অনাথ মৃধা

৫ জুলাই প্রতিবাদী শিক্ষক ও সমাজকর্মী বরুণ বিশ্বাসের মৃত্যুদিন। সুটিয়া গণধর্ষণ কাণ্ডে তিনি অঞ্চলের মানুষদের নিয়ে ধর্ষক বাহিনীর বিরুদ্ধে সংগ্রামী আন্দোলন গড়ে তোলেন। ২০১২ সালের এই তারিখে তাঁকে খুন করা হয়।

কারোর মনে হতেই পারে, তেত্রিশ কোটি দেবতা থাকতে বরুণ বিশ্বাসকে কেন স্মরণ করব? তিনি তো রাষ্ট্রনায়ক, চিন্তাবিদ বা দার্শনিক ছিলেন না। তাহলে কেন বরুণ বিশ্বাসের জীবন, মনন আদর্শ নিয়ে ভাবনাচিন্তা করতে যাব? তিনি তো একজন বেতনভোগী শিক্ষক মাত্র, যিনি শিয়ালদহের কাছে মিত্র ইনস্টিটিউশনে বাংলা পড়াতেন। একজন তরুণ শিক্ষক মাত্র কয়েক বছরের জীবনে কী এমন মহান আদর্শ বা মানবতার নজির গড়ে যেতে পেরেছেন ভাবীকালের জন্য? এ প্রশ্নও তোলা যেতে পারে যে, তাঁর মধ্যে যে চেতনা ছিল তা কি আর আজকের মানুষের পক্ষে অনুকরণীয় বা অনুসরণীয়?

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

এইসব প্রশ্নের উত্তর পেতে গেলে শিক্ষক বরুণ বিশ্বাসকে জানতে হবে। তিনি একজন মাটিতে পা রেখে চলা মানুষ ছিলেন। ঈশ্বর হলে তাঁকে গুলি করে হত্যা করা যেত না। মাত্র উনচল্লিশ বছর বয়সী বরুণকে যখন স্কুল থেকে সুটিয়ার বাড়িতে ফেরার পথে গোবরডাঙা স্টেশনে ভাড়াটে খুনির গুলিতে প্রাণ হারাতে হয়, তখনই বোঝা যায়, হয়ত তিনি একজন সাধারণ বেতনভোগী শিক্ষক ছিলেন না। বারবার “বেতনভোগী” শব্দটা ব্যবহার করার যথেষ্ট কারণ আছে। বরুণ কী করতেন বেতনের এই টাকা দিয়ে? এখানেই অকৃতদার এই শিক্ষক আর পাঁচজন শিক্ষকের থেকে আলাদা। মাসের নির্দিষ্ট দিনে বেতন পাওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই সে টাকা শেষ হয়ে যেত। ভোগ? দাদার বাড়িতে খেতে বসে মাছের দাম শুনে খাওয়া ছেড়ে উঠে পড়তে হয় তাঁকে। কচুরির চেয়ে মুড়ি সস্তা — এই তত্ত্ব বরুণের ভোগের নমুনা। বরুণের বেতনের টাকা আসলে বিলি হয়ে যেত। দুঃস্থ ছাত্রছাত্রীদের টিউশন ফি, বইখাতা কেনার টাকা, স্কুলে ভর্তির টাকা, পাড়ার গরীব অসহায় মানুষের ওষুধ, শীতবস্ত্র কেনার মূল্য চুকিয়ে দেওয়া হত ওই টাকা থেকে। এমন শিক্ষককে ঠিক আর পাঁচজন শিক্ষকের তালিকায় না ফেলাই ভাল। কিন্তু এমন মনের একজন মানুষকে কেন অন্যের চক্ষুশূল হতে হল? ইনি দেবতা না হোন, একজন আদর্শ শিক্ষক তো বটে, যিনি আত্মকেন্দ্রিকতার বাইরে বেরিয়ে আসতে পারেন অনায়াসে।

