রাজনৈতিক পরামর্শদাতা কোম্পানি আইপ্যাকের অন্যতম ডিরেক্টর প্রতীক জৈনের বাড়ি ও অফিসে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) তল্লাশি চালানোর সময়ে তৃণমূল নেত্রী এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির হানার ঘটনায় বঙ্গ রাজনীতিতে নতুন ঢেউ উঠেছে। একটি কেন্দ্রীয় তদন্তকারী এজেন্সির তল্লাশির সময়ে একজন সাংবিধানিক পদাধিকারীর এহেন আচরণ স্বাভাবিকভাবেই সবাইকে হতচকিত করেছে। তল্লাশি চলার সময়ে মুখ্যমন্ত্রী যেভাবে দলের তথ্য ও নথি ‘উদ্ধার’ করে এনেছেন, এটি অনৈতিক শুধু নয়, বেআইনিও বটে। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে তিনি একপ্রকার প্রমাণ করে দিয়েছেন যে, তিনি ঠিক কাজই করেছেন।

বিরোধীরা স্বীকার করুন বা না করুন, আদালতে ইডি-মুখ্যমন্ত্রী-প্রতীক জৈনের মামলার যা ফয়সালাই হোক না কেন, মুখ্যমন্ত্রী এই রাজনৈতিক বয়ান জনমানসে ছড়িয়ে দিতে সফল হয়েছেন যে, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের আগে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী তালিকা ও অন্যান্য নানা কৌশল হাতাতে বিজেপি আইপ্যাকের অফিসে ইডিকে পাঠিয়েছিল। তিনি বীরবিক্রমে গিয়ে আপাতভাবে সেই ‘ছিনতাই’ রুখে দিয়েছেন।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

সাধারণ মানুষের কাছে মমতার বয়ান খুব অস্বাভাবিক ঠেকেনি। কারণ এতগুলো দুর্নীতির মামলার তদন্ত করে সিবিআই বা ইডি – কেউই আজ পর্যন্ত এক চুল এগোতে পারেনি, কাউকে শাস্তি পাইয়ে দেওয়া দূরের কথা। প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় বহাল তবিয়তে নাকতলার বাড়িতে ফিরে গিয়েছেন। বীরভূমের দোর্দণ্ডপ্রতাপ তৃণমূল নেতা অনুব্রত মণ্ডলও স্বগৃহে প্রত্যাবর্তন করেছেন। ‘কালীঘাটের কাকু’-ও কালীঘাটে স্বমহিমায় বিরাজ করছেন। না তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জির এতবার তলব ও জিজ্ঞাসাবাদে কোনো ফল হয়েছে, না রাজ্য পুলিশের ডিরেক্টর জেনারেল রাজীব কুমারকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তদন্ত এগিয়েছে।

অন্যদিকে, পাঁচবছর আগের এক পুরনো মামলায় হঠাৎ তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনৈতিক পরামর্শদাতা একটি কোম্পানির মালিকের বাড়ি ও অফিসে তল্লাশি চালানোর কী দরকার পড়ল, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে সন্দেহ তৈরি করা গেছে।

এই দুয়ের উপর ভর করেই মমতা তাঁর রাজনৈতিক চালটি চেলেছেন। কয়লা চোরাচালানের মামলায় প্রতীকের কোম্পানির কোনো যোগসূত্র যদি থেকেও থাকে, তা এখানে গৌণ হয়ে গেছে। মমতা বরাবরই যে কাজটি ভাল করে থাকেন, এবারেও সেটিই করেছেন – বিরোধী নেত্রীর মূর্তি ধারণ করে রাস্তায় নেমে পড়েছেন, পুরো দলকেও রাস্তায় নামিয়েছেন। বিরোধী দল বিজেপিও রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু একনায়িকার দল তৃণমূলের প্রতিবাদ যেভাবে নজর কেড়েছে, বহু নেতায় বিভক্ত বিজেপির ক্ষেত্রে তা ঘটেনি। তাই বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীকে তৃণমূল সমর্থকদের দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার অভিযোগ করে চন্দ্রকোণা থানায় গিয়ে ধরনায় বসতে হয়েছে।

