শেষ বিকেলটা অন্ধকার হয়ে আসছিল, উত্তরবঙ্গের হাওয়ায় বর্ষার গন্ধ। হয়ত ভুটানের কোনো পাহাড়ে এখন বৃষ্টি নেমেছে, আংরা ভাসা নদীতে বান, খুঁটিমারির জঙ্গলের মাথায় লাল বলের মত সূর্যটা হঠাৎ যেন একবার উঁকি দিয়েই শেষবারের মত মিলিয়ে গেল। চলে গেলেন অনি।

শিপ্রা ভৌমিক স্মৃতি পাঠাগার থেকে প্রথম উত্তরাধিকার হাতে আসে। তখন আমি একাদশ শ্রেণির ছাত্রী। ভারতবর্ষের অনেক জায়গা ঘোরা হলেও উত্তরবঙ্গ তখনো অচেনা, অদেখা। কয়েক বছর আগেও তো উত্তরবঙ্গে যাতায়াতের উপায় বলতে ছিল দার্জিলিং মেল, কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেস আর উত্তরবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহনের রকেট বাস পরিষেবা।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

বিয়ের পরে প্রথম চলেছি জলপাইগুড়িতে স্বজনের কাছে। দার্জিলিং মেলে টিকিট পাওয়া যায়নি, অগত্যা রকেটে। আমার কাছে তখনো ওটা অনিমেষের দেশ, জুলিয়েনের দেশ। রকেটের দুর্বার গতি আমার মনের গতির সঙ্গে পাল্লা দিতে পারছে না। আশ্বিনের সকালে কদমতলা বাস স্ট্যান্ডে নেমে আমার চোখ খুঁজে চলেছে কাঁঠালতলার মিষ্টির দোকান, রূপশ্রী সিনেমা হল, অনুপম ডাক্তারের ডাক্তারখানা, জেলা স্কুল, চৌধুরী মেডিক্যাল হল,এমনকি মাষকলাই বাড়ী শ্মশানও। রায়কত পাড়ার বাড়িতে ঢোকা মাত্র আমার একটাই প্রশ্ন ছিল, সকলের কুশল জিজ্ঞাসারও আগে – সমরেশ মজুমদার কোথায় থাকতেন? শুনলাম, দেখলাম হাকিমপাড়ায় ওঁর বাড়ি। সে বাড়িতে তখন থাকতেন ওঁর ভাই।

তখনো বিস্ময় অপেক্ষা করছিল। ওঁর খুব কাছের বন্ধু, জলপাইগুড়ি জেলা স্কুলের কৃতি ছাত্র অর্কপ্রভ দেব, যাঁর মেধা ও পাণ্ডিত্য জলপাইগুড়ি শহরে এখনও মিথ, উত্তরাধিকার উপন্যাসে যাঁর কথা এসেছে, যাঁর সঙ্গে স্কুল ফাইনাল পরীক্ষার আগে দুষ্টুমির কথা নির্দ্বিধায় সমরেশ লিখেছেন, জানলাম তিনি আমার শ্বশুরবাড়ির দিকের আত্মীয়।

উত্তরাধিকারে সমরেশ হারিয়ে যাওয়া প্রজন্মের সরিতশেখরের কথা লিখেছেন, যিনি নিজের মূল্যবোধ, আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচেছেন চরম অর্থকষ্ট সত্ত্বেও। অনিমেষের জীবনে প্রেমের আগে রাজনীতি আসে। প্রথমে কংগ্রেসি রাজনীতি, তারপরে বামপন্থা। ছয়ের দশকে উত্তাল কলকাতার যে রাজনীতি যে কোনো তরুণ হৃদয়কে উদ্বেলিত করত, তা অনিমেষের জীবনকে স্পর্শ করে, সেইসঙ্গে মাধবীলতাও। কঠোর রাজনীতির আঙিনায় যাঁদের বিচরণ, তাঁদের অনেকের জীবনেই মাধবীলতারা ছিলেন। তাই কালবেলা এ যুগে, এই প্রজন্মের কাছেও স্বীকৃতি পায়।

