কথা ছিল নতুন বছরে এক সফল অভিযান দিয়ে শুরু হবে ইসরোর যাত্রা। দেশি বিদেশি ১৬টি পেলোডকে নির্দিষ্ট কক্ষপথে পৌঁছে দেবে PSLV C62 রকেট। কিন্তু সে আর হল কই? গত ১২ জানুয়ারি, সকাল ১০টা ১৭ মিনিটে অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীহরিকোটা থেকে রওনা হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই রকেটের তৃতীয় পর্যায়ে কিছু যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। ফলে তার গতিবেগ ক্রমশ কমতে থাকে এবং রকেটটা নির্ধারিত কক্ষপথে পৌঁছতে ব্যর্থ হয়, আর সেইসঙ্গে মহাকাশে হারিয়ে যায় অন্বেষা সহ অন্যান্য কৃত্রিম উপগ্রহগুলো।

গত বছর মে মাসেও ব্যর্থ হয় ইসরোর অভিযান। সেবারও তৃতীয় পর্যায়ের যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে মিশন সফল হয়নি।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

পোলার স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিকল বা PSLV C62 রকেটের মোট চারটে পর্যায় রয়েছে। তার মধ্যে দুটো কঠিন, দুটো তরল। প্রত্যেক পর্যায়েই স্বতন্ত্র ইঞ্জিন ও জ্বালানির ব্যবস্থা রয়েছে। প্রথম ধাপের জন্য বেশ শক্তিশালী ইঞ্জিনের দরকার পড়ে, কারণ মহাকর্ষের টান ও বায়ুমণ্ডলের বাধাকে অতিক্রম করে উল্লম্বভাবে উপরে উঠতে হয়। PSLV রকেটে প্রথম ধাপে কঠিন জ্বালানি ব্যবহার করা হয়। দ্বিতীয় ধাপে তরল জ্বালানি ব্যবহার করে রকেটটা ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার উপরে ওঠে এবং সেইসময় সর্বোচ্চ ১৪,০০০ কিমি/ঘন্টা পর্যন্ত গতি অর্জন করতে সক্ষম হয়। কিন্তু এই রকেটের গতিবেগ আরও বেশি হওয়া দরকার। পরবর্তী ধাপে এর অভিমুখ উল্লম্ব থেকে পুরোপুরি আনুভূমিক হয়ে যায়, গতিবেগ দরকার হয় ঘন্টায় প্রায় ২৮,০০০ কিলোমিটার। অর্থাৎ এই পর্যায়ে প্রচণ্ড উচ্চ ত্বরণের প্রয়োজন হয়। এই বিপুল গতিবেগ অর্জনের জন্যে রকেটটা কঠিন জ্বালানি ব্যবহার করে। সবশেষে সুনির্দিষ্ট কক্ষপথে পৌঁছয় চতুর্থ ধাপে।

তৃতীয় ধাপে কঠিন জ্বালানি জ্বালিয়ে গ্যাস উৎপন্ন হয়, যা কম্বাসশন চেম্বারে চাপ বাড়ায়। তখন সেই গ্যাসকে ছোট ছিদ্র দিয়ে বার করা হলে তীব্র শক্তিশালী ঊর্ধ্বমুখী ঘাত বা থ্রাস্ট তৈরি হয়, যা রকেটটাকে চালিত করে। সাধারণত কম্বাসশন চেম্বারে চাপ যত বাড়বে, ঊর্ধ্বমুখী ঘাত তত বৃদ্ধি পাবে। সেইসঙ্গে রকেটের ত্বরণও বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু কোনো কারণে যদি গ্যাস লিক করে, তখন চাপের মান হঠাৎ করে হ্রাস পেতে থাকে আর রকেট তার প্রয়োজনীয় বেগও ধরে রাখতে পারে না। মোদ্দাকথা, তৃতীয় ধাপ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে তার গতিপথ পুরোপুরি আনুভূমিক হওয়ায় উচ্চ গতিবেগ বজায় না রাখতে পারলে মহাকর্ষের টানে পৃথিবীতে এসে পড়বে। এই ঘটনাই ঘটেছিল ২০২৫ সালের PSLV C61 মিশনের ক্ষেত্রে।

গতবছরের মে মাসের C61 মিশনে EOS-09 ছিল মুখ্য পে লোড। এটা একটা ভারি রাডার-ইমেজিং স্যাটেলাইট, যা যে কোনো আবহাওয়ায় ভূপৃষ্ঠ পর্যবেক্ষণ এবং বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ে নজরদারির জন্য বানানো হয়েছিল। রকেটটা ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫২৯ কিলোমিটার উচ্চতায় সূর্য-সমকালীন পোলার অরবিটে স্থাপন করার কথা ছিল। উৎক্ষেপণের পর প্রথম দুটো পর্যায় স্বাভাবিকই ছিল। অসঙ্গতি ধরা পড়ে তৃতীয় পর্যায়ে। কঠিন জ্বালানি ব্যবহার করে একটা মোটর কাজ করছিল। সেইসময় মোটরের চেম্বারের চাপ হঠাৎ কমতে শুরু করে । ফলে রকেটকে তার নির্ধারিত কক্ষপথে পৌঁছনোর জন্য ইঞ্জিনটাকে প্রয়োজনীয় ঊর্ধ্বমুখী ঘাত বা থ্রাস্ট সরবরাহ করতে পারেনি। পরবর্তীকালে ওই মিশন বাতিল করতে বাধ্য হয় ইসরো।

