তীর ধনুক হাতে কিছু আদিবাসী কৃষক আর পাইপগান হাতে কিছু শহুরে ছাত্রের বিক্ষিপ্ত ‘অ্যাকশন’ দিয়ে শুরু হওয়া একটি আন্দোলন ধীরে ধীরে পরিণত হল ২২,০০০ আদিবাসী, দলিত, বুদ্ধিজীবী ছাত্র-যুবর আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত পুরোদস্তুর শৃঙ্খলাবদ্ধ লাল গেরিলা ফৌজে (দেশি অস্ত্র বা পুরনো অস্ত্রধারী অথবা নিরস্ত্র মিলিশিয়ার হিসাব না হয় বাদই দিলাম)। সেই আন্দোলনের মোকাবিলা করতে শুরুতে জমিদারের লেঠেল, গাদাবন্দুক, স্থানীয় থানার পুলিশ নামত। পরে নামল আধাসেনা, বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত কমান্ডো, উপগ্রহ, হেলিকপ্টার, ড্রোন।

গত কয়েক বছরে মাওবাদীদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি, গণহারে আত্মসমর্পণ, মৃত্যু, এমনকি ২০২৫ সালে পার্টির সাধারণ সম্পাদক বাসবরাজুর হত্যা স্পষ্টভাবেই একটি যুগের সমাপ্তি ঘোষণা করে। এর আগে দুজন নকশালপন্থী দলের সাধারণ সম্পাদক রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছিলেন – চারু মজুমদার আর সিপিআইএমএল লিবারেশনের সাধারণ সম্পাদক সুব্রত দত্ত, ওরফে জহর। কিন্তু ওঁদের সঙ্গে বাসবরাজুর তফাত আছে। চারু মজুমদার বা জহরের সময়ে পার্টি পরিচালিত ফৌজ এখনকার মাওবাদীদের পিএলজিএ-র মত প্রশিক্ষিত শৃঙ্খলাবদ্ধ সংগঠন ছিল না। আজকের মত গেরিলা যুদ্ধের অঞ্চলে বিস্তৃতি ছিল না। তার উপর বাসবরাজু শুধু পার্টির রাজনৈতিক সাংগঠনিক প্রধানই ছিলেন না, ছিলেন সর্বোচ্চ সামরিক কমিশন বা সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনের সর্বোচ্চ ব্যক্তি। সুতরাং চারু মজুমদার এবং জহরের তুলনায় অনেক বেশি ক্ষমতাশালী এবং সুরক্ষিত ব্যক্তি ছিলেন তিনি। ফলত রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে বাসবরাজুর মৃত্যুর অর্থ মাওবাদী পার্টির সব দিক দিয়ে সর্বোচ্চ স্থানে, সর্বোচ্চ ক্ষমতায় আঘাত।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

জোসেফ স্তালিন সহ বিভিন্ন বিশিষ্টজন ভারতের মাটিতে বিপ্লবের লাইন হিসাবে ঘাঁটি এলাকা, গেরিলা যুদ্ধের লাইনকে অবাস্তব বলেছিলেন। তাঁরা প্রতিকূলতাগুলোর বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছিলেন। সেসবকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে ৫৮ বছর এই আন্দোলনের টিকে থাকাই একপ্রকার আশ্চর্য বিষয়, বাস্তবতার বিরুদ্ধে মানুষের একগুঁয়ে জেদের জয়ের উদাহরণ। মাও সে তুং যে মার্কসবাদী যুদ্ধবিদ্যার জন্ম দিয়েছিলেন, তার সৃজনশীল প্রয়োগ ঘটিয়ে ক্ষুদ্র শক্তি নিয়েই সঠিক পরিকল্পনায় রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে নিজেদের শক্তি বাড়ায় মাওবাদীরা, ধীরে ধীরে ভারসাম্যে পরিবর্তন আনে। দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রীয় বাহিনীর মোকাবিলা করতে করতে নিজেদের যেমন উচ্চ স্তরে নিয়ে যায়, তেমনি রাষ্ট্রীয় দমনের তীব্রতাও বাড়ে। সেই দমনের মোকাবিলা করতে করতে মাওবাদীরা নিজেদের আরও উচ্চ স্তরে নিয়ে যায়। অবশেষে তাদের আরও উচ্চ স্তরে ওঠার ক্ষমতা শেষ হয়ে গেল। বাসবরাজুর মৃত্যুকে তারই প্রতীক বলে ধরা যায়।

