“বাইবেলের পাতায় পাতায় বিপ্লবীয়ানা। যুগপ্রদর্শকেরা সাধারণ মানুষ, যাঁরা বিপ্লবের বার্তা নিয়ে আসেন। যিশুও তেমনই একজন বিপ্লবের বার্তাবাহক যুগাবতার। আর, আমরাও নিয়ত চেষ্টা করে যাই বিপ্লব করার ও দুনিয়াকে বদলানোর। আমাদের সেইসব বিপ্লবচেষ্টা হয়তো ব্যর্থ হয়েছে বা হচ্ছে, কিন্তু ভবিষ্যতে কেউ না কেউ তা সফল করবেই”

-এর্নেস্তো কার্দেনাল

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

স্ট্যান স্বামী আর নেই। এতে ভারতের স্বঘোষিত ‘অরাজনৈতিক’, স্বচ্ছলবিত্ত, অ-নিম্নবর্ণ, নিশ্চয়তাচর মানুষদের কিচ্ছুটি যাবে আসবে না। যাবে আসবে তাঁদের, যাঁরা উপরোক্ত আর্থসামাজিক গুণাবলীর বৈপরীত্যে অবস্থান করেন — দলিত, আদিবাসী, ভূমিহীন, অনিশ্চিতযাপনে বাঁচা মানুষেরা ও মানবিক — রাজনীতিকরা দুঃখ পাবেন। আর, স্ট্যান স্বামীর মৃত্যুতে আজ উল্লাসের দিন রাষ্ট্রের ও রাষ্ট্রীয় মতাদর্শ অনুশীলন করে চলা প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের। স্ট্যান স্বামীকে খুন করতে আতঙ্কবাদী হিন্দুরাষ্ট্র উঠে পড়ে লেগেছিল বিগত কয়েক মাসে, আজ সফল হল। বিচারব্যবস্থা তারিয়ে তারিয়ে তা উপভোগ করল। সংবাদমাধ্যমগুলি স্ট্যান স্বামী মাওবাদী নাকি অ-মাওবাদী এই দোলাচলে সময় ও খবর কাটিয়ে দিল। আর, স্ট্যান যাঁদের সঙ্গে সক্রিয় আন্দোলনে সরকারকে ত্রস্ত রাখতেন এবং যে যে কারণে এই ন্যায্য আন্দোলনগুলি সংঘটিত হয়েছে, সেগুলি আমাদের ভদ্র-শিক্ষিত-নিশ্চিতবৃত্ত থেকে এতটাই দূরে যে, স্ট্যান স্বামীর মৃত্যু আর পাঁচটা মৃত্যুসংবাদের মতোই। কিন্তু, ঝাড়খণ্ডের জেলে বন্দী বিচারাধীন ‘মাওবাদী’ তকমাপ্রাপ্তদের কাছে, বিচারাধীন দরিদ্র আদিবাসীদের কাছে, বনজ ও খনিজ উপাদানকে আঁকড়ে বাঁচা মূলবাসী জনতার কাছে এবং কর্পোরেটের মুনাফালোভে বিস্থাপিত বিক্ষুব্ধ মানুষদের কাছে তিনি শহীদ। আজ তাঁদের শোকের দিন।

