“আমরা যাইনি ম’রে আজো— তবু কেবলি দৃশ্যের জন্ম হয়।” প্রতিনিয়ত দৃশ্যের জন্ম হচ্ছে আজকের ভারতে। বছর তিনেক আগে উত্তরপ্রদেশের হাথরাসে এক দলিত মেয়ের ধর্ষণের প্রমাণ লোপাটের জন্য রাষ্ট্রীয় পাহারায় বহ্ন্যুৎসবের দৃশ্য দেখেছিলাম। কয়েক মাস আগে দেখলাম মণিপুরে কুকি মহিলাদের নগ্ন করে গোটা গ্রাম ঘোরানোর দৃশ্য। লোভ আর ঘৃণার হাত তাঁদের গোপনাঙ্গকে প্রকাশ্যে লাঞ্ছিত করে চলেছিল। আর এই কদিন আগে, ২৭ সেপ্টেম্বর, দেখলাম মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনীতে এক নাবালিকা মেয়ে ধর্ষিত হওয়ার পর অর্ধনগ্ন অবস্থায় বারবার সাহায্য চাইছে, আর বারবার প্রত্যাখ্যাত হচ্ছে

একটা কথা সোজাসুজি বলাই ভাল। যতই সালঙ্কারা দেবীকে সোনার মন্দিরে সাজিয়ে পুজো করা হোক কিংবা ইসরোর শাড়ি পরিহিতা বৈজ্ঞানিকদের নিয়ে হইচই করা হোক, আজকের ভারতবর্ষ মহিলাদের জন্য মোটেই নিরাপদ নয়। সরকারি তথ্যই বলছে, ২০২১ সালে প্রতিদিন গড়ে ৮৬ জন মহিলা ধর্ষিত হয়েছেন (২০২২ সালের তথ্য এবছর প্রকাশিত হওয়ার কথা, এখনো হয়নি), যার মধ্যে চারজন নাবালিকা। ধর্ষণ ছাড়াও মহিলাদের প্রতি অন্যান্য অপরাধের পরিসংখ্যানও ভারতে ভয়াবহ। বস্তুত, ২০১০ সাল থেকে ভারতে প্রতি বছর ধর্ষণের সংখ্যা ব্যতিক্রমহীনভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে; আর ২০১৩ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত, ২০২০ সাল বাদ দিয়ে, এই সংখ্যা ৩০ হাজারের বেশি

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

ধর্ষণ করার বিকৃত মানসিকতার উৎস কী, তা নিয়ে মনোবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীরা প্রতিনিয়ত ভাবছেন এবং গবেষণা করছেন। আমার এই প্রবন্ধ সে বিষয়ে নয়। আমি অন্য একটি দিকে আলোকপাত করতে চাই। ভারতের মত পিছিয়ে পড়া দেশে বরাবরই মেয়েরা ঘরে বাইরে নির্যাতনের শিকার হয়ে এসেছেন। স্বাধীনতার এতবছর পরেও তা কমেনি, বরং বেড়েছে এবং ক্রমাগত বাড়ছে। কিন্তু ২০১৪ সালের পর থেকে রাষ্ট্র তথা প্রশাসন ভারতে ধর্ষণের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া দূরে থাক, বরং বহু ক্ষেত্রে তার পক্ষেই দাঁড়াচ্ছে এবং সেটা করা হচ্ছে কোনোরকম রাখঢাক না রেখেই। এর আগে তাও আফস্পার মত বিশেষ আইনের দোহাই দেওয়ার মত চক্ষুলজ্জা রাষ্ট্রের ছিল, এখন তাও নেই। এটাই আগের নারী নির্যাতনের সঙ্গে ‘নতুন’ ভারতের নারী নির্যাতনের মৌলিক পার্থক্য।

বিষয়টাকে উদাহরণের সাহায্যে বুঝে নেওয়া যাক। ধর্ষণের ঘটনা তো এদেশে বিরল নয়, কিন্তু ২০১৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির আগে ধর্ষকদের মুক্তির দাবিতে কখনো জাতীয় পতাকা হাতে মিছিল হয়েছে? সহস্র শহিদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের স্বাধীনতা। ২০২২ সালের সেই স্বাধীনতা দিবসেই বিলকিস বানোর ধর্ষকদের মেয়াদপূর্তির আগে জেল থেকে ছেড়ে দেওয়া হল। এমনটা হয়েছে কখনো ৭৫ বছরের স্বাধীন ভারতবর্ষে? হাথরাস আর মণিপুরের রাষ্ট্রসমর্থিত সন্ত্রাসের কথা তো আগেই উল্লেখ করেছি।

