আরো একটি আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারীদিবস আসছে। ৮ই মার্চ সারা বিশ্বে এই দিনটি পালিত হয়, অবশ্য অনেক সময়েই শ্রমজীবী কথাটি বাদ দিয়ে। অনেকেই মনে করেন যে এই দিনটির পণ্যায়ন এই দিনটির ঐতিহাসিক ও সামাজিক গুরুত্বের পরিপন্থী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই লেখায় অবশ্য সেই নিয়ে আলোচনার জায়গা নেই, এখানে আমি মূলত বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে ভারতের বিচারব্যবস্থা ও মেয়েদের অবস্থা নিয়েই কথা বলব, কারণ গত দু-এক মাসের মধ্যে কয়েকটি এমন রায় দেওয়া হয়েছে যা মেয়েদের প্রতি অপরাধের অনুকূল।

মেয়েদের বিরুদ্ধে নানা ধরণের অপরাধ সারা বিশ্বেই একটি জটিল সমস্যা, যার সমাধানের সরকারী প্রচেষ্টা সম্পর্কে সন্দেহ থেকেই যায়। পরিসংখ্যান অনু্যায়ী বিশ্বে প্রতি তিন জন মহিলার একজন এই ধরনের অপরাধের শিকার। ভারতের মত দেশে, যেখানে পিতৃতন্ত্রের শিকড় যথেষ্ট গভীরে প্রবিষ্ট, সেখানে মেয়েদের বিরুদ্ধে প্রতিদিন নানা ধরণের অপরাধ সংঘটিত হয়। গার্হস্থ্য হিংসা থেকে শুরু করে বাড়ির বাইরে যৌন বা অন্যান্য অপরাধ ভারতে ক্রমবর্ধমান। যতই বলা হোক “prevention is better than cure”, প্রতিরোধের (prevention) সদিচ্ছা আসলে কতটা, বা এই প্রতিরোধের প্রভাব সমাজের সর্বস্তরে কতদূর পৌঁছানো সম্ভব, তা নিয়ে অসংখ্য প্রশ্ন উঠতে পারে। সেই প্রেক্ষাপটে আরোগ্য (cure) একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে বৈকি। আর ঠিক এখানেই আইন এবং বিচারব্যবস্থার গুরুত্ব। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, অনতি অতীতে এমন কিছু পদক্ষেপ আইন বা বিচারব্যবস্থা নিয়েছে বা নিচ্ছে, যা ভারতীয় মেয়েদের অবস্থানকে দুর্বল থেকে দুর্বলতর করে দিচ্ছে।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

এই প্রসঙ্গে মনে করা যেতে পারে ৪৯৮(এ) সংক্রান্ত আইনটির কথা, যা গার্হস্থ্য হিংসা দমনের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে সহায়ক হবে বলে নারীবাদী সংগঠনগুলো ভেবেছিলেন। কিন্তু, অপব্যবহারের অজুহাতে, বর্তমানে এই আইনটিকে যথেষ্ট জোলো করে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ, যার ফলে একজন নিগৃহীতার সুবিচার পাওয়া আবার কঠিন হয়ে পড়েছে।

কিছুদিন আগেই পক্সো আইন (Prevention of Children Against Sexual Offences Act, 2012) — যা শিশু তথা অপ্রাপ্তবয়স্কদের যৌন শোষণের হাত থেকে রক্ষা করার জন্যেই তৈরি হয়েছে — সংক্রান্ত কয়েকটা মামলার রায় দিতে গিয়ে মুম্বাই হাইকোর্টের বিচারপতি পুষ্পা গানেড়িওয়ালা দেশ জুড়ে শোরগোল ফেলে দিয়েছেন। তাঁর দেওয়া রায়ের যৌক্তিকতা নিয়েই প্রশ্ন উঠে গিয়েছিল, যখন তিনি বলেন ত্বক স্পর্শ না করা হলে, অর্থাৎ জামাকাপড়ের উপর দিয়ে শিশুর শরীরের বিশেষ কিছু অংশ স্পর্শ করলে তাকে যৌন নিগ্রহ বলা চলে না। আরো দুটো মামলায় তাঁর অবিশ্বাস্য রায়ের কথা এর মধ্যেই সামনে এসেছে, যার মধ্যে একটা ক্ষেত্রে এক শিশুর হাত ধরে প্যান্টের চেন খোলাকেও যৌন নিগ্রহ মনে করেননি মাননীয়া বিচারপতি।

