জাতভিত্তিক আক্রমণের পাল্লার বাইরে রইলেন না সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি বি আর গাওয়াইও। খোদ এজলাসে তাঁকে লক্ষ্য করে জুতো ছোড়েন আইনজীবী রাকেশ কিশোর। মধ্যপ্রদেশের খাজুরাহো মন্দিরে ভেঙে যাওয়া বিষ্ণুমূর্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠার আবেদন জানিয়ে একটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের করা হয়েছিল। বিচারপতি গাওয়াই সেই মামলা খারিজ করতে গিয়ে যে মন্তব্য করেন, তার প্রতিবাদেই রাকেশের জুতো। এজলাসেই তিনি স্লোগান দেন ‘সনাতন ধর্ম কা অপমান নেহি সহেগা হিন্দুস্তান।’ গত ৬ অক্টোবরের সেই ঘটনার পরে রাকেশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে বার অ্যাসোসিয়েশন। বিচারপতি গাওয়াই অবশ্য বিশেষ প্রতিক্রিয়া দেখাননি, লোকটির বিরুদ্ধে আইন ব্যবস্থা নেওয়ার দিকেও যাননি।
সনাতন ধর্ম রক্ষার নামে দেশের প্রধান বিচারপতিকে আক্রমণ করা অবশ্যই অশনি সংকেত। তিনি দলিত সম্প্রদায়ের মানুষ। সাম্প্রতিককালে তাঁর বিভিন্ন রায়ে হিন্দুত্ববাদীরা সন্তুষ্ট নয়। একজন দলিত বিচারপতির রায় মনঃপূত না হলে এমন ক্রোধ প্রকাশ সাম্প্রতিক ভারতে খুব একটা অস্বাভাবিক নয়। সরকার এবং সনাতনীদের সঙ্গে কোনো ব্যক্তি বা সংস্থা একমত না হলে রক্ষে নেই। সেটা দেশদ্রোহিতা বলেই গণ্য হয়। প্রধান বিচারপতির মত মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্বে থাকলেও একজন দলিত, মনুবাদী তাণ্ডবের হাত থেকে নিরাপদ নন। আজকের ভারতে অন্য ধর্মের নারীকে ধর্ষণ করলে ধর্ষককে মালা দিয়ে বরণ করা হয়, অথবা ধর্ষকদের সমর্থনে মিছিল হয়। রাকেশকে প্রকাশ্যে কেউ সমর্থন না করলেও, অনেক অন্ধ সনাতনীর কাছে যে তিনি নায়ক হয়ে গেছেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
গত ৭ অক্টোবর হরিয়ানার আইপিএস অফিসার ওয়াই পূরণ কুমার আত্মহত্যা করেন। তিনি সুইসাইড নোটে লিখে যান যে, দলিত বলে তাঁকে বারবার অবিচার, মানসিক হেনস্থার শিকার হতে হয়েছে। তিনি পুলিশের ডি জি শত্রুজিৎ সিংহ কাপুর, রোহতক জেলার এস পি নরেন্দ্র বিজরনিয়া সহ বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ পুলিশ অফিসারকে এরজন্য দায়ী করেন। তাঁর স্ত্রী একজন আইএএস অফিসার। আত্মহত্যার তদন্ত ঠিকমত হচ্ছে না বলে তিনি অভিযোগ করেছেন।
অত উঁচু পদে থাকা দলিতরাই যখন নিরাপদ নন, তখন সাধারণদের দুরবস্থা সহজেই অনুমেয়। সংবাদমাধ্যমে ছোট করে হলেও প্রায়শই তফসিলি জাতি, উপজাতিদের উপর অত্যাচারের খবর পাওয়া যায়। তাঁদের ঘোড়ায় চেপে বিয়ে করতে যাওয়া, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা – সবেতেই যেন অলিখিত নিষেধাজ্ঞা অমৃতকালের ভারতে বহাল। তথাকথিত উচ্চবর্ণের কেউ অপমানিত বোধ করলেই আর রক্ষে নেই। সালিশি সভা ডেকে ‘অপরাধী’ দলিতকে শাস্তি না দেওয়া পর্যন্ত সমাজপতিরা শান্তি পায় না। মধ্যপ্রদেশে একজন দলিত গাড়ির চালককে তিনজন মিলে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে মারধোর করার পর জোর করে মূত্রপান করায়। আক্রান্ত যুবক ওই তিনজনের মধ্যে একজনের গাড়ির চালক ছিলেন। সেই কাজ ছেড়ে দেওয়াই তাঁর অপরাধ। শীতলা মাতার মন্দির অপবিত্র করেছেন – এই অভিযোগ এনে উত্তরপ্রদেশে এক দলিত বৃদ্ধকে মারধোর করা হয়।
