মধ্যভারতের ছত্তিসগড়ের অবুঝমাড় অঞ্চলে জঙ্গলে ঘেরা পাহাড়ের কোলে একটি গ্রাম – গান্ডেকোট। গত ১৭ এবং ১৮ মে শয়ে শয়ে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর জওয়ান গ্রামটাকে ঘিরে ফেলতে শুরু করে। পঁয়ত্রিশ জন মাওবাদী গেরিলা যোদ্ধা সহ, ভারতের সর্ববৃহৎ নিষিদ্ধ সংগঠনটির সর্বোচ্চ নেতৃত্ব ওখানে গোপনে আশ্রয়ে ছিলেন। গ্রামটিকে ঘিরে ফেলার সময়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে তাদের সাহায্যকারী ভূমিকায় ছিলেন এমন কয়েকজন প্রাক্তন মাওবাদী, যাঁরা কয়েকদিন আগেই আত্মসমর্পণ করেছেন এবং ওই বিপদসংকুল এলাকার ভৌগোলিক চরিত্র যাঁদের নখদর্পণে।
১৯ মে সকাল থেকেই শুরু হয় তীব্র লড়াই। মাওবাদী গেরিলা যোদ্ধারা ২০ মে পর্যন্ত নিরাপত্তা বাহিনীর ঘেরাও ভাঙার চেষ্টা চালাতে থাকেন। কিন্তু নিরাপত্তা বাহিনীর আয়তন বাড়তে থাকে, ফলে সেই ব্যূহ ভাঙা সহজ ছিল না। এদিকে মাওবাদী গেরিলাদের সমস্ত সরঞ্জামই ফুরিয়ে আসতে থাকে, খাবার থেকে বন্দুকের গুলি – সবকিছুই প্রায় নিঃশেষিত। বাইরে থেকে রসদ আনার তেমন উপায় নেই! উলটোদিকের ছবিটা কিন্তু আলাদা। বায়ুসেনার বিমানে করে নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য খাদ্য সহ অন্যান্য জরুরি রসদ সরবরাহ জারি ছিল।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
মাওবাদী যোদ্ধাদের সাতজনের একটা দল কোনো মতে নিরাপত্তা বাহিনীর ঘেরাও ভেঙে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। কিন্তু ভয়াবহ গুলিবর্ষণে বাকি গেরিলা যোদ্ধারা পিছু হটতে থাকে। ২১ মে সকালে কোনোক্রমে মরণপণ প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করা শেষ গেরিলা যোদ্ধারাও নিহত হন। ওইদিনই ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী ঘোষণা করে, অবুঝমাড়ের ওই সংঘর্ষে নিহতদের মধ্যে ছিলেন নাম্বালা কেশব রাও ওরফে বাসবরাজ – ভারতের শীর্ষস্থানীয় সন্ত্রাসবিরোধী সংস্থা ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (এনআইএ) যাঁকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য সর্বোচ্চ আর্থিক পুরস্কার ঘোষণা করেছিল।
নিষিদ্ধ হয়ে থাকা ভারতের বৃহত্তম বিদ্রোহী সংগঠন সিপিআই (মাওবাদী)-র সাধারণ সম্পাদক হিসাবে, ৭১ বছরের নাম্বালা কেশব রাও ২০১৮ সালে পার্টির সর্বোচ্চ নেতার পদে আসীন হন। তার আগে ২০০৪ সালে সিপিআই (মাওবাদী)-র প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই তিনি পার্টির সশস্ত্র শাখা পিপলস লিবারেশন গেরিলা আর্মি (পিএলজিএ)-র দায়িত্বে ছিলেন।
বাসবরাজের মৃত্যুতে উচ্ছ্বসিত হয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এই ঘটনাকে ‘উল্লেখযোগ্য সাফল্য’ হিসাবে ঘোষণা করেছেন এবং মাওবাদী ঝুঁকিকে নির্মূল করার সরকারি প্রতিশ্রুতি আবার মনে করিয়ে দিয়েছেন।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের ভাষায় এ এক ‘ঐতিহাসিক সাফল্য’ এবং বাসবরাজ ছিলেন ‘নকশাল আন্দোলনের মাথা’। ভারতে মাওবাদীদের বোঝাতে অনেকেই ‘নকশাল’ শব্দটা ব্যবহার করেন। কারণ চীনের কমিউনিস্ট নেতা মাও সে তুংয়ের প্রেরণায় এই আন্দোলন শুরু হয়েছিল ভারতের পূর্বপ্রান্তে পশ্চিমবঙ্গের নকশালবাড়ি নামক এলাকা থেকে।
