ঊর্ণা
‘ফ্যাসিবাদের ১৪টি বৈশিষ্ট্য’ লিখতে গিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী লরেন্স ব্রিট দেখিয়েছেন ‘ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার ঘোর বিরোধী।’
কথাটা খুব ভুল বলেননি, অন্তত ইতিহাসের দিকে যদি তাকানো যায়।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
বিংশ শতকে যখন ইতালিতে ফ্যাসিবাদ আর জার্মানিতে নাজিবাদ ফুলে ফেঁপে উঠেছে, দুই দেশেই বিজ্ঞান গবেষণা ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল। দুই রাষ্ট্রের রাজনৈতিক আদর্শ ছিল উগ্র জাতীয়তাবাদ, যা প্রবলভাবে বৌদ্ধিক চর্চারও বিরোধী। স্বাভাবিকভাবেই সেখানে স্বাধীন বিজ্ঞানচর্চার পরিসর থাকা বিপজ্জনক। ফলে পরিকল্পনামাফিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরিকাঠামো দুমড়ে দেওয়া হল, দেশছাড়া হলেন বরেণ্য বিজ্ঞানীরা। সুস্থ জ্ঞানচর্চার দিন ফুরোল, শুরু হল রাজনৈতিক মতবাদের নগ্ন প্রচার।
ফ্যাসিবাদের চরিত্র বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ব্রিট এও দেখিয়েছেন, এই ব্যবস্থায় কর্পোরেট স্বার্থ ঠিক যতটা নিরাপদ, ঠিক ততটাই দমনপীড়নের মুখে পড়তে হয় শ্রমিকশ্রেণিকে – কর্তৃত্ববাদী রাজনীতি আর কেন্দ্রীভূত পুঁজির সার্থক মেলবন্ধন ঘটাতে এর চেয়ে আদর্শ ব্যবস্থা আর কিছু নেই।
বেসরকারিকরণ, নব্য উদারবাদ এবং সস্তা শ্রমিক নির্মাণের কল
ভারতে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার অবক্ষয়ের শুরু মোটামুটি ’৮০-’৯০-এর দশকে। যদিও, তার অনেক আগেই ‘সমাজতন্ত্র কেন?’ প্রবন্ধে এ বিপদের গভীরতা সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন স্বয়ং অ্যালবার্ট আইনস্টাইন। ‘পুঁজি দানবের কবলে পড়ে আমাদের গোটা শিক্ষাব্যবস্থারই বিপুল ক্ষতি হয়েছে,’ একথা তখনই জানিয়েছিলেন তিনি। সঙ্গে ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন ‘অসুস্থ প্রতিযোগিতামূলক মনোবৃত্তি ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে, এখন ভোগবাদী সাফল্যই তাদের কাছে সব।’ আজ এতবছর পরে, পুরো শিক্ষাজগৎই চলছে সেই নীতিতে। বিশ্বব্যাপী গবেষণার ক্ষেত্র জুড়ে ‘হয় গবেষণাপত্র প্রকাশ করো, নয়ত গবেষণার কাজ ছাড়ো’ সংস্কৃতির অসহ্য অনুশীলন। পুঁজিবাদের দুনিয়ায় সময়সাপেক্ষ, গভীর গবেষণার মূল্য নেই, তুলনায় ভুরি ভুরি গবেষণাপত্র প্রকাশ করলে তার বাজারি মূল্য অনেক বেশি।
আইনস্টাইনের সতর্কবাণী যে অমূলক ছিল না, তার প্রমাণ নব্য উদারবাদী ব্যবস্থায় ভারতীয় শিক্ষাক্ষেত্রের ঢালাও বেসরকারিকরণ। এদেশে সরকারি চাকরিতে সুযোগ যত কমেছে, ততই জনপ্রিয়তা বেড়েছে বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ আর কম্পিউটার কোর্সের। উচ্চশিক্ষার বিপুল খরচ জোগাতে মোটা অঙ্কের ব্যাংক ঋণ নিতেও দুবার ভাবেনি সচ্ছলতার প্রতিশ্রুতিতে বিভোর ছাত্রছাত্রীদের পরিবার। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সেই স্বচ্ছলতা তো আসেইনি, উলটে বেশিরভাগেরই বরাতে শেষপর্যন্ত জুটেছে বহুজাতিক সংস্থায় অপর্যাপ্ত বেতনের চাকরি। সেসব চাকরির অন্যতম শর্তই হল, বাড়তি পরিশ্রম করতে হবে।
