মহারাষ্ট্রের বিধানসভা নির্বাচন নিয়ে আবার বিতর্ক শুরু হয়েছে। গতবছর লোকসভা ভোটে মহারাষ্ট্রের ফলাফল অনেকের কাছেই অপ্রত্যাশিত ছিল। আটচল্লিশ আসনের মধ্যে ৩০টি জিতেছিল ইন্ডিয়া জোট। তার মধ্যে কংগ্রেস একাই পেয়েছিল ১৩টি আসন। অন্যদিকে এনডিএ জোট পেয়েছিল মাত্র ১৭টি আসন। বিজেপি পায় নটি। কিন্তু ছমাস পরেই নভেম্বর মাসের বিধানসভা ভোটের ফল পুরো উলটে যায়। মোট ২৮৮ আসনের মধ্যে বিজেপি নেতৃত্বাধীন মহা যুতি পায় ২৩৫। বিরোধী মহা বিকাশ আঘাড়ি পায় মাত্র ৫০টি আসন। যার মধ্যে কংগ্রেস ১৬টি এবং সিপিএম একটি আসনে জেতে।
তখনই বিরোধীরা ওই নির্বাচনে নানা বেনিয়ম, কারচুপির অভিযোগ তুলেছিল। সম্প্রতি লোকসভার বিরোধী নেতা রাহুল গান্ধী সেই প্রসঙ্গ টেনে আগামী বিহার বিধানসভা ভোটেও তার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। গত ৭ জুন দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস কাগজে রাহুলের লেখা ‘ম্যাচ-ফিক্সিং মহারাষ্ট্র’ শীর্ষক একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। সেই নিবন্ধ পোস্ট করে রাহুল তাঁর এক্স হ্যান্ডেলেও একই আশঙ্কা প্রকাশ করেন। প্রত্যাশিতভাবেই নির্বাচন কমিশন অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে, বিজেপি পালটা রাহুলকে আক্রমণের নিশানা করেছে। জাতীয় নির্বাচন কমিশন আর বিজেপির বক্তব্যের মূল সূরের মধ্যে সাদৃশ্য তাৎপর্যপূর্ণ।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
রাহুল অভিযোগ করেছেন, পাঁচটি ধাপে মহারাষ্ট্রের বিধানসভা ভোটে কারচুপি হয়েছিল। প্রথম ধাপ হল নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের প্যানেল গঠন। যেখানে আইন বদলে তিন সদস্যের প্যানেলে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে সরিয়ে কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে আনা হয়। প্যানেলের অপর দুই সদস্য হলেন প্রধানমন্ত্রী ও লোকসভার বিরোধী দলনেতা। নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের ক্ষমতা এভাবে কার্যত শাসকের কুক্ষিগত করা হয়েছে। ফলে শাসক দলের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তির নির্বাচন কমিশনার হওয়ার পথ পরিষ্কার। দ্বিতীয় ধাপ ভোটার তালিকায় ভুয়ো ভোটারের নাম তোলা। ২০১৯ সালের বিধানসভা ভোটে মহারাষ্ট্রে ভোটার ছিলেন ৮.৯৮ কোটি। ২০২৪ সালের মে মাসে লোকসভায় সেই সংখ্যা ৩১ লক্ষ বেড়ে হয় ৯.২৯ কোটি। কিন্তু তার পাঁচ মাস পর নভেম্বরের বিধানসভা নির্বাচনেই ভোটার ৪১ লক্ষ বেড়ে হয় ৯.৭০ কোটি। পাঁচ বছরে যেখানে ভোটার বেড়েছিল ৩১ লক্ষ, সেখানে মাত্র পাঁচ মাসে ৪১ লক্ষ ভোটার বৃদ্ধি নিয়ে নানা মহলেই প্রশ্ন রয়েছে। রাহুলের অভিযোগ, এই বাড়তি ভোটারদের অধিকাংশই ভুয়ো ভোটার।
রাহুলের মতে কারচুপির তৃতীয় ধাপ হল, শেষ মুহূর্তে ভোট পড়ার হিসাবে ব্যাপক গরমিল। নির্বাচন কমিশনের হিসাবে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত ভোটদানের হার ছিল ৫৮.২২%। পরের দিন সকালে কমিশন ভোটদানের চূড়ান্ত হার জানায় ৬৬.০৫%। বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত ভোটদান ও চূড়ান্ত ভোটদানের হারের মধ্যে পার্থক্য ৭.৮৩%। সংখ্যার হিসাবে ৭৬ লক্ষের কাছাকাছি। রাহুলের মতে এই বৃদ্ধি অস্বাভাবিক। অতীতে কোনো ভোটেই এত তফাত হয়নি। ২০১৯ সালের মহারাষ্ট্র বিধানসভা নির্বাচনে ভোটগ্রহণের ঠিক পরে এবং চূড়ান্তভাবে ঘোষিত ভোটদানের হারের হিসাবে ফারাক ছিল মাত্র ০.৬৪%।