মধ্যপ্রদেশে একজন উচ্চবর্ণের যুবক নিষেধাজ্ঞা অগ্রাহ্য করে মদ বেচছিলেন। ধরা পড়ায় তাঁকে জরিমানা করার পাশাপাশি প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ানো হয়। একজন দলিত এই খবর সমাজমাধ্যমে প্রচার করতেই ‘উচ্চবর্ণের মর্যাদা’ আহত হয়। সালিশি সভার বিচারে সেই দলিত যুবককে জরিমানা করা হয় এবং তাঁকে সেই মদ বিক্রেতার পা ধোয়া জল খেতে বাধ্য করা হয়। লক্ষণীয়, মদ বেচলে সালিশি সভা ডেকে অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া যায়। কিন্তু তা একজন দলিত প্রচার করলেই উঁচু জাত অপমানিত বোধ করে। তার বিচারও হয় সালিশি সভায়; প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা কোনো কিছুর পরোয়া না করে। অক্টোবর মাসেই দেশের নানা প্রান্তে ঘটে যাওয়া এসব ঘটনা প্রচারমাধ্যমে স্থান পেয়েছে।
২ অক্টোবর উত্তরপ্রদেশের রায়বেরিলিতে দলিত হরি ওম বাল্মীকিকে চোর সন্দেহে পিটিয়ে খুন করে উচ্চবর্ণের লোকেরা। রাজনৈতিক মহলে শোরগোল পড়লে পুলিশ প্রশাসন পরিবারের উপর চাপ সৃষ্টি করে বলে অভিযোগ। মধ্যপ্রদেশের কাটনি জেলার এক গ্রামে পঞ্চায়েতের সরপঞ্চের বেআইনিভাবে বালি তোলার বিরোধিতা করেন এক দলিত। অভিযোগ – সেই অপরাধে তাঁকে মারধোর করে, গায়ে মূত্রত্যাগ করা হয়। ২০২২ সালে মধ্যপ্রদেশেই এক দলিত যুবক ঘোড়ায় চেপে বিয়ে করতে গিয়েছিলেন বলে তাঁর বাড়িতে হামলা চালানো হয়েছিল। ২০২৩ সালে অভিযোগ উঠেছিল – তামিলনাড়ুর দুটি গ্রামে এখনো নাকি দলিতদের জুতো বা চটি পরা মানা। কুয়োর জল খাওয়া বা মন্দিরে ঢোকার অপরাধে দলিতদের ধরে মারার ঘটনা তো আকছার ঘটছে।
কয়েকদিন আগে ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরো (এনসিআরবি) ২০২৩ সালের অপরাধের রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। দেখা যাচ্ছে, দেশে তফসিলি জাতি ও উপজাতির মানুষের বিরুদ্ধে ঘটানো অপরাধের ঘটনা বেড়েছে। ২০২৩ সালে তফসিলি উপজাতিদের বিরুদ্ধে ঘটানো অপরাধ তার আগের বছরের থেকে ২৮% বেড়ে হয় ১২,৯৬০। জাতিদাঙ্গার কারণে মণিপুরে এই ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটেছিল। দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে রয়েছে যথাক্রমে মধ্যপ্রদেশ ও রাজস্থান। ২০২৩ সালে তফসিলি জাতিদের বিরুদ্ধে ঘটানো অপরাধ ৫৭,৭৮৯। উত্তরপ্রদেশে ঘটে সবচেয়ে বেশি – ১৫,৩৬৮। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে রাজস্থান। গ্রামীণ ভারত শুধু নয়, অত্যাধুনিক নগরেও তফসিলি জাতি ও উপজাতির মানুষ নিরাপদ নন। রাজস্থানের রাজধানী জয়পুর, উত্তরপ্রদেশের রাজধানী লখনউয়ে ২০২৩ সালে এ ধরনের ঘটনার সংখ্যা যথাক্রমে ১,২৩১ ও ১,২০৫। শহরাঞ্চলের মধ্যে তৃতীয় স্থানে রয়েছে উত্তরপ্রদেশেরই কানপুর। তথ্যপ্রযুক্তি কেন্দ্র হিসাবে পরিচিত কর্ণাটকের রাজধানী বেঙ্গালুরুর স্থান চতুর্থ। সেখানে ৬৮২টি এই ধরনের অপরাধের অভিযোগ পাওয়া গিয়েছিল।
