হাঁসখালির নাবালিকাকে ধর্ষণ করে খুন এবং তার আগে আর পরে এক এক করে ঘটতে থাকা ঘটনা থেকে একটা কথা কাব্য করে বলাই যায়, এই ধর্ষণ উপত্যকা আমার দেশ নয়। কিন্তু, জাতীয় বা সমষ্টিগত পরিচয় এতো সহজে বোধ হয় ত্যাগ করা যায় না। একটা দায় থেকেই যায়। সেই দায়ের জায়গা থেকেই প্রত্যেকটি ধর্ষণের ঘটনার পর একজন গণতন্ত্রে বিশ্বাসী আইনের ছাত্রী হিসেবে নিজেকে আরও কিছুটা বেশি অক্ষম বলে মনে হয়। একজন আইনের ছাত্রী হয়েও এমন কিছু করতে পারছি না, যাতে আইনের সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা যায়।গণতন্ত্রে বিশ্বাসী মানুষ হিসাবেও এমন কাউকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ক্ষমতায় আনতে পারছি না, যিনি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চাইবেন। আর ছাত্রী, অর্থাৎ একজন মহিলা হিসেবে অস্বস্তিটা লিখে বোঝানো মুশকিল।

গণতন্ত্রের মাধ্যমে প্রতিনিধি নির্বাচনের প্রসঙ্গ উঠলই যখন, তখন ঠিক কী হেতু উঠল, সেটাও দেখে নেওয়া যাক। গত ৪ঠা এপ্রিলের ঘটনা। নবম শ্রেণিতে পাঠরত হাঁসখালির এক নাবালিকাকে তার গ্রামের পঞ্চায়েতের এক সদস্যের ছেলের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে ধর্ষণ করে খুন করা হয়। ঘটনাটি ঘটেছে নদীয়া জেলার হাঁসখালির গাজনা গ্রাম পঞ্চায়েতের শ্যামনগর গ্রামে। বীভৎস এই ঘটনাটি গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে ১০ই এপ্রিল। ফলে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, পশ্চিমবঙ্গ শিশু সুরক্ষা কমিশনের চেয়ারপার্সন অনন্যা চক্রবর্তী সহ অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, এত দেরি কেন হলো পুলিশকে জানাতে! মুখ্যমন্ত্রীর মুখে মৃত নাবালিকার সঙ্গে ঐ পঞ্চায়েত সদস্যের ছেলের প্রেমজ এবং যৌন সম্পর্ক থাকার প্রসঙ্গ এসেছে। ‘সম্পর্ক’ থাকার কারণে আদৌ বিষয়টি ধর্ষণ কিনা, সেই প্রশ্নও শোনা যাচ্ছে খোদ মুখ্যমন্ত্রীর মুখেই।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

দুঃখজনক। লজ্জাজনক। অস্বস্তিকর। কেন? প্রথমত, আমরা জানি মুখ্যমন্ত্রী নিজেও আইনের স্নাতক। আমার মতোই। আইনের স্নাতক হিসেবে আমরা প্রত্যেকেই জানি, ধর্ষণের নালিশ করার কোনও সময়সীমা বাঁধা নেই ভারতীয় আইনে। মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী আইনের স্নাতক হয়েও এই সহজ বিষয়টুকু জানেন না! দ্বিতীয়ত, নাবালিকার সঙ্গে সম্মতিক্রমে যৌন সম্পর্ক স্থাপন হয়ে থাকলেও তা আইনত ধর্ষণই। একে বলা হয় স্ট্যাচুটারি রেপ (statutory rape)। তৃতীয়ত, যেহেতু এক্ষেত্রে নিগৃহীতা একজন নাবালিকা, এই সম্পূর্ণ ঘটনাটি বিচার হবে শিশুদের যৌন নিগ্রহ থেকে সুরক্ষার আইন POCSO’র (পক্সো আইন) অধীনে। যার ২৩ নম্বর ধারা বলছে, কোনও ব্যক্তি যদি গণমাধ্যমের সামনে এমন কোনও মন্তব্য করেন যা নিগৃহীতের পরিচয় সম্পর্কে দিকনির্দেশক এবং তার গোপনীয়তার সীমা লঙ্ঘন করছে, তাহলে সেই আচরণের জন্য সেই ব্যক্তির ছয়মাস থেকে এক বছর কারাদণ্ডের পাশাপাশি জরিমানাও হতে পারে।