রাহুলের অভিযোগ অনুযায়ী কারচুপির চতুর্থ ধাপ হল বিজেপি যেসব কেন্দ্রে দুর্বল, সেখানে ভুয়ো ভোটার বাড়িয়ে ফল বিজেপির পক্ষে আনা। মহারাষ্ট্রে প্রায় এক লক্ষ বুথের মধ্যে মাত্র ১২,০০০-এর কাছাকাছি বুথে ভোটার সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বুথগুলি ৮৫টি বিধানসভা কেন্দ্রে ছড়িয়ে আছে, যেগুলিতে লোকসভা ভোটে বিজেপির ফল খারাপ হয়েছিল। বিকেল পাঁচটার পর ভোটদানের হারে যে অস্বাভাবিক বৃদ্ধি দেখানো হয়েছে, তার সিংহভাগই করা হয়েছে এই বুথগুলির হিসাবে কারচুপি করে। সেক্ষেত্রে এই ১২,০০০ বুথের প্রতিটিতে গড়ে ৬০০ জন বাড়তি ভোটার হলে সংখ্যাটা দাঁড়ায় ৭২,০০০। প্রত্যেক ভোটারের গড়ে ভোট দিতে এক মিনিট লাগলেও, ৬০০ জনের ভোট দিতে বুথগুলিতে বাড়তি দশ ঘন্টা লাগার কথা, কিন্তু তা হয়নি। এই কেন্দ্রগুলির অধিকাংশই বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট জিতেছে। নির্বাচন কমিশন বলছে তরুণ ভোটার বাড়ায় মোট ভোটার বেড়েছে। রাহুল প্রশ্ন তুলেছেন, এই তরুণ ভোটারদের সিংহভাগ কি ওই ১২,০০০ বুথেই আছেন? বাকি ৮৮,০০০ বুথে নেই? বিজেপি মহারাষ্ট্রে ১৪৯ আসনে লড়ে ১৩২টি জিতেছে। সাফল্যের হার ৮৯%। অথচ মাত্র ছমাস আগে লোকসভা নির্বাচনে তাদের সাফল্যের হার মহারাষ্ট্রে ছিল মাত্র ৩২%।
কারচুপির পঞ্চম ধাপ ভোটের সময়কার ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ্যে আনা আইন করে নিষিদ্ধ করা। গত ডিসেম্বরে কনডাক্ট অফ ইলেকশন রুলস, ১৯৬১-র ৯৩ নম্বর নিয়ম বদলে এ কাজ করে নরেন্দ্র মোদীর সরকার। এভাবে তথ্যপ্রমাণ লোপাটের ব্যবস্থা মজবুত করা হয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগের ঠিকঠাক জবাব নির্বাচন কমিশন দেয়নি। এমনকি ২০২৪ সালের লোকসভা ও বিধানসভা ভোটের সচিত্র ভোটার তালিকার ফটোকপি দেওয়ার দাবি জানানো সত্ত্বেও কমিশন তা মানেনি। হাইকোর্ট ভিডিওগ্রাফি ও ভোটগ্রহণ কেন্দ্রের সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ করার নির্দেশ দিয়েছিল নির্বাচন কমিশনকে। তারপরেই মহারাষ্ট্র বিধানসভা ভোটের এক মাসের মধ্যে কেন্দ্র তড়িঘড়ি আইন সংশোধন করে সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ্যে আনার উপরে বিধিনিষেধ আরোপ করে। রাহুলের মতে, মহারাষ্ট্রের বিধানসভা ভোটের ফলাফলে জনমত প্রতিফলিত হয়নি। আগে থেকেই ফল ঠিক করা হয়, যা প্রকৃতপক্ষে ‘ম্যাচ ফিক্সিং’।
এই নিবন্ধ প্রকাশিত হওয়ার পরেই জাতীয় নির্বাচন কমিশন জানায়, কংগ্রেস এসব নিয়ে কোনো লিখিত অভিযোগ তাদের কাছে করেনি। এ নিয়ে কোনো সভা ডাকার দাবিও জানায়নি। নির্বাচন কমিশনের দাবি, ডিসেম্বরেই কংগ্রেসকে তাদের প্রশ্নের জবাব দেওয়া হয়েছিল। তারপরেও বারবার একই অভিযোগ আনা হচ্ছে। এ ধরনের ভুল তথ্য পেশ করা কেবল আইনের প্রতি অশ্রদ্ধাজ্ঞাপনই নয়, রাজনৈতিক দলগুলির হাজার হাজার প্রতিনিধি, নির্বাচন কর্মীদেরও কালিমালিপ্ত করা। রাহুল এক্স হ্যান্ডেলে নির্বাচন কমিশনের উদ্দেশে লেখেন, এটি একটি সাংবিধানিক সংস্থা। গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর এমন স্বাক্ষরহীন নোটে আসল কথা এড়িয়ে গিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। আরও এক ধাপ এগিয়ে তিনি বলেন, যদি কিছু লুকনোর না থাকে, তাহলে নির্বাচন কমিশন দেশের প্রতিটি লোকসভা ও বিধানসভা কেন্দ্রের ডিজিটাল ভোটার তালিকা প্রকাশ করুক। মহারাষ্ট্রের ভোটে বিকেল পাঁচটার পর ভোটগ্রহণের সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ করার দাবিও তিনি জানান।
