জম্মু-কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা রদকে বৈধ বলে রায় দিল দেশের সর্বোচ্চ আদালত। সন্দেহ নেই, লোকসভা নির্বাচনের আগে এই রায়,  বিজেপির বড় রাজনৈতিক জয়। সংঘ পরিবার তথা বিজেপির দীর্ঘদিনের এই দাবি বাস্তবায়িত হয়েছিল ২০১৯ সালে। দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পরেই তারা জম্মু-কাশ্মীরকে ভেঙ্গে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল করেছিল।  তার সঙ্গে রদ করা হয়েছিল ৩৭০ ধারা এবং তারই অন্তর্ভুক্ত ৩৫ এ। রাজ্যবাসী, নির্বাচিত সরকারের মতামত না নিয়ে এভাবে একটি রাজ্যকে ভেঙ্গে দিয়ে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল করে দেওয়া, ৩৭০ ধারা রদ করা নিয়ে তখন থেকেই রাজনৈতিক বিতর্ক চলছে। বিজেপি তার মোকাবিলায় উগ্র জাতীয়তাবাদ ও হিন্দুত্ববাদকে সম্বল করেছে। যার আবশ্যিক অঙ্গ হল ইতিহাসের বিকৃতি, তথ্য নিয়ে চরম মিথ্যাচার।

 

সুপ্রিম কোর্ট ৩৭০ ধারা রদের সিদ্ধান্তকে বৈধতা দিলেও এর পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। কিন্তু, চূড়ান্ত রায়দানে মনে হয়েছে, পদ্ধতি বা ইতিহাস এসব গৌণ, যেনতেন প্রকারে ৩৭০ ধারা রদটাই মুখ্য। তার জন্য সুপ্রিম কোর্টের অতীতের অবস্থানের বিপরীতে হাঁটতেও তাঁদের আপত্তি নেই। কেবল সরকার নয়, বিচারব্যবস্থা, প্রচার মাধ্যম থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের যাবতীয় প্রতিষ্ঠানগুলির চরিত্র যে বদলে যাচ্ছে তা এই ঘটনায় আবার প্রমাণিত হল। অনেক সংবাদমাধ্যম একে জম্মু-কাশ্মীরের ভারতে অন্তর্ভুক্তিকরণ বলছে। কেউ বলছে জম্মু-কাশ্মীরে ভারতের অধিকার জন্মাল। যেন জম্মু-কাশ্মীর এতদিন ভারতের অংশ ছিল না! আবার তথাকথিত উদারবাদী সংবাদমাধ্যমের সংবাদ পরিবেশনে মনে হচ্ছে, ৩৭০ ধারার প্রয়োজনীয়তা এখন আর নেই। উদার, উগ্র সকলেই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একই কথা বলছে। অথচ, সেই রাজ্যের মানুষের, নির্বাচিত সরকারের মতামত জানার প্রসঙ্গটি সকলের কাছেই গুরুত্বহীন। জম্মু-কাশ্মীরের ভারতে অন্তর্ভুক্তিকরণের সঙ্গে যে মতামত গ্রহণের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। স্বৈরাচারের বীজ লুকিয়ে থাকে এখানেই।

 