গত কয়েক বছরে রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল বিজেপি বারবার এভাবেই মমতার কৌশলের সামনে মুখ থুবড়ে পড়েছে। সেদিক থেকে এই ঘটনাপ্রবাহকে ঠিক অপ্রত্যাশিতও বলা যায় না। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এই আবহে বামেদের প্রতিক্রিয়া সেই তৃণমূল-বিজেপি সেটিং তত্ত্বে আটকে গিয়েছে। গত এক দশক ধরে এই তত্ত্ব আউড়ে যাচ্ছেন বাম নেতা ও কর্মী, সমর্থকরা। ‘বিজেমূল’ তত্ত্বের মূল প্রতিপাদ্য হল – বিজেপি কোনোভাবে তৃণমূলকে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতাচ্যুত করতে চায় না, তৃণমূলের সঙ্গে সমঝোতা করে ছদ্ম লড়াই চালিয়ে যেতে চায়। শাসক আর বিরোধী পরিসর – দুটিই দখলে রাখতে চায়। এ নতুন কোনো তত্ত্ব নয়। বিজেপি নেতাদের মধ্যেও কেউ কেউ এ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। একদা বিজেপির রাজ্য সভাপতি, ত্রিপুরার প্রাক্তন রাজ্যপাল এবং এখন সোশাল মিডিয়ায় সীমাবদ্ধ তথাগত রায় তো বারবার পোস্ট করেন – বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব যদি মানুষের মন থেকে এই ধারণা দূর করতে না পারেন যে বিজেপি-তৃণমূল ‘সেটিং’ আছে, তাহলে পশ্চিমবঙ্গ জেতা শক্ত।

কিন্তু এই তত্ত্ব আউড়ে নির্বাচনী রাজনীতিতে বামেদের কোনো লাভ হয় না। বরং ‘আগে রাম, পরে বাম’ তত্ত্বই প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। ২০১৬ সালের পরে যেভাবে বামেদের ভোট বিজেপির ঘরে গেছে (আচ্ছা, তর্কের খাতিরে ধরে নিচ্ছি কিছু তৃণমূলের ঘরেও গেছে), তাতে বামেরা নির্বাচনী রাজনীতিতে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে। মানে যেসব বাম সমর্থক তৃণমূল-বিজেপির সেটিং নিয়ে সরব, তাঁদেরই একটি বড় অংশ ভোটকেন্দ্রে গিয়ে বিজেপিকে (মতান্তরে একটি অংশ তৃণমূলকে) ভোট দিয়ে আসছেন।

এতকিছুর পরেও ইডির তল্লাশিতে মমতার হানা দেওয়ার ঘটনার প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম যেভাবে ‘প্রতীক জৈন তৃণমূলের কোন পদাধিকারী? এবং সেই নথি তৃণমূল দেখাক’ এমন সব কথা বলেছেন, তাতে তাঁর রাজনৈতিক ছেলেমানুষীই প্রকাশ পেয়েছে। এসব কথা তাঁর দলের কর্মী, সমর্থকরা সোশাল মিডিয়ায় লিখতে পারেন, কিন্তু রাজ্যে দলের সর্বোচ্চ নেতা এমন কথা বলে ভোটের আগে কেন্দ্রীয় এজেন্সিকে ব্যবহার করার পক্ষে একপ্রকার সমর্থনই জানিয়ে ফেললেন যে।

একই ধরনের কাজ এসআইআর বা ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনীর ক্ষেত্রেও করেছেন বাম নেতারা। এই সংশোধনীতে ‘মমতার ভূতুড়ে ভোটার বাদ যাবে’ এই ধারণায় উদ্বাহু নৃত্য করতে করতে এই প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের যে হেনস্থা হল তাকে প্রায় অস্বীকার করে গেলেন বামেরা। ‘ও পাড়ার বাপিদাকে যদি শুনানির জন্য ডাকতে পারে, তাহলে অমর্ত্য সেনকে ডাকায় কী অন্যায় হয়েছে’ – এই জাতীয় কথা বলে পুরো প্রক্রিয়ার অস্বচ্ছতা, গোলমালকে এড়িয়ে যেতে চেয়েছেন বাম সমর্থকদের একাংশ। অন্যদিকে, তৃণমূল কিন্তু এই প্রক্রিয়ার সক্রিয় বিরোধিতা করার পাশাপাশি পাড়ায় পাড়ায় ভুক্তভোগীদের পাশে দাঁড়িয়ে নিজেদের জনসংযোগের কাজ সেরে নিয়েছে।