কিন্তু বামপন্থার বদল, চোরাগোপ্তা অন্য রাজনীতির ছোঁয়া, ফাঁকফোঁকর দিয়ে ঢোকা বেনো জল, পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতি, জুলিয়েনের মত লোকেদের অস্বীকার – কোনোকিছুই স্পষ্ট ভাষায় বলতে সমরেশ দ্বিধা করেননি। মাধবীলতার সঙ্গে, সন্তানের সঙ্গে অনিমেষের প্রাত্যহিক জীবন, যেখানে রাগ অভিমান আছে, খুনসুটি আছে, চাপান উতোর আছে – তা যেন এক আটপৌরে বাঙালি জীবনের নিখুঁত প্রতিচ্ছবি। মাধবীলতা অনিমেষকে ভালবেসে নিজের স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন ছেড়েছে ঠিকই, কিন্তু নিজের সম্মান, আত্মমর্যাদাবোধ কোনোভাবেই ক্ষুণ্ণ হতে দেয়নি। তাই বোধহয় বিপ্লবের আরেক নাম মাধবীলতা।

সমাজের সব স্তরের মানুষ এসেছেন সমরেশের লেখায়। মদেসিয়া কুলি কামিনদের জীবন, পাঁচের দশকের চা বাগানের জীবন, যেখানে তখনো আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি, সেখানে ঘুণ ধরা সংস্কারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে একাকী নারী দীপাবলীর সংগ্রামের কাহিনী তিনি এঁকেছেন সাতকাহন উপন্যাসে। গর্ভধারিণী এক নিটোল বিশ্বাসের গল্প, যে বিশ্বাসের নাম সাম্যবাদ। এই উপন্যাসে অসম সামাজিক অবস্থান থেকে চারজন মানুষ সেই বিশ্বাস, আন্তরিকতা নিয়ে এগিয়ে এসেছিল নতুন সমাজ গঠনে।

উত্তরবঙ্গ, চা বাগান, গয়েরকাঁটা, আংরাভাসা নদী, তিস্তার চর,করলা নদী, আসাম রোড, ভুটান পাহাড় যেমন সমরেশের সাহিত্য থেকে কখনো হারিয়ে যায় না, তেমন হারিয়ে যায় না সাধারণ মানুষ, তাদের জীবনের চলচ্ছবি। একটা শহরের জীবন, রাজনৈতিক বিশ্বাস, আবেগ, বিশ্বাসভঙ্গের কাহিনীও। তাই তাঁর লেখায় আমরাও খুঁজে পাই জীবনের আস্বাদ, বাঁচার রসদ, ভালবাসার মানুষগুলোকে।

অনিমেষের জীবনে মাধবীলতা যেমন অপরিহার্য, নির্মাণে জুলিয়েনকে অস্বীকার করি কীভাবে?

দৌড় দিয়ে সমরেশের পথ চলা শুরু। মাঝে কিছুদিন আয়কর দপ্তরের দমবন্ধ করা চাকরি, যা থেকে মুক্তি মেলে আনন্দবাজারের ডাকে। কিন্তু বিমল করের সঙ্গে কেসি দাসের দোকানে সান্ধ্য আড্ডাই আসলে সমরেশ, রতন ভট্টাচার্য, সুচিত্রা ভট্টাচার্য এবং আরও অনেক তরুণ সাহিত্যিককে আলোর দিশা দেখিয়েছিল।

আরো পড়ুন মৃত্যুচেতনায় উদ্ভাসিত জীবনের কথাকার বিমল কর

ছোটদের জন্য যখন লিখেছেন, তখন অর্জুন গোয়েন্দাগিরি করতে দেশের যত্রতত্র এমনকি পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ালেও, আদতে সে উত্তরবঙ্গের। কলকাতাবাসী হয়েও সমরেশের বুকে আস্ত উত্তরবঙ্গ, ডুয়ার্স যে সবসময় রাজত্ব করত, তাঁর লেখনী তা বারবার প্রমাণ করেছে।

