আট-নয়ের দশকে পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চের কাজ আমরা অনেক দেখেছি। বিভিন্ন সভা-সমিতি, অভিযান, সচেতনতা শিবির, প্রদর্শনী ইত্যাদি। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের বাইরে একটি বিজ্ঞান বিষয়ক সংগঠনের সম্মেলন প্রত্যক্ষ করার অভিজ্ঞতা হল – বিজ্ঞান ভারতীর জাতীয় কনভেনশন। সাধারণ প্রতিনিধি ছাড়াও সেখানে দেশের তাবড় তাবড় শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। পশ্চিমবঙ্গ থেকেও একটি দল যোগ দিয়েছিল। আমরা যেখানে আরএসএস প্রচারক থেকে বিজেপি নেতায় উন্নীত হওয়া দিলীপ ঘোষের ‘গরুর দুধে সোনা’ নিয়ে মস্করায় ব্যস্ত, সেখানে আরএসএসের ভাবধারায় দীক্ষিত বিজ্ঞান ভারতীর কর্তা বা সাধারণ সদস্যরা ‘ভারতীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে প্রাকৃতিক ও আধ্যাত্মিক বিজ্ঞানের এবং স্বদেশী বিজ্ঞানের মেলবন্ধন’ করতে ব্যস্ত। সেখানে দিলীপ ঘোষ নেই, ছিলেন দেশের বিভিন্ন বিজ্ঞান বিষয়ক সংস্থার উচ্চপদস্থ বিজ্ঞানী, অধ্যাপক, গবেষকরা। আমি নিশ্চিত এই বাংলার ৮০%-৯০% মানুষের কোনো ধারণাই নেই বিজ্ঞান ভারতী এবং তাদের কাজকর্ম সম্পর্কে।

আরও মজার ব্যাপার হল, আমার কয়েকজন পরিচিত সেই বিজ্ঞান সম্মেলনে উপস্থিত কয়েকটি মুখ দেখে খুব উত্তেজিত হয়ে পড়লেন। তাঁদের নিজেদের মধ্যে আলোচনার অংশবিশেষ শুনে জানলাম – ওঁরা কেউ কেউ ছাত্রজীবনে অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের সক্রিয় সদস্য ছিলেন। কেউ আবার আরএসএস পরিচালিত শাখার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ওঁদের আমি বেশ কিছুদিন ধরে চিনি। কিন্তু আরএসএসের সঙ্গে যুক্ত অতীত সম্পর্কে আমার কোনো ধারণাই ছিল না। সেদিন তাঁরা কয়েকজন প্রবীণ প্রচারককে দেখে আহ্লাদে আটখানা। কয়েকজন একদা সতীর্থকেও প্রতিনিধি দলের ভিড়ে পেয়ে গেলেন।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

আর একটি সংস্থা সম্পর্কে বলি। যদিও বা বিজ্ঞান ভারতী সম্পর্কে কেউ কেউ শুনে থাকেন, এই সংস্থাটির ব্যাপারে বিশেষ কেউ শুনেছেন বলে মনে হয় না – সংকল্প। কী সংকল্প হয় সেখানে? দেশের জন্য আমলা তৈরির সংকল্প নেওয়া হয়। এটি হল আরএসএস ভাবধারায় গঠিত সিভিল সার্ভিস (আইএএস সমেত) পরীক্ষার জন্য কোচিং সেন্টার। আটের দশক থেকে এই কোচিং সেন্টার শয়ে শয়ে ‘সিভিল সার্ভেন্ট’ বা সরকারি অফিসার তৈরি করেছে। এই কোচিং সেন্টারগুলোতে পড়াশোনা করে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বহু শিক্ষার্থী সরকারের বিভিন্ন উচ্চ পদে কাজ করছেন।

এই লেখার গৌরচন্দ্রিকায় আরও দুটি উদাহরণ দিতে চাই – বনবাসী কল্যাণ আশ্রম, বিদ্যা ভারতী স্কুল। এই দুটি সংস্থা থেকে কতজন উপকৃত হয়েছেন একবার ভাবুন। এগুলো আরএসএস ভাবধারাতেই চলে এবং তাদের ধ্যানধারণাই শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়। যদি ধরেও নিই সবাই সেই ভাবধারায় চলেন না, অধিকাংশের মধ্যেই যে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব থেকে যায় তা কিন্তু অস্বীকার করার উপায় নেই।