মহারাষ্ট্র নির্বাচন কমিশন ভোটারের সংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ে রাহুলের পেশ করা পরিসংখ্যান মেনে নিয়েছে। সাফাই গেয়েছে, রাজ্যের ভোটার তালিকা সংশোধনে জাতীয় নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা থাকে না। তালিকা সংশোধনের সময়ে কংগ্রেসের এজেন্টরাও বুথে ছিলেন। তাদের আরও বক্তব্য, ভোটের এতদিন পরে অভিযোগ তোলা ভিত্তিহীন।
বোঝা দরকার, বিরোধী দলের এজেন্টরা থাকলেও কিন্তু তালিকায় কারচুপি হয়। যেমন পশ্চিমবঙ্গেই ভোটার তালিকা নিয়ে বিজেপি বহুবার এমন অভিযোগ তুলেছে। সাধারণভাবে শাসক দলের অপযুক্তিগুলিই নির্বাচন কমিশন অনুকরণ করেছে। মাত্র ছমাসের মধ্যে এত তরুণ ভোটার বাড়ার যুক্তি ব্যাখ্যা করেনি। তাহলে কি লোকসভা ভোটে ভোটার তালিকা অসম্পূর্ণ ছিল? বাছাই করে কিছু বুথেই ভোটার অস্বাভাবিকভাবে বাড়ল কেন তার ব্যাখ্যাও দেয়নি। অভিযোগ ৬-৭ মাস পরে কেন, কয়েক যুগ পরে আনলেও সে অভিযোগ উড়িয়ে দেওয়া যায় না অভিযোগের উত্তরে কমিশন কিন্তু স্বচ্ছ তথ্য দিচ্ছে না।
রাহুলের পালটা নিবন্ধ লেখেন মহারাষ্ট্রের বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবীশ। তিনি রাহুলের পালটা পরিসংখ্যান দিয়ে দেখান, অভিযোগগুলি মিথ্যা। ভুল অভিযোগ এনে রাহুল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও সাংবিধানিক সংস্থাকেই অবিশ্বাস করছেন। জনমত মানতে পারছেন না।
এখন কথা হল, নির্বাচন কমিশন যে একটি নিরপেক্ষ সাংবিধানিক সংস্থা – একথা বারবার বিরোধীরাই বলে চলেছে। একাধিকবার অভিযোগ উঠেছে, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীন সত্তা ধ্বংস করে মোদী সরকার একে বশংবদ করার চেষ্টা চালাচ্ছে। নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের পদ্ধতি নিয়ে বেশ কয়েক বছর ধরে বিতর্ক চলছে। ২০২৩ সালের মার্চ মাসে সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের জন্য এক প্যানেল গঠনের নির্দেশ দেয়। প্রধানমন্ত্রী, সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ও লোকসভার বিরোধী দলনেতার এই প্যানেলের সদস্য হওয়ার কথা ছিল। সেবছর ডিসেম্বর মাসে কেন্দ্র তাড়াহুড়ো করে এক আইন প্রণয়ন করে। সেই আইন অনুসারে প্রধানমন্ত্রী, তাঁর নিযুক্ত একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং বিরোধী দলনেতাকে নিয়ে গঠিত প্যানেল নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ করবে। অর্থাৎ আইনে প্রধান বিচারপতিকে সরিয়ে কেন্দ্রের শাসক দলের পাল্লা ভারি করা হয়। বিরোধী দলনেতা আপত্তি করলেও প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর পছন্দের মন্ত্রী মিলে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ করতে পারবেন। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও স্বাধীন ক্ষমতার মূলেই এই নয়া আইন কুঠারাঘাত করে। ২০২৪ সালে এই আইনের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের করা হয়। সেই মামলার আজও নিষ্পত্তি হয়নি।