ভারতীয় বিচারব্যবস্থা আরো একবার কাঠগড়ায় এসে দাঁড়াল, যখন এই মাসের প্রথমে, সুপ্রিম কোর্টের মহামান্য বিচারপতি শরদ বোবড়ে দুটো মামলায় অত্যন্ত দুটো বিস্ময়কর মত প্রকাশ করলেন। এক মামলায় নির্যাতিতা অভিযুক্তের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ এনেছিলেন যে, নির্যাতিতার ১৫-১৬ বছর বয়সে প্রাপ্তবয়স্ক অভিযুক্ত তাঁকে নিয়মিত ধর্ষণ করেছেন। (এই প্রসঙ্গে মনে রাখা ভাল, যেহেতু নির্যাতিতা তখনও সাবালিকা হননি, তাই তাঁর সম্মতিকে আইনত সম্মতি বলে ধরা যাবে না। অর্থাৎ তাঁর সম্মতি থাকলেও এই ঘটনা আইনত ধর্ষণ বলেই চিহ্নিত হত। নির্যাতিতা অভিযোগ করেছিলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তি তাঁর আত্মীয় হওয়ার দরুন অনেক বার তাঁর পিছু নিয়েছেন, এবং পরে লুকিয়ে বাড়িতে ঢুকে একাধিকবার তাঁকে ধর্ষণ করেছেন।

এই মামলার পরিপ্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্টের মহামান্য প্রধান বিচারপতি শ্রী বোবড়ে অভিযুক্তকে প্রশ্ন করেছেন তিনি নির্যাতিতাকে বিয়ে করতে রাজি আছেন কিনা। স্বাভাবিকভাবেই সারা দেশে শোরগোল পড়ে গেছে। কারণ ধর্ষণে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ হলে তাঁর আইনত শাস্তি হওয়ার কথা, সেক্ষেত্রে বিয়ে করে নেওয়ার সুযোগ আসলে অভিযুক্তের পক্ষে এক সুবিধাজনক সমাধান। মহামান্য বিচারপতি এ-ও বলেছিলেন, বিয়ে করার জন্য কোন চাপ দিচ্ছেন না, কিন্তু বিয়ে করলে অভিযুক্তকে “সাহায্য করার” আশ্বাস দিচ্ছেন। বিয়ে না করলে অভিযুক্ত চাকরিও হারাবেন এবং তাঁর জেলও হবে। (এই প্রসঙ্গে বলে রাখা ভাল যে এর আগে সেশন্স কোর্টেও নিগৃহীতা সুবিচার না পেয়ে মুম্বাই হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন, যেখানে তাঁর আবেদনকে আদালত যথাযথ বলে মনে করেছিল, এবং সেশন্স কোর্টের রায়কে ভয়ঙ্কর আখ্যা দিয়ে বাতিল করেছিল।)

ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এই মন্তব্যের প্রতিবাদ হয়েছে। দেশের বিভিন্ন নারীবাদী সংগঠন, লিঙ্গ সাম্যের জন্যে লড়াই করেন যে লড়াকুরা এবং সচেতন নাগরিক, যাঁদের সংখ্যা পাঁচ হাজার পেরিয়েছে, একটা খোলা চিঠি লিখে মাননীয় বিচারপতি শরদ বোবড়ের অবিলম্বে পদত্যাগ দাবি করেছেন। মহামান্য বিচারপতির এই মন্তব্য ঘিরে বিচারপতি  মহলেও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। বিচারপতি দীপক গুপ্তার মতে এই মন্তব্যে পিতৃতান্ত্রিকতার ছায়া স্পষ্ট এবং এটা লিঙ্গসাম্যের পরিপন্থী বক্তব্য। আসলে পিতৃতান্ত্রিক সমাজের কাছে নারীর শারীরিক “পবিত্রতা” অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সব সময়েই। ধর্ষণের ফলে সেই পবিত্রতা নষ্ট হয়, সেই “নষ্ট” নারীর বিয়ের সম্ভাবনা অত্যন্ত কম, তাই যদি অভিযুক্ত/ধর্ষক তাকে বিয়ে করে, তাহলে নিগৃহীতার “জীবন নষ্ট” হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করা হয়। অর্থাৎ মেয়েদের প্রধান কর্তব্য বিবাহ — এই চরম পিতৃতান্ত্রিক ধারণা থেকেই এই ধরনের প্রস্তাব দেওয়া হয়।

