অরুন্ধতী রায়ের বিরুদ্ধে আনলফুল অ্যাক্টিভিটি প্রিভেনশন অ্যাক্ট (ইউএপিএ) অনুযায়ী মামলা চালু করার অনুমতি দিলেন দিল্লির লেফটেন্যান্ট গভর্নর গত ১৪ জুন।
অরুন্ধতী নির্ভীক কলম চালনার জন্য ঐতিহ্যবাহী পেন পিন্টার পুরস্কারের জন্য মনোনীত হলেন ২৯ জুন তারিখে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
অরুন্ধতীর সঙ্গে কাশ্মীর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক শেখ শওকত হোসেনকেও একই আইনে অভিযুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু আমার এই নিবন্ধ অরুন্ধতী বা শওকত হোসেনকে নিয়ে নয়। তাঁদের করা কাশ্মীর সংক্রান্ত মন্তব্যকে সমর্থন জানিয়েই বলছি, এই নিবন্ধ কাশ্মীর নিয়েও নয়। বরং অরুন্ধতীর মত প্রথিতযশা লেখকের বিরুদ্ধে ইউএপিএ মামলা আমাকে বেশকিছু মানুষের কথা মনে করিয়ে দিল। বেশকিছু বিরোধী স্বর, অরুন্ধতী আর শওকতের থেকেও বেশি নীরবে কাজ করে যাওয়া মানুষের পুলিসি তথা আইনি দুর্গতির ঘটনাকে আবার প্রাসঙ্গিক করে তুলল।
সেই দুর্গতির মূলে ইউএপিএ। এই আইনের প্রস্তাব সংসদে প্রথম পেশ করা হয় ১৯৬৩ সালে এবং সংসদে পাস হয়ে রাষ্ট্রপতির অনুমত্যনুসারে আইন হিসাবে লাগু হয় ১৯৬৭ সালে। তারপর প্রায় প্রতি দশকেই ইউএপিএ আইনের নানা সংশোধন হয়েছে। ২০০৭ সালে ডাক্তার ও মানবাধিকার কর্মী বিনায়ক সেনকে এই আইনেই গ্রেফতার করা হয়। ডাক্তার সেনের অপরাধ ছিল, উনি নামকরা শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ হওয়া সত্ত্বেও ছত্তিসগড়ে হতদরিদ্র আদিবাসীদের মধ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছিলেন। সেইসময় ওই অঞ্চলের মানুষের প্রতি সরকারের অমানবিক আচরণের বিরোধিতা করায় এই অহিংস এবং নিরপরাধ সমাজকর্মীকে জেলে যেতে হয়। অভিযোগ করা হয়, ডাক্তার সেনের নকশালদের সঙ্গে যোগাযোগ আছে।
এরপর ২০০৮ সালে ইউপিএ সরকারের আমলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদাম্বরমের তত্ত্বাবধানে এই আইন আরও একবার সংশোধিত হয়ে বিশেষ কঠোর রূপ নেয়। এর ক্রমশ ধারালো হতে থাকা নখের আঁচড়ে আহত হতে থাকেন বিরুদ্ধ স্বরের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও মানবাধিকার কর্মী। ২০০৯ সালে ইউএপিএ আইনের নতুন ধারায় প্রথম গ্রেফতার হন মাওবাদী নেতা গৌর চক্রবর্তী। এর কয়েকমাসের মধ্যেই জেলবন্দী হন পিপলস মার্চ পত্রিকার সম্পাদক স্বপন দাশগুপ্ত। গ্রেফতার হবার চারমাসের মধ্যে ২০১০ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি এসএসকেএম হাসপাতালে শ্বাসকষ্টে ভোগা স্বপনবাবু মারা যান। তাঁকেই ইউএপিএ আইনের প্রথম শহিদ ধরা হয়। এর কাছাকাছি সময়েই ধরা পড়েন প্রসূন চট্টোপাধ্যায়, ছত্রধর মাহাতো, টিঙ্কু সরখেল প্রমুখ। তখন কেন্দ্রে ইউপিএ সরকার আর পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার। তারপর ভারত তথা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে পালা বদল হয়েছে। রাজ্যের পরিবর্তনের বয়সও এক দশক পেরিয়ে গেছে।