এককথায়, যে শিক্ষাব্যবস্থা হতে পারত বৌদ্ধিক বিকাশের উর্বর ক্ষেত্র, তা ক্রমশ হয়ে উঠল সস্তা ও বাধ্য শ্রমিক তৈরির অব্যর্থ বন্দোবস্ত। ফলস্বরূপ উচ্চমেধা চালান হয়ে গেল বিদেশে আর জনকল্যাণের আদর্শ থেকে সরে এসে শিক্ষাব্যবস্থা হয়ে উঠল কর্পোরেট মুনাফা তৈরির হাতিয়ার।
হিন্দুরাষ্ট্র নির্মাণ – একটি সমান্তরাল প্রকল্প
এই অর্থনৈতিক পরিবর্তনের পাশাপাশিই চলছিল হিন্দুরাষ্ট্র নির্মাণের ঐতিহাসিক, দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প। ১৯২৫ সালে ভারতে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) প্রতিষ্ঠা হয়। অখণ্ড হিন্দুরাষ্ট্র প্রস্তাবনার অন্যতম প্রবক্তা, দ্বিতীয় সংঘ প্রধান এম এস গোলওয়ালকরের মত ছিল, এই নির্মাণ প্রক্রিয়া চলবে সুপরিকল্পিত এক ‘মানসিক বিপ্লব’-এর মধ্যে দিয়ে – মানুষের ভাবনাচিন্তা ও আচরণে এক ধীর, সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন আনবে এই বিপ্লব। পরবর্তী সময় জুড়ে এই নীতিতেই কাজ করেছে আরএসএস।
হিন্দুরাষ্ট্র নির্মাণের ব্যাপারে গোলওয়ালকর যা কল্পনা করেছিলেন, তা অনেকটা এরকম ‘মানুষের সামগ্রিক মনোবৃত্তি, চিন্তা পদ্ধতি ও আচরণের সম্পূর্ণ পরিবর্তন ঘটাতে হবে। প্রতিটি ব্যক্তির কাছে আলাদাভাবে পৌঁছতে হবে, একমাত্র সেক্ষেত্রেই সকলকে একটি জাতীয়তাবাদী জীবনচর্যার মধ্যে সংগঠিত করা সম্ভব।’ অর্থাৎ এ কল্পনা কেবল একটি রাজনৈতিক প্রকল্প ছিল না, বরং তা দাঁড়িয়েছিল গভীর তাত্ত্বিক বুনিয়াদের উপর, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে মানুষের প্রতিদিনের জীবনে, তার ভাবনায়, তার জ্ঞানপিপাসায়।
আরএসএসের বিপুল পৃষ্ঠপোষকতায় ২০১৪ সালে ক্ষমতায় এসেছিল বিজেপি। এই মুহূর্তে তৃতীয়বারের জন্য তারা ক্ষমতায়। দীর্ঘকাল লালিত হিন্দুরাষ্ট্র পরিকল্পনার বাস্তবায়ন চলছে, তার গতিও তীব্র। পাশাপাশি চলছে সরকারি পরিষেবার বেলাগাম বেসরকারিকরণ, নিয়ন্ত্রণ চলে যাচ্ছে কর্পোরেটের হাতে। স্বাভাবিকভাবেই এ সংকট থেকে শিক্ষার মত চিন্তা-আলোচনার মুক্ত পরিসরও রেহাই পাচ্ছে না।
‘জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০’ এবং ‘নতুন শ্রম বিধি’: একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ
২০২০ সালে প্রস্তাবিত জাতীয় শিক্ষানীতি আর নতুন শ্রম বিধি – এই দুই নীতির মূল বক্তব্যগুলো যদি পাশাপাশি রেখে পড়া যায়, দেখা যাবে দুয়েরই আদর্শগত ও অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য প্রায় এক। একদিকে জাতীয় শিক্ষানীতির আওতায় যথেচ্ছ বদল আনা হচ্ছে পাঠক্রমে। এতদিনের পরিচিত প্রামাণ্য ইতিহাসের আখ্যান বদলে যাচ্ছে; ধর্মনিরপেক্ষ, বিশ্লেষণাত্মক গবেষণার পরিসর প্রতিদিন সংকুচিত হচ্ছে, আর বৈজ্ঞানিক গবেষণার জায়গা নিচ্ছে পুরাণ-প্রভাবিত ভারতীয় জ্ঞান