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

আবার জম্মু-কাশ্মীরকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলেও চলবে না। ভারতের অনেক অঞ্চলই সরাসরি ব্রিটিশ শাসনাধীন ছিল না। রাজা, নবাব ইত্যাদিরা শাসন করতেন। যদিও ব্রিটিশদের প্রভাব একেবারে ছিল না, তা নয়। এমন দেশীয় রাজ্য ছিল ৫৬২টি। দেশভাগের সময়ে এই রাজ্যগুলি ভারত না পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হবে, সেই প্রশ্ন উঠেছিল। জুনাগড়, হায়দ্রাবাদ, জম্মু-কাশ্মীরের ক্ষেত্রে সমস্যার সমাধান করা যায়নি। জুনাগড় ও হায়দ্রাবাদকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করার  পক্ষে বড় যুক্তি ছিল, এগুলির ভৌগোলিক অবস্থান ও ধর্মীয় জনবিন্যাস। জুনাগড় ও  হায়দ্রাবাদের শাসক ছিলেন মুসলমান ধর্মাবলম্বী। নাগরিকদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলেন হিন্দু। হায়দ্রাবাদের ক্ষেত্রে ভৌগোলিকভাবে পাকিস্তানের সঙ্গে সংযোগের কোনো প্রশ্নই নেই। জুনাগড়ের ক্ষেত্রেও ভৌগোলিক অবস্থান ও জনবিন্যাস ছিল, ভারতের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পক্ষে। এই দুই রাজ্যের ক্ষেত্রে শাসকের নয়, মানুষের মতামতকে ভারত সরকার গুরুত্ব দিয়েছিল।
গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলে সেটাই সমর্থনযোগ্য। জুনাগড়ের নবাব পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হতে চেয়েছিলেন। ১৯৪৭ সালেই সামরিক অভিযানের মাধ্যমে ভারত জুনাগড়কে  কার্যত নিজের অধীনে নেয়। ১৯৪৮ সালের গণভোটে একপ্রকার সর্বসম্মতিক্রমেই সেখানকার মানুষ  ভারতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পক্ষে রায় দেয়। ১৯৪৯ সালে জুনাগড় আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। সামরিক অভিযানের মাধ্যমে নবাবকে ক্ষমতাচ্যুত করে ভারত হায়দ্রাবাদকে নিজের অন্তর্ভুক্ত করেছিল। কিন্তুনভারত ও পাকিস্তান দুই দেশের শাসকের কাছে এই অন্তর্ভুক্তিকরণের সঙ্গে ভৌগোলিক অবস্থান ও জনবিন্যাসের থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল ভূখণ্ড প্রসারের তাগিদ। জম্মু-কাশ্মীরের ক্ষেত্রে যা প্রকাশ্যে চলে আসে।

 

পাকিস্তান প্রথম থেকেই জম্মু-কাশ্মীরের দাবি জানিয়ে আসছিল। ভৌগোলিক অবস্থান ও জনবিন্যাস ছিল অনেকখানি তার পক্ষে। রাজা হরি সিং প্রাথমিকভাবে ভারত বা পাকিস্তান কোনো দেশেরই অন্তর্ভুক্ত হতে চান নি। পাকিস্তানের মদতে উত্তর-পশ্চিম অঞ্চল থেকে জম্মু-কাশ্মীরে উপজাতিদের হামলা, পুঞ্চে অশান্তি, জম্মুতে উদ্বাস্তু সমস্যা – সব মিলিয়ে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তাতে ভারতের সাহায্য না চেয়ে রাজা হরি সিং এর উপায় ছিল না। ১৯৪৭ সালের অক্টোবরে তিনি ভারতে অন্তর্ভুক্তিকরণের চুক্তি করেন। যদিও সেই চুক্তি ছিল সাময়িক। পরবর্তীতে জম্মু-কাশ্মীর স্বাধীন থাকবে না কোনো দেশের অন্তর্ভুক্ত হবে, তা নিয়ে গণভোটের কথা বলা হয়েছিল।

 