স্বপন যদি হন প্রথম শহিদ, তাহলে এখন পর্যন্ত স্ট্যান স্বামী এই কালা কানুনের শেষ শহিদ। যদিও ভারতীয় দণ্ডবিধি তথা বিচারব্যবস্থায় যাঁদের অসীম শ্রদ্ধা ও আস্থা রয়েছে তাঁরা এঁদের শহিদ বলবেন না, কারণ এঁদের নাম মাওবাদীদের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। তাই জেলে অসুস্থ হয়ে এঁদের মৃত্যুকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার উপযুক্ত শাস্তি হিসাবেই ধরে নেন অনেকে। কিন্তু আমি এঁদের শহিদ বলেই উল্লেখ করব। ফ্যাসিবাদী দমননীতির বিরূদ্ধে কথা বলা আর সমাজের সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা গোষ্ঠীর উন্নতিকল্পে কাজ করাকে রাষ্ট্রবিরোধিতা বলে গণ্য করার কোনো কারণ দেখি না। যাঁরা তেমন ভাবেন তাঁরা আসলে রাষ্ট্র আর দেশ গুলিয়ে ফেলেছেন। আসলে দুটি সম্পূর্ণ পৃথক অস্তিত্ব।
ইন্ডিয়ান পেনাল কোড (আইপিসি) বা ক্রিমিনাল প্রসিডিওর কোডের (সিআরপিসি) সঙ্গে ইউএপিএর বড় তফাত হল, এই আইনে অভিযুক্তকেই উদ্যোগ নিয়ে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে হয়। যে পুলিস সন্দেহের বশে অভিযুক্তকে গ্রেফতার করেছে, তার কোনো দায় নেই অভিযোগ আদালতে প্রমাণ করার। ফলত এই আইনের শিকার হওয়া অভিযুক্তদের অত্যন্ত দীর্ঘস্থায়ী ও যন্ত্রণাদায়ক বিচার পদ্ধতির মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। জামিন পাওয়াই দুষ্কর হয়ে ওঠে। দুবছর, পাঁচবছর, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে দশবছরেরও বেশি সময় লেগে যায় জামিনে ছাড়া পেতে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের নিজের ২০২২ সাল অবধি নথিভুক্ত তথ্য বলছে, ২৪,১৩৪ জন এই আইনে গ্রেফতার হয়েছেন এবং মাত্র ৩৮৬ জন ছাড়া পেয়েছেন। শুধু তাই নয়, এই ২৪ হাজারের বেশি অভিযুক্তের মধ্যে মাত্র ২১২ জনের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আদালতে প্রমাণ করা গেছে। এর মধ্যে একটা চমৎকার ঘটনা উল্লেখ না করে পারছি না।
বম্বে হাইকোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি হসবেট সুরেশ ও মানবাধিকার কর্মী কাদামাঞ্চি নরসন্নার নামে ২০২২ সালে ইউএপিএ ধারায় অভিযোগ দায়ের করে তেলেঙ্গানা পুলিস। বিচারপতি সুরেশের আরও একটা পরিচয় আছে। তিনি ছিলেন ১৯৯৩ সালের বম্বে দাঙ্গা এবং ২০০২ সালের গুজরাট দাঙ্গার অন্যতম মুখ্য দলিল প্রস্তুতকারী। সেই দলিলগুলোতে যথাক্রমে বম্বে পুলিস এবং গুজরাট সরকারের বিরুদ্ধে দাঙ্গায় ইন্ধন জোগানোর একাধিক প্রামাণ্য নথি উল্লেখ করা হয়েছিল। যা-ই হোক, ২০২২ সালে সুরেশ ও নরসান্নার বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ আনার পর দেখা যায়, ওঁরা দুজনেই কিন্তু ২০২০ সালে কোভিড অতিমারীতে মারা গেছেন।
স্ট্যান স্বামীর ব্যাপারটার সঙ্গে এই ঘটনার মিল আছে। স্ট্যানকে ২০১৮ সালে একবার এবং তারপর ২০২০ সালে ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (এনআইএ) ইউএপিএ আইনের আওতায় ভীমা কোরেগাঁওয়ের ঘটনার জন্য গ্রেফতার করে। অথচ ২০২০ সালে ভীমা কোরেগাঁওয়ের সেই সভার সময়ে স্ট্যান যে পুনেতে ছিলেন তা আদালতে প্রমাণই করা যায়নি। শুধু তাই নয়, ওঁকে যখন এই মামলায় অভিযুক্ত বানানো হয়, উনি সে ব্যাপারে আদৌ অবগতই ছিলেন না। স্ট্যানের পরিচিতদের কাছে শুনেছি, ওইসময় উনি এক বন্ধুকে ফোন করে জিজ্ঞেস করেন ‘ইয়ে ভীমা কোরেগাঁও কেয়া হ্যায়?’ অথচ এই মিথ্যে অভিযোগের জেরেই জেলবন্দি অবস্থায় স্ট্যানের মৃত্যু হল।
আরো পড়ুন স্ট্যান স্বামী হত্যা: আমাদের কিছু যায় আসবে কি?