২০২৪ সালে লোকসভা নির্বাচনের ঠিক আগেই নির্বাচন কমিশনার অরুণ গোয়েল পদত্যাগ করেন। তার আগের মাসেই আরেক কমিশনার সতীশ চন্দ্র পাণ্ডের মেয়াদ শেষ হওয়ায় তিনি অবসর নেন। ফলে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার রাজীব কুমার ছাড়া কেউই তখন কমিশনার রইলেন না। এর দিন সাতেকের মধ্যেই জ্ঞানেশ কুমার ও সুখবীর সিং সান্ধুকে নির্বাচন কমিশনার নিযুক্ত করা হয়। নতুন আইনবলে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিরোধী দলনেতার প্যানেল তাঁদের নাম চূড়ান্ত করে। তৎকালীন বিরোধী দলনেতা অধীর চৌধুরী অবশ্য তাঁর আপত্তির কথা লিপিবদ্ধ করেছিলেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, সম্ভাব্য কমিশনারদের নামের তালিকা যাচাই করার পর্যাপ্ত সময় তাঁকে দেওয়া হয়নি। কার্যত প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ইচ্ছানুসারে গঠিত নির্বাচন কমিশনই লোকসভা নির্বাচন পরিচালনা করেছিল। রাহুল সেই পদ্ধতি ও নতুন আইন নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন।
লোকসভা নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণার কয়েক দিনে আগেই গোয়েলের পদত্যাগ নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়। ২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তাঁর মেয়াদ ছিল এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। শোনা যায়, শিবসেনা দলে ভাঙনের পর একনাথ শিন্ডেকে দলের নাম ও নির্বাচনী প্রতীক দেওয়ার সিদ্ধান্তের সঙ্গে তিনি একমত ছিলেন না। এছাড়াও নাকি মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে আরও কিছু বিষয়ে তাঁর মতপার্থক্য হয়। সে রহস্যের আজও সমাধান হয়নি।
জ্ঞানেশ কুমার স্বরাষ্ট্র দফতরের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকাকালীন অমিত শাহের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। ২০১৯ সালে সংবিধানের ৩৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ বাতিল করে জম্মু-কাশ্মীরকে তিন ভাগ করার সময়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের জম্মু, কাশ্মীর, লাদাখ সংক্রান্ত বিভাগের প্রধান ছিলেন জ্ঞানেশ। অযোধ্যায় রামমন্দিরের ট্রাস্ট গঠনেও আমলা হিসাবে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। নির্বাচন কমিশনার নিযুক্ত হওয়ার বছরখানেকের মধ্যেই তিনি মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হন। রাহুল তখনো আপত্তি করেছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের পদ্ধতি নিয়ে দায়ের হওয়া মামলার যেখানে নিষ্পত্তি হয়নি, সেখানে জ্ঞানেশকে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার করা ন্যায়সঙ্গত নয়।
কেবল মহারাষ্ট্র নয়, মোদী জমানায় লোকসভা নির্বাচন এবং অন্যান্য বিভিন্ন বিধানসভা নির্বাচনেও কারচুপির অভিযোগ উঠছে। নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বিজেপি নেতাদের একের পর এক উস্কানিমূলক বক্তব্যের বিরুদ্ধে কমিশন যথাযথ ভূমিকা পালন করেনি। ভোটার তালিকা, ভোটদানের হার নিয়েও নানা অস্বচ্ছতা রয়েছে। কোথাও ভোটার সংখ্যা বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে, কোথাও বা বাছাই করে নাম কাটার অভিযোগ উঠেছে।
