অমর্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায়

‘যেমনটা হবার ছিল, তেমনটা হল না বোধহয়।’ অথবা আরেকটু তাচ্ছিল্য ভরে লিখলে ‘যতটা ভয় দেখিয়েছিলেন, তেমনটা কি আর ঘটল মশাই? যান, যান, ভয় দেখাতে এসেছেন আবার! – যত বাজে কথা এসব!’

সত্যিই ঘটেনি। দীপাবলির পর মানুষ মারা যায়নি, গঙ্গায় সুনামি হয়নি, আকাশ থেকে ছাই-বৃষ্টি হয়নি, এমনকি ভিনগ্রহের জীবদের আক্রমণও কোথাও ঘটেনি। কাজেই পরিবেশ পরিবেশ করে মাথা ঘামানোর আর প্রয়োজন কোথায়? ফুসফুসে বিষ নিতে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। হাজার হোক, আমরা তো সেই নালা থেকে বল কুড়িয়ে আনা প্রজন্ম! আমাদের মারে কে!

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

গড়পড়তা মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিটাই এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবেশ বিষয়টা আসলে দু কলম লেখবার বিষয়। সোশাল মিডিয়ায় পোস্টানোর বিষয়। হইহই করে লাইক-শেয়ার-কমেন্ট-সাবস্ক্রাইবের বিষয়। এর বাইরে আর কিছুই নয়। তদুপরি আবার যোগ হবে সনাতন, হিন্দু, জাতীয়বাদী চরিত্র-বৈশিষ্ট্যের ধারণা। যে উৎসব জাতির (পড়ুন সনাতনের) পরিচয় নির্ধারণ করে তার বিপক্ষে কিছু বলতে যাওয়াটাই দেশদ্রোহ সমতুল। এক আজব সময়ে বাস করছি আমরা।

এই সময়ে সংখ্যার সাহায্য নিতে হয়। স্বাভাবিকভাবেই দৃষ্টিটা কলকাতা ছেড়ে রাজধানীর দিকে গিয়ে পড়ে। হাজার হোক, পয়লা নম্বরি শহর। দূষণের নিরিখেও। এবছরই দিল্লিতে সনাতনী সরকার এসেছে। গত দশকের ‘জমে থাকা পাপ’ তাই এবছরেই স্খালন করা ছিল জরুরি। গত কয়েক বছরে (২০২০ সালের পর থেকে) দিল্লি শহরে দীপাবলির সময় বাজি ফাটানোর বিষয়ে রীতিমত সরকারি নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এমনকি বাজি বিক্রির উপরেও সরকারি নিষেধাজ্ঞা বলবৎ ছিল। যদিও শহরের নাম নয়াদিল্লি, দেশের নাম ভারতবর্ষ – আমাদের ঠেকায় কে! আইনকে বুড়ো আঙুল দেখানোর কতরকম পদ্ধতিই না আমাদের নখদর্পণে, তাই বাজি একেবারে নিষিদ্ধ করা সম্ভব ছিল না। তবু পরিবেশের উপর খানিকটা হলেও আম আদমি পার্টির সরকারের সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়েছিল।

নতুন আসা সনাতনী সরকারের তরফে এহেন ‘সাফল্য’ সহ্য করা সম্ভব হয়নি। যথারীতি ধর্মীয় ঐতিহ্য, আবেগ ইত্যাদি নানা কারণ দর্শিয়ে তাঁরা আদালতের দ্বারস্থ হন। এর আগেও ‘সবুজ বাজি’ অথবা ‘পরিবেশবান্ধব বাজি’-র ব্যাপারে নানাবিধ প্রচার চলেছে। যদিও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন গতানুগতিক বাজির তুলনায় ওইসব বাজির দূষণ ঘটানোর ক্ষমতা বড়জোর ৩০% কম। আদতে পরিবেশবান্ধব বাজি হল সোনার পাথরবাটি। দীপাবলির আগের সপ্তাহেই সনাতনী সরকারের আবেদনে সাড়া দিয়ে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত উৎসবের দিনে, নির্দিষ্ট সময়সীমা মেনে, দিল্লি শহরে সবুজ বাজি পোড়ানোর অনুমতি দেয়। সময়সীমা অথবা সবুজ বাজির নির্দিষ্ট চরিত্র, দুটোর কোনোটাই যে শেষ অবধি কোনোদিক থেকে মানা হয়নি (পড়ুন, নাগরিক সমাজের তরফে স্বীকৃতি মাত্র দেওয়া হয়নি) তা সহজেই অনুমেয়। স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়াতেই দিল্লিতে বায়ুদূষণ সূচক, অথবা এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স দীপাবলির পরে (২১ অক্টোবর) ৫০০ ছাড়িয়ে যায়। সারা বিশ্বে বায়ু দূষণের নিরিখে আমাদের দেশের রাজধানী প্রথম স্থান অধিকার করে।