১৯৪৮ সালে ভারত রাষ্ট্রসঙ্ঘে কাশ্মীরের প্রসঙ্গ তোলে। রাষ্ট্রসঙ্ঘ কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে ভারত-পাকিস্তানকে  যুদ্ধবিরতি করতে এবং গণভোটের পরামর্শ দেয়। ১৯৪৮ সালে রাজা হরি সিং, শেখ আবদুল্লাকে প্রধানমন্ত্রী করে  জম্মু-কাশ্মীরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ঘোষণা করেন। জম্মু-কাশ্মীরের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক, রাজ্যটির বিশেষ মর্যাদা এইসব চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে সেই সময় বড় ভূমিকা নিয়েছিলেন সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল। তাঁর বাসভবনেই শেখ আবদুল্লার সঙ্গে ভারত সরকারের বৈঠক হয়েছিল। বিজেপি আজ একদিকে সবকিছুর জন্য নেহরু ও  কংগ্রেসকে দায়ী করছে, আবার বল্লভভাই প্যাটেলকে লৌহপুরুষ বলছে। দেশীয় রাজ্যগুলি অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে ভারত ও পাকিস্তান দুই দেশের কাছেই দর কষাকষির হাতিয়ার ছিল জম্মু-কাশ্মীর, জুনাগড় ও হায়দ্রাবাদ। মহম্মদ আলি জিন্নার প্রস্তাব ছিল জুনাগড় ভারত নিয়ে জম্মু-কাশ্মীর পাকিস্তানকে দিয়ে দিক। আবার বল্লভভাই প্যাটেল নাকি বলেছিলেন যে, পাকিস্তান হায়দ্রাবাদ নিক। জুনাগড়, জম্মু-কাশ্মীর ভারতের হোক। দুই দেশের  কূটনীতির এই কূটকচালিতে জম্মু-কাশ্মীরের বাসিন্দারা মতামত জানানোর কোনো সুযোগই পান নি।

 

৩৭০ ধারার খসড়া প্রস্তুতির দায়িত্ব পেয়েছিলেন, মহারাজা হরি সিং-এর প্রাক্তন দেওয়ান, এন গোপালস্বামী  আয়েঙ্গার। উল্লেখ্য সেই সময়ের ভারতের মন্ত্রীসভার ও গণ পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী কিন্তু ৩৭০ ধারা নিয়ে কোনো আপত্তি করেননি। একমাত্র, আপত্তি করেছিলেন, মৌলানা হসরত মোহানি। আপত্তির কারণ ছিল অন্য। তিনি চেয়েছিলেন, কেবল জম্মু-কাশ্মীর নয়, সব রাজ্যেরই স্বশাসনের জন্য একটি মডেল  অনুসৃত হোক। আজ বিজেপি জম্মু-কাশ্মীর প্রসঙ্গে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর ভূমিকা নিয়ে অনেক কথা বলে। কিন্তু বলে না যে, তিনিও সেদিন ৩৭০ ধারা সমর্থন করেছিলেন। ১৯৪৯ সালে গৃহীত সংবিধানে ৩৭০ ধারা স্থান পায়। যা কার্যকরী হয় ১৯৫০ সালের ১৫ ই আগস্ট। এই ধারারই অন্তর্ভুক্ত ৩৫ এ ধারা অনুসারে জমি কেনাবেচা, চাকরিসহ বেশ কয়েকটি বিষয়ে জম্মু-কাশ্মীরের বাসিন্দাদের রক্ষাকবচ দেওয়া হয়েছিল। ৩৭০ ধারা অনুসারে প্রতিরক্ষা, বৈদেশিক বিষয় ও যোগাযোগ এই তিনটি ক্ষেত্র কেবল ভারত সরকারের এক্তিয়ারে ছিল। জম্মু-কাশ্মীরের সংবিধান রচনার দায়িত্ব পায় সাংবিধানিক সভা। সাংবিধানিক সভার অনুমোদন ছাড়া ভারত সরকারের কোনো আইন এখানে প্রযোজ্য হওয়ার কথা নয়। জনপ্রতিনিধিদের মতামতকে এই ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়ার কথা ছিল।

 

