১৯২৭। বছর পঁচিশেকের এক কমিউনিস্ট সংগঠক, বাঙালি তরুণ, গোপন একটি রাজনৈতিক মিশনে ইউরোপের উদ্দেশে পাড়ি দিচ্ছেন জাহাজে চড়ে, সাগর পেরিয়ে। দেশে থাকলে তাঁর গ্রেফতারি নিশ্চিত। নির্ভরযোগ্য সূত্রে আসন্ন গ্রেফতারির খবরটি পেয়ে দলের সহকর্মীরা এ সুযোগ ছাড়তে নারাজ। তাকে সোভিয়েত রাশিয়ায় পাঠাতে পারলে যেন এক ঢিলে যেন অনেক পাখি! গ্রেফতারিও এড়ানো যাবে, আবার দলের জন্যে বিরাট কার্যসিদ্ধির সম্ভাবনা! পারলে এ-ই পারতে পারে সেই দুরূহ কাজ। অবশেষে জুন মাসে  প্যারিস, বার্লিন হয়ে সেই তরুণ পৌঁছলেন মস্কো। নেমে পড়লেন তাঁর কাজে, দলের দায়িত্ব পালনে। ইতিমধ্যে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদ্যগঠিত প্রথম কেন্দ্রীয় কর্মসমিতির সদস্য হয়েছেন এই তরুণ, সঙ্গে মুজফফর আহমদ, এস এ ডাঙ্গে, এস ভি ঘাটে, শওকত ওসমানির মতো কজন।

তা সেই মিশনের বিষয়গুলো কী? কমিন্টার্নের কাছ থেকে ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজেন্টস পার্টির স্বীকৃতি আদায়, ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনে আর্থিক ও অন্যান্য সহায়তার ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে পরিচিত হয়ে কাজ করা, সেইসঙ্গে কমিন্টার্নকে ভারতের প্রকৃত অবস্থা জানানো। উল্লেখ্য, তখন ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজেন্টস্ পার্টির নামেই কমিউনিস্টদের কাজকর্ম চলত। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে এই মঞ্চের বিস্তার ঘটেছিল, যেমন পঞ্জাবে এর নাম ছিল ‘কিরতি কিসান পার্টি’। সরাসরি কমিউনিস্ট পার্টির নামে কাজ করা ছিল যেন রাজদ্রোহের শামিল! মিশনের ছিল আরও একটি লক্ষ্য : ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে কমিন্টার্নের সরাসরি সংযোগ; সিপিজিবির মাধ্যমে নয়।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

তরুণটি কিন্তু এই মিশনের প্রতিটি লক্ষ্যেই পুরোপুরি সফল হয়েছিলেন। দলের সঙ্গে কমিন্টার্নের সরাসরি সংযোগ হল। এর আগে ভারতের মানবেন্দ্রনাথ রায় ছিলেন যোগসূত্র, তাঁর কথাই কমিন্টার্নে গ্রাহ্য হত। এই মিশনের সফলতায় ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলন যেন নতুন দিকনির্দেশ পেল!

এরপর এসে পড়ল কমিন্টার্নের ষষ্ঠ বিশ্ব কংগ্রেস। জুলাই, ১৯২৮ সালের মাঝামাঝি থেকে মাসাধিককাল, মস্কোয়। হাজির ৫৭টি দেশের প্রতিনিধি। ইতিমধ্যেই দায়িত্বপূর্ণ কাজের মধ্য দিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন তৃতীয় আন্তর্জাতিকের পরিচিত মুখ। রুশ ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেছেন। এই কংগ্রেসে ভারতের অন্যতম প্রতিনিধি হয়ে যোগ দিলেন— পূর্ণ ক্ষমতাসম্পন্ন প্রতিনিধি, ভোট দেওয়ার অধিকার-সহ।