দণ্ডকারণ্য বনাঞ্চলের একদম কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত অবুঝমাড়। এই এলাকা দীর্ঘদিন ধরেই মাওবাদীদের শক্তিশালী ঘাঁটি। জঙ্গল ও পাহাড়ে ঘেরা এই এলাকা মধ্য ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ছাড়াও পূর্ব, পশ্চিম এবং দক্ষিণ ভারতের বেশকিছু অঞ্চলে ছড়িয়ে আছে, যেখানে কিছুদিন আগেও কোনোরকম রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা ছিল না বললেই চলে। বেশিদিন আগের কথা নয়, এখানকার শয়ে শয়ে গ্রামকে রাজস্ব দফতরের নথিতেও খুঁজে পাওয়া যেত না এবং কোনো পুলিসি ব্যবস্থাও চোখে পড়ত না। এই বিচ্ছিন্নতা আর অবহেলার কারণেই, বিগত চার দশকে দণ্ডকারণ্য পরিণত হয়েছে অতি বামপন্থীদের সঙ্গে ভারত রাষ্ট্রের সবথেকে বড় যুদ্ধক্ষেত্রে। এখানেই বামপন্থী বিদ্রোহীরা নিজেদের সামরিক ঘাঁটি গড়ে তোলে এবং প্রতিষ্ঠা করে ‘গণবিপ্লবী সরকার’। ভারত রাষ্ট্র এখন যৌথ বাহিনীর অভিযানের মাধ্যমে এই এলাকা থেকে মাওবাদীদের চিরতরে উৎখাত করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
২১ এপ্রিল-১১ মে, অবুঝমাড় থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কারেগুট্টা পাহাড়ে মাওবাদীদের ‘সদর দফতর গুঁড়িয়ে’ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী। মাত্র কয়েক বছর আগেও এই এলাকায় কোনো সরকারি বাহিনী ঢুকতে পারত না। নিরাপত্তা বাহিনী জানায়, ওই সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন ৩১ জন মাওবাদী। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এই অভিযানের নদিন পরে বাসবরাজ নিহত হন।
আরো পড়ুন ইউএপিএ আইনের জাদুবাস্তবের এক ঝলক
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, মাওবাদীরা অস্ত্র তৈরি, অস্ত্রচালনার প্রশিক্ষণ সহ বিভিন্ন বিভাগের সংযুক্ত সদর দফতর হিসাবে কারেগুট্টা পাহাড়কে ব্যবহার করত এবং সেসব ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। শাহ এই অভিযানকে ‘নকশালদের বিরুদ্ধে হওয়া, এখন পর্যন্ত সবথেকে বড় অভিযান’ এবং ‘ঐতিহাসিক সাফল্য’ হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। নিরাপত্তা বাহিনীর এই দুই অভিযানের উল্লেখযোগ্য সাফল্যের পরে শাহ মন্তব্য করেছেন, ২০২৬ সালের মার্চ মাসের মধ্যে সরকার মাওবাদীদের সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করে দেবে। আর এটাই যে সরকারের লক্ষ্য, তা তিনি গতবছর থেকেই বারবার বলে আসছেন।
ভয়াবহ আঘাত
গত দুই দশক ধরে দুনিয়ার সবথেকে বড় সশস্ত্র বামপন্থী সংগঠন হল সিপিআই (মাওবাদী)। মধ্য, পূর্ব ও দক্ষিণ ভারতের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে মাওবাদীদের উপস্থিতি ছিল যথেষ্ট জোরালো ও প্রভাবশালী। তারা মাঝেমধ্যেই এই সমস্ত এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর বড় বড় হামলা চালিয়েছে এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, খনন কার্য ইত্যাদিতে বাধা দিয়েছে। বিভিন্ন সময়ে ভারতের ২৮টার মধ্যে দশটা রাজ্যে মাওবাদীদের প্রবল উপস্থিতি ছিল।
