নাগাল্যান্ডের একদম পূর্ব দিকে মায়ানমারের সীমান্তবর্তী জেলা কিফিরে। প্রত্যন্ত এলাকার চেয়েও প্রত্যন্ত যদি কিছু থাকে, তাহলে সেটাই কিফিরে। কোহিমা থেকে গাড়িতে ১২-১৪ ঘন্টা লাগে, যদি রাস্তায় ফেঁসে না যেতে হয়। কারণ ওখানে যাওয়ার কোনো পাকা রাস্তা নেই। যা আছে তা হলো কাঁচা, খাড়াই পাহাড়ি রাস্তা। এখানকার জনসংখ্যা অত্যন্ত কম। বিভিন্ন উপজাতির পাহাড়ি নাগা আদিবাসীরা এই অঞ্চলের অধীশ্বর। এই উপজাতিদের মধ্যে ১৯৫০-র দশকেও ঝগড়া বিবাদ লেগে থাকতো, সাতের দশকেও ‘হেড-হান্টিং’-এর তথ্য পাওয়া গেছে । নাগাল্যান্ডের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ সারামাটি এখানেই।

এখানে একটা ছোট্ট নদী আছে, যার নাম পুঙরো ।এই পাহাড়ি অঞ্চলেই নদীর উৎস। পূর্ব দিকে বহমান হয়ে এই নদী ঢুকেছে মায়ানমারে এবং অবশেষে চিন্দ্বীন নদীতে গিয়ে মিশেছে। এই পুঙরো নদী ভারত আর মায়ানমারের মধ্যে কিছুটা প্রাকৃতিক সীমানা তৈরী করেছে। এ হেন দুর্গম, উঁচু জায়গায় ভারত সরকার বা মায়ানমার সরকার – কারোর পক্ষেই সারা বছরের জন্য বর্ডার পোস্ট বসানো সম্ভব নয়। তাছাড়া মায়ানমার তো আর পাকিস্তান নয় যে কোটি কোটি টাকা খরচ করে সীমান্ত আগলাতে হবে; কিংবা চীনও নয় যে একটু চোখ ফিরিয়েছ কি জায়গা দখল করে নেবে। অতএব চারিদিকের ঘন জঙ্গলের মধ্যে নিশ্চিন্তে থাকা যায়। আর এইসব পাহাড়ের খাড়াই ঢালে লুকিয়ে আছে অসংখ্য গুহা।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

এই ভূখণ্ড নাগা উপজাতিদের করায়ত্ত। ওরা রাজনৈতিক সীমানা বিশেষ মানে না, চেনেও না। পাহাড় ডিঙিয়ে এপার ওপারের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়, আত্মীয়তা হয়। তারপর অন্নপ্রাশন, জন্মদিন, শ্রাদ্ধশান্তি ইত্যাদি অনুষ্ঠানের জন্যে নেমন্তন্ন তো হয়ই। কোন পাসপোর্টের দরকার এদের পড়ে না। খুবই স্বাভাবিক এই প্রকার যাতায়াত। কুলীন ভারতের বর্ণাশ্রমে এদের যেমন স্থান নেই, তেমনই এদেরও মূল ভূখণ্ডের ভারতবাসীদের মত হওয়ার কোন ইচ্ছা নেই।

এত দীর্ঘ গৌরচন্দ্রিকার কারণ কী? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে আরো কিছুটা ভূমিকার প্রয়োজন।