কিন্তু, জম্মু-কাশ্মীরের জনমতকে কার্যত কোনো মর্যাদা দেওয়া হয় নি। ১৯৫০ সালে সংবিধান কার্যকরী হওয়ার পরেও ভারত সরকার গণভোটের আশ্বাস দিয়েছিল। কিন্তু, তা কার্যকরী হয়নি। অথচ, কেবল জুনাগড় নয়, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ও সিলেটেও এই প্রশ্নে গণভোট হয়েছিল। তার প্রেক্ষাপট যদিও ছিল আলাদা। বরং জম্মু-কাশ্মীরে নির্বাচিত সরকার বারে বারে ফেলে দিয়ে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি, সশস্ত্র বাহিনীর বিশেষ ক্ষমতা আইন (আফস্পা) জারি করে রাজ্যবাসীদের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। স্বাধীনতার পর জম্মু-কাশ্মীর সব মিলিয়ে প্রায় তেরো বছর রাষ্ট্রপতি শাসনাধীন থেকেছে। ভারত, পাকিস্তান, রাষ্ট্রসংঘ কোনো পক্ষই জম্মু-কাশ্মীর সমস্যার স্থায়ী সমাধান চায়নি। কার্যত এই রাজ্যে স্থায়ী যুদ্ধক্ষেত্র করে রেখেছে। সামরিক দাপটে ব্রাত্য হয়ে গেছেন নাগরিকরা।

 

পাকিস্তানের মদতে রাজনৈতিক ইসলাম সেখানে ভিত শক্ত করেছে।পাশাপাশি একে কাজে লাগিয়েছে হিন্দুত্ববাদ। সাম্প্রতিক অতীতে বিজেপি, পিপলস ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (পিডিপি) সঙ্গে জোট করে কিছুকাল রাজ্যের শাসন ক্ষমতাতেও থেকেছে। ন্যাশনাল কনফারেন্স বা পিডিপি’র মতো আঞ্চলিক দলগুলিও মানুষের ক্ষোভকে কাজে  লাগিয়ে ক্ষমতা ভোগ করেছে। মানুষের আশা-আকাঙ্খাকে মর্যাদা দেয় নি। জোট রাজনীতির যুগে জাতীয় রাজনীতিতে তাদের গুরুত্ব বেড়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের গুরুত্ব বাড়েনি। গণভোটের প্রতিশ্রুতি কার্যকরী না করে, সামরিক বাহিনীর আধিপত্য বাড়িয়ে কংগ্রেস জম্মু-কাশ্মীর নিয়ে যে নীতি গ্রহণ করেছিল, তারই সুযোগ আজ নিল বিজেপি।

 

বিজেপির প্রচারে মনে হচ্ছে যেন জম্মু-কাশ্মীরই একমাত্র বিশেষ রাজ্যের মর্যাদা পেয়েছিল। প্রথমে তিনটি ক্ষেত্রে  ভারত সরকারের নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা থাকলেও, কালক্রমে তা বাড়িয়ে ৩৭০ ধারাটাকেই সে রাজ্যে অনেকখানি গুরুত্বহীন করে ফেলা হয়েছিল। সংবিধানের ৩৭১ ধারা অনুসারে সিকিম, আসাম, নাগাল্যান্ড, মণিপুর, অরুণাচল প্রদেশ সহ বারোটি রাজ্যের বিশেষ মর্যাদা আছে। অনেক রাজ্যে যেতে গেলে অনুমোদন লাগে। পঞ্চম ও ষষ্ঠ তফশিলীভুক্ত এলাকার ক্ষেত্রে জমি কেনাবেচায় নানা বিধিনিষেধ রয়েছে। বিশেষ কয়েকটি জনজাতির ক্ষেত্রেও এই অধিকার রয়েছে। এইসবই করা হয়েছে বৈচিত্রময় এই দেশে,  বিভিন্ন জনজাতির এবং অঞ্চলের সাংস্কৃতিক, আর্থিক, রাজনৈতিক অধিকার রক্ষার স্বার্থে। এটাই ছিল ভারতের সংবিধানের মূল সুর। জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা তাই বিচ্ছিন্ন নয়। তা সাময়িক ছিল, কিন্তু তারসঙ্গে জনমত গ্রহণের অঙ্গীকারও ছিল। জনমত নেওয়া হল না, ৩৭০ ধারাকে ধীরে ধীরে গুরুত্বহীন করা হল। আর তারপর সাময়িক বলে, সেই ৩৭০ ধারাই রদ করে দেওয়া হল। সংবিধানের মূল সুরকেই এভাবে ধ্বংস করা হচ্ছে।