তরুণটির পরিচয়: সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৯০১–৭৪)।

রবীন্দ্রনাথের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার নিয়ে যিনি জন্মেছিলেন, জোড়াসাঁকোর এসথেটিক দুর্গে ফাটল ধরিয়ে যিনি রাজনীতির পথে নেমেছিলেন, নিকোলাই বুখারিনের কাছে যাঁর রাজনৈতিক দর্শনের পাঠ, বিপ্লবী সাহিত্য নিয়ে যে-তরুণের প্রাগ্রসর মতামত ম্যাক্সিম গর্কি মেনে নিয়েছিলেন, যিনি নিপুণ যুক্তিপ্রয়োগে টলিয়ে দিয়েছিলেন গান্ধীবাদের প্রতি রম্যাঁ রলাঁ-র অখণ্ড আস্থা, অঁদ্রে জিদ-পল ভালেরি-অঁদ্রে মালরো’র মতো অগ্রণী চিন্তানায়কেরা যাঁর সঙ্গে চিন্তাবিনিময় করেছেন, আলবার্ট আইনস্টাইনের সঙ্গে জিওনিজমের বিরোধিতায় যিনি তর্ক জুড়তে পিছপা হননি, আধুনিক সিনেমার প্রবাদপুরুষ আইসেনস্টাইন এবং আধুনিক থিয়েটারের দিশারি মায়ারহোল্ড-এর সান্নিধ্যে যিনি পেয়েছিলেন বিপ্লবী সংস্কৃতির রূপরেখা, ফ্যাসিজিমের বিরুদ্ধে দুনিয়াজোড়া লড়াইয়ে অঁরি বারবুস ভারতবর্ষের যে-তরুণের ওপর আস্থা রেখেছিলেন— ভারতের সাম্যবাদী আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ সেই সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মবার্ষিকীতে আজ ৮ অক্টোবর এই স্মরণলেখ।

ভারতে কমিউনিস্ট শক্তির উত্থান ও প্রতিষ্ঠায় সৌম্যেন্দ্রনাথের অবদান অপরিসীম। দুর্ভাগ্য, এ দেশে কমিউনিস্ট আন্দোলনের দলনিরপেক্ষ প্রকৃত ইতিহাস পাওয়াটা দুষ্কর। দলীয় স্বার্থ বজায় রেখেই অধিকাংশ বিবরণ। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। মীরাট ষড়যন্ত্র মামলা। রাশিয়া থেকে জার্মানিতে এসে সৌম্যেন্দ্রনাথ তখন দেশে ফেরার তোড়জোড় করছেন, এমন সময়ে ধরপাকড়ের খবর এল। দেশে ফেরা স্থগিত রাখলেন। সরকারি কৌঁসুলি লংফোর্ড জেমসের দীর্ঘ বক্তৃতা দিয়ে মীরাট ষড়যন্ত্র মামলা শুরু হয়েছিল। সে বক্তৃতায় সৌম্যেন্দ্রনাথকে ‘সাংঘাতিক কমিউনিস্ট’ বলা হয়। আরও বলা হয়, যে, মানবেন্দ্রনাথ রায় ও তিনি, এই দু’জন-ই ‘নাটের গুরু’, এরাই থার্ড ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে ভারতের যোগাযোগ রাখার কাজ করছেন।

মীরাট নিয়ে বিস্তর লেখালিখি হয়েছে, কিন্তু সেসবে এই দুজনের উল্লেখ পাওয়াটা আজ অসম্ভবই বলা চলে। এমন নমুনা বহু আছে। দলীয় স্বার্থবাহী ইতিহাস রচনায় এঁদের ভূমিকা অস্বীকৃত তো বটেই, নামোল্লেখও থাকে না।