অবশ্য এটা তেমন আশ্চর্যের নয়। আজকের শাসক দলের টিকি বাঁধা যে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের কাছে, তার অন্যতম গুরু বিনায়ক দামোদর সাভারকর ধর্ষণকে রাজনৈতিক অস্ত্র মনে করতেন। ২০১৪ সালে তৎকালীন বিজেপি সাংসদ এবং বর্তমানে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ তাঁর ওয়েবসাইটে লিখেছিলেন, নারীকে স্বাধীনতা দেওয়া ঠিক নয়, তাকে রক্ষা করতে হবে। এমন মানসিকতা যে সংগঠনের মূল ভিত্তি, তারা ধর্ষণকে রাষ্ট্রীয় মদত দেবেই। এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই।

আশ্চর্য হতে হয় যখন দেখি সংঘের সঙ্গে আপাত সম্পর্কহীন কোনো দলও ধর্ষণের বিরুদ্ধে নয়, রাষ্ট্রীয় উদাসীনতার মাধ্যমে ধর্ষণের পক্ষেই অবস্থান নেয়। আমি বলছি পশ্চিমবঙ্গের কথা। মুখ্যমন্ত্রী ২০১৪ সালের আগেই ধর্ষণকে “সাজানো ঘটনা” বলেছেন। শাসক দলের মহিলা সাংসদ ধর্ষিতার প্রতি অবমাননাকর মন্তব্য করেও আরও দু দফা সাংসদ নির্বাচিত হয়েছেন। নাবালিকা ধর্ষিতার সম্পর্কেও গর্হিত মন্তব্য করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। আজ মহিলাদের জন্য কলকাতা ভারতের সবচেয়ে নিরাপদ শহর হতে পারে, কিন্তু ধর্ষণ এমন প্রশাসনিক উৎসাহ পেলে কতদিন তা থাকবে?

প্রশ্ন উঠতে পারে, সাভারকর তো মুসলমান মহিলাদের বিরুদ্ধে ধর্ষণকে রাজনৈতিক অস্ত্র বলেছিলেন। উজ্জয়িনীর ঘটনায় সে প্রসঙ্গ টেনে আনার দরকার কী? ওই ঘটনার কোনো সাম্প্রদায়িক দিক তো পাওয়া যায়নি, ধৃত ব্যক্তিও কোনো হিন্দুত্ববাদী নয়। পুলিসও ব্যবস্থা নিয়েছে। তাহলে উজ্জয়িনী নিয়ে লিখতে গিয়ে এইসব প্রসঙ্গ টেনে আনছি কেন? প্রথমত, রাষ্ট্র যখনই কোনো একজন ধর্ষকের পক্ষে অবস্থান নেয়, তা অন্য ধর্ষকদের বুকের বল বাড়িয়ে দেয়। সাধারণ ধর্ষকরা সাভারকরের উক্তি জানে না, কিন্তু তারা বুঝে ফেলে যে ধর্ষণ করলেও তার বিরাট কোনো বিপদ হবে না। দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রনেতারা যতই সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক লক্ষ্যে ধর্ষণকে ব্যবহার করতে চান না কেন, ধর্ষকের ধর্ষণ করার ইচ্ছাটা একেবারেই অসাম্প্রদায়িক ও দলনিরপেক্ষ। তাই আজ যে কেবল সংখ্যালঘু মহিলাদের উপর নির্যাতন চালাচ্ছে, সুযোগ পেলেই সে সংখ্যাগুরু মহিলাদের উপরেও ঝাঁপিয়ে পড়বে, এমনকি নাবালক ছেলেদের ধর্ষণ করতেও পিছপা হবে না। সেদিন কিন্তু এই রাষ্ট্রনেতারা তাঁদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না, চাইবেনও না হয়ত। উজ্জয়িনীর ঘটনা সেই অদূর ভবিষ্যতের পূর্বাভাস দিয়ে গেল।

ধর্ষণের পিছনে মনোবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীরা যেসব কারণ চিহ্নিত করেছেন, তার সবগুলোই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ধর্ষণের পক্ষ নেয় যে রাষ্ট্রযন্ত্র, তাকে উৎখাত না করতে পারলে অন্য কারণগুলো দূর করা যাবে কি?

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.