স্বাভাবিকভাবেই তফসিলি জাতি ও উপজাতির মহিলাদের উপর নির্যাতনের চিত্রও উদ্বেগজনক। ২০২৩ সালে তফসিলি জাতির ২,৮৩৫ জন মহিলা ধর্ষিতা হন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এনসিআরবি-র রিপোর্টে অবশ্য সার্বিক চিত্র পাওয়া যায় না। নথিভুক্ত অভিযোগই কেবল গণ্য করা হয়। বলাই বাহুল্য, বহু অভিযোগ নথিভুক্ত হয় না। আক্রান্তরা যেমন পরিস্থিতির চাপে অভিযোগ করার সাহস পান না, তেমন এক্ষেত্রে প্রশাসনও অতি দক্ষ। ঘটনা ধামাচাপা দিতেই তারা ব্যস্ত থাকে। কারণ খুবই সহজ। তথাকথিত উচ্চবর্ণের লোকেদের সাধারণভাবে সামাজিক ও আর্থিক প্রতিপত্তি বেশি। স্থানীয় রাজনীতিতে তাদের প্রবল দাপট। প্রশাসনে থাকা উচ্চপদস্থ কর্তাদের মধ্যেও অধিকাংশের সামাজিক অবস্থান উচ্চবর্ণে। অনেকেই কর্তব্যের চেয়ে জাতপাত, ধর্মীয় সংকীর্ণতাকেই অগ্রাধিকার দেন।
দেখুন পডকাস্ট
জাত বা ধর্মের সঙ্গে আর্থিক অবস্থানের সম্পর্কও স্পষ্ট। সেই কারণেই আজও জমির লড়াই জাতপাতের লড়াইয়ে রূপান্তরিত হয়। উচ্চশিক্ষার দৌলতে উচ্চবর্ণের যে অংশ আজ তথ্যপ্রযুক্তি সহ নানা তথাকথিত সাদা কলারের চাকরি করে, তাদের বড় অংশই এইসব গোঁড়ামি থেকে মুক্ত নয়। দেশের শিক্ষাব্যবস্থা কখনোই বিজ্ঞানমনস্ক পঠনপাঠনকে গুরুত্ব দেয়নি। পশ্চিমবঙ্গে আক্রমণের ঘটনা তুলনামূলকভাবে কম হলেও, সামাজিক ও আর্থিক বৈষম্যের মধ্যেকার সম্পর্ক টের পাওয়া যায়। জমির মালিকানা, অন্য রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া শ্রমিক, উঁচু বেতনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পড়ুয়া, অপেক্ষাকৃত উঁচু বেতনের কর্মচারীদের জাত বা ধর্মীয় পরিচয়ের তুলনামূলক হিসাব কষলেই বোঝা যায় যে এত রিক্ততা, অভাবের মধ্যে সুবিধাভোগী কারা। শাসক বরাবরই এই সামাজিক বৈষম্যকে প্রশ্রয় দেয়। অথচ রাজ্যে প্রগতিশীল রাজনৈতিক অনুশীলনের সঙ্গে সামাজিক আন্দোলনের দূরত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই।
অপরাধ ধামাচাপা দেওয়া সরকার ও শাসক দলের বহুকালের লালিত প্রবণতা। কিন্তু অপরাধকে যখন মহিমাম্বিত করা হয়, তখন দেশ তথা রাজ্য দুষ্কৃতিদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়। পশ্চিমবঙ্গে মহিলাদের উপর ঘটা নির্যাতন আড়াল করতে সরকারের অতি তৎপরতা দুষ্কৃতিদেরই উৎসাহিত করছে। সাম্প্রতিককালে আদিবাসী নারীদের উপর নির্যাতনের ঘটনা তাই সঠিকভাবে নথিভুক্ত হয় না। আর কেন্দ্রে যারা ক্ষমতায়, তারা মনেপ্রাণে