এ তো কয়েকটি মাত্র সংগঠনের নাম। সরাসরি আরএসএস চালিত এরকম বহু সংগঠন দেশজুড়ে অবিরাম কাজ করে চলেছে। তাদের যাত্রা কিন্তু ২০১৪ সালে শুরু হয়নি। মূল সংগঠন আরএসএসের ১০০ বছর পূর্ণ হল। তারাও কিন্তু ২০২৯ সালে নরেন্দ্র মোদী বা বিজেপি সাধারণ নির্বাচনে হেরে গেলে থেমে যাবে না। কারণ এদের যাত্রাপথের আট দশকের বেশি সময় এদেরই ভাবধারায় গড়ে ওঠা ভারতীয় জনতা পার্টি কেন্দ্রে ক্ষমতায় ছিল না, একটা বড় সময় কোনো রাজ্যেও ক্ষমতায় ছিল না।

আরএসএস সংগঠন হিসাবে কত বড় সেকথা ভাবলে চলবে না। একবার ভাবুন, তাদের এই যাত্রাপথে কতজন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের ভাবধারায় লালিত পালিত হয়েছেন। এই যে সংকল্প বলে সংস্থাটির কথা উল্লেখ করলাম, সেই সংস্থা থেকে যাঁরা কোচিং নিয়ে আজ বিভিন্ন দফতরের আমলা হয়েছেন, তাঁদের সংখ্যাই একবার ভেবে দেখুন।

সুতরাং আরএসএস মানে শুধুমাত্র মোহন ভাগবত, নরেন্দ্র মোদী বা অমিত শাহকে বা অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ – এরকম ভাবলে চলবে না। হাজার হাজার আরএসএস ভাবধারায় দীক্ষিত মানুষ আমাদের মধ্যেই মিশে রয়েছে। তাদের আমরা খালি চোখে দেখতেও পাই না। যেমন সাংবাদিকদের মধ্যে, বা তৃণমূল কংগ্রেসের মধ্যে কে কে আরএসএস শাখায় যেত বা শিবিরে সক্রিয় যোগদান করেছে – তা বোঝাও মুশকিল। হঠাৎ করেই তাঁরা জেগে উঠে তাঁদের জন্য নির্দিষ্ট কাজ শুরু করে দেন বা দেবেন।

আরএসএস ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দিয়েছিল কিনা, বিনায়ক দামোদর সাভারকর ব্রিটিশ শাসকদের কাছে আত্মসমর্পণ করে নিজের মুক্তি নিশ্চিত করেছিলেন কিনা, গান্ধী হত্যাকারী নাথুরাম গডসে সত্যিই স্বয়ংসেবক ছিলেন কিনা (পরিবারের দাবি তিনি আরএসএসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন), বিজেপি ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র বলে ঘোষণা করবে কিনা – এইসব বিতর্কের আড়ালে একটি সংগঠন কিন্তু ভারতীয় সমাজে ফল্গুধারার মত বয়ে চলেছে আর জল সিঞ্চন করে চলেছে লক্ষ লক্ষ ভারতীয় জনগণের মনে।

এই হল সংঘের কৌশল – মনের মধ্যে ঢুকে যাওয়া। সে অর্থে সংঘের সদস্যপদ নেওয়া বা দেওয়ার রেওয়াজ নেই। খাকি হাফপ্যান্ট (আজকাল ফুলপ্যান্ট) আর সাদা জামা পরে আপনি লাঠি হাতে স্বয়ংসেবক হোন বা না হোন, আপনার মনের মধ্যে সংঘের বার্তা দাগ কাটলেই হল। সময় মত সংঘের বার্তাকে আপনার সঠিক বার্তা মনে হলেই কেল্লা ফতে। দেশে বহু মানুষ এমন আছেন, যাঁরা নরেন্দ্র মোদীকে ঘোর অপছন্দ করলেও বিজেপিকেই ভোট দেন, কারণ তিনি কোনো না কোনো সময়ে সংঘের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং বিজেপিকে ভোট দেওয়া কর্তব্য বলে মনে করেন। আবার অনেকে আছেন, যাঁরা সংঘের ভাবধারায় আকৃষ্ট হয়েও হয়ত বিজেপিকে ভোট দেন না। এই দুইয়ের কোনোটাতেই সংঘের কিচ্ছুটি এসে যায় না। কারণ তাঁরা সমাজের প্রত্যেকটি মানুষের মনে বাসা বাঁধতে চান।