খেয়াল করার মত ব্যাপার হল – নকশালপন্থী গেরিলারা নতুন কাজের এলাকা তৈরি করতে পারলেও, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর কাছে হাতছাড়া হওয়া এলাকা আবার দখল করতে পারেনি। এর একটা উদাহরণ খোদ পশ্চিমবঙ্গ। ২০১১ সালে অপারেশন গ্রীন হান্টের পর ঝাড়খণ্ডে মাওবাদীদের সমান্তরাল সরকার ব্যবস্থা ভেঙে যাওয়ার পর আর সেসব গড়ে তোলা যায়নি। এবারও ছত্তিসগড়ের বিস্তীর্ণ এলাকা রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে চলে যাওয়ার পর মাওবাদীরা সেগুলো ফের দখল করতে পারবে – এরকম মনে করার কোনো ভিত্তি নেই। এর কারণ যত না সামরিক তার থেকে অনেক বেশি আর্থসামাজিক।

মাও থেকে চে গুয়েভারা – গেরিলা যুদ্ধ বা গেরিলা ঘাঁটি এলাকা ছিল ভৌগোলিক দুর্গমতা নির্ভর। একটা পশ্চাৎপদ দেশে রাস্তা, ব্রিজ, প্রযুক্তির অভাব থাকে। দুর্গম অঞ্চলের শ্রম বাইরে যেতে পারে না, অন্যদিকে বাইরের পণ্য দুর্গমতা পেরিয়ে ভিতরে ঢুকতে পারে না। কোনো জাতীয় বাজার গড়ে ওঠে না। বিস্তীর্ণ অঞ্চল অর্থনৈতিক বা প্রশাসনিকভাবে বিচ্ছিন্ন থাকে। এর সুযোগ নিয়ে গেরিলারা আশ্রয় নেয় দুর্গম এলাকায়, যেখানে পুলিশ বা আধাসেনার ঢুকতে বুক কাঁপে। অর্থনৈতিকভাবেও স্থানীয় অর্থনীতির উপর ভর করে টিকে থাকা যায়।

তত্ত্ব ছিল, আধা সামন্ততান্ত্রিক-আধা ঔপনিবেশিক দেশে সামন্ততন্ত্র পুঁজি জমতে দেয় না, যেটুকু পুঁজি জমে তা সাম্রাজ্যবাদ তুলে নিয়ে চলে যায়। ফলত সাম্রাজ্যবাদ সামন্ততন্ত্রকে উচ্ছেদ না করলে এই দেশের বিকাশ সম্ভব নয়। ফলত এই রাষ্ট্রের কাছে রাস্তা, ব্রিজ ইত্যাদি গড়ার সম্পদ থাকবে না, দুর্গম অঞ্চল দুর্গমই রয়ে যাবে।

কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। পর্যাপ্ত রাস্তাঘাট তৈরি হওয়ায় বিপ্লবের প্রধান শক্তি তরুণ গ্রামীণ শ্রমিক পৌঁছে যাচ্ছে গ্রাম থেকে শহরে, এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে। প্রবাসী শ্রমিক হিসাবে কাজ করতে যাওয়া তরুণ যখন গ্রামে ফিরছে তখন বাড়িটাকে পাকা করছে, বাইক কিনছে, হাতে থাকছে স্মার্টফোন। রাস্তা নিজেই দোকান, টোটো, ট্রেকার, বাস ইত্যাদি ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে। আগে মাওবাদীদের পরিচালনায় যৌথ শ্রমে মোরামের রাস্তা বা পুকুরের উপর মানুষকে নির্ভর করতে হত। এখন সেই মাওবাদী উন্নয়ন নিতান্ত রান্নাবাটি খেলা ঠেকছে, মূলধারার সরকারি উন্নয়ন অনেক বেশি দ্রুত এবং যৌক্তিক হয়ে উঠছে। সেই রাস্তা ধরেই আগের চেয়ে অনেক দ্রুত পুলিশ বা আধাসামরিক বাহিনী ঢুকছে এলাকায়। হাতে হাতে মোবাইল ফোন যে কোনো সময়ে গেরিলা দলের নির্দিষ্ট লোকেশন পৌঁছে দিতে পারে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর কাছে। তাদের উপর মাওবাদীদের মানুষ দিয়ে নজরদারিতে কিন্তু আর কাজ হয় না, কারণ তার খবর পৌঁছতে সময় লাগে। এই বদলে যাওয়া পরিস্থিতিতে মাওবাদীদের রণনীতি বদলানো দরকার ছিল। মাওবাদীদের দখলে থাকা অঞ্চলগুলো থেকে যে বিপুল পরিমাণ প্রবাসী শ্রমিক গোটা দেশের বড় বড় শহরগুলোতে জমা হয়, তাদের নিয়ে অন্যরকম পরিকল্পনা করার ব্যাপক সুযোগ ছিল। কিন্তু মাওবাদীরা যা করল, তা হল গেরিলা দল বাঁচাতে তৈরি রাস্তা খুঁড়ে দেওয়া, মোবাইল টাওয়ার উড়িয়ে দেওয়া। স্মার্টফোন আজ কেবল মানুষের বিনোদন নয়। তার কাজ পাওয়ার মাধ্যম বা সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে। যে মাওবাদীরা অতীতে জনতার জীবনযাপনের মানোন্নয়ন করত, যা ছিল তাদের জনভিত্তির মূল কারণ, তারাই এখন হয়ে উঠেছে মানোন্নয়নের বাধা।