দলিত নিপীড়নকে পবিত্র কাজ বলে মনে করে। হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান যে একটি ব্রাহ্মণ্যবাদী, পুরুষতান্ত্রিক রাজনৈতিক কর্মসূচি – তা আজ ভালো মত টের পাওয়া যাচ্ছে। কেবল অন্য ধর্মের মানুষই নন, দলিত এবং নারীরাও সেই কর্মসূচির নিশানা। ২০১৪ সালের পর থেকে তাই দলিতদের উপর আক্রমণ কেবল বেড়েই যায়নি, শাসকের কাছে একপ্রকার বৈধতাও পেয়ে গেছে। জাতিশুমারিতে আরএসএস ও কেন্দ্রীয় সরকারের প্রাথমিক আপত্তির কারণ এটিই। জনগণনার সঙ্গে জাতগণনার দাবি কেন্দ্র মানতে বাধ্য হলেও, তার মাধ্যমে সামাজিক কারিকুরির নতুন প্রকল্প গ্রহণের আশঙ্কা তাই থেকেই যাচ্ছে। সারা দেশে এসআইআর করে দলিতদের একটা বড় অংশের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হবে – এই আশঙ্কাও অনেকেই করছেন।
উচ্চবর্ণের ধর্ষকদের বাঁচাতে হিন্দুত্ববাদী সরকার কতখানি মরিয়া, তা হাথরসের ঘটনাতেই বোঝা গেছে। ২০২০ সালে সেখানে বাল্মীকি জনগোষ্ঠীর ১৯ বছরের এক তরুণীকে ধর্ষণ করা হয়। অভিযুক্তরা উচ্চবর্ণের ঠাকুর সম্প্রদায়ের লোক। বাড়ির লোককে স্পষ্ট করে না জানিয়েই উত্তরপ্রদেশ পুলিশ ধর্ষিত মেয়েটিকে চিকিৎসার জন্য দিল্লিতে নিয়ে যায়। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু ঘটে। পরিবারের অনুপস্থিতিতেই তাঁকে চটজলদি দাহ করা হয়। সাংবাদিকরা সত্য উদ্ঘাটন করতে গেলে তাঁদের অনেককেও গ্রেফতার করা হয়। কেরালার সাংবাদিক সিদ্দিক কাপ্পানকে ইউএপিএ সহ একাধিক ধারায় অভিযুক্ত করে প্রায় দুবছর আটক রাখা হয়েছিল। ধর্ষণের সত্য উদ্ঘাটন আজ সন্ত্রাসমূলক কাজ বলে গণ্য করা হচ্ছে। অভিযুক্তদের সমর্থনে উচ্চবর্ণের বিভিন্ন সংগঠনের ডাকা মিছিলে বিজেপির প্রাক্তন বিধায়ক সহ হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের কর্মীরা যোগ দিয়েছিলেন। ঠাকুর সম্প্রদায়ের মর্যাদা বাঁচাতে তরুণীর পরিবারটিকে নানাভাবে হেনস্থা করা হয়। সবই হয় প্রশাসনের প্রত্যক্ষ মদতে।
আরো পড়ুন কাঁওয়ারিয়া অজুহাত, আসলে মুসলমান ও দলিতদের ভাতে মারার চেষ্টা
১৮১৮ সালের ১ জানুয়ারি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাহিনী দলিত মাহার সম্প্রদায়ের সহায়তায় পেশোয়া দ্বিতীয় বাজীরাওকে পরাস্ত করে। দলিতদের কাছে পেশোয়ারা (জাতের দিক থেকে ব্রাহ্মণ) অত্যাচারী হিসাবেই গণ্য হতেন। তাই কোরেগাঁওয়ের সেই যুদ্ধে পেশোয়া রাজত্বের অবসানকে তাঁরা আজও নিজেদের জয় বলেই মনে করেন। বহু বছর ধরেই দলিতরা ভীমা কোরেগাঁওয়ে সেই দিনটি উদযাপন করে আসছেন। ২০১৮ সালে ১ জানুয়ারি সেই ঘটনার ২০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিভিন্ন দলিত সংগঠন মহারাষ্ট্রের পুনায় জমায়েতের ডাক দিয়েছিল। পেশোয়ারা হিন্দুত্ববাদীদের কাছে বীর। হিন্দুত্ববাদী বিভিন্ন সংগঠন পালটা কালা দিবস পালনের আহ্বান জানিয়েছিল। প্রথম থেকেই দলিতদের কর্মসূচি