ছোটবেলায় যখন রাজনীতি বুঝতাম না, সংঘ কী তাও জানতাম না, সেইসময় এক পরিচিত ভদ্রলোক আমাদের বাড়িতে আসতেন। তিনি রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ ভাবধারায় গঠিত একটি সংগঠন ছেড়ে এই পশ্চিমবঙ্গেই আটের দশকে আরএসএসে যোগ দিয়েছিলেন। তিনি হঠাৎ করে তীব্র রামকৃষ্ণ মিশন-বিরোধী হয়ে গেলেন। আমার বাবা, মা, দিদিকে বোঝাতেন মুসলমানরা কীভাবে পশ্চিমবঙ্গকে দখল করে নিতে চলেছে। তিনি মনে করতেন – এই রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ করে কিছু হবে না। বেলুড় মঠই যদি একদিন দখল হয়ে যায়! রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘই একমাত্র পশ্চিমবঙ্গকে বাঁচাতে পারে। তখন বিজেপি এ রাজ্যে ছিলই না বলা যায়। ফলে তিনি বিজেপিকে ভোট দেওয়ার কথা বলতে পারেননি, কিন্তু পরবর্তীকালের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, স্বয়ংসেবকরা কেউ সরাসরি বিজেপিকে ভোট দেওয়ার কথা বলেনও না। তাঁরা গৃহস্থের রান্নাঘর পর্যন্ত চলে গিয়ে শুধু দেশের ঐতিহ্য এবং বিপদ নিয়ে সাধারণ কথাবার্তা বলে চলে আসেন।

আরএসএসের বিপদ নিয়ে যাঁরা নিত্যদিন কথা বলেন, তাঁরা বুঝতেই পারেন না, সংঘ কোনদিক থেকে তাঁদের মাথাতেই ঢুকে বসে আছে বা পাশের বাড়ির লোকটির মনে আশ্রয় নিয়েছে। ২০১৪ সালের আগে সচরাচর সংঘের নেতৃত্ব সংবাদমাধ্যমের সামনে খোলামেলা আলোচনায় আসতে চাইতেন না। বিজেপির সঙ্গে তাঁদের কোনো সম্পর্ক নেই – এই ছিল ঘোষিত অবস্থান। অথচ কেন্দ্রীয়ভাবে শুধু নয়, বিজেপির প্রত্যেকটি রাজ্য কমিটির সংগঠনের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকটি কিন্তু সরাসরি আরএসএস দ্বারা নিযুক্ত। মোদী বা দিলীপের মত অনেককেই আরএসএসের তরফে বিজেপিতে কাজ করতে পাঠানো হয়েছে এবং হয়।

ইনিয়ে বিনিয়ে যা-ই বলা হোক, আরএসএসের দুই বড় শত্রু এ দেশের মুসলমানরা এবং কমিউনিস্টরা। আরেকটু খুলে বললে – বামপন্থীরা। আপনি যতই ‘সংঘ ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেনি’ বলে চিৎকার করুন, মনুবাদী বলে তাদের আক্রমণ করুন, সংঘের তাতে বয়েই গেল। যদিও কেউ কেউ স্বাধীনতা সংগ্রামে কেশব বলিরাম হেড়গেওয়ার ও সংঘের স্বয়ংসেবকদের যোগদানের কথা বলেন, কিন্তু স্বাধীনতা সংগ্রামের থেকেও ভারতীয় ঐতিহ্যের অনুসারী দেশ গঠনেই বেশি আগ্রহী ছিলেন মাধব সদাশিবরাও গোলওয়ালকর- হেড়গেওয়াররা।