আমি হলাম ফাঁক তালে তৈরি একজন প্রত্নতাত্ত্বিক। আসলে মেরে কেটে পাঁচ ফুট উচ্চতার আলুভাতে আর ডাল দিয়ে ভাত মেখে খাওয়া নিপাট বাঙালি মেয়ে। ঘটনাচক্রে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট শেষ করে কেমব্রিজেই থাকি আর গবেষণার স্বার্থে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াই। সেই জন্যই প্রত্নতত্ত্বের গবেষণার ‘লাইনে’ কিছুটা পরিচিতি ঘটেছে। সেই সূত্রেই একদিন একটা ইমেল পেলাম কোহিমা ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ডঃ জামিরের থেকে। ইমেলে জামির ব্যাখ্যা করে লিখলেন যে উপর্যুক্ত অঞ্চলের গুহাগুলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার হলোসিন (বিগত ১১,০০০ বছরের ভূতাত্ত্বিক নাম, যে সময়ে আধুনিক মানুষ হোমো সাপিয়েন সাপিয়েন্সের উদ্ভব হয়েছে) পরিবেশ পুনর্নির্মাণের জন্যে খুব গুরুত্বপূর্ণ ।মূল ভারত ভূখণ্ডের সাথে এর হয়তো সেইভাবে সম্পর্ক নেই, আলাদাভাবে অভিযোজন হচ্ছে। ওঁরা গবেষণা চালিয়ে কিফিরে জেলা থেকে ৬০০০-৭০০০ বছরের পুরোনো ক্রেনিয়াম বা মানুষের মাথার খুলির অংশ পেয়েছেন। যদি আমি আমার দক্ষতা দিয়ে ওই অঞ্চলের প্রাচীন পরিবেশ পুনর্গঠনে সাহায্য করি, তাহলে ভালো হয়।

আমি দেখলাম প্রস্তাবটা খাসা! সচরাচর কে আর ঐ প্রত্যন্ত অঞ্চলে যায়?এই পর্যায়ে বলে রাখা ভালো যে মাঝেসাঝে রবীন্দ্রনাথ আমাকে অকারণে প্রভাবিত করে ফেলেন। মানে বলতে চাইছি যে ‘ইহার চেয়ে হতেম যদি আরব বেদুইন’ – ইত্যাদি কবিতার লাইন হঠাৎ মগজের পোকা নেড়ে দেয়। যাকে বলে, রোমাঞ্চকর অ্যাডভেঞ্চারের সুযোগ আছে বুঝলে একটু (চোখ বুজে) উঁকি মেরে দেখতে ইচ্ছে করে। সুতরাং জামিরের প্রস্তাব আমি সাদরে গ্রহণ করলাম। যদিও সে বছর, অর্থাৎ ২০১৪ ডিসেম্বরে, ওঁদের খননকার্য চলার সময় আসতে পারলাম না সুদানের মরুভূমিতে ছিলাম বলে (সে কাহিনী পরে কখনো)। পরের মরসুমে, মানে ২০১৬-তে, আসার জন্য বিভিন্ন তহবিল থেকে টাকাপয়সা জোগাড় করে, আমারই গোত্রের ব্রিটিশ সহকর্মীকে নিয়ে আর একটা মাটি কাটার কড়ার নিয়ে এলাম কলকাতায়।

সুধী পাঠকবর্গ, একথা আপনারাও মানবেন যে ইংরেজি হচ্ছে, যাকে বলে, ব্যাজোক্তির ভাষা। আমাকে যদি প্রশ্ন করেন আমি কী করি আর তার উত্তরে আমি বলি যে আমি মাটি কাটি, তাহলে আপনারা হয়তো ভ্রূ বা নাসিকা কুঞ্চিত করে তাকাবেন বা হাল্কা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসবেন। কিন্তু ‘মাটি কাটি’ – এই ক্রিয়াপদের পরিবর্তে যদি আমি ইংরেজিতে ‘ist’ অনুসর্গ ব্যবহার করে বলি আমি ‘archaeologist’ বা ‘geomorphologist’ বা ‘geo-archaeologist’, তখন আপনারাই ভাববেন “আহা! না জানি ইনি কত বড় বিদুষী!” কিন্তু বিশ্বাস করুন, আমার মাটি কাটা আর গ্রামের রাম শ্যামের মাটি কাটার মধ্যে কোন তফাৎ নেই। বরং ওঁরা কাজটা আমার থেকে বেশি ভালো করেন। আমি তো মুখেন মারিতং জগৎ। যাকগে, এসব কথা পরে হবে কখনো।