এইসব জানার পর থেকে ইউএপিএ আইন এবং পুলিস কর্তৃক তার দক্ষ ব্যবহারের বাস্তবতা আমার চোখে পরাবাস্তবের পর্যায়ে উন্নীত হতে শুরু করে। ছোটবেলায় বিভিন্ন ফিল্মে দেখা আইনের চোখ বাঁধা দেবীর হাতে ধরা দাঁড়িপাল্লাটা মনে হয় রাষ্ট্রের দিকে একেবারে ঢলে পড়েছে। তাই বিশ্বখ্যাত লেখককে এই আইনের অভিযুক্ত করার খবরে আমার যত না অরুন্ধতীর কথা মনে হয়েছে, তার চেয়ে বেশি মনে পড়েছে ভীমা কোরেগাঁও মামলায় এখনো বন্দী থাকা রোনা উইলসন, সুরেন্দ্র গাডলিং, দিল্লি দাঙ্গা সংক্রান্ত মামলায় আটক থাকা শার্জিল ইমাম, উমর খালিদ, মাওবাদী সন্দেহে জেলে যাওয়া রূপেশ সিং, জয়িতা দাস এবং আরও অনেক নাম। এই সুযোগে তেমনভাবে প্রচারের আলোয় না আসা তিন-চারজনের গল্প বলে রাখি।
দীর্ঘ ১১ বছর পর ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে মুক্তি পেয়েছেন হেম মিশ্র। আলমোড়ার ছেলে হেম ২০১০ সালে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের চীনা ভাষা নিয়ে পড়তে গিয়েছিলেন। উত্তরাখণ্ড রাজ্যের দাবিতে আন্দোলন দেখে বড় হওয়া হেমের প্রজন্ম নতুন রাজ্য পেয়ে কিছুদিনের মধ্যেই বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। প্রাকৃতিক সম্পদ সব কর্পোরেটের হাতে চলে যাচ্ছে। জলবিদ্যুৎ প্রকল্প আর অভয়ারণ্য বানানোর নামে স্থানীয় আদিবাসীদের জল-জঙ্গল-জমি থেকে নির্বিচারে উৎখাত করা হচ্ছে। এসব দৃশ্য হেমের মত অনেক তরুণ ছাত্র ও মানবাধিকার কর্মীর মনে বহু প্রশ্ন তুলেছিল। সেই প্রশ্নগুলো অতি সহজ আর উত্তরও তো জানা। উত্তর জেনে যাওয়ার পর থেকে হেম নানা ছাত্র-যুব আন্দোলনে সামিল হতে শুরু করেন। সবকটাই গণতান্ত্রিক ও অহিংস উপায়ে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ। এহেন হেম আদিবাসীদের স্বাস্থ্যরক্ষা বিষয়ক একটা কাজ নিয়ে ২০১৩ সালে মহারাষ্ট্রে গিয়েছিলেন সেখানকার সমাজকর্মী ডাক্তার প্রকাশ আমতের সঙ্গে দেখা করতে। বাল্লারশাহ স্টেশনে নামার কিছুক্ষণের মধ্যেই কিছু সাদা পোশাকের পুলিস হেমের সামনে আবির্ভূত হয় এবং কোনো কারণ না দেখিয়েই তাঁকে তুলে নিয়ে যায়। চোখ বেঁধে তাকে গোপন ডেরায় নিয়ে