হুগলী জেলার একটি গ্রাম ফুরফুরা শরীফ। খ্রিস্টীয় চতুর্দশ শতকে এখানকার বাগদি রাজা পরাস্ত হন আসরাফ সম্প্রদায়ের মুসলমান আক্রমণকারীদের কাছে। আসরাফরা হযরত মহম্মদের কন্যা ফতেমার সূত্রে নবীর বংশধর বলে থাকেন নিজেদের — এর সত্যাসত্য বিচারের মতো শাস্ত্র বা ইতিহাসের জ্ঞান আমার নেই। এই বিজয়ী আসরাফরা ১৩৭৫ খ্রিস্টাব্দে গড়ে তোলেন মসজিদ ও উক্ত যুদ্ধে নিহত দুই মুসলমান সেনাপতির সমাধি বা মাজার। এর প্রায় পাঁচশো বছর পরে অর্থাৎ ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এই মসজিদ ও মাজারের তত্ত্বাবধায়ক হিসাবে কর্মজীবন শুরু করেন আবু বকর সিদ্দিকি। তিনিই প্রতিষ্ঠা করেন সিলসিলা-এ-ফুরফুরা (Order of Furfura)। ধর্মপ্রচার ছাড়াও সমাজসেবা ও সমাজ সংস্কারমূলক কাজের মধ্য দিয়ে তিনি তৎকালীন ইসলামী চিন্তা বিশ্বে নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরী করেন। একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অনাথাশ্রম, চিকিৎসালয় ইত্যাদি দাতব্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পাশাপাশি তিনি নারীশিক্ষার স্বপক্ষে জোরালো দাবি তোলেন এবং বর্তমান অসম ও অবিভক্ত বাংলার বিস্তীর্ণ এলাকা ঘুরে জনমত গড়ার চেষ্টা করেন। এজন্য তিনি সমসাময়িক মুসলিম দুনিয়ায় মুজাদ্দিদ-এ-জামান (Reformer of age/era) বা যুগসংস্কারক নামে পরিচিত হন।

১৯৩৯ এ আবু বকর সিদ্দিকি (এঁকে অনুগামীরা ভালোবেসে দাদাহুজুর বলে থাকেন — এখানে দাদা কথার অর্থ পিতামহ) দেহত্যাগ করলে সিলসিলা-এ-ফুরফুরার দায়িত্ব ন্যস্ত হয় তাঁর পাঁচ পুত্রের উপর, যাঁরা একত্রে পাঁচ হুজুর নামে পরিচিত। এঁরা মূলত সিলসিলার বিস্তারে ও দাদাহুজুরের গড়ে তোলা অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের রক্ষণাবেক্ষণে ব্রতী ছিলেন। দুই চব্বিশ পরগনা সহ সমগ্র দক্ষিণবঙ্গে ফুরফুরা শরীফের আজ যে ধর্মীয়/সামাজিক প্রভাব তার মূল কৃতিত্ব এই পাঁচ হুজুরের। এঁদের পরবর্তী প্রজন্ম হলেন পীরজাদারা অর্থাৎ পীরের পুত্রেরা – ত্বহা সিদ্দিকি যাঁদের মধ্যে (অন্ততঃ রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে) সর্বাধিক বিখ্যাত। তারও পরের প্রজন্মের পীরজাদা হলেন আব্বাস সিদ্দিকি। সুতরাং আজকাল সোশ্যাল মিডিয়ায় যে গোল দেখতে পাই যে আব্বাস সিদ্দিকি যথার্থ পীরজাদা কি না বা ত্বহা এবং আব্বাস সিদ্দিকির মধ্যে ফুরফুরার ন্যায্য প্রতিনিধি কে, তা অত্যন্ত হাস্যাস্পদ আলোচনা। জন্মসূত্রে এঁরা প্রত্যেকেই পীরজাদা এবং যেহেতু সিলসিলা-এ-ফুরফুরা কোনো কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব দাবি করে না, তাই এঁরা প্রত্যেকেই একইরকম জোরের সাথে ফুরফুরা শরীফের প্রতিনিধি হিসাবে নিজেকে তুলে ধরতে পারেন এবং উক্ত দুজন তা করেও থাকেন।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