আরেকটা মামলায় মাননীয় প্রধান বিচারপতি একটা প্রশ্ন তুলেছেন যা ভারতের প্রেক্ষিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই মামলায় বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সহবাসের পর বিয়ে না করার বিষয়টা এসেছে। ভারতীয় আইন মতে এই ধরণের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু শ্রী বোবড়ে এই আইনের বিরুদ্ধে গিয়ে বলেছেন সম্মতিক্রমে সহবাস কোনো অপরাধ নয়, এমনকী পুরুষ অত্যাচারী হলেও একে অপরাধ বলা যায় না। এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য, বর্তমান ভারতীয় দণ্ডবিধি অনুসারে বৈবাহিক ধর্ষণ অপরাধ নয় — পিতৃতান্ত্রিকতার আরেক দৃষ্টান্ত। অর্থাৎ বিয়ের পরে যৌন সংসর্গের জন্য আলাদা করে সঙ্গীর সম্মতি নেওয়ার প্রয়োজন নেই।

একবিংশ শতাব্দীতে এসেও বৈবাহিক ধর্ষণের বিরুদ্ধে আইন না থাকা সামগ্রিকভাবে লিঙ্গসাম্য তথা নারীর অধিকারের প্রশ্নে পিছিয়ে পড়া এক সমাজেরই প্রমাণ। আবার বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সহবাস করার শর্ত ভাঙাকে অপরাধ হিসাবে চিহ্নিত করাও শিক্ষিত উচ্চশ্রেণির পক্ষে যথেষ্ট অপমানজনক এবং পিতৃতান্ত্রিক বলেই মনে করা হয়। তবে নারীবাদীদের কেউ কেউ মনে করেন যে এই আইনের মূল লক্ষ্য সমাজের পিছিয়ে পড়া অংশের মেয়েরা। তারা যেন “নষ্ট” না হয়, অর্থাৎ যেন বিয়ের আগেই যৌন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে সুযোগসন্ধানী এবং দুর্বৃত্তের দ্বারা প্রতারিত না হয়। অনেকসময় এই প্রতারিত মেয়েদের সমাজ বহিষ্কার করে এবং তাদের অনেকেরই জায়গা হয় যৌনপল্লীতে।

তবে এই মামলার ক্ষেত্রে আরো একটি বিষয় শ্রী বোবড়ের সামনে উপস্থাপিত হয়েছিল্, যা তিনি গুরুত্ব দিয়ে বিচার করেননি। এ ক্ষেত্রে অভিযোগকারিণী আদালতের কাছে “intimate partner violence” বা ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর দ্বারা নিগ্রহের প্রমাণ, যেমন ডাক্তারি পরীক্ষার রিপোর্ট, দাখিল করেন। শ্রী বোবড়ে সেই রিপোর্টকে কোন গুরুত্বই দেননি।

গার্হস্থ্য হিংসা কিন্তু এক গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সমস্যা, এবং একটা বড় অংশের নারী এই সমস্যার কবলে পড়েন। সেক্ষেত্রে ডাক্তারের রিপোর্টকে গুরুত্ব না দিয়ে মহামান্য বিচারপতি আরো এক সমস্যা উস্কে দিলেন। অনেক সময়েই গার্হস্থ্য হিংসার প্রমাণ পাওয়া যায় না। বিশেষত মানসিক হিংসা হলে প্রমাণের সম্ভবনা প্রায় নেই বললেই চলে। উপরন্তু গার্হস্থ্য হিংসার যে বলয়, তা নিগৃহীতকে বারবার আশা দেয় যে পরের বার থেকে এরকম আর হবে না। তাই অনেকেই আইনের দ্বারস্থ হতে ইতস্তত করেন। এই প্রেক্ষিতে প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও যদি নিগৃহীত ব্যক্তি বিচার না পান, পরবর্তীকালে এই ধরনের অভিযোগ করার কথা আর চিন্তা করা যায় না। নারীর অধিকারের লড়াই পরাজিত হয়।

এই অবস্থায় ভারতীয় আইন এবং বিচারব্যবস্থার কাছে এই আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারীদিবসের সামনে দাঁড়িয়ে আমরা শুধু আবেদন করি প্রগতির দিকে যাত্রা দ্রুত হোক।

(ছবি ঋণ :Wikimedia ও India Today-র Website থেকে)

Leave a Reply