বছরের পর বছর মাওবাদী অধ্যুষিত এলাকায় নিযুক্ত নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তারা বেশ আতঙ্কে থাকতেন। উত্তর ভারতের কাশ্মীর এবং উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলোর তুলনায় মাওবাদীবিরোধী অভিযানে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মীরা অনেক বেশি সংখ্যায় প্রাণ হারিয়েছেন। মাওবাদীদের বিরুদ্ধে বেশকিছু অভিযানে এক হাজারেরও বেশি নিরাপত্তা কর্মী নিয়ে বাহিনী গঠিত হয়েছে। বোঝাই যায়, সরকার এই সমস্ত অভিযানকে কতটা গুরুত্ব সহকারে দেখছে। ২০০৫ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং মাওবাদী সমস্যাকে ‘ভারতের আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য সবথেকে বড় বিপদ’ হিসাবে চিহ্নিত করেছিলেন।
কিন্তু পরিস্থিতি এক নেই। কালচক্রে বর্তমান ক্রমশ যেন নিজের দিশা বদলে নিচ্ছে।
সরকারী তথ্যানুযায়ী, মাওবাদী হিংসা সবথেকে বেশি সংঘটিত হয়েছিল ২০১০ সালে, যখন ১,৯৩৬ খানা হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয় এবং তাতে ১,০০৫ জন নাগরিক ও নিরাপত্তা কর্মী প্রাণ হারান। কিন্তু ২০১১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মাওবাদী হামলার ঘটনা মাত্র ৩৭৪, যাতে প্রাণহানি হয় ১৫০ জনের। ২০১০ সালে মাওবাদী অধ্যুষিত জেলা ছিল ১২৬, সেটাও একইভাবে কমে ২০২৪ সালে হয়েছে ৩৮।
এই প্রতিবেদককে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ছত্তিসগড় পুলিসের প্রাক্তন ডি জি আর কে ভিজ জানিয়েছেন ‘নাম্বালা কেশব রাও নিহত হওয়ার ফলে, তাঁর পার্টি ক্যাডারদের মনোবল ভেঙে যাবে।’ তিনি আরও বলেন, সাধারণ সম্পাদকের জন্য নির্ধারিত অতিরিক্ত নিরাপত্তা বলয় ভেঙে যাওয়ার বিষয়টাও নিচুতলার ক্যাডারদের মধ্যে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ তৈরি করবে। তিনি মনে করেন, মাওবাদীদের অবশ্যই আবার নিজেদের সংগঠিত করা এবং রণকৌশল তৈরি করার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা উচিত।
আদতে মাওবাদীরা গত দুবছর ধরেই একের পর এক ধাক্কার মুখে তাদের কৌশল বদলানোর চেষ্টা করে চলেছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নিজেদের ২০তম পার্টি প্রতিষ্ঠা দিবসে প্রকাশিত একটি বিজ্ঞপ্তিতে সিপিআই (মাওবাদী) স্বীকার করে যে, তাদের জনসমর্থন এবং আন্দোলনের ক্ষেত্র ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে এবং তারা অপারেশন কাগারের ফলে এক অভূতপূর্ব ঘেরাওয়ের মধ্যে, ধ্বংসাত্মক এক যুদ্ধের’ মুখোমুখি হয়েছে।
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে কেন্দ্রীয় সরকার অপারেশন কাগার নামক অভিযান শুরু করে। পরবর্তীকালে মাওবাদীদের বিবৃতিতে যেসব তথ্য দেওয়া হয়েছে, সেখানে উল্লিখিত তথ্যগুলোই গোটা পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট করে দিচ্ছে। সিপিআই (মাওবাদী) বলছে, তারা ২০২১ থেকে ২০২৪ জুলাই পর্যন্ত মোট ৬৬৯টি ‘গেরিলা অ্যাকশন’ করেছে। তাতে ২২১ জন পুলিসকর্মীকে ‘খতম’ করা হয়েছে এবং ৫১৬ জন আহত হয়েছেন, ২৫টি অস্ত্র মাওবাদীরা দখল করেছে। তাদেরই বয়ান অনুযায়ী, এই একই সময়ে তারা হারিয়েছে ‘পার্টি, পিএলজিএ ও ইউনাইটেড ফ্রন্টের ৪৩৯ জন গুরুত্বপূর্ণ কমরেডকে, এবং ২১৫টি অস্ত্র’ হাতছাড়া হয়েছে। এছাড়াও ২১৮ জন পার্টি সভ্য, সমর্থক গত কয়েক বছরে বিভিন্ন কারণে প্রয়াত হয়েছেন।