আব্বাস সিদ্দিকি ও ত্বহা সিদ্দিকির পূর্বেও ফুরফুরা শরীফে প্রায় সমস্ত রাজনৈতিক দলের নেতা, কর্মীরাই যাতায়াত রাখতেন। সেসব ‘সৌজন্য সাক্ষাৎকার’ ভোটে কতটা প্রভাব ফেলত তা নিয়ে মতানৈক্য আছে। ওয়াকিবহাল মহলের মতে কোনো হুজুর বা পীরজাদার একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের প্রতি পক্ষপাতিত্ব থাকা নতুন নয়। কিন্তু তাঁরা প্রকাশ্যে একটি দলের হয়ে সওয়াল করেছেন এমন নজির ছিল না। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন নতুন নজির তৈরি করতে অগ্রণী আমাদের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী এই নজিরটি তৈরী করেন পীরজাদা ত্বহা সিদ্দিকির মাধ্যমে — সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম ইস্যুকে সামনে রেখে। সেটাকেই আরেক ধাপ এগিয়ে নিয়ে প্রায় এক দশক পরে সরাসরি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসাবে আব্বাস সিদ্দিকির আত্মপ্রকাশ। ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট প্রতিষ্ঠার আগে তিনি নিজের রাজনৈতিক জমি গত দু-তিন বছরে তৈরি করেছেন আহল-এ-সুন্নাতুল জামাত সংগঠনের ব্যানারে। সরাসরি রাজনৈতিক সংগঠন না হলেও, শুধুমাত্র ধর্মীয় কার্যকলাপে নিজেদের আবদ্ধ না রেখে প্রথম থেকেই সমাজসেবামূলক কাজে এই সংগঠন তৎপর হয়। এরপর এই সংগঠনের মঞ্চ থেকে আব্বাস সিদ্দিকি বিভিন্ন সামাজিক ইস্যুতে মুখ খুলতে শুরু করেন। তারও পরে বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোকে তোপ দাগতে শুরু করেন। এই ঘটনাক্রম গুরুত্বপূর্ণ, কারণ একদিকে আহল-এ-সুন্নাতুল জামাত আদিবাসী, দলিত ও অন্যান্য পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ের প্রচুর ছোট ছোট সংগঠনকে ত্রাণ ও সমাজসেবার কর্মসূচির মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ করতে শুরু করে। অন্যদিকে আব্বাস সিদ্দিকি ক্রমশ একের পর এক ধর্মীয় জলসা থেকে বঞ্চিত,অবহেলিত মানুষদের পৃথক রাজনৈতিক দল বা ফ্রন্টের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কথা বলতে শুরু করেন। তাঁর কথাবার্তায় ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্ববাদ ও প্রতিক্রিয়াশীল উপাদান কমে আসে এবং তিনি যে বিজেপি ছাড়া যে কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে জোট করতে প্রস্তুত, তা বারংবার বিভিন্ন ভাবে জাহির করতে থাকেন। এই ছদ্ম আহ্বানে তৃণমূল সেভাবে সাড়া দেয়নি। এর একটা বড় কারণ বোধ হয় মুসলিম ভোটের ব্যাপারে মমতার অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস — “যে গরু দুধ দেয়” ইত্যাদি। এই আত্মবিশ্বাস ভুল কিনা তা সময় বলবে। এরপর মিম (অল ইন্ডিয়া মজলিশ-এ-ইত্তেহাদুল মুসলিমিন) হয়ে শেষমেশ আব্বাসের ‘সেলিমদা’-র হাত ধরে বামেদের সাথে আসন সমঝোতার ইতিহাস আমাদের মোটামুটি জানা।