কলকাতায় এসে দুদিন চর্ব চুষ্য লেহ্য পেয় খেয়ে নিলাম (সব সময় তাই-ই করা হয়)। তারপর থিয়েটার রোডের নাগাল্যান্ড হাউসে গিয়ে বিশেষ অনুমতিপত্র তৈরি করালাম। আমার সহকর্মী ডঃ শন টেলর অন্য দেশের নাগরিক হওয়ায় তাঁর আরো অনেক কাগজপত্র লাগল। যত দূর মনে করতে পারছি, কয়েক জায়গায় এই মর্মে সই সাবুদও করতে হলো যে শনকে যদি কোনো জঙ্গি-টঙ্গি আমন্ত্রণ না জানিয়েই সটান নিজেদের অতিথি বানিয়ে নেয় এবং সেই চক্করে যদি বেঘোরে ওঁর প্রাণ যায়, তাহলে মহামান্য ভারত সরকার দায়ী থাকবেন না । আশা করি বুঝতে পারছেন, আমাদের গন্তব্যটি মোটেই সাধারণ জায়গা নয়।

যাই হোক, নির্ধারিত দিনে এয়ার ইন্ডিয়া এক্সপ্রেসের বিমানে চেপে কলকাতা থেকে ডিমাপুর পৌঁছলাম। আটপৌরে বিমানবন্দর, বেশ একটা ঘরোয়া ব্যাপার রয়েছে চারদিকে। আমাদের গন্তব্যে নিয়ে যাওয়ার জন্য আদাখো নামের একজন দক্ষ গাড়িচালক আসবে, তা আগে থেকেই জানিয়ে দিয়েছিলেন জামির। দেখলাম সে নিজে থেকেই আমাদের চিহ্নিত করে ফেলেছে। বেশ হাসি হাসি মুখখানা। গোলগাল চেহারা, চ্যাপ্টা নাক আর নরুন চেরা চোখ। নিজেই নিজের পরিচয় করিয়ে দিয়ে ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে বলল পরবর্তী দু-সপ্তাহের প্রত্নতাত্ত্বিক সফরে সে আমাদের চালক এবং “দেহরক্ষী” – এক কথায় নিত্যসঙ্গী। আমাদের যা যা দরকার তা যেন ওকে জানানো হয়। ও সাধ্যমত চেষ্টা করবে সব কিছুর ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্যে। আমার সাথে হিন্দিতেও কথা বলার চেষ্টা করল। জানাল কোহিমাতে কিছু হিন্দিভাষী লোক আছে বলে কাজ চালানোর মত হিন্দি ও জানে। আদাখোকে আমাদের বেশ ভালো লেগে গেল। আর ওর টয়োটা ইনোভা গাড়িটা দেখে একটু স্বস্তিও পেলাম। আদাখো জানাল ডিমাপুর থেকে কোহিমা ২.৫-৩ ঘন্টার পথ এবং আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে যেতে হবে। আমাদের যাত্রা শুরু হল।

ফাঁকা ফাঁকা পরিবেশ, টিন কিংবা বাঁশের ছাউনি দেওয়া ঘরবাড়ি, গাছগাছালি ভরা উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাথে আমার সেই প্রথম পরিচয়। শুরু থেকেই দেখতে পাচ্ছিলাম রাস্তার দুই ধরে হরেকরকম ফলমূল সবজি বিক্রি করছেন বিভিন্ন উপজাতির মহিলারা — আনারস, বেগুন,জাঁদরেল নাগা-মরিচ, কমলালেবু, আপেল, বেতের ঝুড়ি ইত্যাদি পণ্যের পসরা সাজানো। খাড়াই পাহাড় বেয়ে আমরা যত উঁচুতে উঠছি, ততই প্রাকৃতিক পরিবেশ বদলাচ্ছে – সে কি অনবদ্য সৌন্দর্য! সাহিত্য রচনা আমার কর্ম নয়, তাই সেই নৈসর্গিক শোভা ভাষায় বর্ণনা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। অসমের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডার প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার মত আমার আবেদন হয়ত অত ওজনদার হবে না, তবে এটুকু বলতে পারি যে পরের বারের পুজোর ছুটিতে, আপনারা যাঁরা এখনো ঐসব দিকে বেড়াতে যাননি, তাঁরা একবার গিয়ে চাক্ষুষ করে আসতে পারেন মনোরম জায়গাটা।