তাহলে প্রশ্নটা এখানে এসে দাঁড়ায়, পশ্চিমবঙ্গের একটি জেলার একটি গ্রাম পঞ্চায়েতের একটি গ্রামের একজন পঞ্চায়েত সদস্য এবং তাঁর ছেলে, যে প্রধান অভিযুক্ত, তাঁদের দুজনেরই নামই প্রকাশ্যে এসে গিয়েছে। এই ছেলেটির সঙ্গে ‘প্রেমজ সম্পর্কে লিপ্ত’ একজন নাবালিকা মেয়ের সঙ্গেই এমন ঘটনা ঘটে গিয়েছে। এই যাবতীয় তথ্য গণমাধ্যমের সামনে বলা কি যথেষ্ট দিকনির্দেশক নয়? প্রেমজ সম্পর্ক ছিল বলেই একজন নাবালিকার সঙ্গে সম্মতি সত্বেও যৌন সম্পর্ক স্থাপন করাটা আইনত অপরাধ, সেটা কি প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তরেও জানা নেই? একজন নাবালিকার যৌন নিগ্রহের ঘটনাকে প্রেমের, বা ‘অ্যাফেয়ার্স’ এর আঙ্গিকে দেখিয়ে ঘটনাটি লঘু করে কি কিছু ঢাকতে চাওয়া হচ্ছে?

তবে মুখ্যমন্ত্রীর হাঁসখালির ঘটনার মতন ঘটনাকে লঘু করে দেখানোর চেষ্টা তো আজকের নয়। আমাদের প্রত্যেকেরই মনে থাকার কথা, পার্ক স্ট্রিট ধর্ষণ কাণ্ডে বা কামদুনির ধর্ষণের ঘটনার ক্ষেত্রেও মুখ্যমন্ত্রী একই গোত্রের মন্তব্য করেছিলেন। পার্ক স্ট্রিটের ঘটনায় প্রধান অভিযুক্তকে গা ঢাকা দিতে সাহায্য করার অভিযোগ উঠেছিল এক অভিনেত্রীর বিরুদ্ধে। তাঁকেই পরে লোকসভা নির্বাচনে প্রার্থী করা হয়েছে। যদি আমরা সার্বিক ভাবে রাজ্যের আইনের শাসনের পরিস্থিতির বিচারে দেখি, তাহলেও বোধ হয় তেমন অবাক হব না। গত ৫ দিনে ৬টি শিরোনামে ওঠার মতো ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে রাজ্যে। গত দু’মাসে প্রতিবাদী ছাত্র আনিস খান থেকে শুরু করে রামপুরহাটের বগটুইয়ে অগ্নিদগ্ধ হয়ে নিহত মানুষ- কেউই আইনানুগ পদ্ধতিতে বিচার পাননি। বরং, প্রত্যেক ক্ষেত্রেই তদন্তের প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছেন খোদ মুখ্যমন্ত্রীই। কখনও তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই নিজের পছন্দ মতো বেছে নিয়েছেন দোষীকে, কখনও বা খুন হওয়া মানুষদের পরোক্ষে বলেছেন ‘ইঁদুর’ বা ‘ছুঁচো’।

বহুদিন ধরেই শুনছি, আমজনতার স্মৃতি নাকি খুবই স্বল্পায়ু। তাই আজকে যাঁরা অবাক হচ্ছেন, তাঁদের বিস্ময়ের কারণ তাঁরা পার্ক স্ট্রিট কিম্বা কামদুনি ভুলেই গিয়েছিলেন। একই ভাবে, তাঁরা হয়তো সামনের নির্বাচনের আগে আবারও রামপুরহাট বা হাঁসখালির ঘটনাকে ভুলে যাবেন। এমতাবস্থায় বোধ হয় সবথেকে দুঃখের বিষয়, আমরা স্রেফ প্রশ্নই করতে পারি, উত্তর যে পাবই তার কোনও গ্যারান্টি নেই। তবুও আইনের ছাত্রী হিসেবে, গণতন্ত্রে বিশ্বাসী মানুষ হিসেবে আশা করব শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচার পাওয়া যাবে।

এই আশাটুকুই আগামীর যুদ্ধের একান্ত সম্বল।

মতামত ব্যক্তিগত।

আরো পড়ুন:

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.