গত কয়েক বছরে ভারতে নারীদের কর্মস্থলে অংশগ্রহণ সার্বিকভাবে কমে গিয়েছে। বিশ্ব ব্যাংকের তথ্য আমাদের জানাচ্ছে, ২০১০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ভারতের কর্মজীবী নারীর সংখ্যা ২৬ শতাংশ থেকে কমে ১৯ শতাংশ হয়েছে। মাত্র এক দশকে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা ৭ শতাংশ কমে যাওয়া রীতিমতো উদ্বেগজনক বিষয়। মনে রাখতে হবে মহিলাদের চাকরি ছেড়ে দেওয়ার একটি বড় কারণ হল কর্মস্থলে যৌন হেনস্থার ঘটনা।

কর্মস্থলে যৌন হেনস্থার বিরুদ্ধে একটি আইন ভারতে লাগু হয়েছিল ২০১৩ সালের ১০ই ডিসেম্বর। তারপর এক দশক পেরিয়ে গিয়েছে। এই আইন কতটা সাফল্য পেয়েছে তা নিয়ে বিভিন্ন নারী সংগঠন আলোচনার ব্যবস্থা করছে। এই আলোচনা সভাগুলি থেকে যে তথ্য বেরিয়ে আসছে তা কিন্তু যথেষ্ট হতাশাজনক।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

১৯৯৭ সালের সুপ্রিম কোর্টের বিশাখা গাইডলাইনসে বলা হয়েছিল দেশের নারী কর্মীদের নিরাপত্তার জন্য একটি আইন প্রণয়ন করা দরকার। ভারতের সংসদ ১৬ বছর সময় নিয়েছে সেই আইন তৈরি করতে। আইন প্রণয়নের ১০ বছর পরে দেখা যাচ্ছে আবারও সুপ্রিম কোর্টকে এই বিষয়ে নতুন করে নির্দেশ দিতে হচ্ছে, কারণ আইন ঠিকমতো রূপায়িত হচ্ছে না।

২০২১ সালে ন্যাশনাল হিউম্যান হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট একটি সমীক্ষা করে। তাতে দেখা গিয়েছে, মাত্র ৮ শতাংশ কর্মী তাঁদের কর্মস্থলে এই আইনের প্রয়োগ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। ওই সমীক্ষাতেই ১১ শতাংশ নারী কর্মী বলেছেন, যৌন হেনস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ করার বদলে তাঁরা চাকরিই ছেড়ে দেবেন। জাতীয় মহিলা কমিশন ২০১৯ সালের আগে কর্মস্থলে যৌন হেনস্থা সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা কত, সেই তথ্যই রাখতে না। ২০২০ সালে কোভিড অতিমারীর কারণে কর্মস্থলের সংজ্ঞা অনেক মানুষের জন্যেই বদলে যায়। বিরাট সংখ্যক মানুষ ‘ওয়র্ক ফ্রম হোম’ করতে শুরু করেন। ভার্চুয়াল মাধ্যমে কাজের সময় কী ধরনের আচরণকে যৌন হেনস্থা বলা যেতে পারে, তা নিয়ে আলাদা করে আলোচনার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। বিষয়টি এতই জটিল হয়ে ওঠে যে, ‘ওয়র্ক ফ্রম হোম’ করাকালীন কোন সময় মিটিং ডাকা যায়, ভিডিও মিটিং চলার সময় কর্মীরা কী ধরনের পোশাক পরবেন, এগুলি নিয়েও নীতিমালা তৈরির কথাবার্তা শুরু হয়।