একজন ৩৪ বছরের যুবকের এই উত্থান অনেকেরই বিস্ময়কর লেগেছে। নিজের ধর্মীয় অনুগামীদের উপর তাঁর প্রভাব যে তাঁর পূর্বসূরীদের তুলনায় বেশি — এরকম মনে করার কোনো কারণ নেই। তা সত্ত্বেও তিনি এই রাজনৈতিক পরিসরটা কী করে তৈরি করতে পারলেন? তার একটা কারণ অবশ্যই এই, যে যখনই ধর্মীয় বা জাতি পরিচয়ের জন্য সমাজের কোন শ্রেণীর রাজনৈতিক প্রান্তিকীকরণ হয়, তখন স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হিসাবে পরিচয়ের রাজনীতি বা আইডেন্টিটি পলিটিক্সের উত্থান অনভিপ্রেত হলেও অনিবার্য। দেশ জুড়ে, এমনকি বাংলাতেও, মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোতে কার্যকরী মুসলিম প্রতিনিধিত্ব কমে এসেছে গত দশ বছরে। এর একাধিক কারণ আছে যা পৃথক ও বিস্তারিত আলোচনার দাবি রাখে। কিন্তু এর সরাসরি ফল হল শূন্যস্থান তৈরি হওয়া, যেখানে আব্বাস সিদ্দিকি বাংলার মুসলমানদের নেতৃত্ব দাবি করার সুযোগ পেয়ে গেছেন। যেখানে তিনি দলিত, মতুয়াদের নাম জড়িয়ে প্রশ্ন তুলছেন, এই লোকগুলো কি শুধু বিভিন্ন পার্টির হয়ে মারই খেয়ে যাবে? দাবি তুলছেন, মার যদি খেতেই হয় নিজেদের আলাদা পার্টি করো, সেই পার্টিগুলোর ফ্রন্ট বানাও, সেই ফ্রন্টের হয়ে নিজের অধিকারের জন্য মার খাও। এই দাবিকে নস্যাৎ করার মত মুখ প্রথাগত রাজনৈতিক দলগুলো দেখাতে পারছে না। মা-মাটি-মানুষের নেত্রী মানেই ব্যানার্জি; পলিটব্যুরো মানেই মিশ্র, বসু বা চক্রবর্তী। শুধু যদি মুসলিম মুখই বলি, সিপিএমএর সবেধন নীলমণি আব্বাসের বর্তমান রাজনৈতিক মেন্টর মহম্মদ সেলিম। আর “আমি তোমাদেরই লোক” মমতা ব্যানার্জির ক্ষেত্রে ফিরহাদ হাকিম। আব্বাস সিদ্দিকির ফিরহাদ হাকিমকে মূর্তি পুজো নিয়ে আক্রমণ করার উদ্দেশ্য মুসলমানদের নেতা দূরে থাক, হাকিম সাহেবের মুসলিম পরিচয়কেই প্রশ্নচিহ্নের মুখে ফেলে দেওয়া। একই কারণে নুসরত জাহানকে কুরুচিকর আক্রমণ। লক্ষণীয়, আব্বাস ততদিনে বামেদের সাথে জোটের সম্ভাবনা আঁচ করতে পেরেছেন, তাই একই যুক্তিতে সুযোগ থাকলেও তিনি সেলিমের সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করেননি। আব্বাসকে শিক্ষানবিশ রাজনীতিবিদ বলে উড়িয়ে দেওয়া আমি এ জন্যই ভুল বলে মনে করি। ইউটিউবে সার্চ করলে আপনি আব্বাস সিদ্দিকির সাথে ক্যানিং পূর্বের তৃণমূল প্রার্থী সওকত মোল্লার একটি ভাইরাল অডিও পেয়ে যাবেন। যেভাবে ঐ মাথা গরম নেতাকে ফাঁদে ফেলে নিজে শান্তভাবে পুরো সময়টা জুড়ে কথা বলে তারপর সেই অডিও প্রচার করে কার্যত সফল স্টিং অপারেশন করেছিলেন, অমনটা পিকে বা নব্য চাণক্য করলে মিডিয়া দিনরাত ঐ নিয়েই মেতে থাকত।