কার্ল মার্কস কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো বা ভারতে ব্রিটিশ শাসন সম্পর্কিত লেখাগুলোয় দেখিয়েছিলেন – কীভাবে ঔপনিবেশিক শক্তি দখল করা অঞ্চলের পুরনো পশ্চাৎপদ উৎপাদন কাঠামো ভেঙে পুঁজিবাদের বিস্তার ঘটায়। সুনীতি কুমার ঘোষ সমেত নকশালপন্থী তাত্ত্বিকরা নতুন তত্ত্ব হাজির করেছেন যে, সাম্রাজ্যবাদী অর্থনীতির হাত ধরে কোনো সামাজিক বিকাশ সম্ভব নয়। এই ফর্মুলা মানলে লগ্নি পুঁজির যুগে যে সামাজিক বিকাশ দেখতে পাবে, সে-ই ‘সাম্রাজ্যবাদের দালাল’ চিহ্নিত হয়ে যায়। ১৯২৮ সালে কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের বোঝাপড়ায় শিল্প পুঁজি আর মুৎসুদ্দি পুঁজি পৃথক করা হলেও, চীনের সঙ্গে মেলানোর জন্য নকশালপন্থী তাত্ত্বিকরা নতুন তত্ত্ব হাজির করলেন – ভারতের শিল্পপতিরা আসলে মুৎসুদ্দি। তাঁরা দাবি করলেন যে নয়া উদারবাদ ভারতে বর্ণবাদকে আরও শক্তিশালী করেছে। দলিতদের একেবারে লেখাপড়া করার অধিকার না থাকা, আর বঞ্চনার সম্মুখীন হতে হতেও পিএইচডি হয়ে যাওয়ার মধ্যে যে বিস্তর পার্থক্য আছে – তা তারা মানতে রাজি নয়। কারণ তাদের মতে, সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির অধীনে কোনো উন্নতি সম্ভব নয়। একই কারণে সমাজ বদলে যাচ্ছে দেখেও মাওবাদীরা স্বীকার করতে রাজি নয়, কারণ তাদের তত্ত্ব বলছে এই বদল অসম্ভব। বলা বাহুল্য, এই ভাবনার মধ্যে প্রবল সাম্রাজ্যবাদবিরোধী নৈতিকতা থাকলেও, মার্কস-লেনিন-স্তালিনের বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এই চিন্তা বহু দূরে। মার্কসের ভুল ধরতে গিয়ে এমন এক উদ্ভট তত্ত্ব খাড়া করেছে মাওবাদীরা, যা শুধু ভারতের অর্থনীতি রাজনীতি সংস্কৃতির দ্রুত বদলে যাওয়াই নয়, গোঁজামিল ছাড়া ভারতের বিদেশনীতি, মার্কিনি তদারকিতে দক্ষিণ কোরিয়ার উত্থান বা চীনের উত্থান – কোনোকিছুরই ব্যাখ্যা দিয়ে উঠতে পারে না।