সোভিয়েত রাশিয়ায় তাঁর নিজের অভিজ্ঞতায় দেখা স্তালিন প্রশাসনের ক্ষমতাপরায়ণ ও মানবতাবিরোধী রূপটি তিনি কখনোই মেনে নিতে পারেননি। তিনিই প্রথম ‘স্তালিনবাদ’ শব্দটি প্রয়োগ করেন। তৃতীয় আন্তর্জাতিকে তাঁর সহকর্মীরা-ই যুদ্ধোত্তর কালে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কমিউনিস্ট পার্টির হাল ধরেছিলেন। নিজস্ব বিচারবোধ ও যুক্তিকে প্রশ্রয় না দিয়ে তিনিও যদি ক্ষমতার স্রোতে গা ভাসাতেন, তবে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব অন্য রকম হত, এতে সন্দেহ নেই। তবে স্তালিনের তীক্ষ্ণ সমালোচনা করলেও মনে হয়েছে, তা আদতে সেই আমলের ক্ষমতাপরায়ণ ও মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধেই। কখনোই তাকে সামগ্রিক ভাবে সোভিয়েত-বিরোধী বলা যায় না। স্তালিন আমলেরই ভূমিসংস্কার কর্মসূচির উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। তবে সে-ই তিরিশের দশকে স্তালিন জমানা-র যে-মূল্যায়ন তিনি করেছিলেন, পরবর্তী কালে তা সঠিক প্রমাণিত হয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের শাসনব্যবস্থা নিয়েও সৌম্যেন্দ্রনাথের পর্যবেক্ষণ ছিল বিস্ময়কর! কিন্তু রাজনৈতিক বিরোধিতায়, বলতে লজ্জা হয়, তাঁকে জড়িয়ে এক ‘মজাদার’ মিথ্যা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল— স্তালিনের নামে কুকুর পোষার ‘মোক্ষম’ এক গুজব। এবং তা কিন্তু এখানকার বাম মহল থেকেই করা হয়েছিল।

এমনিতেই আমাদের দেশে ইতিহাসের উপাদান সংরক্ষণের কাজটি খুবই দুর্বল।  তার ওপর বিভিন্ন স্মৃতিকথা দলীয় স্বার্থে ভরপুর। এ দেশে সোশালিস্ট-কমিউনিস্ট আন্দোলনের পূর্ণাঙ্গ ও দলনিরপেক্ষ ইতিহাস রচনা আজও হয়নি।

তাঁকে আজ আমরা প্রায় ভুলে গেছি। অথচ ভোলার তো কথা নয়! সংসদীয় ব্যবস্থায় উনি ঢুকতে পারেননি বলে? নির্বাচনে বারবার পরাজিত হয়েছেন। বিপ্লব প্রক্রিয়ায় নিরন্তর ডুবে থাকা এই মানুষটির মধ্যে সংসদীয় নির্বাচনে পরাজয় কখনোই কোনও ছাপ ফেলতে পারেনি। স্রোতের বিরুদ্ধেই যেন ছিল তাঁর অভিযান। ১৯৩৪ সাল— যখন কমিউনিস্ট দুনিয়ায় স্তালিনের অবিসংবাদী নিয়ন্ত্রণ, সেই সময়ে স্তালিনবাদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে বিকল্প এক কমিউনিস্ট দল গঠন করার মধ্যেই এর নমুনা মেলে। তাঁর আত্মপরিচয় : “আমি লোকটা জাতে রোম্যান্টিক।” এই রোম্যান্টিক সত্তা নিয়েই তিনি চলেছেন, সঙ্গে ছিল যুক্তিবাদী মন। নিজেই বলেছেন, “…আমি কিছুতেই ওই সকলের মতটাকেই একমাত্র মত বলে গ্রহণ করতে পারলুম না। অর্থাৎ আমার কাছে কোনও কালেই ‘সংখ্যা-অপদেবতা’ আমার জীবনের দেবতা হতে পারেনি। যে-দিকে বেশি লোক সেই দিকেই সত্য— এই কুসংস্কার আমি গ্রহণ করতে পারিনি। আমি নিজের পথ কেটে চলেছি। বহু লাঞ্ছনা, বহু নিগ্রহ দেশবাসীর হাত থেকে হয়েছে। বহু মিথ্যা ভাষণ, বহু নানা রকমের কথা শুনেছি। আমাকে তা ভিতর থেকে স্পর্শ করেনি, একেবারেই করেনি।” তাঁর প্রখর ব্যক্তিত্ব এবং অসাধারণ মননশীলতায় ঢেকে গেছেন তাঁর মূল্যবান সহকর্মীরা, সতীর্থ নেতৃবর্গ, যাঁরা অন্য যে-কোনও কমিউনিস্ট দলেরই সম্পদ হতে পারতেন।