বিগত কয়েক বছরের তথ্য ঘাঁটলে দেখা যাচ্ছে, ২০২২, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে দীপাবলি পরবর্তী দিল্লি শহরে এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্সের সাংখ্যমানগুলি ছিল যথাক্রমে ৩১২, ২১৮ ও ৩২৮। পাশাপাশি মনে রাখতে হবে, পাঞ্জাব ও পাশ্ববর্তী রাজ্যে ফসল তুলে ফেলার পর গোড়া পোড়ানোকে অধিকাংশ সময় দিল্লির দূষণের কারণ হিসাবে কাঠগড়ায় তোলা হয়। এবছরের তথ্য বলছে, ১-১৮ অক্টোবর গতবছরের তুলনায় পাঞ্জাব ও পাশ্ববর্তী রাজ্যগুলোতে গোড়া পোড়ানোর ঘটনা কমেছে প্রায় ৭৭%। অথচ এরপরেও, দীপাবলির আগে দিল্লি শহরে ভাসমান দূষিত কণা বা ‘পার্টিকুলেট ম্যাটার’-এর পরিমাণ পিএম ২.৫ সূচক অনুসারে ১৫৬ মাইক্রোগ্রাম/ঘনমিটার। দীপাবলির পরদিন সেটা তিন গুণ বেড়ে ৪৮৮ মাইক্রোগ্রাম/ঘনমিটারে গিয়ে পৌঁছয়। দীপাবলির রাতে শহরের কোনো কোনো অংশে পরিমাণ ছিল ৬৭৫ মাইক্রোগ্রাম/ঘনমিটার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত মানের চেয়ে দিল্লির এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স দশ গুণ, বাতাসে ভাসমান দূষিত কণার পরিমাণ ১৫-২০ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। বায়ুদূষণের নিরিখে পৃথিবীর প্রথম দশটা সবচেয়ে দূষিত শহরের মধ্যে দিল্লির পাশাপাশি জায়গা করে নেয় বাণিজ্য নগরী মুম্বই এবং তিলোত্তমা কলকাতাও

তথ্য বলছে, বায়ুদূষণের কারণে আমাদের দেশে গড়ে প্রতি বছর ২১ লক্ষ মানুষ মারা যান। সারা পৃথিবীতে এই বিষয়ে আমাদের স্থান চীনের ঠিক পরেই। আরেকটা গবেষণায় জানা যাচ্ছে, ভারতের উত্তরাংশের অন্তত ৫১ কোটি মানুষের গড় আয়ু বায়ুদূষণের কারণে অন্তত সাত থেকে সাড়ে সাত বছর অবধি কমে আসবে। যেহেতু এমন প্রতিটি মৃত্যু, প্রতিটি অসুস্থতার ঘটনা – এর কোনো তাৎক্ষণিক সূচক নেই, তাই গড়পড়তা দেশবাসীর তরফেও সামান্যতম চৈতন্যের প্রকাশ দেখা যাচ্ছে না। আমাদের ভক্তি আছে, চেতনা নেই।

গত দশ বছরে ভক্তি ও জাতীয়তাবাদ যে ঠিক কতখানি সন্ত্রাস সৃষ্টিকারী হয়ে উঠেছে তা ওয়াকিবহাল নাগরিক মাত্রেই জানেন। এই লেখায় তার পুনরুক্তির প্রয়োজন দেখি না। তবু বিশ্ব উষ্ণায়ন ও পরিবেশ পরিবর্তনের বিপদ যে সরাসরি আমাদের উপরে এসেই পড়েছে, তার একের পর এক উদাহরণ দেখা সত্ত্বেও নাগরিক সমাজের এমন চেতনাহীনতা স্তব্ধ করে দেয়।