মাওবাদী পার্টি কিন্তু ভারতের সেই অঞ্চলগুলোতেই সফল হয়েছিল, যে অঞ্চলগুলো তাদের তত্ত্বে কল্পিত পশ্চাৎপদ ভারতের সঙ্গে মেলে। বাকি ভারত তাদের তত্ত্বের সম্পূর্ণ বিপরীত। গত দশ বছরে রাস্তা নির্মাণ, বিদ্যুৎ ও মোবাইল টাওয়ারের বিস্তার – অর্থাৎ উৎপাদিকা শক্তির বিস্তার – তাদের কল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ভারতের এলাকা আরও ছোট করে দিয়েছে। ফলত তাদের আরও গুটিয়ে যেতে হয়েছে। সুতরাং প্রবল একগুঁয়েমির মাধ্যমে মাওবাদীরা জনযুদ্ধকে যে স্তরে পৌঁছে দিয়েছিল, তাকে আরও উচ্চ স্তরে নিয়ে যাওয়ার মত আর্থসামাজিক পরিস্থিতি নেই। এখন শুধুই রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সামরিক আধিপত্যের সময়, কারণ আর্থসামাজিক কাঠামো রাষ্ট্রীয় বাহিনীর অনুকূলে।

নকশালপন্থীদের একাংশের তরফে এই বিপর্যয়ের জন্য কিছু ব্যক্তির উপর দোষ চাপানোর প্রবণতা দেখা যায়, কিন্তু আদতে ব্যাপারটা সামাজিক পরিবর্তনের নিদর্শন। মাওবাদীরা একথা মানেনি, মানতে চায় না। জোর করে অঙ্ক মেলাতে তারা উদ্ভট থেকে উদ্ভটতর তত্ত্বের অবতারণা করে, যার ফলে তাদের কিছু নিজস্ব বৈশিষ্ট্য গড়ে উঠেছে। লেনিন ব্যাপক বিতর্ক চালিয়ে ভাঙাগড়ার মধ্যে দিয়ে পার্টিকে শক্তিশালী করে অবশেষে বিপ্লব সংগঠিত করেছিলেন। ভারতের লেনিনবাদীরা করেছেন ঠিক তার উলটো। বিতর্ক চালিয়ে নিজেদের শক্তিশালী করার বদলে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে শক্তি হারিয়েছেন, রাষ্ট্রের সঙ্গে দর কষাকষির ক্ষমতা হারিয়েছেন।

মাও সে তুংয়ের কৌশল ছিল পার্টির বৃত্তে থাকা মানুষকে সংগঠিত করা, দোদুল্যমান মানুষকে নিজেদের পক্ষে টেনে আনা, শত্রুপক্ষের বৃত্তে থাকা মানুষকে দোদুল্যমান করে দিয়ে শত্রুকে একঘরে করে দেওয়া। ভারতের মাওবাদীদের কার্যকলাপ ঠিক উলটো। এরা নিজেদের সমর্থকদের গালাগালি করে দোদুল্যমান করে দেয়, দোদুল্যমান ব্যক্তিদের গালাগালি করে শত্রু শিবিরে ঠেলে দেয়। এইভাবে শত্রুকে শক্তিশালী করে দিয়ে নিজেরা একঘরে হয়ে বসে থাকে।

আরো পড়ুন সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর: এক রোম্যান্টিক বিপ্লবী

পৃথিবীর যে কোনো দেশে একটা কমিউনিস্ট পার্টি বামপন্থী বিচ্যুতি, ডানপন্থী বিচ্যুতির মধ্যে দিয়ে দুলতে দুলতে এগোয়। কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে দেখা যায় একটু বেশি বামে ঝুঁকলে একবার পার্টি ভাঙে, একটু ডানে ঝুঁকলে আবার পার্টি ভাঙে। এইভাবে ভাঙতে ভাঙতে শক্তিক্ষয় করতে করতে পার্টি এগিয়ে চলে। ফলত পার্টির নীতিনির্ধারক নেতারা – বিশেষত যে পার্টি রাষ্ট্রীয় দমনপীড়নের শিকার হচ্ছে – তথ্যের ভিত্তিতে বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ করে উঠতে পারেন না। কারণ তাঁরা পার্টি ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কায় ভোগেন। পার্টি ভেঙে গেলে সরবরাহ নেটওয়ার্ক ভেঙে যাবে, নিজের কোন মতামতের জন্য কারা সংশোধনবাদী বা শত্রু বলে দেগে দেবে তার ঠিক নেই। যেহেতু বিপ্লবী গেরিলা যুদ্ধের লাইনকে প্রতিষ্ঠা করতে অতীতে বহুবার পার্টিতে ভাঙন ধরেছে, বন্ধুবিচ্ছেদ, এমনকি খুনোখুনিও হয়েছে, তাই তাত্ত্বিকভাবে নিজের আগের অবস্থান রক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। নতুন তথ্য বা যা ঘটছে চারিদিকে, হয় নেতা দেখতে চান না বা দেখলেও তাঁর উদ্দেশ্য হয় নতুন তথ্যের নিরিখে শেষমেশ পুরনো লাইনই যে সঠিক তা প্রমাণ করা। সামগ্রিকভাবে ভারতের সমাজকে বুঝে উঠতে পারার সমস্যাজনিত বিতর্কের ক্ষেত্রে সংসদীয় বাম দলগুলো যত নমনীয়, নকশালরা ততটাই ভঙ্গুর। বিতর্ক আর ভাঙন তাদের কাছে যেন সমার্থক।