বিভিন্ন ফ্রন্টে— ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক আন্দোলনে তাঁর দলের স্মরণীয় অবদান রয়েছে। চটকল, পোর্ট, ডক, ব্যাঙ্ক, বার্মা শেল, বাটা প্রভৃতি নানা শিল্পক্ষেত্রের ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে তুলতে সৌম্যেন্দ্রনাথ ছিলেন পুরোধা। আবার অবিভক্ত বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে কৃষক সংগঠনেও তিনি নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। আবার ছাত্রসমাজেও তাঁর প্রভাব ছিল প্রবল। একদা বাটানগরে তাঁর পরিচালনায় শ্রমিকদের দীর্ঘ সংগ্রামী ধর্মঘট চলাকালীন তাঁর আহ্বানে কলকাতায় ছাত্রসমাজ বাটার দোকানগুলিতে একনাগাড়ে পিকেটিং  চালিয়েছিল। কিন্তু সব ফ্রন্টেই মস্কো-অনুমোদিত কমিউনিস্টদের সঙ্গে ভেদরেখা তৈরি হয়ে যায়। এই মতানৈক্য, দলীয় ছায়াপাতের ফলে শ্রমিক-কৃষক বা ছাত্র, সব আন্দোলনই দুর্বল হয়েছে। বঙ্গীয় প্রাদেশিক কৃষক সমিতি (BPKC) ছেড়ে সৌম্যেন্দ্রনাথকে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কৃষক সভা (BPKS) গড়ে তুলতে হয়। এ ভাবেই দলীয় স্বার্থে ব্যবহৃত হয়ে, বহুধাবিভক্ত হতে-হতে সব ফ্রন্টেরই অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেছে। এমনকী স্বাধীনতার পর উদ্বাস্তু-পুনর্বাসন আন্দোলনেও সেই একই বিভাজন।

১৯৪৮ সালে নিজের দল ভেঙে গেল মতাদর্শের ভিত্তিতে। দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ পান্নালাল দাশগুপ্তের পরিকল্পনায় আঞ্চলিক ক্ষমতাদখলের জন্য সশস্ত্র সংগ্রামের পথে চলে গেছিল। সৌম্যেন্দ্রনাথ সেদিন সেই কর্মসূচিকে ‘খোকামি রোগ’ (infantile disorder) আখ্যা দিয়ে স্পষ্ট বলেছিলেন যে তখনকার ভারতবর্ষে বিপ্লবের স্বপক্ষে objectively বহু উপাদান থাকলেও সারা দেশব্যাপী রাজনৈতিক সমাজসচেতন বলিষ্ঠ সংগঠন তৈরি নেই অর্থাৎ subjectively কোনও প্রস্তুতি নেই, এমত পরিস্থিতিতে সশস্ত্র বিপ্লবের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হতে বাধ্য। হল-ও তা-ই। দেড় দিনের মধ্যে সব শেষ। কিন্তু দলের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল।

অনেক অঞ্চলেই কমিউনিস্ট কার্যক্রমের সূচনা শুরু হয়েছিল কমিউনিস্ট লিগের (আরসিপিআই-এর পূর্বতন নাম) মাধ্যমে। যেমন অবিভক্ত বাংলার মুর্শিদাবাদ জেলায়। যেমন আসামে। শাসকপক্ষ যাঁর রাজনৈতিক পরিচয় মুছে দিয়ে ’কলাগুরু’ হিসেবে চিহ্নিত করে দিয়েছে, আসামের সেই বর্ণময় ব্যক্তিত্ব বিষ্ণুপ্রসাদ রাভা-কে দলে এনেছিলেন সৌম্যেন্দ্রনাথ। বহু বিশিষ্ট ব্যক্তির রাজনৈতিক দীক্ষা হয়েছিল সৌম্যেন্দ্রনাথের হাতে। প্রমোদ সেনগুপ্ত, মণিকুন্তলা সেন প্রমুখ দীর্ঘ সে তালিকা। সম্প্রতিকালে জানা যাচ্ছে, নৌ-বিদ্রোহে আরসিপিআই-এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ‘আইএনএস তলওয়ার’ জাহাজ থেকে গোলা ছুড়ে বিদ্রোহের সূচনা হয়েছিল। গোলাটি ছুড়েছিলেন বিন্ধ্যা সিং, তিনি ছিলেন আরসিপিআই-এর কর্মী। পান্নালাল দাশগুপ্ত তাঁকে দলে এনেছিলেন। সুন্দরবন অঞ্চলে হ্যামিল্টন সাহেবের ও অন্যান্য জমিদারির শোষণের বিরুদ্ধে তাঁর দলের দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলন আজও অনেকে স্মরণ করেন।