সোশাল মিডিয়ায় এখন সকলেই শিল্পী, সকলেই সুগায়ক, সকলেই অভিনেতা, সুসাহিত্যিক ও প্রভাবক (influencer)। এই বিরাট প্রভাবককুলের বৈশিষ্ট্য হল, যুক্তি তর্ক বলতে এরা প্রায় সকলেই ব্যক্তি আক্রমণ বোঝে। সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন ‘হোয়াট্যাবাউটারি’ এবং ধারালো ‘স্যাটায়ার’ হচ্ছে মনে করে অশ্লীল ‘রোস্টিং’। বাজি পোড়ানো নিয়ে কথা বলতে গেলেও একই ব্যাপার ঘটে। আগে যতটুকু অপরাধবোধ, অন্তত চৈতন্যের ভান, কারো কারো মধ্যে কাজ করত, এখন সেসব উবে গিয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামতকে অবজ্ঞা করে গায়ের জোরে নিজের বিশ্বাসকে ঠিক প্রমাণ করা নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এমন লোকেদেরও সভয়ে স্মরণ করিয়ে দিতে ইচ্ছে হয় – ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেব, নবজাগরণের বাংলায় কালীভক্তি জাগিয়ে তোলার ক্ষেত্রে যাঁর অবদান সর্বাধিক, তিনিও উপাসনা প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছিলেন ‘তাঁকে ডাকবে মনে, বনে ও ঘরের কোণে।’ পাড়া জাগিয়ে, রোগীকে বিব্রত করে, অবলা পশুকে অসুস্থ করে ঠাকুরকে ডাকার কথা তিনি বলেননি। রবীন্দ্রনাথও বলেছিলেন ‘আমার আনন্দ সবার আনন্দ হউক!’ একে তো তিনি জমিদার, বিধর্মী, বুর্জোয়া। তদুপরি নয়া ভারতবর্ষে তাঁর বক্তব্যের আদর্শ (সরকারোচিত/প্রশাসনোচিত) ব্যাখ্যা হল ‘আনন্দ নিবি নে মানে? তোর ঘাড় নেবে।’ এই মনোবৃত্তিতে, প্রয়োজনে ভীতি প্রদর্শন করে মানুষকে উৎসবে শামিল করা হয়। আমাদেরই রাজ্যের এক বীভৎস ঘটনার পর প্রশাসনিক প্রধানের উৎসবে ফেরার নির্দেশ এখনো আমাদের স্মৃতিপটে উজ্জ্বল।

তাই বাজি পুড়েছে, পুড়বেও। বোম ফেটেছে, ফাটবেই। বাজির বিরুদ্ধে কথা বলতে গেলে মানুষের মাথা যেমন ফেটেছে, তাও ফাটবে। রাজ্য হোক বা দেশ, এখানে সরকার-নির্দিষ্ট সকলের আনন্দে সকলকে যেমন গা ভাসাতে হয়েছে, তার কোনো অন্যথা হবার নয়। বাবুদের বাজির কারণে ফুটপাথবাসী শিশুর দুই ফুসফুসে যক্ষ্মা ধরে গেলেও বাবুদের উৎসব চলছে, চলবে।

আর অবলা প্রাণীর অসুস্থতা? আদালতের রায় এসে গেছে গত মাসেই। পশুপ্রেম আপাতত ঠান্ডা ঘরে। তাই সনাতন উৎসবে গৃহপালিত পশুর শারীরিক কষ্ট? এটা কোনো ভাবার মত বিষয় হল?

মনে পড়ে গেল, আজ সূর্যের উপাসনা করার দিন, সোজা কথায় ছটপুজো। সঙ্গে মনে পড়ল, সেই পুজো উপলক্ষে এতকাল ঘটে যাওয়া রাজ্যের সরোবরগুলোর ভয়াবহ দূষণের খতিয়ান। সুমিতা বন্দ্যোপাধ্যায় অথবা ধ্রুবজ্যোতি ঘোষের মত মানুষের লড়াই, পরিশ্রম আমাদের প্রাপ্য নয় বোধহয়। সমষ্টি হিসাবে আমরা তাঁদের পরিশ্রমের সামান্যতম প্রতিদান দিতে পারিনি। তাঁদের সহনাগরিক হিসাবে পরিচয় দিতেও লজ্জাবোধ হয়। প্রিয় কবির, প্রিয় এক কবিতার, প্রিয় পংক্তির সামান্য পরিবর্তন ঘটিয়ে – তাই নিষ্ফল উচ্চারণ করতে ইচ্ছে হয়

আমাদের স্যারিডন আছে, স্বর্গ নেই,
আমাদের দশক-জুড়ে গড়ে তোলা সনাতন আছে, চৈতন্য নেই,
ভক্তির অন্ধকার আছে, সাজিয়ে তোলা এক ভুয়ো দেশপ্রেম আছে,
চেতনা নেই!

নিবন্ধকার পেশায় প্রযুক্তিবিদ। পরিবেশ ও রাজনীতি নিয়ে লেখালিখি করেন। মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.