মাওবাদী পার্টির প্রয়াত সাধারণ সম্পাদক বাসবরাজু মৃত্যুর আগেই শান্তি আলোচনার বা মূলধারায় ফেরার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু বিজেপি সরকার চায়নি যে মাওবাদী পার্টি তার দর কষাকষির ক্ষমতা সহ আত্মমর্যাদার সঙ্গে মূলধারায় আসুক। কারণ মাওবাদীরা গোটা ভারতে জনবিচ্ছিন্ন হলেও, জঙ্গলের আদিবাসীদের মধ্যে এখনো ব্যাপক গণজমায়েতের ক্ষমতা রাখে। সম্ভবত ভারতের মূলধারার যে কোনো দলের থেকে বেশিই রাখে। পার্টি নিজের সংগঠন এবং জনসমর্থন নিয়ে সসম্মানে প্রকাশ্য রাজনীতিতে এলে কর্পোরেট পুঁজির সমস্যা বেড়ে যাবে। তাই বিজেপি সরকার চেয়েছে মাওবাদীদের তছনছ করে দিয়ে, হাঁটু গেড়ে আত্মসমর্পণ করাতে। দেখা যাচ্ছে, সরকার অনেকখানি সফল। এক দল প্রাণ বাঁচাতে আত্মসমর্পণের পথ বেছে নিচ্ছে, অন্য দল আত্মহত্যার। যদি সঠিক সময়ে পার্টি সঠিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে সম্পূর্ণ দর কষাকষির ক্ষমতা সমেত সরকারের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসতে পারত, তাহলে হয়ত আত্মসমর্পণের অশ্লীল ছবি আর শিরোনামগুলো সংবাদমাধ্যমে দেখতে হত না। হয়ত জনগণের জন্য পার্টি কিছু আদায় করে নিতেও পারত এবং ভারতের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারত।

অবশ্য আত্মসমর্পণ করা কেন্দ্রীয় কমিটির নেতারা গত কয়েক দিন ধরে যা চলছে তাকে আত্মসমর্পণ বলে মানছেন না, তাঁরা একে আত্মগোপন করে থাকার রাজনীতি থেকে প্রকাশ্য রাজনীতিতে আসা এবং সশস্ত্র আন্দোলন থেকে নিরস্ত্র আন্দোলনে আসা বলছেন। তাঁদের দাবির মধ্যে আছে গণসংগঠনগুলোর উপর থেকে বিধিনিষেধ প্রত্যাহার, খনিজ সম্পদের উপর আদিবাসীদের ২৬% অংশীদারিত্ব। সরকারের থেকে নাকি এসব ব্যাপারে সদর্থক আশ্বাস পাওয়া গেছে। কিন্তু আমাদের ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে, সম্পূর্ণ অস্ত্র ত্যাগ করার পর সরকার আদৌ কথা রাখবে, নাকি নিরস্ত্র প্রাক্তন গেরিলারা, যাঁরা বৃহৎ বুর্জোয়াদের কাছে বা মাফিয়ারাজের কাছে মতাদর্শগতভাবে আত্মসমর্পন করবে না, তাঁদের হত্যার পথ নেবে – তা নিয়ে আশঙ্কা থেকেই যায়। বিপ্লব একটা ঐতিহাসিক নিয়ম, এইভাবে না হলেও অন্যভাবে হবে। নেপালের মাওবাদীরা – নেত্রচাঁদ বা মোহন বৈদ্য গ্রুপ – হিমালয় অঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক বিস্তারের বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে গেরিলা যুদ্ধের বিকল্প কর্মপন্থা হাজির করেছেন। ভারতে সেরকম কিছু হয়, নাকি আত্মসমর্পণ বা আত্মহত্যার পথই পড়ে থাকে – সেটাই এখন দেখার।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.