বানচাল করতে তারা সক্রিয় ছিল। সেদিন দলিতদের জমায়েতের উপর আক্রমণ সংগঠিত হয়। সারা মহারাষ্ট্রে অশান্তি ছড়িয়ে পড়েছিল। মহারাষ্ট্রের ক্ষমতায় তখন দেবেন্দ্র ফড়নবীশের নেতৃত্বাধীন বিজেপি জোট সরকার। সেই সরকার প্রথম থেকেই আক্রমণকারীদের আড়াল করে সংগঠকদেরই ফাঁসাতে সচেষ্ট ছিল। মাওবাদী বলে অভিযোগ করে বেশ কয়েকজন সমাজকর্মী ও সাংস্কৃতিক কর্মীকে ইউএপিএ ধারায় আটক করা হয়। তাঁদের ‘আর্বান নকশাল’ তকমা দেওয়া হয়। ২০১৯ সালে মহারাষ্ট্রে উদ্ধব ঠাকরের নেতৃত্বে অবিজেপি সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে নতুন করে বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন করা হয়। ২০২০ সালের ২৫ জানুয়ারি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীন এনআইএ রাজ্য সরকারের থেকে তদন্তের ভার নিজের হাতে নিয়ে নেয়। রাজ্য সরকারের অভিযোগ ছিল, তাদের সম্মতি ছাড়াই এনআইএ তদন্তের ভার নিয়েছে। অক্টোবর মাসেই এনআইএ ১০,০০০ পাতার চার্জশিট দাখিল করে আরও কয়েকজন সমাজকর্মীর নাম যুক্ত করে। এই মামলায় কোনো বিচার প্রক্রিয়া ছাড়াই কারাবন্দি ফাদার স্ট্যান স্বামীর ২০২১ সালে ৮৪ বছর বয়সে মৃত্যু ঘটে। ভীমা কোরেগাঁওয়ের ঘটনায় দেশের সরকারের আচরণ তাদের দলিতবিদ্বেষের বড় প্রমাণ।
১৮৪৮ সালে জ্যোতিরাও ফুলে ও সাবিত্রীবাঈ ফুলে মহারাষ্ট্রে মেয়েদের স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। দলিতদের অধিকার নিয়ে তাঁরা সারাজীবন সক্রিয় ছিলেন। দলিত ও মুসলমান মহিলাদের মধ্যে শিক্ষার প্রসারে সাবিত্রীবাই ও ফতিমা শেখের অবদান চিরস্মরণীয়। তাঁরা দুজনে বহু লাঞ্ছনা, প্রতিকূলতা জয় করে একসঙ্গে শিক্ষা প্রসারে ব্রতী হয়েছিলেন। পুনা ছিল তাঁদের কর্মক্ষেত্র। আজ সাবিত্রীবাই, ফতিমাদের অবদানও ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
২০১৪ সাল থেকেই দলিত, সংখ্যালঘু, মহিলাদের উপর অত্যাচারের বিরুদ্ধে বিরোধীপক্ষ সহ নানা রাজনৈতিক ও সামাজিক মহল সরব রয়েছে। গত বছর লোকসভা নির্বাচনে সেই বিরোধিতা বিশেষ মাত্রা পায়। বিরোধীদের সংবিধান রক্ষার আহ্বান নির্বাচনকে অনেকখানি প্রভাবিত করে। দলিত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ভোট বিরোধীদের দিকে চলে যাওয়াতেই বিজেপির আসন সংখ্যা অনেক কমে যায়। জাতপাতের সমীকরণ ভারতের অনেক রাজ্যেই বরাবর বড় ইস্যু। বর্তমানে হিন্দুত্ববাদীদের দাপট প্রতিরোধে তা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিহারের আসন্ন নির্বাচনেও এই ইস্যু বিশেষ গুরুত্ব পেতে চলেছে। স্বাধীনতার এতবছর পরেও, কাজ, দারিদ্র্য, অশিক্ষা, খাদ্য নয়; জাতপাত, ধর্মই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। ইদানীং বরং এসবের গুরুত্ব বেড়ে গেছে। যে কোনো ধর্মের মৌলবাদীদের জয় এখানেই।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