এরকম বহু উদাহরণ তুলে ধরা যায়, যাতে দেখা যাবে যে বিজেপি-তৃণমূলের সেটিং তত্ত্বে তা দিয়ে বামেদের কোনো লাভ হয়নি। যে কথাটি বাম নেতা ও কর্মীরা বারবার বলেন, তা হল বাংলার রাজনীতি একটি বাইনারিতে পড়ে গেছে। তা বরং একশো শতাংশ সত্যি। কিন্তু একইসঙ্গে তাঁরা যা স্বীকার করেন না তা হল, তাঁরা নিজেরাও এই বাইনারির ফাঁদেই পড়ে গেছেন। এই দ্বিদলীয় ব্যবস্থার জাল কাটতে গেলে, বামেদের বুঝতে হবে যে সেটিং তত্ত্ব এই ব্যবস্থাকেই স্বীকৃতি দেয়। অতএব ওই বয়ান বাতিল করা দরকার, বরং এই বাইনারি ভাঙার জন্য কাজ করতে হবে।

সে কাজ যে বামেরা একেবারেই করছে না তা নয়। দলের যুব সংগঠনের ডাকে ইনসাফ যাত্রা হয়েছে, বাংলা বাঁচাও যাত্রাও হল। তাতে বাম কর্মী, সমর্থকরা উৎসাহ নিয়ে রাস্তা ভরিয়েছেন। কিন্তু ইনসাফ যাত্রার সাফল্যের ছিটেফোঁটাও ভোটবাক্সে দেখা যায়নি। নিজের দলের কর্মী সমর্থকদের আস্থাই যদি অর্জন করা না যায়, তাহলে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া সাধারণ মানুষের আস্থা কীভাবে অর্জন করবে বাম নেতৃত্ব? সেটাই সবচেয়ে প্রথমে ভাবা উচিত নয় কি?

গত রাজ্য সম্মেলনের আগে এরিয়া কমিটি, জেলা কমিটিগুলির ক্ষমতায় বসার জন্য বাম নেতাদের উৎসাহ কম দেখা যায়নি। দলের কোন পদে কে থাকবেন, তার জন্য ভোটাভুটিও করতে হয়েছে কোনো কোনো জায়গায়। কিন্তু তাতে করে দলের সংগঠনের সার্বিক উন্নয়ন হয়েছে কি? ঘুরে দাঁড়াতে গেলে তো আগে স্থানীয় স্তরে দলকে সংগঠিত করতে হবে। সেখানে মানুষের আস্থা অর্জন করতে হবে, পুরসভা-পঞ্চায়েত ভোটে জিততে হবে। সেখানে তৃণমূলের মার খেয়ে পিছিয়ে এসে শুধু সোশাল মিডিয়ায় হল্লা করলে তো হবে না। বামেদের প্রতি স্থানীয় মানুষের আস্থা থাকলে তৃণমূলের মার উধাও হয়ে যাবে।