নিজের জীবনে বহু সামাজিক বিদ্রোহে ব্রতী হয়েছেন। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে প্রথম পৈতে নিতে অস্বীকার করেন। বাড়িতে বোমা তৈরির কারখানা করেন, তখন অবশ্য বিপ্লবী আন্দোলনে যুক্ত। সারারাত সঙ্গীদের সঙ্গে বোমা বাঁধছেন, আবার দিবাভাগে রবীন্দ্রনাথের কাছে যাচ্ছেন গানের মহড়ায়! একমাত্র কমিউনিস্ট নেতা যিনি পূর্বজীবনে গান্ধীজির প্রভাব এবং দেশের গণজাগরণে গান্ধীজির অবদান মুক্ত কণ্ঠে স্বীকার করেছেন। শ্রমিক-কৃষক দলের সাহায্যার্থে সৌম্যেন্দ্রনাথ-আয়োজিত অনুষ্ঠানে এ-ই প্রথম প্রকাশ্য মঞ্চে ‘ভদ্র পরিবারে’র কোনও মেয়ে নৃত্যে অংশ নিলেন। (এরও কিছুদিন পর ‘নটীর পূজা’য় রবীন্দ্রনাথ মেয়েদের যুক্ত করেন)। এ ছাড়াও, তিনিই প্রথম কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোর বাংলা অনুবাদক। মূল সুর অক্ষুণ্ণ রেখে ‘ইন্টারন্যাশনাল’ গানটির প্রথম বাংলা রূপান্তরও ওঁর।

জার্মানিতে থাকাকালীন বিপ্লবী কমিউনিস্ট রাজনীতির কেন্দ্রে পৌঁছেছিলেন সৌম্যেন্দ্রনাথ। প্রকাশ্যে তখন নাৎসিবাদের বিরুদ্ধে প্রচার করছেন! ইতালিতে থাকালীন ফ্যাসিস্টদের মানসিক কাঠামোটি খুব কাছ থেকে দেখে লিখলেন ‘ফ্যাসিজম’ বইটি। বাংলায় লিখিত ও প্রকাশিত প্রথম ফ্যাসিবিরোধী বই। ১৯৩৩-এ কয়েক মাস প্যারিসে থাকাকালীন জড়িয়ে পড়েছিলেন আন্তর্জাতিক ফ্যাসিবিরোধী আন্দোলনে।