রাস্তায় দু-তিনবার থেমে, ছবি তুলে, চা এবং টুকটাক খাবার খেয়ে অপরাহ্নের নরম আলোয় কোহিমায় পৌঁছলাম। জামিরের সাথে সেই প্রথম সাক্ষাৎ। কি প্রাণ খোলা আতিথেয়তা! হোটেলের রেস্টুরেন্টে বসে আমরা চারজন মিলে ‘fieldwork’ -এর পরিকল্পনা চূড়ান্ত করলাম। পরদিন খুব ভোরবেলা সূর্য ওঠার আগেই আমরা কোহিমা ছেড়ে রওনা দেব কিফিরে জেলার উদ্দেশ্যে – গন্তব্য মিমি নামক একটা গ্রাম। ওখানেই আমাদের থাকার বন্দোবস্ত হয়েছে একজনের বাড়িতে। জামির আগে থেকেই সাবধান করে দিলেন, কোনভাবেই যেন আমরা ঘুম থেকে উঠতে দেরি না করি। অনেকটা রাস্তা। সময়ে মিমি পৌঁছাতে না পারলে জঙ্গলের মধ্যেই রাত কাটাতে হবে।

পরদিন সকাল সকাল শুরু হলো যাত্রা। প্রথম কয়েক ঘন্টা দারুণ লাগছিল। কি সুন্দর চারিদিক! কিন্তু খানিক পরে দেখি যত খাড়াই উঠছি, বারবার মিলিটারি চেক পয়েন্ট আসছে। কাগজপত্র/পারমিট বারবার দেখতে চায়। বুঝতে পারলাম ভারতীয় সীমার মধ্যেই এসে পড়েছি এক অন্যরকম ভূখণ্ডে। এই চেক পয়েন্টগুলোর আশেপাশে আবার নানা শহীদ বেদী। তাতে লেখা অমুক জায়গায় তমুক সালে নাগাদের সাথে লড়াই করে কোন কোন বীর ভারতীয় সেনা শহীদ হয়েছেন। বোঝো ঠ্যালা! আমি ভাবছি এ কোথায় এসে পড়লাম! একি জঙ্গিদের আঁতুড়ঘর নাকি রে বাবা? একমাত্র মুন্ডুটা না ঘ্যাচাং ফু হয়ে যায়। কিন্তু যতবার জামিরের সহজাত আত্মবিশ্বাস আর আদাখোর ঠান্ডা মাথায় দক্ষ গাড়িচালনা দেখছি, ততবার নিশ্চিন্ত লাগছে। আমার সাথের ব্রিটিশ বন্ধুটি অবশ্য অকুতোভয়। শন পারে না এমন কোনকিছুই আমার জানা নেই । তাই ভেবে স্বস্তি পাচ্ছিলাম যে এক্কেবারে বেঘোরে আমার প্রাণ যাওয়ার আগে হয়তো আমার যাত্রাপথের তিন সঙ্গী তাদের প্রাণ দিয়ে আমাকে প্রাণপণে বাঁচাবার চেষ্টা করবে। ততক্ষণ সময় পাব পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে ছোট্ট একটা প্রার্থনা নিবেদন করার। তাই বা কম কী?

এমনভাবে প্রায় চার ঘন্টা চলার পর দেখলাম আর পাকা রাস্তা নেই। জামির জানাল এইবার আমাদের কাঁচা রাস্তা দিয়েই উঠতে হবে। এই জন্যেই আমরা আদাখো-র মতন দক্ষ চালক এবং একটা ভরসাযোগ্য মজবুত গাড়ি নিয়ে এসেছি। একদিকে খাদ আর অন্যদিকে খাড়া পাহাড়। ঘন জঙ্গলের মাঝে দেখা যাচ্ছে ইতিউতি দূরে দূরে ছোট ছোট গ্রাম। বিদ্যুৎ সংযোগ সেইসব এলাকায় নেই বললেই চলে। অবশ্য কাঁচা পাহাড়ি রাস্তায় কে আর কবে ল্যাম্পপোস্ট দেখেছে? এ যে ভারতবর্ষের অংশ, তা মনেই হয় না। আলো যত কমতে শুরু করল, তত ভয়ে বুক দুরুদুরু;যদি কিছু হয় তো হাসপাতাল বলে কোন জিনিস হাতের নাগালে নেই। জামিরকে বলে রাখলাম যে আধা অন্ধকারে পাহাড়ি রাস্তায় দুর্ঘটনায় পটল তুললে যেন অন্তত কলকাতা পৌঁছে দেয় আমাকে।