৫ই জুলাই দুপুরে মুম্বাইয়ের একটি হাসপাতালে শহীদ হলেন স্ট্যান লর্ডুস্বামী। জন্ম ১৯৩৮। ক্যাথলিক যাজক। কিন্তু, এই ধর্মীয় পরিচয়ের থেকে ঢের বেশি বড় হয়ে উঠেছিল তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় — মানবাধিকার আন্দোলনের কর্মী ও আদিবাসী-দলিত অধিকার রক্ষা আন্দোলনের সেনানী। স্ট্যান ছিলেন Persecuted Prisoners’ Solidarity Committee-র অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং বিস্থাপনবিরোধী আন্দোলনের বরিষ্ঠ অগ্রণী নেতৃত্ব। ম্যানিলা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিদ্যায় স্নাতকোত্তর করে ব্রাসেলসে পড়তে যান তিনি। সেখানেই ব্রেজিলের দরিদ্র জনজাতির জন্যে কাজ করা জনৈক আর্চবিশপের সংস্পর্শে আসেন তিনি। ১৯৭৫ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত বেঙ্গালুরুর ইন্ডিয়ান সোশ্যাল ইনস্টিটিউটের দায়িত্বও সামলেছেন তিনি। ১৯৭০ সালের এপ্রিলে যাজকের ভূমিকায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরে ঝাড়খণ্ডের আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় আসেন তিনি। শুধুমাত্র ধর্মপ্রচার আর ঈশ্বরের নামগাথা শোনানোর উদ্দেশ্য ছিল না বলেই হয়তো প্রশাসন ও শাসকবিরোধী কাজে জড়িয়ে পড়েন তিনি। আদিবাসীদের জমি-জঙ্গলের অধিকার কেড়ে নেওয়ার প্রতিবাদ, উন্নয়নের নামে তাঁদের বিস্থাপিত করার প্রতিবাদ, উঁচু জাতের সামাজিক ক্ষমতায় দলিত-আদিবাসীদের শোষণের প্রতিবাদ, শ্রমাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ — যে রঙের শাসকই ক্ষমতায় থাকুক, স্ট্যান স্বামী প্রত্যেকেরই বিরাগভাজন ছিলেন। ঝাড়খণ্ডে ট্রাইব অ্যাডভাইসরি কাউন্সিল প্রতিষ্ঠার জন্যে মূলবাসী মানুষের সঙ্গে মিশে তাঁর লড়াই তাঁকে আরও জনপ্রিয় করে তোলে এবং রাজনৈতিক দলগুলির শত্রুতে পরিণত করে। খনি ও খনিজ সম্পদের ওপরে ভূমিপুত্রকন্যা মূলবাসী মানুষের অধিকার যে সর্বাগ্রে, তা প্রতিষ্ঠা করতে সুপ্রিম কোর্ট অবধি ছুটে গেছিলেন স্ট্যান; স্বাভাবিকভাবেই খনি মাফিয়া আর কর্পোরেটদের চক্ষুশূল ছিলেন তিনি।

২০১৬ সালে অভূতপূর্ব এক পদক্ষেপ নেন স্বামী, সমাজকাঠামোর উপরে নীরব কিন্তু শক্তিশালী আঘাত — পিপিএসসি প্রতিষ্ঠা। দরিদ্র ও প্রথাগত শিক্ষাহীন আদিবাসীদের ‘মাওবাদী’ সন্দেহে জেলবন্দি করা, অত্যাচার করা ও বিনা বিচারে বছরের পর বছর ফেলে রাখার বিরুদ্ধে সোচ্চার হন স্ট্যান। গবেষণায় স্ট্যান প্রমাণ করে দেন যে, জেলে বন্দী বিচারাধীন বন্দীদের ৯৭%-এর বিরুদ্ধে আনা মাওবাদী অভিযোগ মিথ্যে ও তাঁদের মধ্যে ৯৬% দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করেন (শাসকের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ের অর্থ নেই তাঁদের) এবং বিচারাধীনদের ৩১% আদিবাসী জনজাতির। যে রাষ্ট্রব্যবস্থা কমিউনিস্টদের ভূত দেখে আসছে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে, যে রাষ্ট্রব্যবস্থা ২০০৪ সাল থেকে কমিউনিস্ট মাওবাদী পার্টিকে শাসনব্যবস্থার পক্ষে সবচেয়ে বড় বিপদ বলে দেগে দিয়েছে এবং যে রাষ্ট্রব্যবস্থা আদিবাসী-কৃষক-শ্রমিকসহ নিপীড়িত জনজাতির সামান্য দ্রোহসম্ভাবনাকেও ‘মাওবাদী’ বলে তকমা দেয়, সেই রাষ্ট্রব্যবস্থা যে স্ট্যান স্বামীকেও ছেড়ে দেবে না, তা বলাই বাহুল্য।