পরম্পরা (Indian Knowledge Systems) নামক আজব তত্ত্ব। উদ্দেশ্য একটাই – হিন্দুত্বের মহিমাকীর্তন। আরেকদিকে এই সুযোগেই দিব্যি ডালপালা মেলেছে শিক্ষার বেসরকারিকরণ। দিকে দিকে এখন ‘এডটেক’ সংস্থা, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের রমরমা; ওদিকে সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মন্দা। নতুন জাতীয় শিক্ষানীতিতে অনেক বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি পরিচালনা ও স্ব-অর্থায়ন পরিকাঠামোর দিকে। এই পরিস্থিতিতে বিপদে পড়ছে প্রথাগত স্কুল, কলেজগুলো। সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছেও নির্দেশ আসছে বেসরকারি বিনিয়োগে জোর দেওয়ার, অথবা বলা হচ্ছে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে। চূড়ান্ত শ্রেণিবৈষম্যই যে সমাজের বাস্তব, সেখানে এই ধরনের নির্দেশিকার ফলে অসাম্য যে আরও বাড়বে, সেকথা বলার অপেক্ষা রাখে না। এই পরিস্থিতিতে পর্যাপ্ত শিক্ষালাভের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষজন, এমনকি বিরাট অংশের মহিলাও। একচেটিয়া অধিকার থাকবে পুঁজিপতি শ্রেণির হাতে। এককথায়, উচ্চমানের শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ পাওয়া যাবে কিনা তা নির্ভর করবে মানুষের শ্রেণি পরিচয়, জাত পরিচয়, লিঙ্গ পরিচয় আর কিছুটা ভৌগোলিক অবস্থানের উপর।
শিক্ষা ও শ্রমের ব্যাপারে রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি কীভাবে বদলেছে, সাম্প্রতিক এই সংশোধনীগুলো থেকে তার একটা পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়। লক্ষণীয় বিষয় হল, ‘নমনীয়তা’, ‘আন্তঃবিভাগীয় শিক্ষা’ বা ‘দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা’-র উপর জোর দেওয়া হয়েছে বলে এই নব্য শিক্ষানীতিকে আপাতভাবে প্রগতিশীল মনে হতে পারে। কিন্তু খানিক তলিয়ে ভাবলেই বোঝা যাবে, এসব গালভরা শব্দগুচ্ছের আড়ালে আসলে এমন এক স্বল্পমেয়াদি, শিল্পকেন্দ্রিক প্রশিক্ষণের প্রমিত পরিকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে, যে পরিকাঠামোয় প্রকৃত শিক্ষার আদৌ কোনো জায়গা নেই, শিক্ষার্থীরাও বাধ্য শ্রমিক মাত্র।
পাশাপাশি নতুন শ্রম বিধির জোরে বৈধতা পেয়েছে অনিশ্চিত কর্মসংস্থান, দুর্বল হয়েছে সমষ্টিগত দর কষাকষি ব্যবস্থা। এছাড়া, দীর্ঘ লড়াইয়ে অর্জিত শ্রমিক সুরক্ষাও বিপদের মুখে। অর্থাৎ অর্থসংকটে দীর্ণ শ্রেণিকক্ষ থেকে নিয়ন্ত্রণহীন কর্মক্ষেত্র, সর্বত্রই এখন শোষণের এক অবিচ্ছিন্ন ধারা।
যেকথা আগেও বলেছি – এ দুইয়ের প্রভাবে শিক্ষা এখন জনকল্যাণের আদর্শ থেকে সরে এসেছে। বলা ভালো, সে আদর্শকে ভিতর থেকেই দুর্বল করে দেওয়া হয়েছে। সেই শিক্ষায় অর্জিত জ্ঞানও তাই কখনো হয়ে উঠছে বিক্রয়যোগ্য পণ্য, কখনো বা জাতীয়তাবাদী মননচর্চার হাতিয়ার।
চাপিয়ে দেওয়া ভাবাদর্শে বিপন্ন হচ্ছে গণিতচর্চার পরিবেশ