 

সুপ্রিম কোর্টের রায়দানেও সাময়িক বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অথচ, তারই সঙ্গে যে ভারতে জম্মু-কাশ্মীরের অন্তর্ভুক্তিটাই অস্থায়ী ছিল সেটা উহ্য রইল। ১৯৬৮ সালে এক মামলায় সুপ্রিম কোর্ট ৩৭০ ধারা বহাল রাখার পক্ষে রায় দিয়েছিল। ১৯৭৩ সালে সর্বোচ্চ আদালত, এক মামলায় ভারতের সংবিধানকে যুক্তরাষ্ট্রীয়  কাঠামো সমম্বিত সংবিধান বলে। ২০১৬ সালে বলা হয়েছিল যে, ৩৭০ ধারা খারিজে বিধানসভার সম্মতি প্রয়োজন। ২০১৮ সালে জম্মু-কাশ্মীরে পিডিপি সরকারের ওপর থেকে সমর্থন তুলে নেয় বিজেপি। রাজ্যপালের  শাসন জারি হয়। এরপর হয় রাষ্ট্রপতি শাসন। ২০১৯ সালে সংসদে ৩৭০ ধারা রদ করে, জম্মু-কাশ্মীরকে ভেঙ্গে দিয়ে কেন্দ্র শাসিত অঞ্চল করার ঠিক আগেই রাজ্যজুড়ে চলে সন্ত্রাস। অঘোষিত এক জরুরি অবস্থা। সেই সময়ের রাজ্যপাল সতপাল মালিক তখন সামরিকরাজ কায়েমে প্রধান ভূমিকা পালন করেছিলেন। এখন তিনি সুর বদলে সংঘ পরিবারের বিরাগভাজন হয়েছেন। তাঁর এখনকার অভিযোগে স্পষ্ট হয়েছে, ৩৭০ ধারা রদের প্রক্রিয়া পরিকল্পিতভাবেই নেওয়া হয়েছিল। পিডিপি সরকারের থেকে সমর্থন তুলে নেওয়া ছিল যার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

 

প্রায় পাঁচ বছর অতিক্রান্ত। এখনও জম্মু-কাশ্মীরে কেন্দ্রীয় শাসন চলছে। বিরোধী নেতাদের কারাবন্দী বা গৃহবন্দী  রেখে, সাংবাদিকদের কারাবন্দী করে, সাধারণ মানুষের মত প্রকাশের ন্যূনতম অধিকারটাও কেড়ে নিয়ে কেন্দ্রের দাবি জম্মু-কাশ্মীর শান্ত হয়েছে। রাষ্ট্রের চোখে শান্তি বা স্বাভাবিকতার সংজ্ঞাটাই অন্য। রাষ্ট্রের বাধ্য থাকা বা থাকতে বাধ্য হওয়া, প্রতিবাদ না করাই শান্তিপূর্ণ থাকার লক্ষণ। গণতন্ত্রের সঙ্গে যার সম্পর্ক সম্পূর্ণ বিপরীত। রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করে রাজ্য সরকারকে এড়িয়ে ঘুরপথে কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়ার এই প্রবণতার পরিণতি  মারাত্মক। কেবল জম্মু-কাশ্মীর নয়, আগামীদিনে এভাবে অনেক রাজ্যেরই অধিকার খর্ব করা যেতে পারে। এমনকী রাজ্যকে ভেঙ্গেও দেওয়া যেতে পারে।

 