চোদ্দ ঘন্টা এইভাবেই চলতে হল। দু-একবার কাঁচা রাস্তায় গাড়ি আটকে গেলে ঠেলতেও হল। যাত্রাপথের এর থেকে বেশি বর্ণনা দিলে নিজেকে সৈয়দ মুজতবা আলী মনে হবে, যেন একখানা “যাত্রাপথে” নিজেই লিখে ফেলছি। সেই অপচেষ্টা থেকে ক্ষান্ত হই আপাতত। আর বেশি বর্ণনা না দিয়ে এটুকুই বলি যে প্রাণ হাতে করে দুর্গম মিমি গ্রামে গিয়ে যখন পৌঁছলাম তখন অনেক রাত। দেখলাম অনেক লোক নানারকম উপজাতীয় পোশাক পরে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের অভ্যর্থনা করতে। তাদের গায়ে নানারকম উল্কি। মহিলাদের কানে বড়, মোটা দুল। তাদের মুখের অনাবিল হাসি আর আমাদের সম্বন্ধে নির্ভেজাল কৌতূহল দেখে ক্লান্তি আর যাত্রাপথের শ্রান্তি অনেকটাই কেটে গেল। রাতের অন্ধকারে বুঝলাম একটা জমিতে কয়েকটা আলাদা ছোট ছোট কাঠের ঘরের ব্যবস্থা হয়েছে আমাদের থাকবার জন্যে। ডিসেম্বরের রাতে প্রচন্ড ঠান্ডা – হাড়গোড় কেঁপে যাচ্ছে। দেখলাম কাঠের বাড়িগুলোর ভিতরে বিলিতি কায়দার ‘central heating’ নেই বা কল খুললে গরম জলের আরামও নেই। যাত্রার প্রচণ্ড ধকলে শরীর ভেঙে আসছে তখন। কোনক্রমে একটু স্নানের জন্যে তোলা গরম জল ছিল। কিন্তু স্নানের জায়গা দেখে তো চক্ষু চড়কগাছ। খোলা আকাশের নীচে কাপড় দিয়ে ঘেরা একটা জায়গা। ওখানে গিয়ে ঐ ঠান্ডায় গায়ে জল ঢাললে বরফ হয়ে যাব। কিন্তু উপায় নেই। চোখ কান বুজে কয়েক ঘটি গরম জল দিয়ে কোনমতে হাত মুখ ধুয়ে নিলাম।

গ্রামের মানুষ কিন্তু খুব ভাল। এদের লৌকিকতা আছে, আতিথেয়তা, বেরাদরি আছে মানতে হবে। আর আছে অনেক অনেক প্রশ্ন। কলকাতার কোন বাঙালিকে ওরা কস্মিনকালে ঐ গ্রামে দেখেনি, আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কোন সাহেবকেও। তাই দেখলাম সবাই হাঁ করে মুখের দিকে চেয়ে আছে আর প্রশ্ন করছে। যা প্রশ্ন করছে তা জামির আর আদাখো অনুবাদ করে দিচ্ছে। কী নাম, কোথায় থাকি, কী করি, কেন এসেছি, বাড়িতে কে কে আছে, কয় ভাইবোন, কয় মামা, কয় পিসি, তাদের বাচ্চাদের নাম, প্রতিবেশী রিঙ্কু দিদির মেয়ে অঙ্কে কত পেয়েছে — এসবেরও উত্তর দিয়েছি বোধহয়।