তৃণমূলের লাগামছাড়া দুর্নীতি, স্থানীয় স্তরে দাদাগিরির পরেও সাধারণ মানুষের বামেদের উপর আস্থা না রাখার একটি বড় কারণ যদি হয় সরকারি ছত্রছায়ায় থাকার সুবিধা লাভ, অন্য কারণটি হল, এখনো ৩৪ বছরের শাসনের স্মৃতি অনেকেই মন থেকে মুছে ফেলতে পারেননি। না সাধারণ মানুষ, না বাম নেতাদের এক বড় অংশ। তাঁদের বাচিক ঔদ্ধত্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে ভয়ও পাইয়ে দেয়। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার নিয়ে বামেদের এক বৃহৎ অংশের সমালোচনা ও ভোক্তাদের ভিখারির সঙ্গে তুলনা করার বিপদ সেলিম পর্যন্ত বুঝেছিলেন। কিন্তু এই ঔদ্ধত্য তো শুধু লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে সীমাবদ্ধ নয়। পাড়ায় পাড়ায় অনেক প্রবীণ (এমনকী নবীন) নেতাদের আচরণেও তা ধরা পড়ে যায়। উপরন্তু, সিপিএমে বরাবর মধ্যবিত্ত শ্রেণির আধিপত্য থাকলেও, এখনকার মত গরিব মানুষের সঙ্গে সার্বিক বিচ্ছিন্নতা সম্ভবত ছিল না। দিন আনে দিন খায় মানুষ দূরের কথা, রাস্তার ধারে গুমটি খুলে রুটি তরকারি বেচেন যাঁরা, তাঁদের সঙ্গেও স্থানীয় সিপিএমের কোনো সম্পর্ক নেই আজকাল। রিকশাওলা, টোটোওলা, অটোওলাদের মধ্যে যে সিপিএম সম্পূর্ণ অনুপস্থিত তা তো বলাই বাহুল্য। তাঁদের উপরে শাসকদলের একাধিপত্য পশ্চিমবঙ্গের পুরনো কাহিনি, যা বদলানোর কোনো উদ্যোগ বামেরা ১৫ বছর বিরোধী আসনে থেকেও নিয়ে উঠতে পারেনি। অর্থাৎ মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টির আজকের রাজনীতি থেকে শ্রেণির প্রশ্নই উধাও। ফলে মহম্মদ আমিন বা চিত্তব্রত মজুমদারের মত শ্রমিক নেতার উত্তরসূরির দেখা মেলে না। হান্নান মোল্লা যে করিতকর্মা কৃষক নেতা, সেকথাও তিনি পশ্চিমবঙ্গে থাকতে টের পাওয়া যায়নি। সিপিএমে এখন যেদিকে তাকানো যায় সেদিকেই ছাত্রনেতা ও যুবনেতাদের ভিড়। তাঁরা রাজ্যের এই সংকট মুহূর্তেও বাংলা ছবির প্রিমিয়ারে, অমুক পডকাস্টে, তমুক প্রেম সংক্রান্ত মিষ্টিমধুর আলোচনা সভায় ব্যস্ত। তাহলে বাইনারি ভাঙবে কারা, এবং কখন?

তৃণমূল-বিজেপির বাইনারি ভাঙতে গেলে একটি তৃতীয় অক্ষ নিয়ে আসতে হবে বঙ্গ রাজনীতিতে। সামাজিক বিভাজনের যে খাঁজগুলিকে নিয়ে তৃণমূল ও বিজেপি ব্যস্ত – যেমন হিন্দু-মুসলমান, মতুয়ার মত পরিচিতির রাজনীতি, বাঙালি-বহিরাগতের মত আখ্যান, দুর্নীতি-এজেন্সি দ্বন্দ্ব – এর বাইরের কোনো অক্ষকে বঙ্গ রাজনীতিতে যুক্ত করতে হবে। দিল্লিতে আম আদমি পার্টি যেমন স্বচ্ছ সরকারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সেখানে কংগ্রেস-বিজেপির বাইনারি ভেঙেছিল। নতুন কোন আখ্যান সাধারণ মানুষকে উদ্বেলিত করবে, তার খোঁজ বাম নেতাদেরই করতে হবে। সেখানে চলতি আখ্যানে গা ভাসালে বিজেপি বা তৃণমূলই লাভবান হবে।

যেসব দল এই বাইনারি থেকে লাভবান হতে চায়, তারা সাধারণ মানুষের আবেগকেই উস্কে দিতে ভালবাসে। তা সে মমতার বাঙালি বনাম বহিরাগত তত্ত্বই হোক বা বিজেপির রোহিঙ্গা-সংখ্যালঘু তত্ত্ব। দুটিতেই আবেগকে উস্কে দেওয়ার রসদ রয়েছে প্রচুর। বামেদের এক বড় অংশ এই আবেগেই নিজেদের রাজনীতির পথ হারাচ্ছেন। শহুরে বাম সমর্থক তাই অষ্টপ্রহর হরিনাম ছেড়ে মুসলমানদের আজান বা সারারাতের জলসায় বিরক্ত এবং ভীত হয় আজকাল।