বলাই বাহুল্য যেটুকু তথ্য আছে বা যে ধরনের নীতি এখনও পর্যন্ত তৈরি হয়েছে, তার সবই হয়েছে সংগঠিত ক্ষেত্রের জন্য। অথচ এ দেশের মহিলা কর্মী দের মধ্যে ৯০ শতাংশের বেশি অসংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মরত। অবশ্য একদিক থেকে ভাবলে এই অসংগঠিত ক্ষেত্রের নারী শ্রমিকরাও এই আইনের আওতায় পড়ছেন। অর্থাৎ যে মহিলারা গৃহপরিচারিকার কাজ করেন, ছোট দোকানে কাজ করেন বা কলকারখানায় কাজ করেন, তাঁদের সকলের জন্যই এই আইন প্রযোজ্য। এই আইন অনুসারে যে সব কর্মস্থলে ১০ বা তার বেশি সংখ্যক মহিলা কর্মী আছেন, সেখানে ইন্টারনাল কমপ্লেন কমিটি বা আইসিসি তৈরি করতে হবে। গৃহপরিচারিকা, ছোট দোকানের কর্মী বা কোনও কারখানার কর্মী যদি নির্যাতনের শিকার হন, তাহলে তাঁরা কোথায় যাবেন? তাঁদের জন্য তৈরি করতে হবে ‘লোকাল কমিটি’ এবং এই কমিটিগুলি হবে জেলাভিত্তিক। কিন্তু তথ্যের অধিকার আইনের মাধ্যমে প্রশ্ন করে জানা গেল, দেশের মাত্র ২৯ শতাংশ জেলা এই লোকাল কমিটি তৈরি করেছে। বাকি ৭১ শতাংশ জেলা এমন কোনও কমিটি তৈরিই করেনি। ফলে অধিকাংশ জায়গায় নারী কর্মীদের কর্মস্থলে হেনস্থার ব্যাপারে অভিযোগ জানানোর পরিসরই তৈরি হয়নি। দিল্লি বা মুম্বাইয়ের মতো বড় বড় শহরেও লোকাল কমিটি তৈরি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেখানেও সমস্যা অনেক। ওই সব বড় শহরের স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার প্রতিনিধিরা জানাচ্ছেন, কমিটি তৈরি হলেও তার বৈঠক করার জন্য কোন নির্দিষ্ট ঘর নেই৷ কোনো বাজেট বরাদ্দ নেই। ফলে এই কমিটিগুলি নাম-কা-ওয়াস্তে কমিটিতে পরিণত হয়েছে।

এই রাজ্যের ছবিটা ঠিক কেমন? পশ্চিমবঙ্গের জুটমিলগুলিতে এই বিষয়ে যৌথভাবে সমীক্ষা চালিয়েছে ‘সংহিতা’ এবং নাগরিক মঞ্চ। এই সমীক্ষার রিপোর্ট থেকে জানা যাচ্ছে, জুট মিলে যৌন হেনস্থা প্রায়ই ঘটে। যদিও খুব কম জনই ঘটনার কথা স্বীকার করতে রাজি হযন। মহিলাকর্মীরা বিভিন্ন ধরণের হেনস্থার কথা শোনালেও ট্রেড ইউনিয়নের সঙ্গে বৈঠকের সময় বোঝা যায়, তাঁরা অধিকাংশ সময় এই ধরনের ঘটনার খবর রাখেন না। ‘ও সব আমাদের এখানে হয় না, অন্য সেক্টরে বেশি হয়’- এই ধরনের কথাবার্তাই প্রতিষ্ঠিত ট্রেড ইউনিয়ন নেতাদের মুখে শোনা যায়, যদিও বাস্তবের ছবিটা একেবারেই অন্যরকম।