অনিমেষ, অর্জুন, সমরেশ কোথায় যেন এক হয়ে যান, যখন বারবার ফিরে আসে আংরাভাসা, গয়েরকাঁটা চা বাগান, ঘন সবুজ বীরপাড়া, হাসিমারা, গরুমারা চা বাগান, হলং, রাজাভাতখাওয়া, জলদাপাড়ার জঙ্গল, তিস্তা, তোর্সা, করলার নানা ঋতুর রূপ। করলার চরে এক মফস্বল শহরের দুর্গাপুজোর ভাসান, কালীপুজোর হিম ভেজা রাত, শিউলির গন্ধ, জেলা স্কুল, তিস্তা ব্যারাজ, ডি এম বাংলো, বেগুনটুলি – সবকিছু যেন তুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে তুলেছেন একের পর এক উপন্যাসে। পাঠকের চোখের সামনে বায়োস্কোপের মত করে এইসব তুলে ধরাতেই বোধহয় সাহিত্যিক হিসাবে সমরেশের সার্থকতা।

লেখক বিশ্বাস করতেন, বেঁচে থাকা মানে সক্রিয় থাকা। তাই হঠাৎ করে ৪৮ বছর বয়সে অসুস্থতার কারণে বাংলা হরফ বিস্মৃতির পরে নতুন করে সহজ পাঠ, বর্ণপরিচয় পড়ে ফিরে এসেছিলেন লেখক জীবনে। কালবেলার জন্য পেয়েছেন সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার, দৌড় উপন্যাস চলচ্চিত্রায়িত হয়েছে, দূরদর্শনে ধারাবাহিক হয়েছে তেরো পার্বণ নিজে নাটকের দল গড়ে অভিনয়ও করেছেন। ২০১৮ সালে তাঁর সারাজীবনের সাহিত্য কীর্তির জন্য সেরা বাঙালি পুরস্কার পেয়েছেন।

“জীবন এক যাত্রা” – এই উপলব্ধি তাঁকে জীবনকে ভালবাসতে শিখিয়েছিল। ছয়, সাতের দশকের রাজনীতি যে মেধা, যে স্বপ্ন নিয়ে তাঁর কাছে ধরা দিয়েছিল, পরবর্তী প্রজন্মের কাছে অত্যন্ত সৎভাবে তা তুলে ধরেছিলেন। অনিমেষ ট্রিলজিতে অনিমেষদের জীবনের ওঠাপড়া, আগুনে ঝাঁপ, বাম ও অতি-বাম রাজনীতির সংঘাত, বিপ্লবোত্তর জীবন,সবকিছুই এসেছে। স্বপ্ন, স্বপ্নভঙ্গের সেই বেদনা এক সময়ের দলিল।

তিলোত্তমা কলকাতায় আজ চিরঘুমে শায়িত লেখক। বরাবর নিজের শর্তে বেঁচেছেন, পঁচিশে বৈশাখে শুরু হল তাঁর অনন্ত পথযাত্রা। জলপাইগুড়ি শহরে ভোর হবে প্রতিদিনের মতই। শহর জেগে উঠবে কিন্তু খুঁটিমারির জঙ্গল, গয়েরকাঁটা চা বাগান, আংরাভাসা নদী অপেক্ষা করবে ছোট্ট অনির জন্য। হয়ত ভুটান পাহাড়ের ওদিক থেকে ধেয়ে আসা এক ঝাঁক কালো মেঘ আসাম রোডে টাপুর টুপুর বৃষ্টি হয়ে ভিজিয়ে দেবে জলপাইগুড়ি শহরটাকে। সমরেশ বেঁচে থাকবেন পাঠকের হৃদয়ে।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.