ব্রিটিশদের ২০০ বছরের শাসনকে তাঁরা ভারতীয় ইতিহাস বলে মনেই করেননি। গোলওয়ালকরের ধারণা ছিল, স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় থেকে এদেশের মুসলিমদের অনেক ছাড় দেওয়া হয়েছে, সেটাই কাল হয়েছে। আর এই ব্রিটিশ শাসনের হাত ধরেই দেশে মুক্ত বিদেশি চিন্তার প্রবেশ, বাইরে থেকে ধার করে আনা শ্রেণিযুদ্ধের কাঠামোতে তৈরি মার্কসবাদ ভারতীয় সংস্কৃতির পরিপন্থী। সংখ্যালঘু মুসলমান ও বামমনস্কদের হিন্দুরাষ্ট্রের ধারণা-বৃত্তের মধ্যে নিয়ে আসাই সংঘের লক্ষ্য। যাঁরা এখনো এই ভেবে বসে আছেন যে সংবিধান সংশোধন করে ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র ঘোষণা করা হবে – তাঁরা মূর্খের স্বর্গে বাস করছেন। বর্তমান সরসংঘচালক ভাগবত তো গতবছরেই ঘোষণা করে দিয়েছেন যে ভারতকে আলাদা করে হিন্দুরাষ্ট্র ঘোষণা করার দরকার নেই। কারণ ভারত হিন্দুরাষ্ট্রই। ব্যাপারটা এইরকম যে, এ দেশে যাঁরা থাকবেন, তাঁরা হিন্দুই।

আমাদের সংবিধান যে বিদেশি ভাবনায় তৈরি, তা নিয়ে আরএসএসের মনে কোনো সংশয় নেই। সংঘচালকরা এবং প্রচারকরা মনে করেন যে, হিন্দু সভ্যতাই এদেশে শেষ কথা। হিন্দু সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদই সমস্ত ভারতবাসীকে এক সূত্রে বাঁধতে পারে বলে তাঁদের বিশ্বাস। বহু সংস্কৃতি, বহু ভাষা, বহু জাতির দেশে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদকে হাতিয়ার করে তাঁরা অসাধ্য সাধনে ব্রতী হয়েছেন। নাগপুরের ব্রাহ্মণদের আধিপত্যে যে সংগঠন বেড়ে উঠেছে, তাদের কার্যকলাপে যে উচ্চবর্ণের দাপট দেখা গেছে, তাকে এখন একটু মাজা ঘষা করতে হচ্ছে ঠিকই। কিন্তু দেশের আদিবাসী থেকে শুরু করে প্রান্তিক মানুষকেও আরএসএস হিন্দুত্বের সূত্রেই বাঁধতে চাইছে। তাই যখন আদিবাসীরা সারনা ধর্মের স্বীকৃতির জন্য লড়াই করেন, তখন আরএসএস-প্রশিক্ষিতরা বলার চেষ্টা করেন – এটি আসলে সনাতন ধর্মের কথাই হচ্ছে। সারনা তখন সনাতনের অপভ্রংশ হয়ে যায়।

আরো পড়ুন চর্চার অভাবের সুযোগে রবীন্দ্রনাথ আরএসএস হেফাজতে

দলিতদের প্রতি সংঘের মনোভাব নিয়ে বিতর্ক হোক বা গোমাংস নিয়ে মুসলমানদের উপর আক্রমণের ঘটনা হোক আর গরু পাচারের অভিযোগে হত্যার ঘটনাই হোক, অথবা অসীমানন্দের বা বিশ্ব হিন্দু পরিষদের মত আগ্রাসী হিন্দুত্বের কর্মসূচীই হোক – সবকিছুতেই যে আরএসএস সরাসরি যুক্ত বা তারা সরাসরি বক্তব্য রাখছে তা নয়। কিন্তু হিন্দু সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের ধ্বজা যতক্ষণ উড়ছে, ততক্ষণ বুঝতে হবে সবকিছু সংঘের এজেন্ডা অনুযায়ী সঠিক পথেই এগোচ্ছে।