মাওবাদীরা লিখেছে, ভারত সরকার কর্তৃক সংগঠিত এই অভিযানে প্রায় ১,৫০০ থেকে ৩,০০০ বা তারও বেশি ‘বিশেষ পুলিস বাহিনী, কমান্ডো, আধাসামরিক মিলিটারি এবং সেনা কর্মী’ বহাল করা হয়েছে। তারা এও জানিয়েছে যে, ২০-২৫টি গ্রাম বা প্রায় ১০-১২ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে ‘ঘেরাও, চিরুনি তল্লাশি এবং হত্যা’ অভিযান চালানো হচ্ছে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে।
চরম মূল্য
চরম মূল্য দিয়েই বাসবরাজকে হত্যা করা সম্ভব হয়েছে। ফলে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী দ্বারা ব্যাপক দমনের কারণে গত কয়েক মাস ধরে দণ্ডকারণ্য অঞ্চল এক যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। মাওবাদীদের উচ্চতর নেতৃত্বের হত্যাকে সরকার নিরাপত্তা বাহিনীর সাফল্য হিসাবে তুলে ধরলেও সমালোচকরা কিন্তু নিরাপত্তা অভিযানের নামে ব্যাপক মৃত্যু এবং মানবসম্পদের ক্ষয়ের কথা তুলে ধরছেন।
এবছরের শুরু থেকে এই সমস্ত অভিযানে অনেক ক্ষেত্রেই মৃত্যুর সংখ্যা দুই অঙ্কে পৌঁছে গেছে। ১৬ জানুয়ারি নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে নিহত হয়েছেন ১৮ জন। তারপর ২১ জানুয়ারি ১৪ জন, ৯ ফেব্রুয়ারি ৩১ জন, ২০ মার্চ ৩০ জন, ২৯ মার্চ ১৮ জন, ২ এপ্রিল ১৩ জন, ৩০ এপ্রিল ১০ জন, ২১ এপ্রিল থেকে ১১মে-র মধ্যে ৩১ জন এবং ২১ মে ২৭ জন নিহত হয়েছেন নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে। এছাড়াও যেসব বিচ্ছিন্ন এনকাউন্টারে ৩-৯ জন নিহত হয়েছেন তার সংখ্যাও কমবেশি ৫০।
মাওবাদী দমনের নামে সরকার আদতে আদিবাসী জনগণকেই নিশ্চিহ্ন করে দিতে চাইছে বলেও কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন। নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যাপক হারে মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং সাধারণ গ্রামবাসীদের ভুয়ো সংঘর্ষে হত্যা করার অভিযোগও উঠেছে।
সমালোচকদের মতে, সরকার আদতে এই এলাকার খনিজ সম্পদের বিপুল ভাণ্ডার লুঠ করার উদ্দেশ্যেই বৃহৎ খনন প্রকল্প চালু করতে চায়। তার ফলেই এই বিস্তীর্ণ অরণ্যাঞ্চল উজাড় করে এলাকা খালি করার পরিকল্পনা করেছে। এই হত্যাকে ‘বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড’ আখ্যা দিয়ে নিন্দা করেছে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী মূল ধারার তিন প্রধান বামপন্থী দল – সিপিআই, সিপিএম এবং সিপিআই (এম-এল) লিবারেশন। তারা বিচারবিভাগীয় তদন্তের দাবিও জানিয়েছে।
ভারতের মূলধারার সর্ববৃহৎ বাম দল সিপিএমের পলিট ব্যুরো সদস্য মহম্মদ সেলিমের মতে, নজিরবিহীনভাবে এত বিরাট নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করার পিছনে সরকারের কিছু অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য নিশ্চিত আছে। এই প্রতিবেদককে সেলিম বলেছেন ‘খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ এই অঞ্চলে খননকার্যের সঙ্গে জড়িতদের স্বার্থ আছে। এর পাশাপাশি সরকার জমি থেকেও আয় করতে চায়। আর বড় বড় কর্পোরেট সংস্থাগুলোও তাদের উদ্বৃত্ত অর্থ এই সমস্ত জমিতে বিনিয়োগ করতে চায়।’ তিনি জানিয়েছেন, এই সব জমি এবং সেখানকার সম্পদ থেকে যদি অর্থনৈতিক ফায়দা তোলার জন্যই কেন্দ্রীয় সরকার সব ধরণের বাধা উৎখাত করতে চাইছে। সেলিম আরও বলেন ‘এখানে কোনোরকম স্বচ্ছতা নেই। বহু মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে, আর সরকার তাদের মাওবাদী হিসাবে দেগে দিচ্ছে। আমরা জানি না, মাওবাদী তকমা দিয়ে সাধারণ গ্রামবাসীদেরও হত্যা করা হচ্ছে কিনা।’
মূল ধারার সমস্ত বামপন্থী দলই অবিলম্বে মাওবাদীদের শান্তি আলোচনার আবেদনে সাড়া দেওয়ার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছে। এই সমস্যা সমাধানের জন্য সরকারের নিরাপত্তাকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি সর্বদাই নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার কর্মীদের দ্বারা সমালোচিত হয়েছে। ২০০৮ সালের এক সরকারি কমিটির রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছিল, তথাকথিত চরমপন্থা এবং দারিদ্র্যের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক আছে। সরকারি দস্তাবেজেও এই মতকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও উক্ত রিপোর্টে বলা হয়েছে, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর ত্রুটিপূর্ণ বাস্তবায়ন, বনজ সম্পদ ও আদিবাসীদের মধ্যে নিবিড় আত্মিক সম্পর্ক এবং বাসভূমি থেকে আদিবাসীদের উৎখাত করার মাধ্যমে যে অনাচার করা হয়, সেই সমস্ত বিষয়েও গুরুত্ব সহকারে নজর দেওয়া উচিত। ওই রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে যে, এইসব বিষয় অগ্রাহ্য করে এখন পর্যন্ত ক্ষমতায় আসীন সব সরকারই এই সমস্যাকে শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যা হিসাবেই দেখেছে।
হার না মানা এক যাত্রা
ছত্তিসগড়কেন্দ্রিক লেখক ও সাংবাদিক শুভ্রাংশু চৌধুরী বহু মাওবাদী শীর্ষনেতার সান্নিধ্যে এসেছেন। তাঁর মতে, ওই এলাকায় মাওবাদী আন্দোলনের আর কোনো ভবিষ্যৎ নেই। তিনি বলছেন, ছত্তিসগড়ে এই আন্দোলনের কেন্দ্র ছিল মূলত স্থানীয় অন্যায়, অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ। এছাড়া মাওবাদী কার্যকলাপ দমনের নামে সাধারণ গ্রামবাসীদের ওপর সরকারি মদতপ্রাপ্ত অরাষ্ট্রীয় বাহিনীর নৃশংসতাও মানুষকে অনেকাংশে মাওবাদীদের দিকে ঠেলে দিয়েছিল বাঁচার তাগিদে। পূর্ব ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, বিহার অথবা দক্ষিণ ভারতের অন্ধ্র, তেলেঙ্গানার মাওবাদী আন্দোলনের মত মতাদর্শগত ভিত্তি ছত্তিসগড়ে ছিল না। ফলে ছত্তিসগড়ের মাওবাদী আন্দোলনের সঙ্গে বাকি এলাকার মাওবাদী আন্দোলনের কিছু বুনিয়াদি পার্থক্য আছে।
তাছাড়া গত কয়েক বছরে সরকার বিভিন্ন পরিষেবা দিয়ে এবং বেশ কিছু পরিকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে আদিবাসীদের একটা অংশকে নিজেদের দিকে টানতেও সক্ষম হয়েছে। এই কারণে সরকারি গোয়েন্দা ব্যবস্থা এবং সার্বিক তথ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়াও অনেকটা শক্তিশালী হয়েছে। শুভ্রাংশু বলেন ‘নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে থাকা প্রযুক্তিগত পরিকাঠামোর পাশাপাশি, পরিস্থিতির এই পরিবর্তনটাই সবথেকে বড় চাবিকাঠি, যা খেলা ঘুরিয়ে দিয়েছে।’ তাঁর স্পষ্ট অভিমত – মাওবাদীরা ছত্তিসগড়কে বেছে নিয়েছিল তাদের মতাদর্শগত সংগ্রামের ‘রিট্রিট এরিয়া’ হিসাবে। ফলে অন্ধ্রপ্রদেশে যখন তারা ব্যাপক সরকারি দমনের সম্মুখীন হল, তারা পালিয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছিল ছত্তিসগড়ে। কিন্তু দণ্ডকারণ্যের মানুষের শিক্ষাস্তর ও সামাজিক, রাজনৈতিক চেতনা তেমন উন্নত না হওয়ার ফলে মাওবাদীরা কখনোই এই অঞ্চলকে তাদের বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রস্থল হিসাবে বিবেচনা করেনি। তিনি আরও বলেন, ‘এমনকি প্রায় তিন দশক ধরে ছত্তিসগড়ে সক্রিয় কার্যকলাপ চালানোর পরেও এখানকার ক্যাডারদের মধ্যে মতাদর্শগত প্রভাব তেমন নেই। মাওবাদ কী? সেটাও তাঁরা সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন না।’
শুভ্রাংশুর মতে, ছত্তিসগড়ে মাওবাদীদের অধিকাংশ ক্যাডারই এসেছেন আদিবাসী সমাজ থেকে, বিশেষত মহিলারা। অথচ নেতৃত্ব দখল করে আছেন অনাদিবাসী শিক্ষিত পুরুষরা, যাঁরা অধিকাংশই অন্ধ্রপ্রদেশ বা পশ্চিমবঙ্গের অধিবাসী। তিনি আরও বলেন ‘এই মতাদর্শগত তাত্ত্বিকরা একবার নিজেদের নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে অন্যত্র চলে গেলে কর্মীবাহিনীকে একজোট রাখার মত আর কোনও ব্যবস্থাপনাই নেই।’
ছত্তিসগড় পুলিসের প্রাক্তন ডি জি আর কে ভিজের মত অবশ্য আলাদা। তিনি বলছেন ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে মাওবাদীরা নিরাপত্তা বাহিনীর উপর আক্রমণ করার অবস্থায় নেই। কিন্তু তারা পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে ভেবে নেওয়া একদমই ঠিক হবে না।’ তিনি মনে করেন, মাওবাদীদের সেনাবাহিনী ব্যাটেলিয়ন থেকে কমে কোম্পানি, এমনকি কোম্পানি থেকে কমে প্ল্যাটুনের আকারেও নেমে আসতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, তাদের এখনো ১২ জনের মত কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং প্রায় ২০ জনের কাছাকাছি দণ্ডকারণ্য স্পেশাল জোনাল কমিটির সদস্য সক্রিয়। ভিজ জানিয়েছেন, মাওবাদীদের কাছে বর্তমানে দুটো পথ খোলা আছে। হয় তারা সংগঠনে নতুন কর্মীবাহিনী যুক্ত করে নেতৃত্বের শূন্যস্থান পূরণ করতে পারে, অথবা একপাক্ষিকভাবে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে আপাতত পিছু হটে শান্তি আলোচনায় অংশ নিতে পারে। তাঁর মতে, সিপিআই (মাওবাদী) পার্টির বর্ষীয়ান পলিট ব্যুরো সদস্য মাল্লোজুলা ভেনুগোপাল রাও অথবা তিপ্পিরি তিরুপতি পরবর্তী সাধারণ সম্পাদক হিসাবে মনোনীত হবেন।
তিনি আরও বলেন, “মাওবাদীরা যদি সাময়িকভাবে পিছু হটার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে সরকারের ভূমিকা কী হবে? তারা কি শান্তি আলোচনায় অংশ নেবে, নাকি বাকি সশস্ত্র স্কোয়াডগুলোকে খুঁজে বের করে দমন করার নির্দেশ দেবে নিরাপত্তা বাহিনীকে? এটাই এখন দেখার।”
ভাষান্তর: নীলাশিস বসু
দ্য ডিপ্লোম্যাট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত নিবন্ধের এই ভাষান্তর সম্পাদকের অনুমত্যনুসারে প্রকাশিত হল। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







