গতবছর অক্টোবর মাসে বিহারে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনী (এসআইআর) প্রক্রিয়া চলার শেষভাগে যখন দেখা গেল বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম বাদ পড়ছে, তখন নির্বাচন কমিশন বলেছিল, এইসব নাম বাদ পড়া নিয়ে তাঁদের কাছে বিশেষ কোনো অভিযোগ আসেনি। সুতরাং এ বিষয়ে তাঁরা কিছু করতে অপারগ। কার্যত তথ্য দিয়ে তাঁরা দেখিয়েছিলেন, মুষ্টিমেয় কিছু অভিযোগ রাজনৈতিক দলগুলির পক্ষ থেকে জমা দেওয়া হয়েছিল, সংখ্যাটা একশোরও কম। বোঝাই যাচ্ছে, মূলত বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি এই কাজে জোর দিতে পারেনি। কারণ যখন এইসব ত্রুটি বিচ্যুতি ধরা পড়ছে, তখন ভোটের বাদ্যি বেজে গেছে।

সেইসময় প্রার্থী নির্বাচন, প্রচার ইত্যাদি কাজে সব রাজনৈতিক দলকেই বেশি ব্যস্ত থাকতে হয়। ভোটারদের নাম বাদ নিয়ে মাথা ঘামাবার সময় ও লোকবল স্বভাবতই থাকে না। গোটা দেশে এসআইআর নিয়ে যে নানা বিতর্ক ও বিরোধ, তার একটা জরুরি প্রান্ত কিন্তু এই পুরো পদ্ধতিটা নিয়ে কমিশনের সময়সীমা নির্বাচন। পশ্চিমবঙ্গেও এই প্রক্রিয়ার পিছনে এমন একটা সময়ের অভিসন্ধি খুব স্পষ্ট। ঠিক এই মুহূর্তে রাজ্যে এসআইআর প্রক্রিয়া মাঝপথে, আগামী একমাসের মধ্যে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হবে, যার ভিত্তিতে হবে বিধানসভার ভোট। ঠিক এই জায়গাটাতেই কমিশন নতুন একটা বেড়া দিয়ে বাঁধতে চলেছেন ভোটারদের। ‘যেতে নাহি দিব’। অর্থাৎ ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের কিছুতেই তাঁরা পৌঁছতে দেবেন না।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

কেমন বেড়া? এ রাজ্যের হিসাবে খসড়া তালিকা থেকে যেসব নাম (মোটামুটি ৫৮ লক্ষ) বাদ পড়েছিল তার মধ্যে ছিল মৃত, স্থানান্তরিত, অনুপস্থিত ও ডুপ্লিকেট ভোটার, আর তার সঙ্গে যাদের নাম ২০০২ সালের তালিকায় খুঁজে পাওয়া যায়নি। কমিশনের মৌখিক বা হোয়াটস্যাপ নির্দেশ মেনে এইসব ভোটারদের শুনানি জানুয়ারির ২০ তারিখের মধ্যে শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। প্রায় গোটা রাজ্যেই এই সময়সীমা মেনে কাজ হচ্ছে। যদিও কমিশনের প্রকাশিত ‘ক্রোনোলজি’ অনুযায়ী ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত শুনানি চলতে পারে। কিন্তু ডিসেম্বরের শেষে যখন সারা রাজ্য শীতের প্রকোপে জবুথবু, ঠিক তখনই কমিশন এক আশ্চর্য বিষয় সামনে আনে, যার পোশাকি নাম ‘লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি’, অর্থাৎ যুক্তিগত অসঙ্গতি। কার যুক্তি? কেমন যুক্তি? কীরকম অসঙ্গতি? সে ব্যাপারে কমিশন আজ পর্যন্ত কোনো যুক্তিযুক্ত সদুত্তর দিতে পারেনি। কিন্তু কোন এক অদৃশ্য মন্ত্রবলে কমিশনের ওয়েবসাইট থেকে নাগাড়ে বেরিয়ে আসছে শুনানির নোটিস, যার ভিত্তি এই ‘অসঙ্গতি’। আর এই নোটিস তাঁদের জন্যেই আসছে, যাঁদের নাম খসড়া ভোটার তালিকায় উঠেছে এবং কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী প্রাথমিক শুনানিতে ডাকা হয়নি। তার মানে এঁদের নিয়ে কমিশনের কোনো সমস্যা নেই।