খানিকটা ‘এলিট’ কর্মস্থলেও ছবিটা দুঃখজনক। ২০২১ সালের ৮ মার্চ ‘সংহিতা’ এবং ‘সাউথ এশিয়ান ওমান ইন মিডিয়া’ যৌথভাবে একটি সমীক্ষার খসড়া রিপোর্ট পেশ করে। এই রিপোর্টে পশ্চিমবঙ্গের মহিলা সংবাদকর্মীদের কর্মস্থলের অভিজ্ঞতার কথা বিস্তৃতভাবে লেখা হয়েছে। সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে ৫৬ শতাংশ মহিলা সংবাদকর্মী যৌন হেনস্থার শিকার হয়েছেন কর্মক্ষেত্রে। অর্থাৎ প্রতি ১০ জন মহিলা মিডিয়াকর্মীর মধ্যে প্রায় ৬ জন যৌন হেনস্থার মুখোমুখি হন। নির্যাতিতাদের মাত্র ২০ শতাংশ মহিলা অভ্যন্তরীণ কমিটির কাছে অভিযোগ জানিয়েছেন, বাকিরা জানাননি। মহিলা সংবাদকর্মীদের একাংশ এ কথাও জানান, অভিযোগ করলে চাকরি চলে যাবার ভয় রয়েছে। তাছাড়াও নিয়মিত তাঁদের অপমান ও বিদ্রুপ শুনতে হয়। ৩৬.৭ শতাংশ মহিলা জানিয়েছেন, তাঁদের কর্মস্থলে যৌন হেনস্থা বিরোধী নীতিমালা আছে। ৩৩.৩ শতাংশ জানিয়েছেন, তাঁদের কর্মস্থলে যৌন হেনস্থার বিরুদ্ধে কোন গাইডলাইনের অস্তিত্ব নেই। বাকি ৩০ শতাংশ জানিয়েছেন, তাঁরা নিজেরাই জানেন না আদৌ এই সংক্রান্ত কোনও নীতিমালা বা গাইডলাইন আছে কি না।

এ কথা পরিষ্কার বোঝা যাযয় যে, জুটমিল কর্মী থেকে শুরু করে মহিলা সাংবাদিক- সকলেই মারাত্মক রকমের লিঙ্গ বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। প্রতিবাদ করতে গেলে জুটছে অপবাদ, চরিত্রহনন। সঙ্গে রয়েছে কাজ হারানোর ভয়। এই রকম বৈরি পরিস্থিতিতে খুব কম মহিলাই এগিয়ে এসে অভিযোগ জানাতে পারছেন। আরো চিন্তার বিষয় হল, শ্রমিক সংগঠনগুলিও এই সমস্যাকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দিচ্ছেন না। অনেক সময় ‘মেয়েদের সমস্যা’ বলে এড়িয়ে যাচ্ছেন। শ্রম সংক্রান্ত অন্যান্য আইন নিয়ে তাঁরা যতখানি স্পষ্ট উচ্চারণ করেন, যতখানি তীব্রতায় সরব হন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই আইন নিয়ে তাঁরা তেমন সোচ্চার নন।

কর্মস্থলে নারীদের সংখ্যা কমে যাওয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হল কর্মস্থলে যৌন হেনস্থার। অথচ বিষয়টি তেমন গুরুত্ব পায় না। মি টু আন্দোলনের সময় যে মহিলারা খোলাখুলি নির্যাতনের অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলেছেন, তাঁদের প্রতি অনেকেই খড়গহস্ত হয়ে ওঠেন। অনেকে সমালোচনা করেন যে, ওই মহিলারা সঠিক পদ্ধতিতে বিচার চাইতে পারতেন৷ তা না করে সোস্যাল মিডিয়ায় দোষারোপ করছেন। কিন্তু এই তথাকথিত ‘সঠিক পদ্ধতি’ যে ন্যায়বিচারের সামনে কত বড় পাঁচিল তৈরি করে রেখেছে, তা এই সব সমীক্ষাগুলো থেকে জানা যায়। নারী ক্ষমতায়নের কথা সকল রাজনৈতিক দল মুখে বলে থাকে ঠিকই, কিন্তু বাস্তবে কি আদৌ যৌন হেনস্থা মুক্ত কর্মস্থল নিশ্চিত করতে আদৌ কোনও কার্যকর পদক্ষেপ করেন?

~ মতামত ব্যক্তিগত

আরো পড়ুন:

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.