কিছুদিন আগে গণিত পাঠ্যক্রমের একটি খসড়া প্রকাশ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। যে বিকৃতি নিয়ে এত আলোচনা, এই খসড়াটি তার সার্থক উদাহরণ। প্রস্তাব অনুযায়ী, এই পাঠ্যক্রমে যুক্ত হচ্ছে ‘ভারতীয় গণিতের দর্শন’ নামে একটি কোর্স, যে কোর্সে প্রয়োজনীয় অ্যাকাডেমিক ক্রেডিটের জন্য ছাত্রছাত্রীদের বেদ, বেদাঙ্গ, পুরাণ, এমনকি ধনুর্বেদও পড়তে হবে। বিষয় হিসাবে গণিতকে বুঝতে গেলে গণিতশাস্ত্রের ইতিহাস বা দর্শন সম্পর্কে জানা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এখানে এই ধরনের কোর্স কাজ করবে সাংস্কৃতিক প্রচারযন্ত্র হিসাবে, যা কেবল ভিত্তিহীনই নয়, সুস্থ গবেষণা ও বিদ্যায়তনিক মুক্তচিন্তা অনুশীলনের পরিপন্থীও। ‘ধ্যানচর্চায় গণিত’ নামে আরেকটি কোর্সও যোগ করা হয়েছে, যেখানে ‘ধ্যান ও মননশীলতায় গাণিতিক ভাবনা ও পদ্ধতি’ সম্পর্কে পড়ানো হবে।
ইতিমধ্যেই বিশ্লেষণাত্মক জ্যামিতি (Analytical Geometry) ও বলবিদ্যার (Mechanics) মত প্রথাগত বিষয়ের উপর জোর দেওয়া শুরু হয়েছে, কিন্তু উপেক্ষিত হচ্ছে আধুনিক গণিতের তিনটি মৌলিক বিষয় – বাস্তব বিশ্লেষণ (Real Analysis), রৈখিক বীজগণিত (Linear Algebra) আর বিমূর্ত বীজগণিত (Abstract Algebra)। অথচ এই তিনটি বিষয় ছাড়া গণিত শিক্ষাই অসম্পূর্ণ। আদ্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ এই পাঠ্যক্রম নিয়ে একাধিক গণিতবিদ মুখ খুলেছেন। স্নাতক স্তরের গণিতের জন্য ইউজিসি প্রস্তাবিত লার্নিং আউটকামস কারিক্যুলাম ফ্রেমওয়ার্ক (এলওসিএফ)-এর খসড়াটি এবছরই কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সারা ভারতের নশোরও বেশি গণিতবিদ, গবেষক, শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীরা এই এলওসিএফ খসড়াটির বিরুদ্ধে একটি স্বাক্ষরিত আবেদনপত্র দাখিল করেছেন। পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে কেন্দ্রের তরফে একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেল গঠন করা হয়েছে, যদিও কেউই জানেন না এই বিশেষজ্ঞরা আসলে কারা।
পাঠ্যক্রমের এই বদল আদৌ কোনো পদ্ধতিগত ত্রুটি নয়, বরং সেখানে নিহিত আছে বৃহত্তর আদর্শগত নির্মাণের বীজ। ভারতে শিক্ষাব্যবস্থা এখন গড়ে তোলা হচ্ছে ‘প্রাচীন জ্ঞান’ নামক এক আজব ধারণাকে সামনে রেখে, যার না আছে কোনো ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, না সেখানে জায়গা পায় বিশ্লেষণাত্মক আলোচনা। এর ফল দাঁড়াবে এই – উচ্চশিক্ষা বা গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুতি থেকে বঞ্চিত হবে ছাত্রছাত্রীরা।