স্ট্যান আদিবাসী ও মেহনতি মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন ও তাঁদের লড়াইকে উৎসাহ দিয়েছেন, অন্যদিকে মাওবাদী কমিউনিস্টরাও মেহনতি জনতার পাশে শোষিত দলিত-আদিবাসীর দ্রোহের পাশে দাঁড়ান। অতএব স্ট্যান স্বামীকে মাওবাদী বলে ধরে নিয়ে গেল এনআইএ ৮ই অক্টোবর ২০২০ তারিখে। ‘সিজার লিস্টে’ দেখানো হল কমিউনিস্ট বইপত্র, মাওবাদী ইস্তেহার ও ভীমা-কোরেগাঁও সংক্রান্ত পুস্তিকা। চাপানো হল ইউএপিএ ও রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা। ২০১৮-র পয়লা জানুয়ারি ভীমা-কোরেগাঁওতে মারাঠা উচ্চবর্ণের বিরুদ্ধে দলিতদের জয়ের দুশো বছর পূর্তি উপলক্ষে যে হিংসাত্মক কার্যাবলী সংঘটিত করে হিন্দুত্ববাদী ঘাতকবাহিনী, তাতে আহত হন প্রচুর মানুষ। আর, এরপরেই সারা ভারত থেকে ‘এলগার পরিষদে’র ‘মিথ্যে’ মামলা সাজিয়ে দলিত ও আদিবাসী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করতে শুরু করে এনআইএ। যাঁরাই মেহনতি মানুষের হয়ে গণতন্ত্রের সপক্ষে কথা বলেন, তাঁরাই মাওবাদী — এই যুক্তিতেই উত্তর-ঔপনিবেশিক ভারতে ধরপাকড়ের নেশায় মেতে ওঠে রাষ্ট্রীয় বাহিনী। এঁদের বিরুদ্ধে প্রায় দশ হাজার পাতার চার্জশিট জমা দিয়েছে এনআইএ। অভিযোগ — পুনের ভিমা-কোরেগাঁওতে দলিতদের বিজয়োদযাপনের নামে হিংসা ছড়ানোয় মদত দিয়েছেন উক্ত ব্যক্তিরা। অভিযোগ — রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নাকি ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত তাঁরা ও প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে নাকি নাশকতার ছক কষছিলেন।

চলতি বছরের ২২শে মার্চ এনআইএ-র বিশেষ আদালতের বিশেষ বিচারপতি কোথালিকার বলেছিলেন, তাঁরা “hatched a serious conspiracy to create unrest in the entire country and to overpower the Government, politically and by using muscle power” স্ট্যান স্বামী ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছিলেন আগে। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি দুরারোগ্য পার্কিনসন্স অসুখে ভুগছিলেন। তাঁর জল খাওয়ার জন্যে ‘স্ট্র’ বা সিপার লাগে, অথচ সেই ‘স্ট্র’ ব্যবহারের অনুমতি দিতে আদালত ও পুলিশের কয়েক সপ্তাহ লেগে যায়। আশিউর্ধ্ব স্ট্যানকে এনআইএ যখন পনেরো ঘন্টা জেরা করেছিল ভীমা-কোরেগাঁওয়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক স্থাপনের জন্যে, তখনই স্ট্যান বুঝেছিলেন তাঁর দ্রোহস্বরের পরিণতি কী হতে চলেছে। “What is happening to me is not something unique or happening to me alone, it is a broader process taking place all over the country. We all are aware how prominent intellectuals, lawyers, writers, poets, activists, student leaders are all put in jail because they have expressed their dissent or raised questions about the ruling powers of India.” ভিডিওতে বলেছিলেন স্ট্যান।

স্ট্যানের আশঙ্কা সত্যি ছিল, তিনি কারাগার থেকে বেরোতে পারেননি। রাষ্ট্র তাঁর বিরুদ্ধে আনা একটাও অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি, মৃত্যু তাঁকে সেইসমস্ত অত্যাচার ও অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিয়ে শহীদের ভূষণ পরিয়ে দিয়েছে। গিয়ের্মো সার্দিনাস যেমন ছিলেন গির্জার ফাদার এবং কিউবার বিপ্লবের অন্যতম সেনাপতি। এর্নেস্তো কার্দেনাল ছিলেন নিকারাগুয়ার ক্যাথলিক যাজক, যিনি সান্দিনিস্তা জাতীয় মুক্তিফ্রন্টে যুক্ত হন স্বৈরতান্ত্রিক সরকারের পতন ঘটাতে। শোষিত জনগণের পক্ষে দাঁড়াতে ধর্মের বাধা মানেননি, বরং শোষিতদের দ্রোহে অংশ নিয়ে বলেছিলেন “Christ led me to Marx. For me, the four gospels are all equally communist.” যে ধর্ম মানুষকে শাসক-মতাদর্শের প্রতি মোহাচ্ছন্ন রাখে সেই ধর্মের প্রচারক হওয়া নয়, বরং যে ধর্ম নিপীড়িত মানুষের দীর্ঘশ্বাসকে ধারণ করে অসাম্য-বৈষম্য-অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়তে প্রাণিত করে সেই ধর্মের প্রচারক ছিলেন কার্দেনাল, গিয়ের্মো, স্ট্যান স্বামীরা। কার্দেনাল ঠিকই বলেছিলেন যে, দ্রোহচেষ্টা আজ ব্যর্থ হলেও ভবিষ্যতে ঠিকই সফল হবে, কেউ না কেউ ঠিক করবেনই…