ক্রমে বলল খাওয়ার জায়গায় যেতে। দেখলাম খোলা আগুনের ওপর কিছু একটা ঝলসানো হচ্ছে। আর দেওয়ালে তাকের ওপর বিকট কতকগুলো শিরস্ত্রাণ। জিজ্ঞেস করে জানা গেল যে ওদের পূর্বপুরুষরা নাকি ওসব পাগড়ির মতো পরে অন্য উপজাতির সাথে যুদ্ধে যেত। উদ্দেশ্য হত অন্য উপজাতিদের মধ্য থেকে মুন্ডু কেটে আনা। বড় বড় কোতল করার খড়গও দেখলাম শোভা পাচ্ছে। হরিবোল! বলে কি এরা! শুনে তো মনে হচ্ছে গেলাম বুঝি এইবার। যেটা ঝলসানো হচ্ছে সেটা নাকি একটা হরিণ শাবক, সেদিনই ধরে আনা হয়েছে। বুঝলাম এই হরিণটাই রাতের খাবার। চোদ্দ ঘন্টা যাত্রা করে খিদেতে প্রাণ যাচ্ছে, তখন হরিণ খেতে হবে শুনলে কিরকম লাগে? আগে তো খাইনি! যদিও শুনেছি ‘venison’ নাকি অত্যন্ত উপাদেয় খাদ্য।

যাই হোক, সেই ঝলসানো হরিণের মাংসের সাথে স্থানীয় rice-beer দিয়ে দিব্যি খাচ্ছে সবাই। একটু মশলা চাইতে এল পৃথিবীর সবচেয়ে ঝাল লঙ্কাবাটা, নাগা লঙ্কার। শন জাতে ব্রিটিশ। ওর সবকিছুতেই ‘স্টিফ আপার লিপ।’ ‘এইসব আর এমন কি’ মার্কা হাবভাব নিয়ে, না দেখে শুনে, প্রথমেই এক খাবলা লঙ্কাবাটা মুখে দিতে গেল। তার ছোঁয়ায় ঠোঁট দুটো সঙ্গে সঙ্গে ফুলে গেল। আমি অল্প পরিমাণ একটু মুখে দিয়েছিলাম। তাতেই ঝালের চোটে চোখে সর্ষেফুল দেখে সেই ঝলসানো হরিণের স্বাদ একবর্ণ না বুঝে গপগপ করে খেয়ে নিলাম। রাত্রে একখানা কাঠের পাটাতনে শুতে দিল। তার সাথে বলল, ওদের বাপ-দাদাদের আত্মা রাত্রিবেলায় হাওয়া খেতে বের হন, তাই সাবধানে থাকতে। এছাড়াও রাত্রিবেলা নাকি ঐ অঞ্চলের বার্মিস পাইথন হানা দেয়। দিনের বেলাও পাইথনরা ঘোরাঘুরি করে। কিন্তু তখন তাদের হয়ত দেখতে পাওয়াটা বেশি সহজ। সুতরাং রাতের বেলা যেন একা একা না বেরোই। দরকার পড়লে ঘরের দেয়ালে টোকা দিতে হবে। ওরা আশপাশের ঘরেই থাকবে।

সে দিন রাত্রে আমার কোন আত্মা, অশরীরী, পাইথন কিছুর কথাই মনে পড়েনি আর। গভীর ঘুমে চোখের পাতা এমনিতেও ভারি হয়ে ছিল। জানি পরের দিন থেকে কাজ শুরু হবে। তাই একটুখানি ঘুম ছিল ভীষণ জরুরী।

সকালে উঠে দিনের আলোয় দেখলাম যে গ্রামটা পাহাড়ের একেবারে মাথায়। অনেক নীচে পুরু সাদা মেঘের স্তর। মনে হচ্ছিল শুধু কয়েকটা উর্বশী-রম্ভা ছেড়ে দিলেই একেবারে ইন্দ্রপুরী হয়ে যাবে। সেই সকালের অপরূপ শোভা আমার মনে গেঁথে থাকবে আজীবন।

যা-ই হোক, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করা ছেড়ে যে কাজে এসেছি, সেই কাজে তো লাগতে হবে। মানে এবার উঠতে হবে পাহাড় বেয়ে দুর্গম গুহায়। আমি বাঙালি, গাঙ্গেয় বদ্বীপ অঞ্চলের সমতলভূমিতে বড় হয়েছি। তড়তড় করে পাহাড় চড়া কি আমার কাজ! আর কোনক্রমে যা-ও বা একটু উপরে উঠতে যেতে পারি, নামতে গেলে তো কুপোকাত। আর এইসব ভয়ানক খাড়াই ঢাল বেয়ে উঠে ঢুকতে হবে। কি ভয়ানক কঠিন ব্যাপার! মনে হচ্ছিল মরেই যাব পাহাড় থেকে পড়ে গিয়ে। কোমরে দড়ি বেঁধে নাগারা কিছু একটা ব্যবস্থা করেছে দেখলাম। আর ওরা কিরকম পাহাড়ি বেজীর মত পটপট করে উঠছে আর নামছে। আমি কিছু বলতেও পারছি না। অযাচিতভাবে নামের পিছনে আর্কিওলজিস্ট লাগিয়ে দিয়েছে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়। উঠতে পারছি না বললে মান-সম্মান নিয়ে টানাটানি পড়বে।