৩৭০ ধারা রদ বৈধতা পাওয়ার অর্থই হল, আগামীদিনে অন্য রাজ্যগুলির বিশেষ মর্যাদা কেড়ে নেওয়ার আশঙ্কা। যে কোনো সময়ে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করে, নির্বাচিত সরকারকে গ্রাহ্য না করে কেন্দ্রীয় সরকার তা করতে পারে। এমনিতেই ধর্মীয়, উপজাতি, ভাষাগত দাঙ্গার মাধ্যমে বিজেপি উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলিতে অশান্তি জিইয়ে রেখেছে। অশান্তি যত বেড়েছে, তত বেড়েছে সামরিক, আধা সামরিক বাহিনীর সক্রিয়তা। রাজ্য প্রশাসনের গুরুত্ব গেছে কমে। এনআরসি-সিএএ’র মাধ্যমে সেই অশান্তি আরও বাড়ানো  হয়েছে। একদিকে ভারতবাসীকে জম্মু-কাশ্মীরে জমি কেনার স্বপ্ন দেখানো হচ্ছে। আরেকদিকে এনআরসি’র মাধ্যমে বহু নাগরিককে বেনাগরিক করার পরিকল্পনা হচ্ছে। বাংলা ভাগের পরিকল্পনাও তাদের আছে। জম্মু-কাশ্মীরের  মতো রাষ্ট্রপতি শাসনের মাধ্যমে তা করার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

 

এক দেশ এক আইনের স্লোগান দিয়ে সংবিধানের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো ধ্বংস করা, বিজেপি তথা সংঘ পরিবারের রাজনৈতিক কর্মসূচি। এভাবেই জমি কেনাবেচায় বিধি নিষেধ তুলে দিতে পারলে, রাজ্য সরকার বা স্বশাসিত আঞ্চলিক পরিষদ বা সংস্থাগুলির ক্ষমতা কেড়ে নিতে পারলে সেই রাজনৈতিক কর্মসূচি কার্যকরী করার পথে অনেকটাই এগোনো যাবে।

 

সঙ্ঘ পরিবারের এই রাজনীতি কর্পোরেট মহলকেও লাভবান করবে। জমি কেনা বেচায় নিষেধ, বিভিন্ন রাজ্যের বিশেষ মর্যাদা তুলে দিলে পুঁজি বিনিয়োগের সুবিধে। জমিসহ প্রাকৃতিক সম্পদ লুট অবাধ হবে। জম্মু-কাশ্মীরের মতো প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ রাজ্যে ৩৭০ ধারা ও ৩৫ এ ধারা রদে তাদেরও স্বার্থ রয়েছে। এভাবেই প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ নানা জনজাতি, উপজাতি অধ্যুষিত এলাকা দখলের সুবিধা। পরিবেশ আইন, বন আইন, বনাধিকার আইন সংশোধন করে তাদের এমনিতেই অনেক সুবিধে করে দেওয়া হয়েছে। এবার এক দেশ, এক আইনের নামে ৩৭০, ৩৭১ ধারা  বা পঞ্চম, ষষ্ঠ তফশিলীভুক্ত এলাকার বিশেষ মর্যাদা কেড়ে পুঁজির পথকে  আরও সুগম করা হবে। সংবিধানের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো আজ পুঁজি আগ্রাসনের পথে বড় বাধা।

 

সুপ্রিম কোর্ট ৩৭০ ধারা রদকে বৈধতা দিয়ে সেই রাজনৈতিক কর্মসূচিকেই মান্যতা দিল। আগে রাম মন্দির প্রসঙ্গে সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র এবং বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ গড়ার রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার প্রশ্নের মুখে পড়েছিল। এবার প্রশ্নের মুখে পড়ল সংবিধানের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো। রাষ্ট্রই আজ তার সংবিধান, আইনকে বিপরীত অভিমুখে বদলে দিচ্ছে।
– মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.