আমি বিস্ফোরক যোগান দিইনি

আদর্শও হাতে তুলে দিইনি কারও

তোমরাই জুতোর নালে গুঁড়িয়ে দিয়েছ

আমদের সামান্য বসতি, ঘরদোর

সেই শোক ধিকিধিকি জ্বলে ক্রোধ,

ধ্বংসস্তূপ থেকে জন্মেছে প্রতিশোধ

লাঠি দিয়ে হিংস্র উল্লাসে ভেঙ্গেছ মৌচাক —

উদ্বাস্তু মৌমাছিঝাঁক

তোমাদের নিরাপদ নিশ্চয়তার দিকে

ধেয়ে যাচ্ছে জবাব চাইতে

রণবাদ্য দারুণ শব্দে বাজে জনতার বুকে

তুমি বন্দুক সাজাও, শাসনক্ষমতা।

ভাবো দু-একজনকে মেরে সব যায় চুকে,

দেখো, দিগন্ত জুড়ে ওড়ে দ্রোহের পতাকা

— ভারভারা রাও (অনুবাদ – লেখক)

ফ্যাসিস্ত রাষ্ট্রের কাছে স্ট্যান স্বামীকে খুন করা কেবলমাত্র একটি ‘ঝাঁকি’। কারণ, আরও অনেক দ্রোহী কমিউনিস্টকে মারা ‘বাকি’ আছে তাদের। আপাতত ভারভারা রাও, সুধা ভরদ্বাজ, গৌতম নাভালখা, সোমা সেন, আনন্দ তেলতুম্বড়ে, জি এন সাইবাবা, এম টি হ্যানিবাবু… লম্বা তালিকা। এঁদের মধ্যে অনেকেই দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত। ভারভারা রাওকে (৮৪) বিগত এক বছরে মৃত্যুর দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া হয়েছে অনেকবার। কোলোনিক পলিপোসিস আর উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত গৌতম নাভালখার (৬৮) চশমা ‘হারিয়ে’ দিয়েছিল জেল কর্তৃপক্ষ, নতুন চশমা পেতেও বহু টালবাহানা। মারণ সিওপিডিতে আক্রান্ত আনন্দ তেলতুম্বড়েকে (৭০) প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বারবার বঞ্চিত করার অভিযোগ উঠেছে। সুধা ভরদ্বাজ (৫৯) মধুমেহ ও ইস্কেমিক হার্টের অসুখে আক্রান্ত, এই বছর এপ্রিলের শেষে গুরুতর অসুস্থ হওয়ায় মানবাধিকার আন্দোলনের চাপে টনক নড়ে প্রশাসনের। কিন্তু, এঁদের প্রত্যেকের জামিনের আবেদন বারংবার খারিজ করছে আদালত। প্রশাসন কিংবা এনআইএ এঁদের বিরুদ্ধে পোক্ত ‘প্রমাণ’ হাজির করতে না পারলেও এঁদের মুক্তি মেলে না। বোধহয় ইউএপিএ আর দ্রোহের অভিযোগ দুইই ‘রিনিউ’ হতে থাকে। মাঝে মাঝে ভুয়ো ও বিকৃত প্রমাণ হাজির করে এনআইএ, মামলা জিততে পারে না, নির্লজ্জ হয়ে পরবর্তী শুনানির তারিখ চায় এবং আদালতও তা মঞ্জুর করতে থাকে — এভাবেই বছর ঘুরে যায়। জেলের ভেতরে আরও অসুস্থ করে দেওয়া হয় এঁদের।

