কিবরিয়া আনসারী
চব্বিশ বছর ধরে শরিয়ত হোসেন ভারতের সীমান্ত পাহারা দিয়েছেন। ভারতীয় সেনাবাহিনীর এই জওয়ান লখনউ ও দিল্লি থেকে কাশ্মীর, কেদারনাথ ও উত্তরকাশীর মত দেশের সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও কঠিন কিছু জায়গায় নিযুক্ত ছিলেন। তিনি ২০১৩ সালে দেশের সেবা করে চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন। এই সপ্তাহে মুর্শিদাবাদের ডোমকল মহকুমায় এই প্রাক্তন সেনা জওয়ানকে লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে, দেশের সেবা করতে নয়, নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে।
ডোমকল থানার অন্তর্গত কালুপুরের বাসিন্দা শরিয়ত ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনী (এসআইআর) সংক্রান্ত নোটিস পেয়েছেন। তাঁকে শুনানিতে উপস্থিত হয়ে নিজের নাগরিকত্ব প্রতিষ্ঠা করার জন্য নথি জমা দিতে বলা হয়েছিল। এই নোটিসগুলো ওই এলাকার মানুষের মধ্যে রাগ, অবিশ্বাস ও ভয়ের জন্ম দিয়েছে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
গত ৬ জানুয়ারি, শরিয়ত যখন শুনানি কেন্দ্রে নিজের যাবতীয় কাগজপত্র নিয়ে হাজির হলেন, তাঁর উদ্বেগ খালি চোখেই দেখা যাচ্ছিল। তিনি বললেন ‘আমার চাকরির কারণে আমি বহুবছর বাইরে ছিলাম। ফলে ২০০২ সালের লিস্টে আমার নাম ছিল না। আমি ২০১৩ সালে রিটায়ার করেছি, তারপর থেকে পেনশন পাচ্ছি। আমি যখন আর্মিতে যোগ দিয়েছিলাম, তখন ভোটার কার্ড লাগত না। তাই আমি কোনোদিন ভোটার কার্ড করাইনি।’ তিনি আরও বললেন, ২০০২ সালের তালিকায় নাম না থাকায় তিনি ইনিউমারেশন ফর্মও পূরণ করার সুযোগ পাননি। ‘আমার বাবা-মা ২০০২ সালের আগেই মারা গেছেন। আমাদের দাদুকে তো চোখেও দেখিনি, অনেককাল আগে মারা গেছেন।’
দুই দশকের বেশি দেশের সেবা করা একজন মানুষকে নাগরিকত্ব প্রমাণ করার নোটিস পাঠানোর যুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শরিয়তের প্রতিবেশীরা। একজন বললেন ‘একজন প্রাক্তন সেনা জওয়ানের কাছেই যদি নাগরিক হওয়ার প্রমাণ চায়, তাহলে আমাদের মত সাধারণ মানুষের আর কী হবে?’ তাঁর মতে ব্যাপারটা অপমানকর এবং বেদনাদায়ক।
এখন পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো সরকারি প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি, যদিও জানা গেছে যে এই নোটিস এবং সংশ্লিষ্ট কাগজপত্রের বৈধতা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
শরিয়তের ব্যাপারটা অবশ্য কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গোটা ডোমকল মহকুমা জুড়েই এসআইআর নিয়ে ভয় ও উদ্বেগের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। বয়স্ক, নিরক্ষর ও প্রান্তিক বাসিন্দাদের মহকুমার শাসকের অফিসে ডাকা হচ্ছে। কারণ এঁদের অনেকের নাম খসড়া তালিকা থেকে বাদ গেছে বা তাঁদের কাগজপত্রে অসঙ্গতি রয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছে নির্বাচন কমিশন। অনেকেই কাগজপত্রের অভাবে বা জটিল প্রশাসনিক প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন এবং এই আতঙ্ক ক্রমশই বাড়ছে যে গায়ে ‘অনাগরিক’ তকমা লেগে যাবে। ফলে এই মানুষগুলো গভীর মানসিক চাপে ভুগছেন।
ডোমকল থানারই জুগিন্দা মালোপাড়ার ৭৫ বছরের বৃদ্ধা মর্জিয়া বিবির বেলায় এই সংকট খুব স্পষ্ট। মর্জিয়া লিখতে পড়তে পারেন না, জীবনে কখনো স্কুলে যাননি। তাঁর বাবা-মাও মারা গেছেন ২০০২ সালের অনেক আগেই। ফলে তাঁর নাম ২০০২ ভোটার তালিকায় ছিল না। সরকারি আধিকারিকরা বলছেন এই কারণেই তাঁর নাম খসড়া এসআইআর তালিকা থেকে বাদ গেছে। তিনিও ৬ তারিখ মহকুমার শাসকের অফিসে হাজিরা দিতে গিয়েছিলেন। সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরা তাঁকে ধরতেই মর্জিয়া কান্নায় ভেঙে পড়েন। জিজ্ঞেস করেন ‘আমার বাপ-মা অনেককাল আগে মারা গেছে। তাই আমার নাম ২০০২ লিস্টে নেই। আমাকে কি দেশ থেকে বার করে দেবে?’