এই ‘যুক্তিগত অসঙ্গতি’-র জাঁতাকলে ফেলে দেওয়া হয়েছে প্রায় ১ কোটি ৩৬ লক্ষ ভোটারকে। কেন? এর কোনো সমুচিত জবাব কমিশনের হাতে নেই। তাঁরা বলছেন, সফটওয়্যার থেকে নাকি এগুলো তৈরি হচ্ছে, যাকে বলে ‘সিস্টেম জেনারেটেড’। দুনিয়ায় এমন কোন সিস্টেম আছে, যা তার নিয়ন্ত্রকের হাতে থাকে না? এমন কোন সফটওয়্যার তৈরি হয়, যা তার নির্মাতাকে উপেক্ষা করে নিজের মত চলে? এতদিন শুনে এসেছি কম্পিউটার তার ব্যবহারকারীর চেয়ে বুদ্ধিমান হতে পারে না। এ তবে কেমন যন্ত্র, যার কাজের উপর তার ব্যবহারকারীর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই? রবীন্দ্রনাথের রক্তকরবী-র রাজা, নাটকের অন্তিম পর্বে আর্তনাদ করেছিল ‘ওরা আমায় ঠকিয়েছে!’ এ কি তবে রাজাকে ঠকানোর কোনো কারসাজি?

না। আদপে এখানে জাতীয় নির্বাচন কমিশনই সমানে ঠকিয়ে চলছে এ রাজ্যের নাগরিকদের। কারণ বিহারের ক্ষেত্রে এই ‘লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি’ ধুয়ো তোলা হয়নি। ছিল না পশ্চিমবঙ্গের জন্য এসআইআর জারি করার সরকারি গেজেটেও। এই বিষয়ে সংবাদমাধ্যমে বা কমিশনের নিজের ওয়েবসাইটে যত তথ্য প্রকাশিত, সেখানে ম্যাপিং হয়ে যাওয়া বা শেষ এসআইআরে নাম না থাকার কারণে শুনানি কত তারিখ অবধি হবে তারই সময়সীমা ছিল, বাড়তি কিচ্ছুটি নয়। তাহলে গত ১৪ ডিসেম্বর খসড়া তালিকা প্রকাশের পরেই এই নতুন অধ্যায় শুরু হল কেন? কেনই বা সরকারিভাবে ঘোষণা না হলেও কমিশনের মাধ্যমে সব আধিকারিকদের বার্তা দেওয়া হতে লাগল, সব শুনানি জানুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহের মধ্যে শেষ করার? নির্বাচনের কাজে যাঁদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, তাঁরা অনেকেই জানেন, নির্বাচনের প্রতিটি প্রক্রিয়ার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবকিছু নথিবদ্ধ রাখতে হয়। প্রতিটি আদেশনামা, কর্মী-আধিকারিকদের নিয়োগ, গাড়ির চলাচল, পুলিশের গতায়াত, প্রতিটি সভার আলোচনার সারসংক্ষেপ, এমনকি ইদানিং ভিডিও রেকর্ডিং করে রাখার ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। তাহলে ভোটারের নাম নথিভুক্ত করার মত গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় এত ঝাপসা এলাকা কেন? কমিশন নিজেই নিজেদের চারদিকে এক সন্দেহের পরিবেশ তৈরি করে দিচ্ছে প্রতি পদে।

তাহলে এই ‘লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি’ ব্যাপারটি আসলে কী? যেমন কারও নামের মধ্যনাম বা পদবিতে ‘গোলমাল’, কারও বাবার/মায়ের নামের সঙ্গে বর্তমান ভোটারের বাবা/মায়ের নাম না মেলা। কোনো কোনো ভোটারের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে মুসলমান সম্প্রদায়ের মহিলাদের ক্ষেত্রে পদবির নানা রূপ। অবিবাহিত মুসলমান নারী খাতুন লেখেন, বিবাহের পরে সাধারণত হন বেগম বা বিবি, স্বামী প্রয়াত হলে অনেকে বেওয়া লেখেন – এসব তো প্রচলিত ধর্মীয় সামাজিক প্রথা! এর উপরে তাঁদের ভোটার হওয়া বা না-হওয়া নির্ভর করবে কেন? আদিবাসীদের ক্ষেত্রেও এই ধরনের নানা প্রথা আছে। ভদ্রলোক শ্রেণি এসব তেমন জানে না। এখন অনেক হিন্দু মহিলাও বিয়ের পরে তাঁদের পিতৃদত্ত পদবিই ব্যবহার করেন, কেউ কেউ বাবা ও স্বামী – দুজনের পদবিও লেখেন। সবই দেশের আইনে সিদ্ধ। তাহলে এগুলো অসঙ্গতি কোন অর্থে? কোনো বাবার নামের সঙ্গে ৫-৬ সন্তানের নাম যুক্ত থাকলে তাকেও ফেলে দেওয়া হচ্ছে সন্দেহের তালিকায়। এর পিছনেই বা যুক্তি কী? কোনো বাড়ির নম্বরের সঙ্গে এক সঙ্গে ১০০-১৫০ নাম যুক্ত হলে তাও নাকি অসঙ্গতি। স্বয়ং অমর্ত্য সেনের জন্মের সময়ে কেন তাঁর মায়ের বয়স ১৫ বছর ছিল, তা নিয়েও নোটিস গেছে। আবার কোনো বাবার সঙ্গে তাঁর ছেলের বয়সের ফারাক ৫০-৬০ হলেও তিনি প্রশ্নের মুখে। এগুলোর সঙ্গে ভোটের অধিকার থাকা, না-থাকার কী সম্পর্ক?