আমি যখন ২০০৯ সালে স্নাতক স্তরে অঙ্ক নিয়ে পড়াশোনা শুরু করি, তখন বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রীই সরকারি স্কুলে শিক্ষকতার কথা ভেবে পড়তে আসতেন (আজকের পশ্চিমবঙ্গে সেই পেশার কী হাল হয়েছে, সকলেরই জানা)। পরবর্তীকালে আমরা যারা বিজ্ঞান গবেষণার পথে এসেছি, তাদের সংখ্যা ছিল খুবই কম। আমি বেছে নিয়েছিলাম তাত্ত্বিক গণিত বা ‘থিওরেটিক্যাল ম্যাথমেটিক্স’। এই নতুন খসড়াটি ছাত্রছাত্রীদের কোনো উপকারেই লাগবে না। না তারা স্নাতকোত্তর স্তরের জন্য সঠিক প্রস্তুতির সুযোগ পাবে, না তৈরি হবে গবেষণা-উৎসুক মন। পাঠ্যক্রমটি যেভাবে সাজানো হয়েছে, তাতে শাসক দলের দুটি কর্মসূচির সঙ্গেই তা দিব্যি খাপ খেয়ে যায় – একদিকে যেমন তা হিন্দুত্ববাদী প্রকল্প নির্মাণের ভিত শক্ত করবে, অন্যদিকে নব্য শ্রম নীতি অনুযায়ী কর্পোরেটের জন্য তৈরি করে দেবে সস্তা শ্রমিকের বিরাট সংরক্ষিত বাহিনী।
বিজ্ঞান ও স্বাধীনতা – এক অবিচ্ছেদ্য জুড়ি
আজ আমরা যে সংকটের মুখোমুখি, তা কেবল শিক্ষানীতিতে আবদ্ধ নয়। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হল, এখানে বৈজ্ঞানিক মননের অপমৃত্যু ঘটছে। বিজ্ঞান স্বাধীনতা চায় – প্রশ্ন করার স্বাধীনতা, মতবিরোধের স্বাধীনতা, পরীক্ষানিরীক্ষার স্বাধীনতা, এমনকি ব্যর্থ হওয়ার স্বাধীনতাও। জ্ঞান যেখানে গোঁড়ামি আর বাজারি যুক্তির দাস হয়ে ওঠে, সেখানে বিজ্ঞানও হেরে যায়। গবেষণাগারগুলো হয়তো তারপরেও দাঁড়িয়ে থাকে, প্রাণহীন, অসাড়।
আরো পড়ুন নোলানের ওপেনহাইমার: সৃষ্টির আনন্দ ও অনুশোচনার ছবি
কেবলমাত্র একজন গণিতবিদ হিসাবে নয়, এই নিবন্ধ আমি লিখছি একজন সচেতন মানুষ হিসাবে, যে বিশ্বাস করে – সমাজের আসল শক্তি লুকিয়ে থাকে তার যুক্তিনিষ্ঠায়। কর্তৃত্ববাদী, বৌদ্ধিক চর্চাবিরোধী শক্তির হাতে বিজ্ঞানের আদর্শকে প্রতিদিন ভূলুণ্ঠিত হতে দেখে মনে পড়ে কিংবদন্তি গণিতবিদ, তাত্ত্বিক পদার্থবিদ ও বিজ্ঞান-দার্শনিক অঁরি পঁয়কারের সেই উক্তি। আজ থেকে একশো বছরেরও বেশি আগে, ১৯০৯ সালে, তিনি বলে গিয়েছিলেন
প্রাণিদের জন্য অক্সিজেন যেমন, তেমনই বিজ্ঞানচর্চার জন্য চাই স্বাধীনতা। স্বাধীনতা কেড়ে নিলে বিজ্ঞানের অবস্থা হয় অক্সিজেনের অভাবে দমবন্ধ হয়ে ছটফট করতে থাকা পাখিটির মত। এবং এই স্বাধীনতা হতে হবে সীমাহীন, কারণ তাকে যদি আমরা প্রয়োজনমত চাপিয়ে দিতে চাই, তবে শেষ অবধি যেটা দাঁড়াবে, সেটা অর্ধবিজ্ঞান, আর অর্ধবিজ্ঞান আর যাই হোক, বিজ্ঞান নয়। মতবাদ, রাজনৈতিক দল বা পূর্বনির্ধারিত ধারণা – কেবলমাত্র সত্য ছাড়া বিজ্ঞানের কারো কাছেই নিজেকে সমর্পণ করার কোনো দায় নেই। কারণ, বিজ্ঞানের কাছে সমর্পণ করার অর্থ একটাই, তার অস্তিত্বের সংকট।
দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি ভয়ে আর প্রলোভনের ফাঁদে পড়ে চুপ করে যায়, শ্রেণিকক্ষগুলো যদি হয়ে ওঠে কাল্পনিক পুরাণ আর বাজারি স্লোগানের প্রতিধ্বনি কক্ষ, সে দেশের মুক্তচিন্তা আর যুক্তিবাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। বিজ্ঞানকে রক্ষা করা তাই আজ আর কেবল পেশাগত কর্তব্য নয়। বরং তা নৈতিক কর্তব্য – আসলে স্বাধীনতা রক্ষারই লড়াই।
নিবন্ধকার তাত্ত্বিক গণিতবিদ্যার গবেষক। মতামত ব্যক্তিগত
গ্রাউন্ডজিরো ওয়েবসাইটে প্রকাশিত মূল প্রবন্ধের ভাষান্তর করেছেন সোহম দাস
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







