%, ২০১৯ সালে তা কমে ২৭% হয়ে দাঁড়ায়। অন্যদিকে ১৯৯৬ সালে এই অংশের ভোট বিজেপির ঝুলিতে ছিল ১৯%, ২০১৯ সালে তা বেড়ে হয় ৪৪%। বিশেষজ্ঞরা বললেন, “মন্ডল কমন্ডলে ঢুকে গেছে!”

কৌশল বদল?

বর্ণশুমারি থেকে পাওয়া তথ্যাবলী আমাদের কী দেয়? কোন সত্যের উপর তা আলোকপাত করে? প্রথমত, আমরা জানতে পারি, দেশে কোন জাতের জনসংখ্যা কত? দ্বিতীয়ত আমরা জানতে পারি, তাঁদের হাতে কতটা সম্পদ আছে, কী পরিমাণ চাকরি আছে, কী পরিমাণ জমি আছে ইত্যাদি। প্রথমটি সংখ্যা আর দ্বিতীয়টি অংশীদারী বা ভাগ। এই দুটি তথ্য হাতে এলেই আসল ভারতের চেহারাও সামনে চলে আসে। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়রা জনসখ্যার ক্ষুদ্র অংশ হলেও তাদের হাতেই উচ্চশিক্ষা থেকে শুরু করে চাকরিবাকরির অধিকাংশটাই পুঞ্জীভূত রয়েছে – এই চিত্র দিনের আলোর মতই পরিষ্কার হয়ে যায়। ফলে খুব সহজেই এই দাবিও উঠে যায়, যা আজ উঠছে, “যিসকি জিতনি সংখ্যাভারী উসকি উতনি হিস্যেদারী!” এর অনিবার্য ফল হিসাবে বিজেপির বহু যত্নে ও পরিশ্রমে আড়াই দশক ধরে গড়ে তোলা কমন্ডল রাজনীতি, যার উপর বিজেপির সাফল্য দাঁড়িয়ে রয়েছে, তা দুর্বল হয়ে পড়বে। ফলে রাহুল সঠিকভাবেই আসন্ন পাঁচ রাজ্যের নির্বাচনী প্রচারে জাতভিত্তিক আদমশুমারিকে হাতিয়ার করেছেন। অন্যদিকে মোদীসহ বিজেপি নেতারা একে “বিভাজনের রাজনীতি” বলে আক্রমণ করছেন। কংগ্রেস দলের চিরকালের বৈশিষ্ট্য হল কোনো ইস্যুতেই কোনো স্পষ্ট ও নির্ণায়ক অবস্থান না নেওয়া। কিন্তু এবার পরিষ্কারভাবেই একটি বদল লক্ষ করা যাচ্ছে। এবার অন্তত বর্ণশুমারি করার প্রশ্নে খুব দৃঢ় অবস্থান নিচ্ছে কংগ্রেস। এখন প্রশ্ন হল, এটি কি শুধুই কৌশল বদলের খেলা হিসাবেই থেকে যাবে, নাকি তা মতাদর্শ বদলের রাজনীতিতে উত্তরিত হবে? এটিই আজকের কোটি টাকার প্রশ্ন।

মন্ডল রাজনীতিকে কমন্ডলের রাজনীতি কেন এত সহজে গলাধঃকরণ করে নিতে পেরেছিল? পেরেছিল, কারণ সেই রাজনীতির কোনো বৃহত্তর মতাদর্শ ছিল না। বা বলা ভাল, সমাজের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতি হলেও তা ভুল ও প্রতিক্রিয়াশীল মতাদর্শের উপর দাঁড়িয়ে ছিল। আম্বেদকরের জাতি নির্মূল করার প্রগতিশীল মতাদর্শকে তা জাতি-স্থায়ীকরণের প্রতিক্রিয়াশীল মতাদর্শ দিয়ে প্রতিস্থাপিত করেছিল। কারণ জাতিবর্ণ ব্যবস্থা যতদিন টিকে থাকবে ততদিন সংরক্ষণের দাবিও টিকে থাকবে। সংরক্ষণের রাজনীতিকে ক্ষমতা দখলের রাজনীতিতে উত্তরণের কোনো পরিকল্পনাই তার ছিল না। অর্থাৎ অমন গুরুত্বপূর্ণ একটি আন্দোলন দাঁড়িয়েছিল প্রতিক্রিয়াশীল ধ্যানধারণার উপর। এ এক আজব স্ববিরোধিতা। ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন যেমন একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন, কিন্তু শেষ বিচারে তা সামাজিক উদ্বৃত্তের উপর শ্রমিকশ্রেণির ভাগীদারীর লড়াই। এ লড়াই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তা যদি শুধু তাতেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়, শ্রমিকশ্রেণির ক্ষমতা দখলের রাজনীতিতে উত্তরিত হতে না পারে, তাহলে তা নিশ্চিতভাবে শ্রেণিবৈষম্যকেই স্বীকৃতি দিয়ে ফেলে। ফলে তা শেষ পর্যন্ত বুর্জোয়া রাজনীতির কাছে বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য হয়, তার অধীন হয়ে পড়তে বাধ্য হয়। মন্ডলের রাজনীতিও যার ফলে কমন্ডলের রাজনীতির আরও দক্ষিণপন্থী, আরও প্রতিক্রিয়াশীল মতাদর্শের সামনে ভেঙে পড়ল।

অন্যদিকে কংগ্রেস কেন দুর্বল হয়েছিল? হয়েছিল, কারণ কংগ্রেস কখনোই তথাকথিত উচ্চবর্ণের মানুষের মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ, জাতিভেদবিরোধী আদর্শ জোরের সঙ্গে স্থাপন করার উদ্যোগ নেয়নি। বরং এক নরম হিন্দুত্বের কাঠামোর মধ্যে উচ্চবর্গীয়দের সাম্প্রদায়িক ও বর্ণকেন্দ্রিক মানসিকতাকে প্রশ্রয় দিয়ে গেছে। ফলে বিজেপি খুব সহজেই তার রাজনৈতিক হিন্দুত্বের উগ্রবাদী ঝড়ে এদের ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পেরেছে।

মতাদর্শ ছাড়া রাজনীতি দাঁড়ায় না। কৌশলের পালটা কৌশল হয়, কিন্তু একটা সঠিক মতাদর্শকে হত্যা করা অসম্ভব। ইতিহাস আমাদের নেতাদের কিছু কি শেখাতে পারবে? পারলে বিজেপির মৃত্যঘন্টা স্রেফ সময়ের অপেক্ষা।

*ভোট শতাংশের তথ্যসূত্র: লোকনীতি/ সিএসডিএস, জাতীয় নির্বাচন সমীক্ষা।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.