আরো পড়ুন চে শুধু একটি রোম্যান্টিক বিপ্লবী চরিত্র নন

সামাজিক আন্দোলনে তিনি জড়িত থাকতেন নিরন্তর। তাঁর উদ্যোগে গড়ে উঠেছিল বহু গ্রন্থাগার, হয়তো সংখ্যায় তা হাজারেরও বেশি। বহু স্কুল, উচ্চশিক্ষা-প্রতিষ্ঠান স্থাপনেও ওঁর সক্রিয় উদ্যোগ কাজ করেছে। সমবায় আন্দোলন নিয়ে নিজে অসম্ভব উৎসাহী, বিশেষ করে কৃষি-সমবায়ে। ব্যক্তিগত ভাবে বিভিন্ন গ্রামে জমি কিনে কৃষি-সমবায়, কৃষি-কমিউন গড়ার চেষ্টা চালিয়েছেন। উদ্বাস্তু-পুনর্বাসনের  সমাধানে তিনি আন্দামানের কথা বলেছিলেন। কারণ বাংলার সঙ্গে সেখানকার জলহাওয়ার সাদৃশ্য, তাই কৃষিকাজে সুবিধা হবে, আর পুনর্বাসনের কাজটা অনেজ সহজ হবে। বাঙালিপ্রধান অঞ্চল হয়ে উঠলে বাংলারই লাভ। তখন এই প্রস্তাবকে ব্যঙ্গ করে বলা হয়েছিল ‘দ্বীপান্তর’। সিপিআই উদ্বাস্তুদের বলেছিল ‘কালাপানি’ পার না হতে। কালক্রমে দেখা গেল, সৌম্যেন্দ্রনাথ ছিলেন অভ্রান্ত। যারা ওখানে গেলেন, ধীরে-ধীরে তাদের সমৃদ্ধি ঘটে। ১৯৬৮-তে সৌম্যেন্দ্রনাথ আন্দামানে গেলে তাঁকে বিপুল সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল। সত্তরের দশকের গোড়ায় বাংলায় হিংসাত্মক রাজনীতির মোকাবিলায় লাগামছাড়া পুলিশি সন্ত্রাস শুরু হয়, পাড়ায়-পাড়ায় ছেলেদের তুলে নিয়ে গিয়ে বিনা বিচারে আটকে রেখে অত্যাচার ও হত্যার অভিযোগ ওঠে। সৌম্যেন্দ্রনাথ বিচলিত হয়ে ওঠেন। জার্মানিতে থাকতে সে-ই ১৯৩০-এ লিগ ফর ডিফেন্স অব হিউম্যান রাইটস্-এর বিশ্ব-সম্মেলনে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় ও তিনি। এখানকার সাধারণ মানুষের মানবাধিকার রক্ষায় সংগঠন গড়ার প্রয়োজন বোধ করলেন। সমমনস্ক কয়েকজনের সঙ্গে উদ্যোগ নিলেন। পরপর ক’টি বৈঠক হল। কিন্তু সেখানে মতান্তর। সৌম্যেন্দ্রনাথ দৃঢ় ভাবে ব্যক্তিহত্যায় অভিযুক্তের পাশে দাঁড়াতে নারাজ। ফলে ওনাকে বাদ দিয়েই গড়ে উঠেছিল মানবাধিকার সংগঠন এপিডিআর।

সৌম্যেন্দ্রনাথের মতো বহুকৌণিক ব্যক্তিত্বকে নিয়ে আরও বহু কিছু বলার থেকে যায়। এটি তাঁর কোনও মূল্যায়ন নয়, তাঁকে স্মরণ মাত্র। তাঁর রাজনৈতিক লেখালিখি, তাঁর লেখা বিভিন্ন বইয়ের কথা, তাঁর নেতৃত্বে বহু আন্দোলন, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর বন্ধন, রবীন্দ্রচর্চায় তাঁর অবদান, সাংস্কৃতিক জগতে তাঁর অধিনেতৃত্ব, প্রভৃতি। কিন্তু এই পরিসরে তা সম্ভব নয়। কিন্তু সৌম্যেন ঠাকুরকে স্মরণ কেন? নীতিতে অবিচল এক আদর্শনিষ্ঠ, আত্মস্বার্থবিহীন অধিনেতা, শুধু রাজনৈতিক নয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক অনেক ক্ষেত্রেই। বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর সংস্পর্শে থাকা বহু মানুষ জীবনে সেই শুদ্ধতার মন্ত্র, সেই নির্লোভতার সুরকে নিজেদের জীবনে বেঁধে নিয়েছেন। দারিদ্র্যে ডুবে থাকা তাঁর একাধিক রাজনৈতিক সহকর্মী হাসিমুখে স্বাধীনতা-সংগ্রামীর পেন্সন প্রত্যাখ্যান করেছেন। (দেশের কাজের বিনিময়ে মাসোহারা)!

প্রজন্মান্তরে এই শিক্ষা, চেতনা বহমান থাকুক, সে যতই সীমিত সংখ্যায় হোক!

মতামত ব্যক্তিগত

2 মন্তব্য

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.