তাই আব্বাস সিদ্দিকি ধর্মগুরু বলে রাজনীতি বোঝেন না, এমনটা আমি মনে করি না। আমার আপত্তি তাঁর যোগ্যতা নিয়ে নয়, তাঁর সাফল্যের সম্ভাবনা ও সম্ভাব্য পরিণাম নিয়ে। এই মুহূর্তে আব্বাস সিদ্দিকির অনুগামী কারা তা জানলেও আব্বাস সিদ্দিকির ভোটার কে কে তা আমরা জানি না। আমাদের বুঝতে হবে পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম ভোট একটা মনোলিথ নয়। যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নিই, ফুরফুরা শরীফের অনুগামীরা আব্বাসের মুখ চেয়ে সব্বাই সংযুক্ত মোর্চাকে ভোট দেবেন, সিদ্দিকুল্লা সাহেবের জমিয়ত উলেমা-এ-হিন্দের অনুগামীরা (যাদেরকে আমরা সংক্ষেপে ও সহজে জামাতি বলতে অভ্যস্ত) তাঁর কথা শুনে তৃণমূলকে ভোট দেবেন না কেন? এছাড়া আছেন আরো বিভিন্ন দরবার শরীফের অনুগামীরা (উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাট দরবার শরীফ, মেদিনীপুরে প্রতাপপুর দরবার শরীফ ইত্যাদি) যাঁদের পীরজাদারা ইউনাইটেড সেকুলার ফ্রন্ট (ইউ এস এফ)-এর ব্যানারে ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন আব্বাসকে প্রতিহত করার মূল লক্ষ্যে। খোদ ফুরফুরার মধ্যেও ত্বহা সিদ্দিকিসহ একাধিক পীরজাদা ধর্মীয় মঞ্চ থেকে আব্বাসকে হারানোর আবেদন করছেন। আর একটা বড় গেরো হলো অবাঙালি মুসলিম ভোটার। এঁদের মধ্যে পূর্বে উল্লিখিত জামাতের প্রভাব অত্যন্ত বেশি। জেনে রাখা ভাল যে আব্বাসের আগেই এই ‘বহিরাগত’ জামাতকে প্রতিরোধ করতে ফুরফুরা শরীফের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছিল জামাত উলেমা-এ-বাংলা। যাঁরা আব্বাসের ব্রিগেড বক্তৃতা মন দিয়ে শুনেছেন (বা আগের যাবতীয় বক্তব্যও যদি শোনেন) তাঁর উদ্দিষ্ট শ্রোতা “বাঙালি” ও “বাংলার ভাই ও বোনেরা” ইত্যাদি। তিনি জাতীয় স্তরের সংবাদমাধ্যম ছাড়া অন্যত্র বাংলাতেই বক্তব্য রাখেন এবং কোনো অবাঙালির কাছে পৌঁছানোর আগ্রহ দেখান না। এই সীমাবদ্ধতার জন্যই তিনি প্রথমদিকে পরিপূরক হিসাবে ওয়েসিকে পাশে চেয়েছিলেন বলে অনেকে মনে করেন। আর সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো এত ‘প্রভাব’-এর পরেও মুসলিম ভোটারদের বিরাট অংশ গ্রামবাংলার রাজনৈতিক বাস্তবতা মেনে আজও পার্টি লাইনে ভোট দেন বা দিতে বাধ্য হন, সে যে ধর্মগুরু তাঁকে যা-ই বোঝান।