এই বিশেষ নিবিড় সংশোধনের আরেকটা বিশেষ লক্ষণ হল, জাতীয় নির্বাচন কমিশন বা রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের অফিসের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ উঠছে, কমিশন সে বিষয়ে স্পিকটি নট হয়ে থাকলেও, কেন্দ্রের শাসক দল তথা রাজ্যের বিরোধী দল কমিশনের হয়ে জবাব দিয়ে দিচ্ছে। ফলে ‘লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি’, আদপে যা কমিশনের বিকৃত ও বিক্রীত মস্তিষ্কের শিশু, যাকে দানব আকারে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে আপামর মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নিতে, তা নিয়ে কমিশনের ভক্তরাও ঠিক জুতসই জবাব পাচ্ছেন না।

আসলে এসআইআর নামক বুলডোজার মানুষকে গণতন্ত্রের উৎসব থেকে উচ্ছেদ করতে উদ্যত। ছলে-বলে-কৌশলে কত বেশি মানুষের নাম কেটে দেওয়া যায়, এ হল তারই ফিকির। দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস কাগজে গত ৩০ ডিসেম্বর রাহুল শাস্ত্রী ও যোগেন্দ্র যাদব দেখিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গের মতই ভোটমুখী রাজ্য আসামে ইনিউমারেশন ফর্ম বিলি না করে, বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটার তালিকা সংশোধন করা হয়েছে। তাতে মৃত ভোটার, ডুপ্লিকেট ভোটার ইত্যাদি বাদ দিয়ে, নতুন ভোটার জোড়ার পরেও ভোটার সংখ্যা একই থেকে গেছে (২ কোটি ৫২ লক্ষ)। আরও মজার কথা, উত্তরপ্রদেশে এসআইআরের পাশাপাশি সে রাজ্যের নির্বাচন কমিশন পঞ্চায়েত নির্বাচনের জন্য আলাদা ভোটার তালিকা সংশোধন করেছে। তা থেকে গ্রামাঞ্চলে যে ভোটার সংখ্যা পাওয়া গেছে, তার সঙ্গে শহুরে ভোটারের সংখ্যা যোগ করলে ডিসেম্বর ২০২৫-এ উত্তরপ্রদেশের সম্ভাব্য প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের সংখ্যার সমান হচ্ছে (১৬ কোটি ১ লক্ষ)। অথচ খসড়া এসআইআর অনুযায়ী ওই রাজ্যে ভোটারের সংখ্যা ১২.৬ কোটি। এরপরেও এসআইআর-এর প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ আছে কি?