কিন্তু এরপর হল আসল বিপত্তি। ঐ যে গৌরচন্দ্রিকায় পুঙরো নদীর কাহিনী শুনিয়েছিলাম? তার একটা শাখানদী পেরোতে হবে আমাদের। খরস্রোতা পাহাড়ি নদী, তার উপর কোন সেতু নেই। আমি তো আবার সাঁতার জানি না। কোন জ্যোতিষী না সাধুবাবা জন্মের পর মুখ দেখে বলেছিল জলে ফাঁড়া আছে। মা তাই ঠিক করে নিয়েছিল যে জলের ফাঁড়া থেকে বাঁচতে, সাঁতার শিখতে না দেওয়াই শ্রেষ্ঠ সিদ্ধান্ত। সাধে কি গুরুদেব বলেছিলেন “রেখেছ বাঙালি করে মানুষ করোনি!” তা আমি এখন ঐ নদী পার হব কী করে?

নাগারা বলল ব্রিজ নেই তো কী হয়েছে? গাছের গুঁড়ি আছে, তার দুপাশে দড়ির রেলিং। তাতে উঠে পার হতে হবে। ওটার ওপর দিয়ে নাকি হেঁটে চলে যাওয়া যায়। চমৎকার ব্যবস্থা। আমার তো পিলে চমকে যাওয়ার যোগাড়। লজ্জার মাথা খেয়ে সাফ জানিয়ে দিলাম এই গুঁড়ির উপর দিয়ে দড়ি ধরে খরস্রোতা নদী পার হওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। নাগারা মুখ চাওয়া চাওয়ি করে একটা ব্যবস্থা করল। আমার আগে একজন আর পিছনে একজন। দুদিকে একটা গাছের পাতলা লগির মত কী যেন ধরেছে। আমি ওটা ধরে ব্যালান্স করে পেরোব। বাংলাতে যাকে বলে “পড়ে গেলাম”, “মরে গেলাম” দশা। যেতে যেতে ভয়ে হাউমাউ করে চিৎকার করছি। আর যেই না চিৎকার শুরু করেছি, দেখি আদাখো বলছে, “একদম চিৎকার করবেন না ম্যাডাম! এই জায়গাটা হচ্ছে বার্মিস পাইথনের ডেরা। ওরা তাড়া করতে পারে।” বার্মিজ পাইথন সাদামাটা ভারতীয় পাইথনদের মতন লক্ষ্মী নয় যে আলাপ না করেই ছেড়ে দেবে।

বোঝো ঠ্যালা। নীচে জল, পায়ের তলায় গাছের গুঁড়ি। উপরন্তু ভারসাম্য বজায় রাখতে পারছি না, হাত পা কাঁপছে। এদিকে গোদের উপর বিষফোঁড়ার মত বলে কিনা বার্মিজ রক পাইথন চলে আসবে। কেমন লাগে? ভাবলাম বাংলার মেয়ে, মা মনসাকে ডাকি। কিন্তু দেবী কি বার্মিজ ভাষা জানেন? তাহলে রক পাইথনকে ধমকে নিরস্ত্র করবেন কী করে?