আপাতত সরকারে এসে বিজেপি যে সংঘের রাজনৈতিক এজেন্ডা পূরণের কাজেই ব্যস্ত তা আলাদা করে বলার দরকার পড়ে না। রামমন্দির এখন অতীত। এখন ‘এক ভারত শ্রেষ্ঠ ভারত’ তৈরির কাজে ব্যস্ত বিজেপি। ভারতের বহুত্ববাদ, সংবিধান, বৈচিত্র্য – সব দূর করে দিয়ে সবাইকে দিয়ে ‘ভারতমাতা কি জয়’ বলাতে পারলেই সংঘের তৃপ্তি। রাহুল গান্ধী থেকে শুরু করে মমতা ব্যানার্জি, সাবেক অরবিন্দ কেজরিওয়াল – সবাইকে মন্দিরে মন্দিরে দৌড় তো করিয়েছে বিজেপি। এতেই সংঘের তৃপ্তি। পশ্চিমবঙ্গের রাস্তা থেকে মমতার হিজাব পরা পোস্টার যে উঠে গিয়েছে – তাতেই সংঘের তৃপ্তি। সিপিএম নেতৃত্ব যে শ্রেণিসংগ্রামের পাশাপাশি জাতপাতের কথাও ভাবছেন – তাতেই সংঘের তৃপ্তি। মেকলের শিক্ষাব্যবস্থাকে বিদায় জানিয়ে যে সারা দেশের জন্য ‘ইন্ডিয়ান নলেজ সিস্টেম’ অনুযায়ী একটি জাতীয় শিক্ষানীতি তৈরি করা হয়েছে – তাতেই সংঘের তৃপ্তি।

তবে বিজেপি হোক বা আরএসএস – এই বহুধাবিভক্ত, বৈচিত্র্যময় ভারতকে এক লাইনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া মোটেই সহজ নয়। সেকথা বুঝেও যাঁরা এই শক্তিকে সত্যিই প্রতিহত করতে পারতেন, সেই বাম দলগুলি কিন্তু আরএসএস আগ্রাসন রুখতে সম্পূর্ণে ব্যর্থ। জওহরলাল নেহরুর রাজনীতি, ভারতীয় সংবিধান, শিক্ষাব্যবস্থা, ‘শহুরে নকশাল’-দের ব্যাপারই হোক, রোমিলা থাপারের ইতিহাস বইয়ের বিষয়ই হোক, কেরালায় সিপিএম নেতৃত্বাধীন বাম সরকারের বিরোধিতাই হোক, জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় বা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় হোক বা রাহুলের রাজনীতি – সবরকম বাম ধারণাকেই উৎখাত করতে চায় আরএসএস। শুধুমাত্র মুসলমানদের হিন্দুত্বের বলয়ে নিয়ে আসাই একমাত্র লক্ষ্য নয় সংঘের। অথচ বামেরা এই বড় লড়াইকে নির্বাচনী লড়াইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলায় সংঘের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধে নামতে পারেনি। কিন্তু আদর্শভিত্তিক, ক্যাডারভিত্তিক সংগঠন একমাত্র তাঁদেরই মূল শক্তি ছিল। ভারতের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটকে মাথায় রেখে নয়া উদারবাদী পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে কোনো শক্তিশালী বিকল্প বামেরা দাঁড় করাতে পারেনি। একই সঙ্গে দেশের অন্য সমাজবাদী দলগুলি হয় জাতপাতের আড়ালে চলে গেছে অথবা (কংগ্রেস সহ) মুসলমান তোষণের দায়ে অভিযুক্ত হয়েছে। ফলে দক্ষিণপন্থী রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। বাম আদর্শ ও বাম মানসিকতায় বেড়ে ওঠা রাজনীতি বা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের যত খাটো করা গেছে, তত দক্ষিণপন্থী রাজনীতির রমরমা হয়েছে। কিন্তু গত দশ বছরে বিজেপি-আরএসএসের বিকল্প কোনো সামাজিক-রাজনৈতিক ভাষ্য দাগ কাটতে পারেনি। বিরোধী রাজনৈতিক ও সামাজিক ভাষ্য তৈরির কাজ যতটুকু হচ্ছে, তা অত্যন্ত সীমিত এবং সংঘের সমালোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