কিন্তু বাইনারি ভাঙতে গেলে ‘বোরিং’ ইস্যুকেই হাতিয়ার করতে হবে। বামেরা তা করার চেষ্টা করছে বটে – বেকারত্বের কথা বলছে, রোজগারের কথা বলছে। কিন্তু শুধু সমস্যা তুলে ধরে লাভ নেই। প্রবাসী শ্রমিকদের সমস্যা যেখানে পশ্চিমবঙ্গে বড় ইস্যু, সেখানে সেই সমস্যা সমাধানে বামেদের ভূমিকা কী? এমনকী ভিনরাজ্যে বাঙালী প্রবাসী শ্রমিকদের হেনস্থার প্রতিবাদেও তো তৃণমূলই সামনের সারিতে থাকছে। তাঁদের উদ্ধার করা থেকে শুরু করে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার কাজেও দেখা বারবার উঠে আসছে তৃণমূল সাংসদ সামিরুল ইসলামের নাম। তাদেরই পরিচালিত রাজ্য সরকারের জন্য এত মানুষকে বাংলা ছাড়া হতে হচ্ছে, তবু তারাই এই শ্রমিকদের ত্রাতা হয়ে উঠছে। গরিব মানুষের কথা বলা বামেরা কোথায়? দাঙ্গা কবলিত এলাকায় বা সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতিতে বিদ্ধ এলাকায় বাম নেতারা কোথায়?

বেকারত্ব হোক বা শিল্প – তাঁরা সরকারে থাকলে সমস্যাগুলির কী ধরনের সমাধান করতেন, তা তুলে ধরলে তবেই বামেদের প্রতি ধীরে ধীরে ফিরে তাকাতে শুরু করতে পারেন সাধারণ মানুষ। স্থানীয় স্তরে নিজেদের পঞ্চায়েত বা পৌরসভার প্রতিনিধিরা কী ধরনের কাজ করছেন বা করতে পারেন, তা তুলে ধরলে তবেই মানুষের বিশ্বাস জন্মাতে পারে।

দুই পক্ষই খারাপ বললে বা এক পক্ষকে ক্রমাগত আক্রমণ করে গেলেও যে বামেরা হালে পানি পাবেন না, তা প্রমাণিত হচ্ছে বারবার। তৃণমূলকে দুর্নীতিগ্রস্ত আর বিজেপিকে সাম্প্রদায়িক বলে সোশাল মিডিয়ায় গলা ফাটিয়েও ভোটবাক্সে বিজেপিকে ভোট দিয়ে এলে সুবিধাবাদী কাকে বলবেন? দ্বিদলীয় ব্যবস্থা ভাঙতে গেলে শুধু অভিযোগ করে গেলেই চলবে না। শক্ত ইস্যুর উপরে নিজেদের নতুন পথের কথা বলে এই বাইনারিকে চ্যালেঞ্জ করতে হবে।

বিজেপি ক্ষমতায় এলে তৃণমূলের ছন্নছাড়া অবস্থা হবে ঠিকই, কিন্তু গেরুয়া শিবির যে বিরোধী পরিসর বামেদের হাতে ছেড়ে দেবে – এমনটা ভাবা মূর্খামি। হয় বিজেপি বামেদের বঙ্গ রাজনীতি থেকে একেবারে উড়িয়ে দিয়ে ছাড়বে, অথবা তৃণমূলকে বিরোধী পরিসরে খেলতে দেবে। আরএসএসের সবচেয়ে বড় শত্রু যে কমিউনিস্টরা সেকথা কিন্তু তারা একশো বছর ধরে বলে আসছে।

যারা প্রথমবারের ভোটার, তারা তো সিপিএম বা বামফ্রন্টের শাসন দেখেনি। তাদের নিজেদের পক্ষে টানার জন্য বামেদের কৌশল কী? তাদের কাছেও বিজেপি-তৃণমূল বাইনারি বেচে কোনো লাভ আছে?

মোটকথা এই বাইনারি বা সেটিং তত্ত্বে তা না দিয়ে, বামেদের নতুন রাজনীতির সন্ধান করতে হবে। বলতে হবে তারা কাদের জন্য, কাদের পক্ষে কথা বলবে, কী ধরনের সরকার দেবে, কী ধরনের সমাজ তারা গড়বে। সামাজিক বিভাজনের শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্তের খাঁজগুলি থেকে বেরিয়ে নতুন পরিসর খুঁজতে হবে, নিজেদের নতুন পরিচিতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তারাও যে সমস্যার ইতিবাচক সমাধান করতে পারে, তা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নিজেদের সংগঠনকে ঢেলে সাজাতে হবে, মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে স্থানীয় স্তরে। সেখানে ৩৪ বছরে বা বুদ্ধবাবুর আমলে বামেরা কী স্বপ্ন দেখেছিল, সেই বস্তাপচা উদাহরণ টেনে লাভ হবে না। নতুন কিছু বলতে হবে মানুষকে।