এর পরেও যদি আব্বাস সফল হন তাহলে লাভ কার? বামেরা নিজেদের গ্রামীণ মুসলিম ভোট আব্বাস সিদ্দিকিকে যেভাবে তুলে দিচ্ছেন, জোট আজ বাদে কাল ভাঙলে (ভাঙবেই। আব্বাসও বলেছেন) এই জয়নিং বোনাস বামেদের ঘরে ফিরবে তো? বামেদের যে হিন্দু ভোট বিজেপির দিকে ইতিমধ্যেই গিয়েছে তাঁরা এবার বামেদের কিছুটা উন্নতি দেখে হয়ত ভাবছিলেন ফিরবেন। আব্বাসের জুজু দেখিয়ে বিজেপি সেই ভোটারদের চিরতরে নিজেদের করে নেবে না তো? এ তো এমন সমীকরণ যে আব্বাস ব্যর্থ হলে জোটের ক্ষতি, সফল হলে আব্বাসের লাভ! আর আজ আব্বাস ব্রিগেডে মার্জিত, পরিশীলিত বক্তব্য রেখেছেন বলে যে বামপন্থীরা বুক বাজাচ্ছেন, তাঁদের বোঝা প্রয়োজন ওঁর হাতে এই মুহূর্তে কোনো প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক ক্ষমতা নেই। চারটে আসন পেলে উনি একই বক্তব্য রাখবেন তো? ওঁর একটু পুরনো বক্তব্য শুনুন, ক্ষমতায় এলে উনি কী কী করতে পারেন তার লম্বা ফিরিস্তি পেয়ে যাবেন ওঁর মুখেই। আপনি যেমন ওঁর একটা ব্রিগেড বক্তব্যকে অবিশ্বাস করার কারণ দেখছেন না, তেমন আমিও ঐসব হুমকিকে অবিশ্বাস করার কারণ দেখছি না কমরেড।

আব্বাসের ক্ষমতায়ন সবথেকে বড় অশনি সংকেত অবশ্যই মূলধারায় মিশে থাকা, মূলত শহুরে, ‘লিবারাল’ মুসলিমদের জন্য। মুসলিম মুখ হিসাবে রাজনৈতিক পরিসরে তাঁরা এমনিতেই লুপ্তপ্রায়, সে কথা আগেই বলেছি। আব্বাস ফর্মুলা সাফল্য পেলে রাজনৈতিক দলগুলো ভবিষ্যতে মুসলিম ক্ষমতায়নের অকারণ ঝক্কি খুব সহজেই এ জাতীয় স্বঘোষিত প্রতিনিধিদের আউটসোর্স করে দেবেন। মানুষ মাত্রই যেহেতু নিজেকে অন্য অপেক্ষা শ্রেয় মনে করে, আব্বাস সিদ্দিকিরাও নিজেদের ধাঁচেই আরো আরো ক্লোন বা রেপ্লিকা তৈরি করবেন। যাঁরা ধর্মীয় গোঁড়ামিমুক্ত নন, যাঁরা শাস্ত্রের নিক্তিতে প্রতি মুহূর্তে নির্ধারণ করতে চান কে কী খাবে, কোথায় যাবে, কী পরবে, কার সাথে শোবে — সবটাই। অনেকে দাদাহুজুরের তুলনা টেনে আব্বাস সিদ্দিকিকে বেনিফিট অব ডাউট দিতে চাইছেন। দাদাহুজুর নিজের সময়ের নিরিখে অনেকটাই এগিয়ে ছিলেন, একথা যদি মেনেও নিই, তাঁর উত্তরসূরীরা এর পরে একের পর এক সামাজিক সংস্কার করে গেছেন এমন নজির তো পাচ্ছি না। কেউ কেউ বলছেন এঁরা সুফি ঘরানার পীর, কাজেই গোঁড়ামিমুক্ত। অনুরোধ করছি যাঁরা এঁদের অনুগামী সেইসব গ্রামে গিয়ে দেখুন এবং জানান ঠিক কী কী উদারতার নমুনা দেখতে পেলেন এই ঘরানার যাপনে, যা আপনি পূর্বে কথিত শিক্ষিত, মূলধারার মুসলিমদের মধ্যে পান না। সমস্যা হচ্ছে মুসলিম সমাজ সম্পর্কে ধারণা এতটাই নীচু, আশা এতটাই কম যে সামান্যতম স্বাভাবিকত্ব চোখে পড়লেই সবাই ধন্য ধন্য করে ওঠেন।

‘নলেজ সিটি’ প্রকল্প নিয়ে বড় বড় পোষ্ট নামছে বামপন্থী বন্ধুদের ফেসবুকের পাতায়। তাঁরা ভুলে যাচ্ছেন বা জানেনই না যে আব্বাস সিদ্দিকি রাজনীতিতে নামার বহু পূর্বেই এই ‘নলেজ সিটি’-র নামে টাকা তুলে আত্মসাৎ করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অথচ আব্বাস নাকি তৃণমূলের দুর্নীতির হাত থেকে গরীব মানুষকে উদ্ধার করবেন! তিনিও যুগের দাবি মেনে মমতা ব্যানার্জিকে স্বজনপোষণ নিয়ে তুলোধোনা করেন। এদিকে নিজে পার্টি গড়েই তার চেয়ারম্যান করেন ভাই নওশাদ সিদ্দিকিকে! এ যদি স্ববিরোধ না বলেন তবে আব্বাস সিদ্দিকি যাই হোন, আপনি উদার নিঃসন্দেহে।