রাহুল খানিকটা হলেও আরএসএস রাজনীতির মূল সূত্র ধরতে পেরেছেন। তাই দলীয় পতাকার বাইরে ভারত জোড়ো যাত্রা করেছেন, সংবিধান বাঁচাও, জাতিশুমারি ইত্যাদির কথা বলেছেন। যদিও সেখানে রাহুলের নিজের ভাবমূর্তি তৈরি করার বিষয়টিও সম্পৃক্ত ছিল। আমরা অনেক সময়েই নির্বাচনী রাজনীতিতে রাহুলের আগ্রহ নেই বলে সমালোচনা করে থাকি। কিন্তু একথা ঠিক যে, সংঘের বিপরীত বয়ান তৈরি করার জন্য তিনি যে আন্দোলন তৈরি করার চেষ্টা করছেন তেমনটিই প্রয়োজন তৃণমূল স্তর থেকে। কিন্তু রাহুলের দুর্ভাগ্য – তাঁর হাতে তেমন আন্দোলন করার সংগঠন বা পরিকাঠামো নেই।

সম্প্রতি কংগ্রেসশাসিত কর্ণাটকে আরএসএসের কাজকর্ম নিষিদ্ধ করা নিয়ে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। সেখানকার মন্ত্রী এবং কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গের ছেলে প্রিয়াঙ্কা খড়্গে জোর গলায় আরএসএসের বিরুদ্ধে এবং তার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা তুলেছেন। ইতিমধ্যেই এক পঞ্চায়েত ডেভেলপমেন্ট অফিসারকে আরএসএসের রুট মার্চে অংশগ্রহণ করায় সাসপেন্ডও করা হয়েছে

কিন্তু আরএসএসের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে বা আরএসএসকে নিষিদ্ধ করে তার ভাবধারাকে রোখা যাবে না। যে দেশের রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন এবং সারা দেশের অধিকাংশ রাজভবনে সংঘের ভাবধারায় পরিচালিত ব্যক্তিত্বরা বাস করছেন, কেন্দ্রের অধিকাংশ এবং বিজেপিপরিচালিত রাজ্যগুলির মন্ত্রীরা সংঘের ভাবধারায় লালিত পালিত হয়েছেন, সেখানে এই সংগঠনকে কোনো একটি বা দুটি রাজ্যে নিষিদ্ধ করে দিলেও কোনো লাভ হবে না। আবার অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের দিকে তাকিয়ে দেশের তরুণ-তরুণীরা কখন মত পালটে সরকার বদলে দেবেন – সেই আশায় বসে থাকলেও কাজের কাজ হবে না।

যাঁরা ভাবছেন মমতা বিজেপিকে পশ্চিমবঙ্গে রুখে দিয়ে বিকল্প তৈরি করছেন, তাঁরাও মূর্খের স্বর্গেই বাস করছেন। দক্ষিণে জগন্নাথ মন্দির, আর উত্তরে মহাকাল মন্দির (পরিকল্পনা স্তরে) কার দান? ভেবে দেখুন।

পুনশ্চ: মজা করে বলা হয়ে থাকে, সাধারণত একটি রাজনৈতিক দল বা তার আদর্শের প্রত্যক্ষ প্রভাব ৮০ থেকে ৯০ বছর পর্যন্ত সক্রিয় থাকে। ১৮৮৫ সালের প্রতিষ্ঠিত কংগ্রেসের পতন শুরু হয় ১৯৮০-র দশকের শেষ থেকে। ১৯২০-র দশকে প্রতিষ্ঠিত হয় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি। বহুধাবিভক্ত কমিউনিস্ট দলগুলো এই দেশের মূলধারার রাজনীতিতে ২০০৯-১০ সাল পর্যন্ত প্রত্যক্ষ প্রভাব ধরে রাখতে পেরেছিল। আরএসএসের তো ১০০ বছর হয়েই গেল, ১৯৮৪ সালে তৈরি হওয়া বিজেপির ক্ষেত্রে এই তত্ত্ব খাটে কিনা তা দেখতে হবে।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.