যাওয়া হয়। তিনদিন যথেচ্ছ মানসিক ও শারীরিক অত্যাচার করে বিভিন্ন মিথ্যা অভিযোগ শিকার করে নিতে জোর করা হয়। হেম রাজি না হওয়ায়, তিনদিন পর সেখান থেকে ৩০০ মাইল দূরে আহেরি সেশনস কোর্টে তাঁকে পেশ করা হয়। সেখানে অভিযোগ আনা হয়, হেমের কাছে নাকি একটা মাইক্রো চিপ পাওয়া গেছে, যার মধ্যে মাওবাদী সংগঠনের গোপন তথ্য আছে। অবশ্য দশ বছরেও সেই মাইক্রো চিপের অস্তিত্ব প্রমাণ করা যায়নি। হেমের ছোটবেলা থেকে বাঁ হাতে রক্তনালীর বিকৃতিজনিত সমস্যা ছিল। তাই চেন্নাইতে ডাক্তারের পরামর্শ মত অপারেশন করানো হয় এবং বাঁ হাতের চারটে আঙুল বাদ যায়। হাতের এই বিকৃতির জন্য জেলে থাকাকালীন পুলিস এই গুজব ছড়িয়ে দিয়েছিল, যে বোম বানাতে গিয়ে বিস্ফোরণে হেমের হাতের ওই দশা হয়েছে।
এরপর আসা যাক বি অনুরাধার গল্পে। হায়দরাবাদের মেয়ে অনুরাধা ২০ বছর ধরে দলিত-আদিবাসী-শ্রমিক-কৃষকদের অধিকারের দাবি নিয়ে কাজ করছেন। বিত্তহীন পরিবারের নারী এবং প্রান্তিক মানুষদের জন্য তৈরি আইন বাস্তবায়নের কাজে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। যেখানেই আইন লঙ্ঘন করে বা আইনের ফাঁক খুঁজে নিয়ে রাষ্ট্র কর্পোরেটকে সাহায্য করে অথবা আদিবাসী বা অন্য প্রান্তিক মানুষের আবাস, জমি এবং যাবতীয় অধিকার কেড়ে নিতে যায়, সেখানেই অনুরাধা তাঁদের পক্ষে সওয়াল করেন। ২০০৯ সাল নাগাদ এই কাজে উনি পাটনায় ছিলেন। একদিন রাতে বেশ কিছু সাদা পোশাকের পুলিস এসে তাঁকে মাওবাদী তথা সন্ত্রাসে মদতদাতা হিসাবে চিহ্নিত করে তুলে নিয়ে যায়। অনুরাধা জানিয়েছেন, বিনা ইউনিফর্মে আসা এই পুলিসকর্মীদের কাছে না ছিল কোনো পরিচয়পত্র, না ছিল শমন। মাওবাদী হিসাবে অভিযুক্ত হলে কি গ্রেফতার করতে পুলিসের ইউনিফর্ম, পরিচয়পত্র বা গ্রেফতারি পরোয়ানা দেখানোর প্রয়োজন পড়ে না? রাতবিরেতে বাড়িতে ঢুকে বা হঠাৎ রাস্তা থেকে গ্রেফতার করে ইউএপিএ ঠুকে দিলেই হয়ে যায়? তাহলে আর দেশের আইনের কী মানে থাকে, কোথায় থাকে মানবাধিকার? অনুরাধা প্রশ্ন তুলেছেন, তাহলে কে ‘আনলফুল অ্যাক্টিভিটি’-তে যুক্ত? সাধারণ মানুষের অধিকারের দাবিতে সোচ্চার হওয়া অনুরাধা, নাকি পুলিস?
