বাংলা সহ নটি রাজ্য এবং তিনটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধনের দ্বিতীয় পর্যায় চলছে। বিভিন্ন ছোটখাটো সমস্যার কারণে অসংখ্য মানুষকে যে শুনানিতে ডাকা হচ্ছে, তা এখন রোজকার খবর। কীভাবে বয়স্ক, অসুস্থ মানুষকে লাইনে দাঁড়িয়ে হয়রান হতে হচ্ছে তাও এখন আর নতুন খবর নয়, কিন্তু এর মধ্যেই একটা নতুন ঘটনা ঘটেছে। বাংলার মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ আগরওয়ালের ব্যক্তিগত ফোন নম্বর কে বা কারা প্রকাশ করে দিয়েছে সোশাল মিডিয়ায়। তারপর থেকে অসংখ্য ফোন আর মেসেজ আসছে তাঁর কাছে। শোনা গেছে, তিনি নাকি এতে অত্যন্ত বিরক্ত। দিন নেই রাত নেই তাঁর ফোন বেজে উঠছে। সকলেই বলছেন তাঁদের নানাবিধ সমস্যার কথা। কেউ বলছেন তাঁর বাবার নাম ছিল ২০০২ সালের তালিকায়, বিএলও সাহেব তো সেইসব তথ্য মিলিয়েই বলেছিলেন কোনো সমস্যা নেই, তাঁর নাম চূড়ান্ত তালিকায় থাকবে। তাহলে এখন কেন শুনানিতে ডাকা হচ্ছে, কেন বলা হচ্ছে বয়সের ফারাক বাবার সঙ্গে কম, তাই তাঁকে শুনানিতে আসতে হবে? কেউ আবার বলছেন, তাঁর নামের মাঝে ‘কুমার’ ছিল। কখনো ব্যবহার করেন, কখনো করেন না। কিন্তু দুই ব্যক্তি যে একই, তা কেন তাঁকেই প্রমাণ করতে হবে? এইরকম নানা প্রশ্ন অনবরত এসে চলেছে মনোজের কাছে। শেষমেশ তিতিবিরক্ত হয়ে তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, এফআইআর করবেন এই মর্মে, যে তাঁর প্রাইভেসি লঙ্ঘিত হয়েছে এবং কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে এ কাজ করেছে।

শুধু মনোজ নন, আরেকজনের ফোন নম্বরও মানুষের কাছে পৌঁছে গেছে। তিনি হলেন সীমা খান্না। কোভিডের সময়ে যিনি আরোগ্য সেতু মোবাইল অ্যাপ এবং কনট্যাক্ট ট্রেসিং সংক্রান্ত প্রযুক্তি এনেছিলেন, সেই সীমা। এই যে নতুন শব্দবন্ধ বাজারে এসেছে – ‘লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি’ – যা চূড়ান্ত অযৌক্তিক, তারও উদ্গাতা এই সীমা। শোনা যাচ্ছে তিনি দিল্লির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের, খোদ অমিত শাহের প্রিয় পাত্রী। তিনি জেলা স্তরে নেমে এসে মিটিং করছেন এবং জেলাশাসকদের নাকি নানারকম হুমকিও দিচ্ছেন। কোনো ব্যক্তির যদি ছজন সন্তান থাকে, তাহলে সেই সন্তানদের ডাকা হচ্ছে শুনানিতে। খুব হিসাব করে করে মহিলা এবং সংখ্যালঘু মানুষকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে শুনানিতে ডেকে নাম বাদ দেওয়ার চক্রান্ত চলছে বোঝাই যাচ্ছে। তা সোশাল মিডিয়া থেকে সীমার ফোন নম্বর জেনে তাঁকেও অনেকেই ফোন করছেন। প্রশ্ন করছেন, এক পিতার ছয় সন্তান থাকলেই যদি শুনানিতে ডাকা হয়, তাহলে নরেন্দ্র মোদীর পিতারও তো ছয় সন্তান। প্রধানমন্ত্রী না হয় পদাধিকার বলে ইনিউমারেশন ফর্ম পূরণ করেননি, কিন্তু তাঁর ভাইবোনদের ডাকা হয়েছে কি? সীমাও এফআইআর করবেন কিনা বা ইতিমধ্যেই করেছেন কিনা, তা অবশ্য এখনো জানা যায়নি।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