আরো পড়ুন মমতা যা করেছেন তাতে তিনি জিতলেও হিন্দুত্ববাদ হারবে না পশ্চিমবঙ্গে

এতদিন বামেরা লিপসেট ও রোক্কানের রাজনৈতিক-সমাজনীতির তত্ত্ব অনুযায়ী শ্রেণি এবং শ্রমিকের মত সামাজিক গোষ্ঠীগুলির রাজনৈতিক দাবি তুলে এনেছে। কিন্তু পরিচিতি, জনমোহিনী ও সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতি সেই বিভাগগুলির জায়গায় নতুন বিভাগ তুলে এনেছে। কাজেই বামেদের নতুন পথের খোঁজ করতে হবে। কেবল পুরনো পথে হাঁটলেও বামেরা প্রান্তিক শক্তি হিসাবেই থেকে যাবে। সাধারণ মানুষের দাবিদাওয়া, ক্ষোভগুলির সঙ্গে নিজেদের মতবাদকে খাপ খাইয়ে নতুন দিশা দেখাতে হবে। স্থানীয় স্তর দিয়েই রাজ্য স্তরকে ঘিরতে হবে। আলিমুদ্দিন থেকে সরকার চালানো সহজ, কিন্তু দলকে দাঁড় করানো সহজ নয়। যাঁরা এরিয়া কমিটি বা জেলা কমিটিতে জিতেছেন, তাঁদেরই দায়িত্ব নিতে হবে। রাজ্যস্তর থেকে সাবোতাজ করলে হবে না। নিচুতলার সংগঠনকে চাঙ্গা না করে, রাজ্যস্তরে পাশা উলটে দেব ভাবলে ভুল হবে।

আর নির্বাচনী রাজনীতিতে যদি জোট করতেই হয়, একটি তৃতীয় শক্তিকে তুলে ধরতে হয়, তাহলে শুধু নির্বাচনী আসন সমঝোতায় তা সীমাবদ্ধ রাখলে যে কোনো লাভ হয় না, সেটিও প্রমাণিত। নির্বাচনী আদর্শ মেনে সেই জোটকে ভরসাযোগ্য করে তুলতে হবে ভোটের অনেক আগে থেকে।

মূলধারার মিডিয়া যে তাদের পাত্তা দেবে না, তা তো বামেরা বুঝে গেছে (তবু তো টিভি চ্যানেলগুলি এখনো বাম মুখপাত্রদের জায়গা দেয়)। কাজেই নিজেদের কাজ সোশাল মিডিয়ার মাধ্যমেই ছড়িয়ে দিতে হবে। শুধুই একে অন্যকে গালাগালি করে, মিডিয়াকে কটাক্ষ করে, মমতার মিম বানিয়ে সে কাজও হবে না। এক পক্ষকে অনুকরণ করে যেমন লাভ নেই, তেমন কখন এই সরকার পড়বে তারপর মাঠে নামব – এই মানসিকতাতেও লাভ নেই।

বিপণনের ভাষায়, নিজেদের রাজনীতির বাজারে নতুন করে ‘পজিশন’ করতে হবে বামেদের। যাতে সবসময় বামেদের ‘কান্নাকাটি করা বাচ্চা’ বা ‘গালাগালি দেওয়া দাদা’ বলে মনে না হয়। আমার মত সাধারণ মানুষ যদি বুঝতে পারে যে, সেটিং তত্ত্বের রাজনীতি কোনো কাজে দিচ্ছে না, তাহলে এমন ভাবার কোনো কারণ নেই যে, চব্বিশ ঘন্টা রাজনীতি করা বাম নেতারা বুঝতে পারছেন না।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

1 মন্তব্য

  1. SIR/NRC এবং Blinkit/zomatoর গিগ শ্রমিকদের আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ার নামতেই কিন্তু ভেনেজুয়েলা নিয়ে কয়েক ঘন্টার মধ্যেই মিছিল – অপ্রাসঙ্গিক হওয়ার আখ্যানের অংশ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.