নিজের বৃত্তের বাইরে এমন সন্ন্যাসযাপনই ছিল আদর্শ শিক্ষক বরুণ বিশ্বাসের জীবন।

নরনারীর সুস্থ সহাবস্থানেই এই চরাচর মধুর হয়ে ওঠে, অন্যথায় নন্দনকাননও নরকে পরিণত হয়। সেইভাবে বেশ কয়েক বছর ধরে বরুণের গ্রাম সুটিয়াও হয়ে উঠেছিল ধর্ষণের মুক্তাঞ্চল। রাজনীতির মদতপুষ্ট হয়ে নারীর সম্মানহানির নেশায় মেতে উঠেছিল দুঃশাসনেরা। এর প্রতিকারে গঠিত হয় ‘প্রতিবাদী মঞ্চ’। নির্ভীক বরুণ মঞ্চে উঠে ননীগোপালবাবুর হাত থেকে মাইক্রোফোন প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেন, “আমরা যদি আমাদের মেয়ে, বৌ, মা, বোনদের সম্মান রক্ষা করতে না পারি, তাহলে সভ্য সমাজে থাকা আমাদের উচিৎ নয়। ধর্ষণকারীদের মুখোমুখি হওয়ার সাহস যদি আমাদের না থাকে তাহলে তাদের থেকেও বেশী শাস্তি হওয়া উচিত আমাদের। আসুন আমরা একত্রে মহিলাদের সম্মান রক্ষায় হাত মেলাই”। বুঝতে অসুবিধা হয়নি, এই নরকে লাঞ্ছিতা, ধর্ষিতা দ্রৌপদীদের সম্মানরক্ষকের ভূমিকায় বরুণের মত তরুণদের খুব প্রয়োজন।

বরুণকে নিয়ে চর্চা করতে গিয়ে যদি আর একটিও তাঁর মত মানুষ তৈরি হয়, তা হবে অনেক বড় পাওয়া। মানুষের পাশে দাঁড়াতে গেলে মানুষকে ঈশ্বর হতে হয় না, কোনো দলতন্ত্র অথবা দার্শনিক উপলব্ধিরও প্রয়োজন পড়ে না। দরকার শুধু মনোবল এবং ভাল কাজ করার মত চারিত্রিক দৃঢ়তার সঙ্গে আন্তরিকতা। এই গুণগুলো থাকলে নেতা না হয়েও মানবিকতার জোরে নেতৃত্ব দেওয়া যায়।

তবে এরকম মানুষ হয়ে ওঠেন কায়েমী স্বার্থের শত্রু। বরুণের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। ইছামতির সংস্কার পরিকল্পনায় যুক্ত এক শ্রেণির মানুষের বিরাগভাজন হয়ে ওঠেন সংস্কারমুখী বরুণ। এ ছাড়াও ধর্ষণকারী দলের কার্গিল বাহিনীর [তখন ওই এলাকায় যে নামে ডাকা হত ওই দুষ্কৃতীদের] পান্ডা সুশান্ত ঢালিকে জেলে পাঠানোয় বরুণের ভূমিকার কারণে জেলের ভিতরে বসেই বরুণ হত্যার নীল নকশা তৈরি করা হয়। বরুণকে পৃথিবীর বুক থেকে সরিয়ে না দিলে আর চলছিল না ওদের।

এমন মানুষের আদর্শ, তার চরিত্র, রেখাঙ্কিত পথকে অনুসরণ করা মানে মানবতাকে সম্মান জানানো। এই মানবিক অবক্ষয়ের দিনে মা-বোনেদের সম্মানরক্ষার্থে এমন মানুষ প্রয়োজন।

নিবন্ধকার পেশায় শিক্ষক এবং একত্রে নানা কাজ করার সূত্রে বরুণ বিশ্বাসের বন্ধু। বরুণ বিশ্বাস স্মৃতিরক্ষা কমিটির কার্যকরী সদস্য।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

মতামত জানান

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.