২০১৭ সালের ২৪ আগস্ট ভারতের সর্বোচ্চ আদালত একটি যুগান্তকারী রায় দিয়েছিল। তাতে বলা হয়, প্রতিটি মানুষের প্রাইভেসি তার অধিকার। সংবিধানের ১৪, ১৯ এবং ২১ নম্বর ধারায় প্রতিটি ভারতীয় নাগরিকের এই অধিকার স্বীকৃত। কোনোভাবেই রাষ্ট্র সেই অধিকার খর্ব করতে পারে না। কিন্তু বেশিরভাগ নাগরিক কি এই অধিকারের ব্যাপারটি বোঝেন? আজ যখন এই বিশেষ নিবিড় সংশোধনীর সময়ে প্রত্যেক নাগরিকের ফোন নম্বর চাওয়া হচ্ছে, বা বিএলও-র ব্যক্তিগত ফোন নম্বর ইনিউমারেশন ফর্মে ছেপে দেওয়া হচ্ছে, নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে দিয়ে দেওয়া হচ্ছে তাঁদের অনুমতি না নিয়েই, তখন কি দেশের সর্বোচ্চ আদালতের ওই ২০১৭ সালের রায় লঙ্ঘিত হচ্ছে না? যদি মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ বা প্রযুক্তি বিশারদ সীমার নাম প্রকাশ্যে আসা নিয়ে এতই আপত্তিকর হয়, তাহলে বিএলও-দের ফোন নম্বর প্রকাশ্যে আসা আপত্তিকর নয় কেন?

আরো পড়ুন রাহুলের নির্বাচন কমিশন নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ অকারণ নয়

মনে পড়ছে, একবার প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি ফোন পেয়েছিলেন একটি ব্যাংক থেকে। তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তিনি ধার নিতে ইচ্ছুক কিনা। যেমন ফোন আমি, আপনি রোজ পেয়ে থাকি। সেইসময় এ নিয়ে যথেষ্ট শোরগোল পড়েছিল। তখন মনে হয়েছিল, আমরা যে এই ধরনের ফোন পেয়ে বিরক্ত হই, তা নিয়ে তো কোনো সরকার বা কোনো মোবাইল পরিষেবাদাতা একটি কথাও বলে না! অনেকে তো আরও নানারকম ফোন পেয়ে থাকেন। কোনো কোনো কলে জিজ্ঞেস করা হয় – আপনি কোন রাজনৈতিক মতবাদের সমর্থক? এই কলাররা কোথা থেকে ফোন নম্বর পান, সে প্রশ্নের উত্তর দেন না। কে গ্যারান্টি দেবে যে নির্বাচন কমিশনই এইসব সংস্থাকে আমাদের নম্বরগুলো দিয়ে দেয়নি? তাহলে বড় বড় আধিকারিকদের ফোন নম্বরের প্রাইভেসি নিয়ে এত হইচই কিসের? প্রাইভেসি কি শুধু সমাজের উপরতলার কিছু মানুষের জন্যই প্রযোজ্য? সাধারণ মানুষের কোনো প্রাইভেসি থাকতে নেই?

এসআইআরের শুনানি চলাকালীন বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্নরকম আন্দোলন হচ্ছে। সেইসব আন্দোলনের রাশ কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দলের হাতে নেই। বহু মানুষ নিজেরাই মিলেমিশে নানা জায়গায় জড়ো হচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে বড় বড় আমলাদের নম্বর ছড়িয়ে পড়াও এক ধরনের বিদ্রোহ। তাঁদের ফোন করা, হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ করাও এক ধরনের আন্দোলন। সরাসরি কর্তাদের ফোন করে জবাবদিহি চাওয়াও এক ধরনের প্রতিবাদ। অনেকেই একে নৈরাজ্য বলতে পারেন, কিন্তু কখনো কখনো নৈরাজ্যও জরুরি। আমাদের অনেকের প্রিয় সাহিত্যিক নবারুণ ভট্টাচার্য এই নৈরাজ্য নিয়ে বিস্তর লিখেছেন। তাঁর অমর সৃষ্টি ফ্যাতাড়ুরা নৈরাজ্যই তৈরি করে। বাঙালি ভদ্রলোকদের কানে যতই খারাপ শোনাক, নবারুণ কিন্তু হুঁশিয়ারি দিয়েই গেছেন ‘লাগো যদি গরীবের গাঁড়ে, ফ্যাতাড়ুরা হেগে দেবে তোমাদের ঘাড়ে’।

নবারুণের এই কাল্পনিক চরিত্রগুলি উত্তর-আদর্শিক যুগের বিদ্রোহী। যখন মেনে নেওয়া কিংবা মানিয়ে নেওয়াই আদর্শ আচরণ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত, তখন ফ্যাতাড়ুরা যদি উড়ে এসে ওই নির্বাচনী আধিকারিকদের ফোন করে ব্যতিব্যস্ত করতে পারে, তাও একটি লড়াই। নবারুণের সাহিত্য চালু ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং নিজের সমস্যা হজম করে যাওয়ার বিপরীত বয়ান রচনা করে। সুতরাং এই মুহূর্তে যারা নির্বাচন কমিশনের মাথাদের ফোন নম্বর বুকের প্ল্যাকার্ডে লিখে ঘুরে বেড়াবে এবং অন্যদের উদ্বুদ্ধ করবে ওই নম্বরে ফোন করে অসুবিধার কথা জানাতে, তারাই ফ্যাতাড়ু। তাদের পাশে আমাদের দাঁড়াতে হবে।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.