হেমের মত অনুরাধাকেও চোখ বেঁধে এক জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়, প্রায় পাঁচদিন ওভাবেই রাখা হয়। এভাবে কোনো চার্জশিট ছাড়া কাউকে চোখ বেঁধে বন্দি করে রাখা আদতে বেআইনি। এরপর অনুরাধাকে আদালতে পেশ করা হয় এবং মাওবাদীদের সঙ্গে যোগের নানা অভিযোগ দেখিয়ে মোট চারটি মামলা ঠোকা হয়। এর একবছর পর বিচারের দিন অনুরাধার বিরুদ্ধে মুন্না সিং নামে এক বেসরকারি বাসের বুকিং এজেন্ট সাক্ষী দেয়। তার দুবছর পর সেই একই লোক অন্য আরেক মামলায় অনুরাধার বিরুদ্ধে সাক্ষী দিতে আসে এবং তখন নিজের পরিচয় দেয় কনস্টেবল মুন্না সিং বলে। অনুরাধা আবিষ্কার করেন, হাজারিবাগ পুলিস নিজেদের লোককে অনুরাধার বিরুদ্ধে সাজানো মামলায় মিথ্যে সাক্ষী হিসাবে ব্যবহার করে চলেছে। এরপর আরও এক বিচারের দিন অনুরাধার পক্ষে সাক্ষী দেবার জন্য তিনজনের আদালতে হাজিরা দেওয়ার কথা। কিন্তু তারা মাঝপথে অপহৃত হয় এবং তাদের ভয় দেখিয়ে সাক্ষ্য দেওয়া থেকে নিরস্ত করা হয়।
এই পর্যন্ত পড়ে হিন্দি সিনেমার গল্প বলছি বলে মনে হলে কিছু করার নেই। আগেই বলেছিলাম এই নিবন্ধে বাস্তব আর কাহিনি মিলেমিশে পরাবাস্তব বা জাদুবাস্তবের দিকে মোড় নেবে। এইভাবে চার বছর কেটে যায়। তারপর আদালতে অনুরাধার বিরুদ্ধে আনা সমস্ত অভিযোগ খারিজ হয়ে যায় এবং উনি ছাড়া পান। যদিও ছাড়া পাওয়ার ছবছর পর ২০১৯ সালে আবার হায়দরাবাদ পুলিস তাঁকে ওই একই সন্দেহে তুলে নিয়ে যায়। তার আটমাস পরে অনুরাধা জামিন পান, কিন্তু মামলা এখনো চলছে। গতমাসেই অনুরাধার বাড়িতে পুলিস হানা দেয় এবং ১৫ ঘন্টা ধরে তল্লাশি চালিয়ে কিছুই না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে গেছে।
শেষ গল্প মনীশ আজাদ আর অমিতা শিরিনের। অমিতা ভোপালের এক স্কুলে বিকল্প শিক্ষাব্যবস্থার কাজে যুক্ত ছিলেন। মনীশ সাংবাদিক ও লেখক। এঁরা দুজনেই এলাহাবাদ নিবাসী। বামপন্থী মানসিকতার এই দুই সঙ্গী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সচেতনতা তৈরির কাজে নিবেদিত ছিলেন। ২০১৯ সালে অমিতার ভোপালের ঠিকানায় মনীশ দেখা করতে গিয়েছিলেন। সেইসময় ওঁদের বাড়িতে পুলিসি অভিযান চালানো হয়। একটি ফ্ল্যাটবাড়িতে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করা হয় এবং তা রাত দুটো অবধি চলে। প্রায় ১২-১৩ ঘন্টা ধরে দুজনকে দুটি আলাদা ঘরে বসিয়ে একনাগাড়ে একই প্রশ্ন করে যায় পুলিস। সন্তোষজনক উত্তর না পেয়ে ওদের ঝাঁসি আদালতে তোলা হয় একই আইনে অভিযুক্ত করে। মামলা চালু থাকে এবং দুজনকে লখনৌ জেলে বন্দী রাখা হয়। অমিতা জানান, চার্জশিট বানাতে পুলিসের বেশ অসুবিধা হয়েছিল। ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২০বি, ১২১ এবং ৪২০ ধারায় অভিযুক্ত করা হয়। তবে বহু চেষ্টাতেও কিছু প্রমাণ করতে না পারায় দুজনেই আটমাস পর ছাড়া পান। প্রথম ও শেষ ধারাটি তুলে নেওয়া হয়, কিন্তু পুলিস এখনো ১২১ ধারায় তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। এই ধারা অনুযায়ী রাষ্ট্র কাউকে সন্ত্রাসবাদী হিসাবে প্রমাণ করতে পারলে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাবাস হতে পারে।