উত্তরপ্রদেশ ও বিহারে বাছাই করে মুসলমান ও যাদবদের অনেককে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। দিল্লিতে আবার অনেক ঝুপড়িবাসী গরিব মানুষের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে ১২ কোটি ভোটারের নাম বাদ গিয়েছিল, যার অর্ধেকের বেশি হলেন মুসলমান ও তফসিলি জাতি-উপজাতির মানুষ। মহিলাদের মধ্যেও বহুসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ যায়। ২০২৩ সালের এক সমীক্ষায় জানা যাচ্ছে, দেশের প্রতিটি কেন্দ্রে গড়ে ৪০,০০০ মহিলার নাম বাদ গেছে। এই সংখ্যা বহু কেন্দ্রের জয়ের ব্যবধানের থেকে বেশি। আর্থসামাজিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষের মধ্যে এতজনের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাওয়া স্বাভাবিক নয় বলে অনেকের মত।
ভোটদানের হার নিয়েও সাম্প্রতিককালে নানা প্রশ্ন উঠছে। ভোটগ্রহণের অনেক পরে, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে গণনার আগের দিন চূড়ান্ত হার প্রকাশ করা হচ্ছে। শতকরা হার বলা হলেও, কেন্দ্র অনুযায়ী ভোটদাতার মোট সংখ্যা না বলায় সন্দেহ আরও বাড়ছে। মহারাষ্ট্রের মত বহু রাজ্যেই ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার ঠিক পরের হিসাবের সঙ্গে চূড়ান্ত হিসাবের অনেকখানি ফারাক হচ্ছে। অভিযোগ, কারচুপি করে ভোটদানের হার বাড়ানো হচ্ছে।
গতবছর জুলাই মাসে ভয়েস ফর ডেমোক্রেসি নামে একটি সংস্থা লোকসভা নির্বাচন নিয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করে। তাদের অভিযোগ, ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে সাত পর্বেই নির্বাচন কমিশন ভোটদানের হারের চূড়ান্ত হিসাব পেশে অস্বাভাবিক দেরি করেছে। ভোটদানের হারের প্রাথমিক ও চূড়ান্ত ঘোষণার মধ্যে ফারাকও অস্বাভাবিক মাত্রার। হিসাবে কারচুপি করে ভোটদানের হার বেশি দেখিয়ে নির্বাচনী ফলকে প্রভাবিত করা হয়েছে। তাদের আরও অভিযোগ, এভাবে ৭৯টি আসনে বিজেপি কারচুপি করে জিতেছে। অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্র্যাটিক রাইটস নামে একটি সংস্থাও সমীক্ষা করে এই কারচুপির অভিযোগ এনেছে। লোকসভা নির্বাচনে অনেক কেন্দ্রেই ভোটগ্রহণের শেষে ঘোষিত ভোটদানের হার ও গণনার আগে ঘোষিত চূড়ান্ত হারের মধ্যে ৭%-১২% ফারাক দেখা গেছে।
আরো পড়ুন কোথাকার ভোট কোথায় গড়ায়? সন্দেহ দানা বেঁধেছে
লোকসভা নির্বাচন চলার সময়েই ভোটদানের চূড়ান্ত হার প্রকাশে অস্বাভাবিক দেরি হওয়ায় বিরোধীরা সরব হয়েছিল। প্রথম পর্বের ভোটের ১১ দিন পরেও নির্বাচন কমিশন চূড়ান্ত পরিসংখ্যান প্রকাশ করেনি। হরিয়ানা বিধানসভা নির্বাচনেও একই অভিযোগ উঠেছিল। কংগ্রেস অভিযোগ তুলেছিল, কমপক্ষে ২০টি কেন্দ্রে হিসেবে কারচুপি হয়েছে।
অভিযোগ উঠলেই তার সত্যতা যেমন প্রমাণিত হয় না, তেমন অভিযোগ খণ্ডন করার দায়িত্বও কর্তৃপক্ষ অস্বীকার করতে পারে না। সবকিছু প্রকাশ্য ও স্বচ্ছভাবে করার বদলে নির্বাচন কমিশনের নানা কাজে গোপনীয়তা বাড়ছে। শাসক ও কমিশন এক সুরে কথা বলছে, যা গণতন্ত্রের পক্ষে মোটেই ভাল লক্ষণ নয়। নির্বাচন কমিশনার নিয়োগে যেখানে শাসক দলের আধিপত্য থাকে, সেখানে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা যায় না। ভোটব্যবস্থাকে নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ, বিশ্বাসযোগ্য রাখতে তাই নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের নিয়ম বদলানো দরকার। ২০২৩ সালের আইন কার্যকরী থাকলে যা কখনই সম্ভবপর নয়।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