আসলে নির্দিষ্ট কিছু আলেখ্য তৈরি করার চেষ্টাই এইসব কাজের মূল চালিকাশক্তি। ‘লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি’ নামক গিলোটিনের উৎপত্তিও সেই উদ্দেশ্যেই। এ রাজ্যে এসআইআর করা হয়েছে বাংলাদেশি মুসলমানদের অনুপ্রবেশের এক স্ফীত কল্পনাকে সামনে রেখে। প্রায় এক দশক ধরে ধারাবাহিকভাবে বলে আসা হয়েছে জঙ্গি মুসলমানরা নাকি কাতারে কাতারে ঢুকে পড়েছে এ রাজ্যে, সঙ্গে আছেন রোহিঙ্গারা। এসআইআর মানে এক প্রকাণ্ড ছাঁকনি দিয়ে তুলে তাঁদের চিহ্নিত করা। তেমন কিছু ঘটে থাকলে সে কাজ করার কথা ছিল সীমান্তরক্ষী বাহিনীর, অথচ এ রাজ্যে অনুপ্রবেশ নিয়ে কেন্দ্রীয় বা রাজ্য – কোনো সরকারের কাছেই কোনো সুনির্দিষ্ট খবর নেই। তবু একনাগাড়ে বিরোধী দলের চার আনা, ছ আনার নেতারাও এ নিয়ে বাজার গরম করলেন। শুধু তাই নয় ভিনরাজ্যে যাওয়া পশ্চিমবঙ্গের প্রবাসী শ্রমিকদের বাংলাদেশি বলে নির্যাতন করে বীভৎস মজাও লুটলেন। এই রাজ্যের স্বীকৃত বাসিন্দাদের জোর করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে কালি দিলেন দেশের সম্মানে। এদিকে খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ হওয়ার পরে সবিস্ময়ে সবাই দেখে ফেলল যে সীমান্তবর্তী জেলাগুলির সংখ্যালঘু বাসিন্দাদের ম্যাপিংয়েই বরং কোনো গুরুতর সমস্যা নেই। ফলে কমিশনের এতাবৎ প্রচারিত নিয়মবিধির আওতায় তাঁদের ঘিরে বাড়তি সন্দেহ বা নিবিড় শুনানির কোনো পরিসর আর নেই। ভাতে পড়ল মাছি।

তাহলে? কোটি কোটি বাংলাদেশির অনুপ্রবেশের প্রচারকদের হাতে পেন্সিল ছাড়া আর কিছু নেই। এমনই এক ভ্যাবাচ্যাকা অবস্থার গর্ভস্রাব হল ‘লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি’। কারণ যে করেই হোক বাদ দিতে হবে ‘ওদের’ নাম। তাই শূন্য ঝুলি থেকে এবার বেরলো বিচিত্র এক বেড়াল। নানা জেলা থেকে খবর আসছে, বেছে বেছে সংখ্যালঘু মহল্লার নাগরিকদের কাছে পাঠানো হচ্ছে শুনানির নোটিস। এঁরা কিন্তু খসড়া তালিকায় জায়গা পেয়েছেন এবং বাড়তি তথ্য চেয়েও ডাকা হয়নি এর আগে। এইবার ডাক পাচ্ছেন। কারণ, তাঁদের নামের বানান নাকি ভুল, পদবি ভুল। এই ‘ভুল’ আদপে করেছে কমিশনের সফটওয়্যার, এখন তার দায় চাপানো হচ্ছে ভোটারদের উপর।

ভেবে অবাক হতে হয়, যেখানে একটি বুথে গড়ে হাজারখানেক ভোটার থাকেন, তাঁদের ৫০/৬০ শতাংশকে ‘লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি’ দেখিয়ে আবার তলব করা হচ্ছে। অথচ যেসব নথিকে কমিশন স্বীকৃতি দিয়েছে, তার কোনোটার মাধ্যমেই এইসব ভুল সংশোধন করা সম্ভব নয়। তাহলে? নিজেদের এক্তিয়ারের অনেক বাইরে আগেই চলে গেছে কমিশন। এবারে অকুতোভয় হয়ে ঢুকে পড়তে চাইছে নাগরিকের অন্দরমহলে। কোন বাবার ছটি পুত্র, তার সঙ্গে তাঁদের ভোটাধিকারের কিসের সম্পর্ক? ‘ওঁদের’ অনেক অনেক ‘বাচ্চা’ হয় – এই আলেখ্য থেকে এইসব প্রশ্নের চাষবাস। এবার থেকে ভোট দিতে গেলে আঙুলে কালি শুধু নয়, কমিশন ভোটারদের হাতে যেন গর্ভনিরোধকের প্যাকেটও ধরিয়ে দেয়।

সচরাচর শহরাঞ্চলে মুসলমানরা একেকটি জায়গায় একসঙ্গে থাকেন। বস্তি অঞ্চলে একেকটি প্লট নম্বরের ভিত্তিতে বস্তির নাগরিকদের বাড়ির পরিচয় থাকে। যেমন ১০০ নম্বর বস্তি মানে সেখানে যত ঘর মানুষ বাস করেন, তাঁদের সকলেরই ‘প্রেমিসেস নাম্বার’ ১০০ লেখা হয়। তার মানে একটি নম্বরের সঙ্গে জুড়ে যাচ্ছেন অনেক ভোটার। এতে আবার অসঙ্গতির কী আছে? আদিবাসীদের মধ্যে মা-বাবার নাম ব্যবহার নিয়ে নানা প্রথা আছে, যা আমাদের সঙ্গে মেলে না। না মেলাই স্বাভাবিক। সুতরাং তাঁদেরও সন্দেহ করা হচ্ছে এসআইআরে। বহু আদিবাসী পরিবারে নোটিস যাচ্ছে।