ছাড়া পাওয়ার তিন বছরের মাথায় গত সেপ্টেম্বরে আবার ওঁদের বাড়িতে এনআইএ চড়াও হয়। শুধু ওঁদের বাড়ি নয়, দস্তক পত্রিকার সম্পাদক এবং পিপলস ইউনিয়ন অফ সিভিল লিবার্টিজ সভাপতি সীমা আজাদ এবং মানবাধিকার আইনজীবী ও রাজনৈতিক কর্মী কৃপাশঙ্করের বাড়িতেও এনআইএ হানা দেয়। সেইসময় অমিতা আর মনীশকে লখনৌতে নিয়ে গিয়ে একতরফা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এরপর গত ২ ও ৩ মে মনীশকে আবার ডেকে পাঠানো হয় এবং একই প্রশ্ন করা হয়। লখনৌ পুলিস তাতেও কোনো সন্তোষজনক উত্তর পায়নি। সম্প্রতি মনীশের থেকে জানা গেল, ২ জুলাই ওঁদের উকিল ফোন করে জানিয়েছেন, পুলিস নাকি ইউএপিএ ধারায় আবার মনীশকে গ্রেফতার করার পরিকল্পনা করছে। যে কোনোদিন মনীশ আবার বন্দি হতে পারেন। অমিতার কথায়, গ্রেফতার হওয়ার চেয়েও এই পুলিসি পরোয়ানার অপেক্ষায় রোজ দিন গোনা বেশি দমবন্ধ করা। এযাবৎ যা হয়েছে তা ইন্ডিয়ান পেনাল কোড ও ক্রিমিনাল প্রোসিডিওর কোড অনুযায়ী হয়েছে। ১ জুলাই থেকে লাগু হওয়া নতুন ভারতীয় ন্যায় সংহিতায় ‘সিডিশন’ অর্থাৎ রাষ্ট্রদ্রোহিতা শব্দটা সরিয়ে ‘ট্রিজন’ শব্দ আমদানি করা হয়েছে। এর আক্ষরিক অর্থ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতারণা। আর এই নতুন শব্দ আমদানির তাৎপর্য হল, যে কোনো বিরোধী স্বরকে শুধু দেশদ্রোহী নয়, দেশের বিরুদ্ধে প্রতারক হিসাবে অবলীলায় দাগিয়ে দেওয়া যাবে।
এ যাবৎ শোনা গল্পগুলো আমরা আগামী দিনে নেটফ্লিক্স বা অ্যামাজন প্রাইম ভিডিওতে থ্রিলার সিরিজ হিসাবে দেখতেই পারি। কিন্তু সেখানে নায়ক হবেন মহারাষ্ট্র, বিহার কিংবা উত্তরপ্রদেশের পুলিসের কোনো কর্তা। সেখানে শেফালি শাহের মত ধুরন্ধর আইপিএস বা মনোজ বাজপেয়ীর মত সৎ ও সাহসী তদন্তকারী অফিসার কীভাবে নিজেদের জীবন, সংসার এমনকি সন্তানের ভবিষ্যৎ তুচ্ছ করে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করছেন তা দেখানো হবে। সেখানে হেম, অনুরাধা কিংবা মনীশ-অমিতার মত চরিত্রদের দেশদ্রোহী ও সন্ত্রাসবাদী হিসাবে চিহ্নিত করে একটা রক্ত গরম করা দেশাত্মবোধক গান দিয়ে নাম দেখিয়ে পর্ব শেষ হবে। শূর্পনখার লাঞ্ছনা আর শম্বুকের বঞ্চনা নিয়ে ভারতের মানুষ কোনোদিন ভাববে না, কারণ রাম-লক্ষ্মণের দেবভূমি ভারতের মূল ভূখন্ডে আজও তাদের খল চরিত্র হিসাবেই দেখা হয়।
কিন্তু ক্ষুরধার কলমচি অরুন্ধতীকে ইউএপিএ আইনে অভিযুক্ত করার ঘটনা কাউকে কাউকে রামায়ণের বিকল্প পাঠ মনে করিয়ে দেয়। মনে করিয়ে দেয় তাঁর এই লাইনগুলো
It’s easier on the liberal conscience to believe that the war in the forests is a war between the government of India and the Maoists, who call elections a sham, parliament a pigsty and who have openly declared their intention to overthrow the Indian state. It’s convenient to forget that tribal people in Central India have a history of resistance that pre-dates Mao by centuries. The Ho, the Oraon, the Kols, the Santhals, the Mundas and the Gonds have all rebelled several times – against the British, against zamindars and against moneylenders. The rebellions were cruelly crushed, many thousands killed, but the people were never conquered. Even after independence, tribal people were at the heart of the first uprising that could be described as Maoist, in Naxalbari village in West Bengal. Since then Naxalite politics has been inextricably entwined with tribal uprisings, which says as much about the tribals as it does about Naxalites.
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