সেই ঘটনার পরে ইসরো একটা বিশ্লেষণ কমিটি গঠন করে, যারা তৃতীয় পর্যায়ে ব্যবহৃত সলিড মোটর সিস্টেমের আবরণ ব্যবস্থার গঠনগত ত্রুটি খুঁজে পায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, একমাত্র রকেটের অগ্রভাগে হঠাৎ কোনো বিস্ফোরণ হলে বা এর আবরণ ভেঙে গেলেই এরকম তাৎক্ষণিক চাপ হ্রাসের সম্ভাবনা দেখা দেয়। তবে বিপর্যয় বিশ্লেষণ করে ঠিক কী পাওয়া গেল তা জনসমক্ষে আসেনি। কমিটি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে তার রিপোর্ট জমা দেয়। এই PSLV রকেট ইসরোর তুরুপের তাস, অনেক সফল অভিযানের সাক্ষী। মূলত বাণিজ্যিক সম্ভাবনা নষ্ট হতে পারে মনে করেই বোধহয় ওই রিপোর্ট প্রকাশ্যে আনা হয়নি।

এবারে শুরুতে সব ঠিকঠাক ছিল, কিন্তু উৎক্ষেপণের ৪ মিনিট ২৫ সেকেন্ড পরে তৃতীয় পর্যায়ে প্রবেশ করে PSLV C62 এবং পরবর্তী দু মিনিটের মধ্যেই নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ঘুরতে থাকে, যার পোশাকি নাম ‘রোল রেট ডিস্টার্বেন্স’। মূলত রকেটের অনুদৈর্ঘ্য অক্ষের চারপাশের ঘূর্ণন বিঘ্নিত হয়, ফলে তার গতিবিধি বিচ‍্যুত হয়।

আরো পড়ুন ভারতে বিজ্ঞানকে রক্ষা করা আজ কেবল পেশাগত কর্তব্য নয়

মহাকাশে সুনির্দিষ্ট কক্ষপথে পৌঁছবার জন্য ওই রকেটকে সুনির্দিষ্ট অভিযোজনে থাকতে হয়, ঘূর্ণনের কোনো গণ্ডগোল হলে দিকনির্দেশ করা সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। কারণ রকেটের আভ্যন্তরীণ ন্যাভিগেশন সিস্টেম দিকনির্ণয়ের জন্য মূলত জাইরোস্কোপগুলোর উপর নির্ভর করে। সেক্ষেত্রে রকেটের রোল রেট বেশি হলে, অর্থাৎ ঘূর্ণন অনিয়ন্ত্রিত হলে সেন্সরগুলো বিভ্রান্ত হয় এবং একসময় আর রকেটটাকে সঠিক অবস্থানে পরিচালিত করতে পারে না। এছাড়া, তৃতীয় পর্যায়ে, PS3 মোটর সাধারণত থ্রাস্ট সরবরাহ করে। তবে সমস্যা হল, এর নিজস্ব রোল কন্ট্রোল থ্রাস্টার নেই। একে নির্ভর করতে হয় PS4-এর ছোট থ্রাস্টারগুলোর উপর। এখন পর্যন্ত প্রাথমিক রিপোর্টে PSLV C62 রকেটে যে বিশৃঙ্খলার খবর পাওয়া গেছে তা অগ্রভাগের কোনো অংশ থেকে গ্যাস লিকের ইঙ্গিত দেয়। বিজ্ঞানীদের অনুমান, এর ফলে যে পরিমাণ টর্কের সৃষ্টি হয়েছে, তা সামাল দেওয়ার ক্ষমতা PS4-এর ছোট থ্রাস্টারগুলোর নেই। সে কারণে রকেট ইসরোর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। যদিও প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ সম্পন্ন হলে তবেই প্রকৃত কারণ জানা যাবে।

১৯৯৩ সালে যাত্রা শুরু করা PSLV রকেট এখন পর্যন্ত মোট চারখানা মিশনে সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। প্রথমবার ছাড়া, ২০১৭ সালে, PSLV C39 রকেটে তাপরোধক ব্যবস্থায় গণ্ডগোল ধরা পড়ে। তবে গত আট মাসে পরপর দুবার মহাকাশ অভিযান সফল না হওয়া ইসরোর জন্য বেশ অস্বস্তিকর। সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হল, প্রতিবারই তৃতীয় পর্যায়েই সমস‍্যা দেখা দিয়েছে। এর অন্তর্নিহিত কারণ যা-ই হোক না কেন, দুটো ব্যর্থতার মধ্যে কোথাও যেন একটা যোগসূত্র রয়েছে। আট মাস আগের PSLV C61 মিশন থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার মহাকাশ অভিযানে নামলে আর ব্যর্থতার মুখ দেখতে হত না বলে অনুমান করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.