এইসব সংশয় প্রতিহত করার মত কাগুজে সাবুদ প্রায় অমিল। দেশের সর্বোচ্চ আদালতে এসব নিয়ে মামলার পাহাড় জমছে, নানা প্রশ্নে বিদ্ধ হচ্ছে কমিশন, কিন্তু আদালতের বিচারপতিরাও এখন জল মাপা ছাড়া আর কিছু করছেন না। কমিশন এখনো পরিষ্কার করে বলেনি যে এইসব তথাকথিত ভ্রান্তি নিরসনে প্রথম শ্রেণির বিচারবিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দেওয়া হলফনামা তাঁরা গ্রাহ্য করবেন কিনা। জনমত তাঁদের বিরুদ্ধে, স্বাভাবিক বিচারের কষ্টিপাথর কমিশনের কাজের পক্ষে নয়, বিচারবিভাগকে তাঁরা মানবেন কিনা তাও তাঁরা ধীরেসুস্থে ভেবে দেখছেন। এর থেকে রাষ্ট্রদ্রোহী প্রতিষ্ঠান আর কারা? সব মিলিয়ে যে আতঙ্কের ও ষড়যন্ত্রের পরিবেশ তা যুদ্ধ পরিস্থিতির থেকেও খারাপ। যুদ্ধে তবু প্রতিরক্ষা বাহিনী আমাদের সুরক্ষা দেন, কিন্তু এখানে মারটা আসছে প্রত্যক্ষভাবে রাষ্ট্রের দিক থেকে, নাগরিকতা থেকে বেনাগরিকতার খাদে মানুষকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিতে রাষ্ট্র মরিয়া।

আরো পড়ুন ইভিএমে তিনবার কারচুপি করার সুযোগ আছে: জহর সরকার

তাহলে কারা ভোট দিতে পারবেন? আজকের দিনে এই জিজ্ঞাসার কোনো স্পষ্ট উত্তর নেই। এক কোটি ৩৬ লক্ষের বাড়ি নোটিস পৌঁছেছে। তাঁদের শুনানি আগামী ১৫ দিনের মধ্যে শেষ হওয়া একেবারে অসম্ভব। এমনকি যাঁরা শুনানিতে গিয়ে পৌঁছতে পারবেন, তাঁরাও ঠিক ঠিক কাগজ দিয়ে সংশয় মেটাতে পারবেন মনে করার কোনো কারণ নেই। এখানেই আসে ‘ক্রোনোলজি’-র কথা। বিহারে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের অল্প দিন পরেই বিধানসভা নির্বাচন ঘোষণা করে দেওয়া হয়েছিল। এই রাজ্যেও ১৪ ফেব্রুয়ারির নির্ধারিত দিনে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ হলে, তাকে ঘিরে যাবতীয় বিভ্রান্তি, ক্ষোভ, প্রতিবাদ আচমকা স্তিমিত হয়ে যাবে ফেব্রুয়ারির শেষে বা মার্চের গোড়ায় ভোট ঘোষণা হয়ে গেলে। তখন ভোটার তালিকার থেকেও জরুরি হয়ে উঠবে ভোট পরিচালনা। কমিশন একথা বিলক্ষণ জানে। তাই আপাতত যুক্তিগত অসঙ্গতি নামক আষাঢ়ে গপ্পো ফেঁদে নাগরিকদের যারপরনাই বেইজ্জত করে লুঠ করতে চাইছেন তাঁদের ভোটাধিকার। ১৯৫২ সালের প্রথম নির্বাচনের সময় থেকে আমাদের দেশের নির্বাচন কমিশনের উদ্দেশ্য ছিল আরও বেশি বেশি মানুষকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় জুড়ে দেওয়া। কেউ যাতে ভোট দিতে বাধা না পান, তাই ছিল নির্বাচন কমিশনের লক্ষ্য। এতবছর পরে সেই হাওয়া মোরগ একেবারে বিপরীতে, ছায়া পূর্বগামিনী। এখন সবটাই কাজির বিচার। কপালে জুটলে বাজি, ছাড়বেন তাঁকে কাজি।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.