মর্জিয়া বললেন তাঁর কাছে ভোটার কার্ড নেই কারণ তিনি বাপের বাড়িতে থাকতেন, অথচ তাঁর ভোটার তালিকায় প্রথমবার নাম উঠেছিল বিয়ের পরে শ্বশুরবাড়ির এলাকায়। শুনানির দিন মর্জিয়া যা যা নথি তাঁর আছে – আধার, ভোটার আর রেশন কার্ড – সব নিয়ে এসেছিলেন। বললেন ‘আমি তো কোনোদিন স্কুলে যাইনি। সার্টিফিকেট কোথায় পাব? আমার কাছে যা যা কাগজ আছে সব এনেছি। বাকি বাবুরা ঠিক করবেন।’
ভাটশালা এলাকার শঙ্কর মাল আর তাঁর স্ত্রী সুপর্ণার মত বাসিন্দাদের নিত্য সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে উদ্বেগ। তাঁদের নাম খসড়া তালিকায় উঠেছে বটে, কিন্তু তাঁদের মহকুমার অফিসে ডেকে পাঠানো হয়েছিল নথিতে অসঙ্গতির অভিযোগে। তাঁরা চুপচাপ শুনানির অপেক্ষায় মহকুমা শাসকের দফতরে বসেছিলেন উৎকণ্ঠা, আতঙ্ক আর উদ্বেগ নিয়ে। তাঁরা ঠিক করে বোঝেন না যে ‘অনাগরিক’ তকমা পেলে কী ঘটতে পারে, কিন্তু একটা প্রশ্ন তাঁদের চিন্তায় ফেলেছে – নিজের জন্মস্থানে কি কেউ বহিরাগত হয়ে যেতে পারে?
আরো পড়ুন সোনালী ফিরলেন এবং বর্ণহিন্দু মধ্যবিত্তের মুখোশ খসে পড়ল
এই দম্পতির মতে, তাঁদের পরিবার এই জায়গায় বাস করছে ৭০-৮০ বছর ধরে। ‘আমাদের বাপ ঠাকুর্দারা এখানে বাস করে এখানেই মারা গেছেন।’ বহুবছর আগে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে তাঁদের বাড়ি ভেঙে যায়, সঙ্গে অনেক পুরনো কাগজপত্রও নষ্ট হয়ে যায়। শুনানির জন্যে মাল দম্পতি ভোটার কার্ড, আধার কার্ড আর রেশন কার্ড নিয়ে এসেছিলেন। তবে তাঁদের কাছে জমির মালিকানার প্রমাণ নেই, নির্বাচন কমিশন যে নির্দিষ্ট সময়কালের কাগজপত্র চাইছে তাও নেই। ‘ওনারা এমন এক সময়ের কাগজ চাইছেন যখন আমাদের বাড়িই ছিল না। সব নষ্ট হয়ে গেছিল। আমরা ওসব কাগজ এখন পাব কোথায়?’ শঙ্কর মাল প্রশ্ন তুললেন।
এসআইআরের নোটিসে ১৩ রকম নথি জমা দেওয়া যাবে বলা হয়েছিল, যার বেশিরভাগই এই দম্পতির কাছে নেই। পরিণাম কী হবে তা নিয়ে ওঁরা দুশ্চিন্তায় ভুগছেন।
যে বয়সে মানুষ সম্মান আর নিরাপত্তা নিয়ে নিশ্চিন্তে বাঁচার আশা করে, সেই বয়সে ডোমকলের মাহিষ্য পাড়ার ৬৬ বছরের বৃদ্ধ রঞ্জিত সরকার নিজেকে ভোটার হিসাবে প্রমাণ করতে লাইনে দাঁড়িয়েছেন। ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় নাম না থাকায় রঞ্জিত ৬ তারিখ ডোমকল সাব-ডিভিশনাল ম্যাজিস্ট্রেটদের অফিসে শুনানিতে ডাক পেয়েছিলেন। বললেন ‘শুনানিতে ডেকেছে, এসেছি। আর কী করব? আমি একজন সাধারণ নাগরিক। কমিশনের লোকেদের যা মনে হবে করবে।’
রানিনগর থানার অধীনে কাঠলামারি মোহনগঞ্জে রঞ্জিতের জন্ম। তিনি ডোমকলে আসেন ১৯৭৫ সালে এবং তখন থেকেই এলাকার ভোটার তালিকায় তাঁর নাম রয়েছে। তাঁর দাবি হল, কেবল তাঁর নাম নয়, তাঁরা বাবা আর দাদুর নামও ২০০২ সালের আগে থেকেই ভোটার লিস্টে ছিল। বললেন ‘এই দেশে জন্ম থেকে বাস করার পরে এখন আমাকে আবার নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে বলা হচ্ছে। ভাবলেই শিউরে উঠছি।’
এইরকম অনিশ্চয়তায় বহু বয়স্ক ও প্রান্তিক মানুষই ভুগছেন। পরিচিতি পত্র থাকা সত্ত্বেও এবং বহু প্রজন্ম ধরে এই এলাকায় বাস করা সত্ত্বেও তাঁদের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে জোর দেওয়া হচ্ছে কয়েক দশক আগের কাগজপত্রের কিছু খামতির কারণে।
ইনিউজরুম ওয়েবসাইটের মূল প্রতিবেদন থেকে ভাষান্তরিত। নিবন্ধকার পেশায় সাংবাদিক। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