এহেন আব্বাসকে দিয়ে জোটের আশু রাজনৈতিক লাভ হবে কিনা সময় বলবে। কিন্তু এদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে বাংলার মুসলমান সমাজ যে আরো খানিকটা পিছিয়ে পড়বে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আমার এক বামপন্থী দাদা সেদিন বলছিলেন, পরিবর্তন বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া যায় না। মুসলমান সমাজের ভিতর থেকেই বদলটা আসতে হবে। কথাটা সম্পূর্ণ অস্বীকার করতে পারি না। কিন্তু সেই প্রচেষ্টা কি বাংলার মুসলমান সমাজে একেবারেই হচ্ছে না? আল আমিনের মত একাধিক মিশন মুসলমান সমাজের এমনকি হতদরিদ্র পরিবারের ছেলেমেয়েকেও আজ অশিক্ষা এবং শুধুমাত্র ধর্মীয় শিক্ষার নাগপাশ থেকে উদ্ধার করে মূলধারার শিক্ষায় শিক্ষিত করছে, ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-আমলা তৈরি হচ্ছে, তারা নিজেদের মত করে আরো ছোট ছোট প্ল্যাটফর্ম তৈরি করছে, যাতে ভবিষ্যতে আলাদা করে ‘মূলধারার মুসলমান’ কথাটা ব্যবহার করতে না হয়। রাজনৈতিক দলগুলোকে অনুরোধ, পারলে এদের হাত শক্ত করুন। এদের পাশে দাঁড়ান। কিন্তু হায়! কোনো মিশন আপনাকে কোনদিনই ভোটে জেতাতে পারবে না, কোনো দরবার শরীফ পারলেও পারতে পারে।

তাই যে মুখ্যমন্ত্রী আই এস এফ ব্রিগেড ভরানোর পরদিনই ফুরফুরা শরীফে নতুন করে কোটি টাকা অনুদান দিতে ভোলেন না, তিনি সরকারি সাহায্যবিহীন মাদ্রাসার মুসলিম শিক্ষকদের দাবিদাওয়া দশ বছর ভুলে থাকেন। তাই বামপন্থীরা নন্দীগ্রাম ইস্যুতে মুসলমান চাষীকে “বোঝাতে” ইমাম বুখারীকে উড়িয়ে আনেন, তসলিমা নাসরিনকে দেশছাড়া করতে কোনো পন্থার মধ্যে কোনো বিরোধ বাধে না।

বাংলার মুসলমান জানে তার লড়াই তাকে নিজেকেই লড়তে হবে। সে লড়াই একদিকে যেমন মুসলিমবিদ্বেষী ব্রাহ্মণ‍্যবাদের বিরুদ্ধে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই, অপর দিকে তার নিজের সমাজের রক্ষণশীল শক্তির বিরুদ্ধেও, যা “পদে পদে শত শত নিষেধের ডোরে” মূলস্রোত থেকে বিচ্ছিন্নতা সুনিশ্চিত করতে চায়। সে লড়াইয়ে কাঁধে কাঁধে না মেলাতে পারেন, অন্তত অন্তরায় হয়ে উঠবেন না। এটুকুই অনুরোধ।

পড়ুন বিপক্ষের মত : আব্বাস যে আওয়াজ তুলছেন তা বহুজনের আওয়াজ

তথ্যসূত্র:

উইকিপিডিয়া, ফুরফুরা শরীফ ওয়েব সাইট, ওয়েস্ট বেঙ্গল ট্যুরিজমের ওয়েবসাইট, ইউটিউব

(ছবি ফেইসবুক থেকে)

Leave a Reply