ঠিক নদীর মাঝামাঝি পৌঁছেছি, দেখি নাগারা দাঁড়িয়ে পড়ল। আমিও থামলাম। যেদিক থেকে বেরিয়ে এসেছি, সেদিকে আঙ্গুল দেখাচ্ছে। আমার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখার মতো অবস্থা নেই কী দেখাচ্ছে, কেন দেখাচ্ছে। চিঁ চিঁ করে আদাখোকে কিছু একটা বলছি, কিন্তু সে কোন উত্তর দিচ্ছে না দূর থেকে। তারপর আবার চলতে শুরু করল। এবার একদমই আওয়াজ করছে না নাগারা। দু মিনিট লাগবে বলেছিল ঐ নদী পার হতে। কিন্তু পাক্কা কুড়ি মিনিট লাগল। একজন দেখি ফিসফিস করে দেখাচ্ছে একটা গাছের উপর একখানা পাইথন কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে আছে। আমি তখন ভাবছি যদি সত্যি তাড়া করে ,এই পাহাড়ী রাস্তায় কোথায় দৌড়ব? আমি সবচেয়ে ছোট। বোধহয় আমাকেই আগে গিলবে। জামিরকে একবার মিনমিন করে জিজ্ঞেস করেছিলাম পাইথনের পেট কেটে জ্যান্ত বের করা যায়? উত্তর পাইনি! কয়েকজন বলল তারা সাপটাকে অনুসরণ করবে, আরেক দল আমাদের নিয়ে গুহাতে ঢুকবে। এ হেন পরিস্থিতির পরে মাথায় কোনো পাথর, মাটি, আকাশ, বাতাস আর ঢোকে? জানি তো আবার ঐ রাস্তা দিয়েই ফিরতে হবে গ্রামে। কি ঘোড়ার ডিম খননকার্য করলাম আর নোটস নিলাম জানি না। শনকে খালি বলছি যে বেশি বিস্তারিত গবেষণা করে কাম নেই। সন্ধে হওয়ার আগে গ্রামে পৌঁছতে পারলেই হল। যে দলটা পাইথনের পিছু পিছু গিয়েছিল, তারা ফিরে এসে বলল সেটা নাকি অন্য দিকে চলে গেছে। তাতে একটু বল পেয়ে, সেই একই উপায়ে, কোনক্রমে নদী পেরিয়ে গ্রামে ফিরলাম। রাতের খাবার ভাল্লুকের ঝাল। শুনলাম খুবই মর্যাদাপূর্ণ খাদ্য। বিশেষ অতিথি থাকাকালীন ওরা ভাল্লুক শিকার করে আনে।

পরের দু সপ্তাহ ভাগ্যিস আর ঐ নদী পেরোতে হয়নি! পরের কাজগুলো অন্যান্য গুহাতে হয়েছিল। কিন্তু চলে আসার ঠিক দুদিন আগে, সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি সবার মুখ খুব কাঁচুমাচু। কারণ রাত্রে পাইথন এসেছিল এবং ওদের গোদা শুয়োরটাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আমি একবার মনে মনে একটা গোদা শুয়োরের মাপের সাথে নিজের দৈর্ঘ্য প্রস্থ মিলিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলাম। ভাবলাম আর তো একদিন আছি, কোনক্রমে কাটিয়ে দিই। আজকের দিনটা আমাকে না নিলেই হল। তারপর একটা শুয়োর খেলে কতদিন পাইথনের পেট ভর্তি থাকে, নড়তে চড়তে অসুবিধা হয় কিনা, এসব নানা প্রশ্ন করলাম গ্রামের লোকেদের। একেক জনের কাছে একেক রকম উত্তর পেয়ে একটা গড় হিসাব করে নিয়ে বোঝার চেষ্টা করলাম আবার কবে নাগাদ পাইথন বাবাজির খিদে পেতে পারে। যা-ই হোক, সৌভাগ্যের বিষয় সে যাত্রায় রক পাইথন আমাকে খায়নি।

কিছুদিন আগে মিমির গুহাতে আমাদের কাজের গবেষণাপত্র গৃহীত হয়েছে। কোহিমা ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে হয়েছে ছেপে বেরোবে কিছুদিন পর। বিভিন্ন গবেষণার তহবিল থেকে টাকা আসার সম্ভাবনা আছে আরো কাজ করার জন্য। তবে পরের বার যখন যাব, তখন পাইথনের হাত থেকে বাঁচার জন্য কিছু একটা আবিষ্কার করে নিয়ে যেতে হবে। খালি নদীটা আবার না পেরোতে হলেই হল!

(নাগাল্যান্ডের কিফিরে ও মিমি গ্রামের ছবি। চিত্র নিজস্ব)

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.