স্ট্যান স্বামীর মুখ থেকে সিপার, গৌতম নাভালখার চোখ থেকে চশমা, স্বপন দাশগুপ্তর শরীর থেকে কম্বল, সোমা সেনের ওষুধ সরিয়ে নেয় রাষ্ট্র। সচেতন অবজ্ঞা করা হয় ভারভারা রাও, রোনা উইলসন, তেলতুম্বড়েদের শারীরিক অবনতিকে। বিনা বিচারে আর মিথ্যে মামলার পাহাড় ঠেলার চাপে হয়তো এঁদের ‘লাশ’ রাষ্ট্রের দখলমুক্ত হবে। ফ্যাসিস্ত রাষ্ট্র এঁদের এবং গণতন্ত্রকামী দ্রোহী ও কমিউনিস্টদের খুন করতে বদ্ধপরিকর। আর, এই খুনগুলো করতে ও অধিকারের লড়াইকে দমিয়ে দিতে যতটুকু দেরি, তার মধ্যে গণতন্ত্রের লবেজান অবস্থা তীব্র হবে আরও। ভারতবর্ষের কোনও সরকারই গণতন্ত্র ও সাংবিধানিক অধিকারকে মান্যতা দেয়নি। দিনে দিনে গণতন্ত্রের নাভিশ্বাস আরও বাড়ছে। আদিবাসীদের বিক্ষোভ, কৃষকদের আন্দোলন ও শ্রমিকশ্রেণির প্রতিবাদ ভারতরাষ্ট্রের কাছে বিপদসঙ্কেত — তাই এই সব প্রতিরোধকেই ‘মাওবাদী/নকশাল’ বলে চিহ্নিত করেছে/করছে তারা। দধীচির মতো নিজের জীবন দিয়েও জনতার হাতিয়ার তৈরি করে গেছেন স্ট্যান — তাঁর এই বলিদান ভারতবর্ষের মানুষকে একটিই প্রশ্নের মুখোমুখি বসায় — আমি কার পক্ষে? রাষ্ট্রের নাকি গণতন্ত্রের?

ইউএপিএ-র মতো অমানবিক মারণ আইনকে যে রাজনৈতিক দলগুলি সমর্থন করেছে বা একবারের জন্যেও প্রয়োগ করেছে কোনও আন্দোলনকারীর ওপরে, স্ট্যান লর্ডুস্বামীর মৃত্যুতে তাদের শোকবার্তা কুম্ভীরাশ্রুর সমান। স্ট্যান স্বামীর মৃত্যু সংবাদমাধ্যম থেকে জেনে এরকম ১৫০০টা শব্দ লেখা কিংবা ফেসবুক-টুইটারে পাঁচ লাইনের ‘ধিক্কার’বাক্য লেখা কঠিন নয়। কঠিন হচ্ছে, স্ট্যান স্বামীর মতো নিরবচ্ছিন্ন ভাবে আদিবাসী-দলিত-নিম্নবর্গের সঙ্গে মিশে থাকা ও তাঁদের দ্রোহস্বরে স্বর মিলিয়ে সোচ্চার হওয়া। রাষ্ট্র ‘মাওবাদী’ তকমা দিয়ে নিপীড়ন করবে জেনেও এবং সংবাদমাধ্যম নিরপেক্ষতার ঠুলি এঁটে থাকবে জেনেও রাষ্ট্রের চোখে চোখ রেখে আদিবাসী ও দলিতদের অধিকারের দাবিতে লড়াই করে যাওয়া সহজ নয়। রাষ্ট্রের খুনে বাহিনী ধরতে আসবে জেনেও গণতন্ত্রের পক্ষে, “I am ready to pay the price whatever be it.” বলার দৃঢ়তা কুর্নিশযোগ্য। না, স্ট্যান কোনও শাসক মতাদর্শের না। স্ট্যান কোনও সংসদীয় রাজনৈতিক দলের ‘মুখ’ নন। স্ট্যান রাষ্ট্রের আধিপত্যমূলক যন্ত্রের প্রকাশ্য বা গোপন প্রতিনিধি নন। স্ট্যান নিপীড়িত আদিবাসী ও দলিতদের প্রতিনিধি। স্ট্যান ফ্যাসিস্ত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো যেকোনও গণতন্ত্রপ্রেমী মানুষের প্রতিনিধি। যদি এক মুহূর্তের জন্যেও ফ্যাসিস্ত রাষ্ট্রকে আমরা ঘৃণা করে থাকি, তবে সেই পবিত্র মুহূর্তটুকুর সহযোদ্ধা স্ট্যান স্বামী। তিনি রাষ্ট্রের হেফাজতে খুন হলেন — গণতন্ত্রের এই শোক থেকে গণতন্ত্রের ক্রোধ উদ্দীপিত হোক।

~মতামত লেখকের ব্যক্তিগত।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.